পোশাক


পোশাক ঋগ্বেদ (আনু. খ্রি.পূ ২৫০০-১৫০০) কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র এবং আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দেড় হাজার বছর আগে রচিত উপনিষদে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য থেকে গাঙ্গেয় সমভূমিতে পোশাক ব্যবহারের সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারতে (খ্রি.পূ ৪র্থ-খ্রি ৪র্থ) বিখ্যাত পৌরাণিক নায়কদের বেশভূষা ও পোশাক-পরিচ্ছদের গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ রয়েছে যেমন ধর্মীয় কৃত্যে, উৎসবাদিতে, শিকার উপলক্ষে, পূত ক্রিয়াকর্মে এবং নববধূর সাজসজ্জাতে ব্যবহূত পোশাকের বর্ণনা। ভারতীয় গাঙ্গেয় সভ্যতার প্রাচীন কেন্দ্রগুলির খননকার্যের ফলে সুতো কাটার ও বস্ত্রবয়নের ছোট ছোট কল এবং কাপড় রং করার চৌবাচ্চার সন্ধান পাওয়া গেছে। একই জায়গাতে প্রাপ্ত মাটির ও পাথরের ছোট ছোট মূর্তি এবং ভাস্কর্য মূর্তিগুলি সাধারণ নরনারীর ও রাজরানীদের পরিধেয় পোশাকের পরিচয় তুলে ধরে। বাংলাদেশে দুই চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন (পঞ্চম শতক) ও হিউয়েন-সাঙের (সপ্তম শতক) ভ্রমণ বৃত্তান্তে ঐ সময়ের মানুষদের পরিধেয় পোশাকের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গের দিনাজপুর ও ময়নামতীতে (অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী) প্রাপ্ত পোড়ামাটির চমৎকার ফলকসমূহ ঐ  সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পরিচয় প্রদান করে।

সাঁচি, ভরত, অমরাবতী ও উড়িষ্যাতে অবস্থিত প্রাচীন ভারতীয় প্রস্তর নির্মিত ও পোড়ামাটির ভাস্কর্যসমূহ এবং বাংলাদেশের দিনাজপুরের কান্তনগরে ও কুমিল্লার  ময়নামতী এলাকায় প্রাপ্ত পোড়ামাটির চমৎকার সূক্ষ্ম কাজ প্রাচীন ও মধ্যযুগের সামাজিক অবস্থার ওপর যথেষ্ট আলোকপাত করে। প্রস্তর ও মৃত্তিকা নির্মিত এইসব আলঙ্কারিক কাজ সে সময়ের সাধারণ ও অভিজাত মানুষদের পোশাক-পরিচ্ছদ সম্বন্ধে সমৃদ্ধ তথ্যাবলি তুলে ধরে। দেখা যায়, নারী মূর্তিগুলি দড়ি বা কোমর-বেষ্টনী দিয়ে অাঁটকানো বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের কটিবস্ত্র পরিহিতা এবং অন্য নারীমূর্তিগুলি কাঁধ পর্যন্ত বস্ত্রাবৃত। ক্ষুদ্রাকৃতির পুরুষমূর্তিগুলির পরিধানে বেশ শক্তভাবে অাঁটা ধুতি এবং তা কখনও কখনও কাঁধ পর্যন্ত প্রলম্বিত, মস্তকের উষ্ণীষ ও দৈবৎ ব্যবহৃত অলঙ্কার বিশদ শৈলীর পরিচায়ক। কিছু পোশাকে লক্ষণীয় সূক্ষ্ম সূচিকর্ম ও বয়নের রীতিকৌশল। রাজপুরুষদের অনুচরবৃন্দ ও সৈন্যদের পোশাকের মধ্যে রয়েছে অাঁটো জামা, লম্বা আলখাল্লা, কোমরবন্ধ, পাগড়ি, মাথায় বাঁধার রুমাল এবং ঝালরওয়ালা ঘাগরা জাতীয় কাপড়। অনেক মূর্তিতে পোশাকের স্বল্পতা থাকলেও সেগুলিতে আভরণ হিসেবে রয়েছে প্রচুর সংখ্যক চুড়ি, বাহুবন্ধনী, পায়ের মল, গলার হার এবং কানের মাকড়ি। সপ্তম শতকে হিউয়েন-সাঙের বর্ণনাতে যে পোশাকগুলির বিবরণ রয়েছে সেগুলি দরজি দিয়ে তৈরি নয় কিংবা সেলাই করা নয়। দীর্ঘ গ্রীষ্মকালের তাপ প্রতিরোধের জন্য অধিকাংশ মানুষ শাদা কাপড় পরত।পুরুষরা একটা লম্বা কাপড় কটি বেষ্টন করে বাহুর নিচে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে শরীর পেঁচিয়ে ডান দিকে ঝুলিয়ে দিত।

