ডাকটিকিট


ডাকটিকিট  উপমহাদেশের প্রথম ডাকটিকিট চালু করা হয় ১ অক্টোবর, ১৮৫৪। এক পয়সা মূল্যের পোস্টকার্ড এবং আধা আনা মূল্যের খামে ভারতের যে কোন অংশে চিঠি পাঠাবার ব্যবস্থা হয়। ব্রিটিশ ভারতে বিভিন্ন সময়ে ছাড়কৃত ডাকটিকেটের সংখ্যা:  ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (১৮৫৪-১৮৫৮) শাসনামলে ১৮টি, রানী ভিক্টোরিয়ার (১৮৫৮-১৮৮২) শাসনামলে ১৯টি, রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের (১৮৮২-১৯১১) শাসনামলে ২৪টি, রাজা পঞ্চম জর্জের (১৯১১-১৯৩৫) শাসনামলে ৬৭টি এবং রাজা ষষ্ঠ জর্জের (১৯৩৫-১৯৪৭) শাসনামলে ৫২টি। এ সময়ের মোট ১৮০টি ডাকটিকেটের মধ্যে কেবল ২৮টি হলো স্মারক ডাকটিকিট। বাংলাদেশের কোন স্থাপনা বা ব্যক্তিত্ব এতগুলি ডাকটিকিটের চিত্রে স্থান পায় নি। ষষ্ঠ জর্জের আমলে অবিভক্ত ভারত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।

প্রথম প্রকাশিত ডাকটিকিট [সংগ্রহ: এ.টি.এম আনোয়ারুল কাদের]

১৯৪৭ সাল থেকে পূর্ববাংলার জনসাধারণ পাকিস্তানের চালু করা ডাকটিকিট ব্যবহার আরম্ভ করে। দেশ বিভাগের পরই নিজস্ব ডাকটিকিট মুদ্রণ ও প্রকাশের পর্যাপ্ত সময় না থাকায় সে সময়ে প্রচলিত ব্রিটিশ সরকারের নামাঙ্কিত ডাকটিকিটে ‘পাকিস্তান’ কথাটি ইংরেজিতে ছাপিয়ে নিয়ে ব্যবহারের পাশাপাশি সরকার ডাকটিকিটে দেশের নাম হাতে লিখে চালু করারও অনুমতি দেয়। পাকিস্তানের ডাকবিভাগ বিদ্যমান ডাকটিকিটসমূহের উপর পাকিস্তান কথাটি ছাপানোর কাজ করাচি, লাহোর, হায়দ্রাবাদ, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন ছাপাখানায় সম্পন্ন করে। বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন মেশিনে, বিভিন্ন অক্ষরে ছাপার কাজ করায় এবং ছাপার কালির বিভিন্নতার কারণে ডাকটিকিটের ছাপার অক্ষর, কালির ঘনত্ব, রং এবং বাহ্যিক আদল ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেছিল।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অদক্ষতার কারণে পাকিস্তানের নিজস্ব ডাকটিকিট প্রকাশ হতে প্রায় এক বৎসর সময় লেগে যায়। পাকিস্তানের নিজস্ব ডাকটিকিট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম চালু করা হয় ৯ জুলাই ১৯৪৮।     এরপর ১৪ আগস্ট ১৯৪৮ তারিখে আরও ২০টি ডাকটিকিট  চালু করা হয়। এই ডাকটিকিটগুলির মধ্যে মাত্র তিনটি ডাকটিকিটে পূর্ব পাকিস্তানের একটি ভবন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) চিহ্নিত ছিল। পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডাকটিকিটে বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হয় নি। পাকিস্তানের ২৪ বছরে (১৯৪৭-১৯৭১) সর্বমোট ২৯৬টি ডাকটিকিট ছাড়া হয়, যার মধ্যে মাত্র ৫১টি ডাকটিকিটে পূর্ব পাকিস্তানের বিষয় অন্তর্ভূক্ত ছিল। পাকিস্তানের ডাকটিকিটে মাত্র একজন বাঙালি ব্যক্তিত্বকে সম্মানিত করা হয়েছিল, তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধের সময়  মুজিবনগর সরকার বেশ কয়েকটি ফিল্ড পোস্ট অফিস চালু করে এবং মুক্তাঞ্চলের ডাকঘরসমূহের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর পরিবহণ ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডাকবিভাগকে ন্যস্ত করে। ডাকটিকিট ডিজাইনার বিমান মল্লিক আটটি ডাকটিকিটের ডিজাইন করেন এবং তা ১৯৭১ সনের জুনে মুজিবনগর সরকারের কাছে পাঠান এবং সেগুলি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ডাকটিকিটগুলি লিথোগ্রাফি পদ্ধতিতে সাদা বর্ডার ঘেরা জলছাপবিহীন নিরাপত্তা কাগজের প্রতিটিতে দৈর্ঘে ও প্রস্থে ১০×১০টি হিসেবে অর্থাৎ মোট ১০০টি করে ছাপানো হয়েছিল। প্রতি ডাকটিকিটের দৈর্ঘে ও প্রস্থে ছিদ্রক মাপ ছিল ১৪×১৪.৫ (প্রতি ২ সেন্টিমিটার দৈর্ঘে)। এই নতুন ডাকটিকিটের আটটির সেট কলকাতাস্থ বাংলাদেশ মিশন থেকে ২১.৮০ রুপি এবং ডাকটিকিট লাগানো উদ্বোধনী খামের (ফার্স্ট ডে কভার) মূল্য ২২ রুপি নির্ধারিত হয়। ইংল্যান্ডে এই নতুন ডাকটিকিটের সেট প্রতিটি ১.০৯ পাউন্ড স্টার্লিং মূল্যে বিক্রয় করা হয় এবং এর সাথে ২০ পেনি হ্যান্ডলিং চার্জ যোগ করা হয়েছিল। উদ্বোধনী খামের নকশায় খামের নিচের দিকে মুদ্রিত ছিল ‘বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট’, ছোট অক্ষরে ‘উদ্বোধনী খাম’ কথাটি লেখা ছিল ডানপাশে এবং বামপাশে ‘বাংলাদেশ’ কথাটি বড় অক্ষরে নিচ থেকে উপর পর্যন্ত খোদিত ছিল। লন্ডনে মুদ্রিত উদ্বোধনী খামের রং ছিল উজ্জ্বল সিঁদুরে কমলা। অন্যদিকে কলকাতা থেকে মুদ্রিত উদ্বোধনী খামের রং ছিল গাঢ় সবুজ এবং এর কাগজের মানও লন্ডনের খামের মতো উন্নত ছিল না।

সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর ডাকটিকিটগুলি চালু করার তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৯ জুলাই ১৯৭১ সনে।

২৯ জুলাই ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের প্রথম চালু করা ডাকটিকিটগুলির বিষয় ছিল- বাংলাদেশের মানচিত্র (১০ পয়সা); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃশংস গণহত্যা (২০ পয়সা), সাড়ে সাত কোটি নাগরিক (৫০ পয়সা), মুক্তিযুদ্ধের পতাকা (১ রুপি), শেকল ভাঙা (২ রুপি), ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল (৩ রুপি),  শেখ মুজিবুর রহমান (৫ রুপি) এবং বাংলাদেশকে সমর্থন করুন (১০ রুপি)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর এ.এম আহসানুল্লাহ বাংলাদেশ ডাক বিভাগের প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন। একই দিনে বাংলাদেশ সরকারের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে জন স্টোনহাউস, ব্রিটিশ এমপি, বিশেষ সামরিক হেলিকপ্টারে ঢাকা আসেন। স্টোনহাউস ২৯ জুলাই ১৯৭১-এ চালু করা মূল্যবান প্রথম আটটি ডাকটিকিটের সেটের কয়েকশত কপি তার সাথে নিয়ে এসেছিলেন। একই সাথে তিনি এই আটটি মূল্যবান ডাকটিকিটের সেটের সাথে আরও এনেছিলেন ১০ পয়সা, ৫ রুপি এবং ১০ রুপি মূল্যমানের তিনটি ডাকটিকিট, যার উপর ছোট অক্ষরে বাংলা এবং ইংরেজিতে ছাপা ছিল ‘বাংলাদেশ মুক্তি’। এই এগারোটি ডাকটিকিট ঢাকা জিপিও থেকে ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ বিক্রয় আরম্ভ হয়।

ইতিপূর্বে ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী কিছু জেলা ১৬ ডিসেম্বরের আগেই মুক্ত হয় এবং এ সকল জেলার ডাকঘরসমূহ অনতিবিলম্বে কাজ আরম্ভ করে। যশোর প্রধান ডাকঘর ৮ ডিসেম্বর থেকে কাজ শুরু করে। বাংলাদেশের কোন ডাকটিকিট না থাকায় যশোরে পোস্ট মাস্টার নিজ উদ্যোগে তার কাছে থাকা পাকিস্তানের নয়টি ডাকটিকিটের উপর প্রেস থেকে ছাপিয়ে নিয়ে সাধারণের ব্যবহারের জন্য ব্যবস্থা নেন। বাংলাদেশ ডাকবিভাগের মহাপরিচালক বিষয়টি অবহিত হওয়া মাত্র ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ তারিখে ওই সকল ডাকটিকেটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেন।

