জাতীয় প্রেসক্লাব


জাতীয় প্রেসক্লাব  জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকদের একটি সংঘবিশেষ। বিশ্বের কোথাও কোথাও এ ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রেসগিল্ড নামেও পরিচিত। এটি সাংবাদিকদের সামাজিক মিলনকেন্দ্র বা অবসর বিনোদনের স্থল হলেও মূলত বুদ্ধিচর্চার পীঠস্থান হিসেবেই এর সর্বাধিক পরিচিতি। প্রেসক্লাবের গঠনকাঠামো ও আদর্শ-উদ্দেশ্য সব দেশে হুবহু একরকম নয়। ঢাকায় অবস্থিত জাতীয় প্রেসক্লাবই বাংলাদেশের প্রধান প্রেসক্লাব। প্রায় প্রতিটি জেলা ও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে আলাদা আলাদা প্রেসক্লাব রয়েছে। স্ব-নিয়ন্ত্রিত এ প্রতিষ্ঠানগুলির গঠনবিধি ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য স্বকীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।

জাতীয় প্রেস ক্লাব

অবিভক্ত বাংলায় প্রথম প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালে কলকাতায়। এর প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার পূর্ণচন্দ্র সেন এবং সেক্রেটারি ছিলেন হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার মণীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন অমৃতবাজার পত্রিকার অবনিমোহন মজুমদার ও দ্য স্টেটসম্যান-এর ডব্লিউ. এইচ নানি-সহ ৪৫ জন সাংবাদিক।

দেশ বিভাগের পর এ অঞ্চলে প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব ইন্ডিয়ার প্রতিনিধি পি.এম বালান, ইংল্যান্ডের ডেইলি মেইল-এর প্রতিনিধি দৈনিক সংবাদ-এর তৎকালীন সম্পাদক খায়রুল কবির এবং বার্তা সম্পাদক সৈয়দ নূরুদ্দিন ছিলেন এর উদ্যোক্তা। দু বছর পর এ আলোচনায় যুক্ত হন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ডাইরেকটর অব ইনফরমেশন সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন এবং দি অবজার্ভার সম্পাদক আব্দুস সালাম। এক পর্যায়ে এপিপি-র ম্যানেজিং এডিটর এ.এম.এ আজিমকে সভাপতি এবং ইউপিপি-র সম্পাদক আব্দুল মতিনকে সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাব (ইপিপিসি) নামে স্মারক পরিমেল সমিতি গঠিত হয়।

১৯৫২ সালে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাংবাদিকদের এক সম্মেলনে প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। কিন্তু সে সময় এ ধারণা সমর্থন লাভ করতে পারে নি। অবশেষে ১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৮ তোপখানা রোডের সরকারি লাল ভবনটি প্রেসক্লাবের নামে মাসিক ১০০ টাকা ভাড়ায় বরাদ্দকৃত হয়। ১৯৪৭-এর আগে এ বাড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কোয়াটার ছিল এবং এতে বাস করতেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী  সত্যেন্দ্রনাথ বসু। বাড়িটি প্রেসক্লাবের নামে বরাদ্দ দানের ক্ষেত্রে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চিফ সেক্রেটারি এন. এম খানের বিশেষ ভূমিকা ছিল। এ জন্য তাঁকে প্রেসক্লাবের প্রথম আজীবন সদস্যপদ দান করা হয়।

পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাবের প্রথম সভাপতি হন দৈনিক আজাদ-এর যুগ্ম সম্পাদক মুজীবুর রহমান খাঁ। প্রথম সম্পাদক হন দৈনিক সংবাদের জহুর হোসেন চৌধুরী। ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দ্য মর্নিং নিউজ-এর এইচ হোসায়নী, এপিপি-র এ এম.এ আজিম ও আবুল হাশিম, ইউপিপি-র আবদুল মতিন, পিটিআই-এর ঢাকা প্রতিনিধি পি. এম বালান এবং দ্য স্টেটসম্যান-এর ঢাকা প্রতিনিধি আবদুল ওহাব। ব্যবস্থাপনা কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৫ সালের ১২ জানুয়ারি। ১৯৫৯-৬০ সালের দিকে প্রেসক্লাবকে ক্লাব হিসেবে রেজিস্ট্রি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রেসক্লাব সংশোধন করে নাম রাখা হয় জাতীয় প্রেসক্লাব। এ সময় সভাপতি ছিলেন আবদুল আউয়াল খান, অবৈতনিক সম্পাদক ছিলেন এ. এস. এম হাবিবুল্লাহ। ১৯৯৫ সালে জাতীয় প্রেসক্লাবের পতাকা ও প্রতীক নির্বাচন করা হয়।

পঞ্চাশের দশকে প্রেসক্লাবের সদস্য ছিল প্রায় পঞ্চাশ জন। ১৯৬১ সালে সাংবাদিকদের প্রথম ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ ঘোষিত হয়। ফলে সংবাদপত্র, সাংবাদিক এবং সে সঙ্গে ক্লাবের সদস্য সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্তমান গঠনতন্ত্রে তিন শ্রেণির সদস্যপদ দানের বিধান রয়েছে জীবন, স্থায়ী ও সহযোগী। দীর্ঘ সাংবাদিকতা ও প্রেসক্লাবের প্রতি বিশেষ অবদানের জন্য জীবন সদস্যপদ, পেশাদার সাংবাদিকদের স্থায়ী সদস্যপদ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ কর্মকর্তাদের সহযোগী সদস্যপদ দান করা হয়। সহযোগী সদস্যদের ভোটাধিকার নেই। সব মিলে এখন সদস্য সংখ্যা প্রায় আটশ।

১৯৫৪ সালে যে লাল ভবনটিতে প্রেসক্লাব স্থাপিত হয়েছিল এখন আর তা নেই। ১৯৭৫ সালে তদানীন্তন সরকার প্রধান ঘোষণা করেন, সচিবালয় সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন বিধায় প্রেসক্লাবকে তার বর্তমান স্থান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি এর পরিবর্তে শিল্পকলা একাডেমী সংলগ্ন এক বিঘা জমি বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু প্রেসক্লাব সদস্যদের আপত্তির মুখে জায়গাটি আর পরিবর্তন করা হয় নি। ১৯৭৭ সালের ২২ ডিসেম্বর সরকার জাতীয় প্রেসক্লাবের অনুকূলে এ জায়গাটি বরাদ্দ দেন। ১৯৭৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং এর সমুদয় ব্যয়ভার সরকার বহন করে। দুটি অডিটোরিয়াম, ভিআইপি লাউঞ্জ, ক্যান্টিন, টিভি কক্ষ, অতিথিশালা, কম্পিউটার সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার সব মিলে জাতীয় প্রেসক্লাব আজ একটি পরিপূর্ণ উন্নতমানের প্রতিষ্ঠান। দেশিয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের অনেকেই প্রেসক্লাবে এসেছেন এবং এখানে ভাষণ দিয়েছেন।

জাতীয় প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের একটি প্রফেশনাল ক্লাব হলেও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে গোড়া থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গাবিরোধী শান্তি মিছিল, ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রতিবাদ মিছিল এ প্রেসক্লাব থেকে শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে স্বাধিকার আন্দোলন, একাত্তরের  মুক্তিযুদ্ধ, আরও পরে গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় এবং স্বৈরশাসনের দুঃসহ দিনগুলিতে প্রেসক্লাবই হয়ে উঠেছিল আন্দোলন ও সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী প্রেসক্লাব ভবনে মর্টারশেল নিক্ষেপ করেছিল।  [আমিনুর রহমান সরকার]