আচকন

মেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদও শরীরকে আচ্ছাদন করে কাঁধ ও মাথার উপর পর্যন্ত প্রসারিত হতো। তাদের কেশ পরিচর্যার ধরন ছিল শঙ্কুসদৃশ খোঁপা, সাধারণ খোঁপা এবং শিথিল অলকগুচ্ছ। পুরুষরা বয়নকৃত অথবা সূচিকর্মযুক্ত টুপি এবং জপমালা পরত।

কালিদাসের (আনু. খ্রি.পূ ১ম/খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতক) রচনাতে শিকারের পোশাক, সন্ন্যাসীর পোশাক ও ভিক্ষুকের পোশাকের উল্লেখ রয়েছে। তাঁর উল্লিখিত বস্ত্তসমূহ থেকে উষ্ণ ও শীতল আবহাওয়ার উপযোগী পোশাকের ধারণা লাভ করা যায়। চীনাংশুক নামক রেশমি বস্ত্রের উল্লেখ আছে, যার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নির্দেশ দেয় যে, এ বস্ত্র চীন থেকে আনা হয়েছিল। এমনও সূক্ষ্ম কাপড়ের বিশেষ বর্ণনা রয়েছে যাতে জানা যায় প্রাচীন কালে গাঙ্গেয় উপত্যকায় উৎপন্ন  মসলিন ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যেত।

পনেরো শতকে উপমহাদেশের পোশাক ও সংস্কৃতিতে মুসলিম প্রভাব দেশের দূরবর্তী এলাকাগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রাক্-মুগল মুসলিম অভিযানকারীরা, যেমন সুলতান ও খানেরা অাঁটসাট পাতলুন, কোমরের দিকে সরু ও নিচের দিকে ক্রমশ প্রসারিত পূর্ণ ঘাগরা-সদৃশ অাঁটো আস্তিনের একটি লম্বা কোট পরত। মাথাকে বেষ্টন করে পাগড়ি বাঁধা হতো এবং পাগড়ির কাপড় ছিল পাঁচ হাত লম্বা। মেয়েরা ছেলেদের মতো একই পোশাক পরত এবং মাথায় একই রকম টুপি পরত। এইসব পোশাককে বলা হতো তাতারিক (তাতারিয়াত)। মেয়ে ও ছেলে উভয়ের টুপির আকৃতি ছিল চৌকোণ এবং তাতে থাকত মণিমুক্তা; এ শৈলীটি তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান ও অন্যান্য মধ্য এশীয় দেশগুলিতে এখনও প্রচলিত রয়েছে। মেয়েরা যেভাবে চুলের বিনুনি করে রেশমি সূত্রগুচ্ছ (টাসল) দিয়ে চুল বাঁধত তা তুরস্ক, মিশর, সিরিয়া ও মধ্য এশিয়াতে সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল। নারী ও পুরুষ উভয়েই সোনা ও রুপার সূক্ষ্ম সুতায় কারুমন্ডিত কোমরবন্ধনী ও জুতো পরত।  কাজী ও আলেম সম্প্রদায় ঢিলে আলখাল্লা জাতীয় পোশাক (ফারাজিয়াত) এবং আরবীয় পোশাকও পরত।