বাংলাদেশের নতুন সরকার ডাকটিকিট ছাপানোর ক্ষেত্রে যে প্রধান সমস্যার সম্মুখীন হয় তার মধ্যে নিজস্ব নিরাপত্তা ছাপাখানা, উপযুক্ত প্রযুক্তি এবং যথোপযুক্ত উপাদানের অভাব অন্যতম। বিদেশ থেকে ডাকটিকিট ছাপিয়ে আনা ছিল সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। এছাড়া প্রয়োজনীয় ডাকটিকিটের চাহিদাও ছিল বিপুল। অথচ সে সময় দেশের বিভিন্ন ডাকঘর ও ট্রেজারিতে বিপুল পরিমাণ পাকিস্তান সরকারের ডাকটিকিট জমাকৃত ছিল। উপযুক্ত পরিবহণের অভাব এবং নিরাপত্তার কারণে সমস্ত ডাকঘর থেকে ওই সকল ডাকটিকিট ফেরত আনা, সেগুলির উপর নতুন নাম ছাপানো বাস্তবসম্মত ছিল না। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশ এবং মনস্তাত্বিক কারণে কোন পরিবর্তন ছাড়া ওই সকল ডাকটিকিট ব্যবহার অব্যাহত রাখাও ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত।

১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে সকল ডাকঘরের উদ্দেশ্যে একটি সার্কুলার জারি করে নিজস্ব উদ্যোগে দেশের নাম সম্বলিত রাবার সিল তৈরি করে ডাকঘরসমূহের কাছে থাকা ডাকটিকিট ও ডাক বিভাগীয় কাগজপত্রে উক্ত সিল ব্যবহারের নিদের্শ দেওয়া হয়। সকল সরকারি অফিসে বিদ্যমান কাগজপত্র, সাইনবোর্ড ও রাষ্ট্রের নাম পাকিস্তানের স্থলে ‘বাংলাদেশ’ লিখে ব্যবহার করা সংক্রান্ত সরকারের সাধারণ নির্দেশের সাথে এ সার্কুলারটি ছিল সঙ্গতিপূর্ণ। ডাকবিভাগ কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করেছিল যে, সুনির্দিষ্ট ডিজাইন ও অক্ষরের আকৃতিবিশিষ্ট রাবার সিল এবং তা’ মুদ্রণের কালির রং সম্পর্কিত নির্দেশ জারি করা বাস্তবসম্মত নয়। সে কারণে ব্যবহূত রাবার সিলসমূহের ডিজাইনে যথেষ্ট পরিমাণে হেরফের ঘটেছে। তাছাড়া সিল-এ ব্যবহূত কালির রং ও ভিন্ন ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা’ ছিল বেগুনি, তা’ছাড়া ডাক কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা পোস্টমার্ক দেওয়ার কালির রং ছিল কালো। অল্প কিছু স্থানে সবুজ ও লাল রংও ব্যবহার হয়েছে। রাবার সিলযুক্ত ডাকটিকিটের ব্যবহার ৭ এপ্রিল ১৯৭৩-এর জারি করা নির্দেশ অবধি অনুমোদিত ছিল। বাংলাদেশ ডাকবিভাগ ৭ এপ্রিল থেকেই ১, ২, ৩, ৫, ১০, ২০, ২৫, ৫০, ৬০, ৭৫ ও ৯০ পয়সা এবং ১, ২, ৫ ও ১০ টাকা মূল্যমানের ১৪টি সাধারণ বা নিয়মিত ডাকটিকিট চালু  করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এটিই ছিল প্রথম চালু করা নিয়মিত ডাকটিকিটের সেট, যা সারা দেশে ব্যবহারের জন্যে ছাড়া হয়েছিল।

১৯৭১-এর জুলাই থেকে ২০০৯ সনের ডিসেম্বর অবধি সময়ে বাংলাদেশ ডাকবিভাগ মোট ১০১২টি বিভিন্ন ডাকটিকিট চালু করেছে। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা ছাপাখানা চালুর পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ ডাকবিভাগকে তার ডাকটিকিটসমূহ বিদেশের (ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, অস্ট্রিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন) বিভিন্ন নিরাপত্তা ছাপাখানা থেকে  ছাপিয়ে আনতে হয়েছে।

বিদেশের বেশ কয়েকজন গ্রফিক ডিজাইনারসহ দেশের বেশ কয়েকজন গ্রাফিক ডিজাইনার ও প্রখ্যাত শিল্পী, যেমন কাইয়ূম চৌধুরী, হাশেম খান,  নিতুন কুন্ড প্রমূখ বাংলাদেশের ডাকটিকিটের নকশা প্রণয়ন করেছেন। গত প্রায় চার দশকে প্রকাশিত সকল ডাকটিকিটের মোট মূল্যমান টাকা ৪২২৯.৫৪, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি ডাকটিকিট আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত উচ্চমূল্যে কেনা-বেচা হয়ে থাকে।  [সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান]