জঙ্গনামা


জঙ্গনামা  মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্যভিত্তিক যুদ্ধবিষয়ক কাব্য। ফারসি ‘জঙ্গ’ শব্দের অর্থ যুদ্ধ, আর ‘জঙ্গনামা’ শব্দের অর্থ তদ্বিষয়ক গ্রন্থ বা রচনা। বিশেষত  হযরত মুহম্মাদ (স.) ও তাঁর স্বজনদের যুদ্ধই এ শ্রেণীর কাব্যের মূল বিষয়। যেসব যুদ্ধের ঘটনা ও পরিণাম অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক, সাধারণত সেসব যুদ্ধের কথাই মানুষকে বেশি আলোড়িত করে। তাই আরবি-ফারসি সাহিত্যে যেমন, বাংলা সাহিত্যেও তেমনি ‘জঙ্গনামা’ বলতে বিশেষভাবে কারবালার যুদ্ধ ও তার বিষাদময় ঘটনাবলি সংক্রান্ত রচনাকেই বোঝায়।

কারবালা-কেন্দ্রিক কাব্যের অপর নাম মর্সিয়া সাহিত্য। আরবি ‘মর্সিয়া’ শব্দের অর্থ শোক। শোকবিষয়ক রচনাকে মর্সিয়া সাহিত্য বা শোককাব্য বলা হয়। অতএব জঙ্গনামা ও মর্সিয়া সাহিত্যের মধ্যে বিষয়গত মিল থাকলেও আঙ্গিক ও রসগত পার্থক্য আছে। জঙ্গনামা ও মর্সিয়া সাহিত্য প্রথমত আরবে, পরে পারস্যে বিকাশ লাভ করে এবং মধ্যযুগে মুসলিম শাসনামলে এ সাহিত্যধারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলায় এ কাব্যধারা মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।

জঙ্গনামা শ্রেণীর কাব্যধারার উল্লেখযোগ্য কবি ও কাব্যের নাম হলো:  শেখ ফয়জুল্লাহ (ষাল’শ শতক, জয়নবের চৌতিশা),  দৌলত উজির বাহরাম খান (ষোল’শ শতক, জঙ্গনামা), মুহম্মদ খান (সতের’শ শতক, মকতুল হোসেন), শেরবাজ (আঠার’শ শতক, কাশিমের লড়াই ও ফাতিমার সুরতনামা), হেয়াত মামুদ (আঠার’শ শতক, জারি-জঙ্গনামা), জাফর (আঠার’শ শতক, শহীদ-ই-কারবালা ও সখিনার বিলাপ), হামিদ (আঠার’শ শতক, সংগ্রাম হুসেন), ফকির গরিবুল্লাহ (আঠার’শ শতক, জঙ্গনামা  ও সোনাভান), মুহম্মদ হামিদুল্লাহ খান (উনিশ’শ শতকের প্রথমার্ধ, গুলজার-ই-সাহাদৎ), ওয়াহিদ আলী (উনিশ’শ শতকের প্রথমার্ধ, বড় জঙ্গনামা), জনাব আলী (উনিশ’শ শতক, শহিদ-ই-কারবালা), মুহম্মদ মুনসি (উনিশ’শ শতক, শহিদ-ই-কারবালা), মুহম্মদ ইসহাকউদ্দীন (বিশ শতকের প্রথমার্ধ, দাস্তান শহিদ-ই-কারবালা), কাজী আমীনুল হক (বিশ শতকের প্রথমার্ধ, জঙ্গে কারবালা) ইত্যাদি। এসব কাব্য বাংলার মুসলিম সংস্কৃতিকে একটা স্বতন্ত্র পরিচয় দান করেছে। [খন্দকার মুজাম্মিল হক]