চোগা

শাসক সম্প্রদায়ের বেশভূষা স্থানীয় লোকজনদেরও ক্রমশ প্রভাবিত করেছিল। শাসকরা পরত পারস্য দেশীয় পোশাক, অাঁটসাঁট পাতলুন, একটি লম্বা কোর্তা কোমরে সাঁটানো ঘাগরার মতো নিচের দিকে ক্রমপ্রসারিত। সোনার বা রুপার কোমরবন্ধনী দিয়ে তা ধরে রাখা হতো এবং আস্তিন মণিবন্ধে দৃঢ়ভাবে লাগানো থাকত।

পোশাকে ছিল সূচের সূক্ষ্ম কারুকাজ ও মূল্যবান পাথরের অলঙ্করণ। মধ্য এশিয়া থেকে আগত মুসলমানরা পাগড়ি পরত, তুর্করা পরত ছুঁচালো টুপি। টুপিগুলি ছিল বিভিন্ন আকারের চোঙাকৃতি, প্রলম্বিত প্রান্ত, বর্গাকৃতি ও আয়তাকার। পূর্ববর্তী অভিযানকারীর পোশাক ও ভারতীয় জনসাধারণের রুচির সঙ্গে পারস্য প্রভাবের মিশেলে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতার জন্য বিচিত্র পোশাকশৈলী গৃহীত হয়েছিল।

মুগল সম্রাট মুহম্মদ জালালউদ্দিন আকবর (১৫২৬) কর্তৃক দিল্লির ক্ষমতা গ্রহণের পর পোশাকে, বিশেষ করে মেয়েদের পোশাকের ক্ষেত্রে, লক্ষণীয় পরিবর্তন সাধিত হয়। মঙ্গোলীয় নারীদের মাথায় পরার পোশাক মণিমুক্তায় আচ্ছাদিত পাখাসদৃশ মুকুট এবং মেয়েদের পাগড়ি আকৃতির ইরানি টুপির স্থান গ্রহণ করে রাজপুত মহিলাদের নেকাব বা দোপাট্টা। ঘাগরা এবং কাঁচুলি বা চোলিও পরিধান করা হতো।  জামদানি সূচিশিল্পের পোশাকরীতিতে, যেমন কশিদাজরি, জারদজি ও চিক্কন সূচিকর্মের পোশাকে ইরানি প্রভাবের প্রাধান্য ছিল। পুরুষদের পশ্চিমি প্রভাবজাত মুসলিম পোশাকের একটি উদাহরণ হলো আচকান বা শেরওয়ানি। এটি ওভারকোটের মতো হাঁটুর নিচে নামানো এবং সম্মুখভাগ নিচ পর্যন্ত বন্ধ একটি লম্বা পোশাক।

আধুনিক পোশাক উনিশ শতকের শেষে এবং বিশ শতকের শুরুতে নারী ও পুরুষ উভয়ের পোশাকশৈলীতে পরিবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ফলে পুরুষরা পশ্চিমা রীতির শার্ট, প্যান্ট, স্যুট ও টাই পরতে শিখেছে।

বেবী ফ্রক

মুসলমানদের পায়জামা এবং হিন্দুদের ধুতি প্রায়শ পশ্চিমা রীতির কলার ও আস্তিন বিশিষ্ট শার্টের সঙ্গে পরা হতো। কোর্তা বা পাঞ্জাবি অর্থাৎ ঢিলে পোশাক, এর উপরে কটি এবং বাম কাঁধে চাদর বা শাল ছিল আনুষ্ঠানিক পোশাক। কিন্তু দিন যতই অতিবাহিত হয়েছে মানুষ ততই অফিসের জন্য এবং জাতীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে পাশ্চাত্য পোশাক বেশি করে পরেছে। ফিতে ও বগলস অাঁটা পাশ্চাত্য রীতির জুতোরও চল হলো, আবার স্বদেশী পোশাকের সঙ্গে ফিতাবিহীন পাম্পসু ও স্যান্ডেল পরার রীতিও অব্যাহত রইল। মুসলমান পুরুষরা বিভিন্ন উৎসবাদিতে সাধারণ সুতির অথবা সুচের কারুকাজ করা বিভিন্ন নকশার টুপি পরত। ব্রিটিশ রাজশাসনের সময় বাঙালি কর্মকর্তারা রোদ ঠেকানোর হ্যাট অর্থাৎ শোলার টুপি পরত, যারা বিভিন্ন সরকারি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার প্রাক্কালে খাকি, সাদা বা নেভি ব্লু রঙের পাশ্চাত্য পোশাকে সজ্জিত হতো।

