দরবার


দরবার একটি ফারসি শব্দ। এর দ্বারা রাজসভা বোঝায় এবং নির্বাহি সরকার অর্থেও শব্দটি ব্যবহূত হয়। মুগলগণ  আমির, মুৎসুদ্দি, দর্শনার্থী, রাজদূত, বিচারপ্রার্থী এবং অন্যান্যদের নিয়ে রাজকীয় সভা অনুষ্ঠান করতেন। তারাই একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দরবার  প্রবর্তন করেন। এটি ছিল রাজপ্রাসাদের একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে একটি আনুষ্ঠানিক সভা। সাংবিধানিকভাবে দরবারে একটি পদানুক্রমিক ধারা অনুসরণ করা হতো। স্বয়ং সম্রাটের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দরবার--আলা ছিল সর্বোচ্চ সভা। প্রাদেশিক সুবাহদার তাঁর মন্ত্রিবর্গ, মুৎসুদ্দি অভিজাতবর্গ এবং উল্লেখযোগ্য নাগরিকদের উপস্থিতিতে দরবার অনুষ্ঠান করতেন। দরবারে সুবাহদার প্রদেশসংক্রান্ত কতিপয় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সম্পাদন করতেন। বিচার বিভাগীয় রায়সহ সুবাহদারের আদেশনামাগুলি দরবারেই ঘোষিত হতো। রাজপুরুষ ও সহচরদের সন্তোষ বিধানকারী, আনন্দ দানকারী এবং সভাকবি, সাধু, দরবেশ এবং পন্ডিতদের নিয়ে সুবাহদার কর্তৃক সামাজিক দরবারও অনুষ্ঠিত হতো।

মুগল দরবার ছিল একটি প্রতিষ্ঠান যা শাসক এবং শাসিতের মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সুযোগ প্রদান করত। দরবারের মধ্যে সুবাহদারগণ আবেদন শুনতেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অভ্যর্থনা জানাতেন, উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন এবং অভিজাত ও সাধারণের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বিষয়ে মন্ত্রণা গ্রহণ করতেন। উপনিবেশিক শাসকগণ মুগল দরবারের জাঁকজমক অনুসরণ করেন। তবে তাদের দরবারে উক্তআলোচনা অংশটি বাদ পড়ে। লর্ড ওয়েলেসলীর সময় হতে বছরে একবার ফোর্ট উইলিয়ম-এর মধ্যে দবরার অনুষ্ঠানের রীতি প্রচলিত হয়। দেশিয় রাজ্যগুলির রাজন্যবর্গ এবং দীউয়ানগণ, বড় বড় জমিদারগণ এবং অনুগৃহীত দেশিয় কর্মকর্তাগণ সরকারের প্রতি তাদের অব্যাহত আনুগত্য প্রকাশ করার জন্য দরবারে উপস্থিত হতেন। মুগল দরবারে প্রচলিত রীতির ন্যায় তাদের দরবারে কিন্তু রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কদাচিৎ শলাপরামর্শ করা হতো। ১৯১১ সালের দিল্লি অভিষেক দররারই ছিল এ ধরনের সমাবেশের মধ্যে বৃহত্তম।

শিখ ধর্মের প্রধান ‘দরবার’ এ বসেন এবং মুসলমান বিভিন্ন সুফি সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক নেতারাও তাই করে থাকেন। বড় বড় জমিদারগণ পুণ্যাহ-র সময় তাদের প্রধান রায়তদের নিয়ে বার্ষিক দরবার অনুষ্ঠান করতেন। পুণ্যাহ-র সময় এবং সরকারের গুরুত্বপুর্ণ প্রজাদের ওপর সম্মানজনক উপাধি বিতরণের সময় জেলা কালেক্টর দরবারে বসতেন। কোনো কোনো স্থানে গ্রাম্য সালিশকেও দরবার বলা হয়। মোটকথা মুগল সম্রাটগণ যে দরবারের উৎপত্তি ঘটান কালক্রমে তা মুগল নির্বাহী কর্তৃত্বের সীমানা অতিক্রম করে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক অন্যান্য ক্ষেত্রেও বিস্তৃতি লাভ করেছে।  [সিরাজুল ইসলাম]