পুণ্যাহ


পুণ্যাহ বাংলার রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত বার্ষিক বন্দোবস্তের একটি উৎসব। জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর পুণ্যাহ উৎসবেরও বিলুপ্তি ঘটেছে। রাজস্ব বন্দোবস্ত ও আদায় সংক্রান্ত বিষয়ে পুণ্যাহ ছিল একটি মুগল যুগের ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় সকল জমিদার, তালুকদার, ইজারাদার এবং অন্যান্য রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তিদেরকে একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হতো। এ অনুষ্ঠানে পূর্বের বছরের রাজস্ব পরিশোধ করা হতো এবং নতুনভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হতো। এ উপলক্ষ্যে নওয়াব দরবার পরিচালনা করতেন এবং যেসকল ব্যক্তি তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারতেন তাদেরকে তিনি সম্মানসূচক খিলাত বা পোশাক পরিয়ে দিতেন। এভাবে জমিদার ও অন্যান্য ভূস্বামীও তাদের রায়ত বা প্রজাবর্গকে নিয়ে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান পালন করতেন। রায়তগণ বিগত বছরের বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করতেন এবং নতুন বছরের বন্দোবস্ত গ্রহণ করতেন। রায়তগণ জমিদারের কাচারিতে একত্রিত হতেন এবং জমিদার অথবা তার নায়েবের কাছ থেকে পান-সুপারি  গ্রহণ করতেন। এ উপলক্ষে নাচগান, যাত্রা, মেলা, গবাদি পশুর দৌড়, মোরগ লড়াই সহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো।

মুগল আমলে পুণ্যাহর নির্দিষ্ট কোন তারিখ ছিল না। যখন থেকে এ উৎসব রাজস্ব বন্দোবস্ত এবং রাজস্ব সংগ্রহের সাথে যুক্ত হলো, তখন থেকেই পুণ্যাহর তারিখ প্রধান ফসল তোলার সময়ে সাধারণভাবে নির্ধারিত হতো। এ বিষয়ে মুর্শিদকুলী খান এর নতুন রীতি হলো, চৈত্র মাসে (বাংলা সনের শেষ মাস, এর ইংরেজি সালের অনুরূপ মাস হলো মার্চ-এপ্রিল) ফসল তোলা শেষ হওয়ার পর পুণ্যাহ উৎসব পালন করা। এরপর তিনি রাজস্ব দিল্লিতে প্রেরণ করতেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল উৎপাদন কম হলে পুণ্যাহ উৎসবেই রাজস্ব মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো। উল্লেখ্য যে, পুণ্যাহ বলতে সমস্ত রাজস্বের আদায়কে বোঝাত না। অনাদায়কৃত রাজস্ব মওকুফ কিংবা ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত করা যেত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে রায়তগণ বকেয়া রাজস্ব মওকুফ পেত। অধিকন্তু, চাষাবাদের জন্য তাদেরকে তাকাবি বা ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হতো। এরূপ ঋণের লেনদেন পুণ্যাহ উৎসবে সম্পন্ন করা হতো।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক দীউয়ানি লাভের পর ১৭৬৬ সালে প্রথম পুণ্যাহ উৎসব অনুষ্ঠিত হয় মুর্শিদাবাদে ইংরেজদের রাজনৈতিক আবাসস্থল মতিঝিলে। ক্লাইভ নিজেই এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং প্রতিবছর এ সামাজিক উৎসব পালনের পক্ষে মতামত দেন। কিন্তু কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স ফোর্ট উইলিয়ম সরকারকে এ পুণ্যাহ উৎসব পালন না করার নির্দেশ দেয়, যদিও বাস্তবে এ নির্দেশ মফস্বলে পালিত হয়নি।

ঐতিহাসিকভাবে, দু ধরনের পুণ্যাহ ছিল- সদর এবং মফস্বল। সদর কিম্বা কেন্দ্রীয় পুণ্যাহ এমন একটি উৎসব যেখানে জমিদার এবং অন্যান্য ভূস্বামিগণ বাংলার দীউয়ানের বাসভবনে অংশগ্রহণ করতেন। মফস্বল পুণ্যাহ উৎসব জমিদারের কাচারিতে অনুষ্ঠিত হতো। এ উৎসবে প্রজাবর্গও অংশগ্রহণ করত। এ রীতি ক্ষীণভাবে চালু ছিল। কারণ সমস্ত জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল না। কিছু শর্তে খাস জমি ইজারদারদেরকে দেওয়া হয়েছিল। খাস জমির বন্দোবস্তের জন্য জোতদার এবং ইজারাদারদের নিয়ে পুণ্যাহ উৎসব পালন করা হতো। এরূপ পুণ্যাহ উৎসব পূর্বে যেমন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হতো সেভাবে না হয়ে কালেক্টোরেট অফিসে অনুষ্ঠিত হতো। জমিদারগণ পুণ্যাহ উৎসব চালু রেখেছিলেন। তারা বরং ব্যাপকভাবেই উৎসব পালন করতেন। ব্যাপকভাবে উৎসব পালন জমিদার ও প্রজাবর্গের মধ্যে স্বাতন্ত্রের চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়। উনিশ শতকের মাঝামাঝির মধ্যে পুণ্যাহ বাংলা নববর্ষ এর সমার্থক হয় এবং প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ১ তারিখে নিয়মিতভাবে তা পালন শুরু হয়। এ উপলক্ষে মেলা অনুষ্ঠিত হতো। ১৯৫০ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর বিলুপ্তির পর পুণ্যাহ উৎসব বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তার কিছু অনুষ্ঠানাদি যেমন নৌকা বাইচ, মেলা, পুতুল নাচ, এবং নববর্ষ উদযাপন এখনও পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাংলা নববর্ষের উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং বর্তমানে তা আরও জাঁকজমক সহকারে পালিত হচ্ছে।  [বিলকিস রহমান]