চামড়া শিল্প


চামড়া শিল্প  দীর্ঘকাল ধরেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানির জন্য চামড়া এবং চামড়াজাত সামগ্রী উৎপাদন করে আসছে। কাঁচা চামড়া এবং সেমিপাকা চামড়া বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি সামগ্রী। সব সময়ই বিশ্ব বাজারে এ দেশের ছাগলের চামড়ার চাহিদা রয়েছে। গত দু দশকে এ খাতে উল্লেখযোগ্য আধুনিকায়ন ঘটেছে এবং এর ফলে বিশ্বে প্রথম শ্রেণির চামড়া ও চামড়ার তৈরি সামগ্রী প্রস্ত্ততকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশ শতকের সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে পরবর্তী সরকারগুলি চামড়া শিল্পকে রপ্তানি মূল্যের ওপর ভর্তুকি প্রদান করে আসছে।

চামড়া শিল্প

শতকরা ৯৫ ভাগ কাঁচা চামড়া এবং চর্মজাত দ্রব্যাদি, প্রধানত আধা পাকা ও পাকা চামড়া, চামড়ার তৈরি  পোশাক এবং জুতা হিসেবে বিদেশে বাজারজাত করা হয়। অধিকাংশ চামড়া এবং চামড়ার সামগ্রী রপ্তানি করা হয় জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, রাশিয়া, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর এবং তাইওয়ানে। এসব রপ্তানির মূল্য সংযোজনের শতকরা ৮৫ ভাগ স্থানীয় এবং ১৫ ভাগ বিদেশি। ঢাকা মহানগরীর প্রধানত হাজারীবাগ এলাকায় বর্তমানে প্রায় ১০০ চামড়ার কারখানা চালু রয়েছে। ১৯৯৮ সালে চামড়া খাতে বিদেশে রপ্তানি হয় ১৬ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের ১৭ কোটি ৮০ লক্ষ বর্গফুট চামড়া।

২০০৯ সালে বিদেশে রপ্তানি হয় ২৮ কোটি ৮৪ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের চামড়া। বিশ্বের চামড়া খাতে রপ্তানির শতকরা দু ভাগ হচ্ছে বাংলাদেশের। চর্মজাত সামগ্রী যথা জুতা, স্যান্ডেল, জ্যাকেট, হাত মোজা, ব্যাগ, মানি ব্যাগ, ওয়ালেট, বেল্ট ইত্যাদি রপ্তানি করে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে।

বাংলাদেশে রয়েছে বিপুলসংখ্যক পশু পালনের মতো ঘাস ও গাছপালার সমারোহ। বাংলাদেশের কাঁচা চামড়া গুণগতভাবে ভাল। কারণ এ দেশের মাঠে ও ফসলের ক্ষেতে চামড়ার জন্য ক্ষতিকর কাঁটাতারের ব্যবহার নেই। কুষ্টিয়ার কালো ছাগলের চামড়া চমৎকার গঠন এবং প্রসার-ক্ষমতার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। এদেশে গৃহপালিত পশু সযত্নে প্রতিপালনের বিষয়টিও চামড়ার গুণগত মান রক্ষায় অবদান রাখে।

শতকরা ৪০ ভাগ চামড়া সরবরাহ হয় প্রতিবছর মুসলমানদের পবিত্র  ঈদুল আযহা উৎসবে কোরবানিকৃত পশুর চামড়া থেকে। দৈনন্দিন মাংস সরবরাহের জন্য জবাইকৃত পশুর চামড়া ছাড়াও বিবাহ ও অন্যান্য উৎসবাদি উদযাপন থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চামড়া সংগৃহীত হয়। রপ্তানি মূল্যের ওপর ভর্তুকি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে চামড়ার ট্যানিং শিল্প উন্নয়নের প্রসার ঘটছে, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে কাঁচা চামড়ার সরবরাহ দ্বিগুণ হয়েছে। উৎপাদিত সামগ্রীর পরিমাণ বৃদ্ধিকল্পে এ খাতে বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে সহযোগিতা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদান এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক চামড়ার রপ্তানি বাজার পরিবীক্ষণ করা।

বাংলাদেশের চামড়ার রপ্তানি বাজার প্রতিবছর ১০-১৫% বাড়ছে এবং এ অঙ্কে আয় দাঁড়িয়েছে বছরে গড়ে ২২৫ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে উন্নয়নশীল বিশ্বে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিলাস দ্রব্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, বস্ত্তত উন্নতমানের চামড়ার সামগ্রী সবসময়ই একটি উন্নত বিলাস দ্রব্য হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের মসৃণ চামড়া জাপান এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। চামড়া শিল্পের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হওয়ার পিছনে দেশে মজুরির কম হার এবং ‘ওয়েট ব্লু’ চামড়া রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। পুরানো ঢাকার একটি ক্ষুদ্র এলাকায় চামড়ার বেশির ভাগ শিল্প ইউনিট স্থাপনের ফলে পরিবেশের ব্যাপারে যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে তা নিরসনের জন্য চামড়া শিল্প শহরের বাইরে নেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে।

বাংলাদেশের চামড়া উৎপাদানকারীরা কেবল উৎপাদন এবং রপ্তানি কাজে সম্পৃক্ত থাকতে আগ্রহী। নিম্ন পর্যায়ের কর্মকান্ডে তাদের তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবুও পুমা, পিভোলিনোস, হুগো বস ইত্যাদি বিখ্যাত কোম্পানি যে বাংলাদেশ থেকে চর্মজাত শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ করছে তা থেকেই বোঝা যায় চামড়া শিল্পের বিকাশে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।  [এস.এম মাহফুজুর রহমান]