১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পোশাকের ক্ষেত্রে তেমন কোন পরিবর্তন হয় নি। ১৯৮০-এর দিকে পুরুষদের পোশাকের ফ্যাশনে নতুন প্রবণতা দেখা দেয়। এই প্রভাবটি এসেছে প্রধানত স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও ব্যাপক হারে বিদেশ ভ্রমণের কারণে।

পোশাকের রূপনির্মাতারা সাম্প্রতিক প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে যে পোশাক তৈরি করল তাতে ধ্রুপদী মুগল শৈলীর সচেতন পরিবর্তন ঘটল। বোতাম অাঁটা কলারবিশিষ্ট পাঞ্জাবি আরও লম্বা হলো, তাতে সূচিশিল্পের অপূর্ব অলঙ্করণ অথবা ছাপ নকশারীতি এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিল। একই কাপড় দিয়ে বানানো পাঞ্জাবির স্যুট পুরুষের ত্রিখন্ডিক (থ্রিপিস) পোশাকের রূপ নিল। তৃতীয় ধরনের পোশাক হলো বাম কাঁধে শাল অথবা আস্তিনবিহীন লম্বা ঢিলা মার্জিত পোশাক, দুপাশে চেরা এবং সূক্ষ্ম সূচিকর্মশোভিত। এগুলি সাধারণত দামি রেশমি কাপড়, তসর ও বুনট কাপড়ে সোনার কারুকাজমন্ডিত অথবা সোনা ও রুপার সুতোয় বোনা। নববইয়ের দশকের দিক থেকে বিয়েতে ও উৎসবে পুরুষদের নতুন নতুন ফ্যাশনের আনুষ্ঠানিক সান্ধ্য পোশাক চালু হয়েছে, এর ফলে উচ্চবিত্ত তরুণ সমাজেও পাশ্চাত্য রীতির স্যুটের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে এখন চাহিদা হচ্ছে দেশীয় পোশাকের, সুতরাং কোর্তা-পায়জামা অথবা পাঞ্জাবি-পায়জামা কটিযুক্ত বা কটিবিহীন এখন সকলের ব্যবহার্য পোশাক হয়ে উঠেছে।

সালোয়ার কামিজ

অফিস ও কর্মস্থলে প্যান্ট ও খোলা কলারের শার্ট সর্বত্র দেখা যায়। সকল ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত শ্রমিকরা প্রাত্যহিক পোশাক হিসেবে এখনও লুঙ্গি-গেঞ্জি, সেলাই করা লুঙ্গি জাতীয় পোশাক (সারং) এবং ছোট হাতার সুতি ফতুয়া পছন্দ করে। গ্রামের ও শহরের গড়পড়তা মানুষ আবহাওয়ার উপযোগী লুঙ্গি-গেঞ্জি বা লুঙ্গির সঙ্গে শার্ট পরে। এটিই শতাব্দীকাল ধরে বাংলার জাতীয় পোশাক। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণীভু্ক্ত মানুষ ঘরোয়া পোশাক হিসেবে সাধারণত কারুকাজ করা পাঞ্জাবির সঙ্গে লুঙ্গি পরে।

উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের প্রথমে শহরবাসী বাঙালি মহিলাদের পোশাকের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য প্রভাব সূক্ষ্ম ও প্রচ্ছন্ন। আগের মতোই  শাড়ি প্রধান পোশাক হিসেবেই আছে, তবে ব্লাউজ হয় দামি কাপড়ে ও বিচিত্র ডিজাইনমন্ডিত, যেমন মখমল, সাটিন ও জরি দিয়ে তৈরি পাশ্চাত্য কায়দার ফোলানো হাতা কিংবা মণিবন্ধ পর্যন্ত অাঁটসাঁট হাতাবিশিষ্ট; ইউরোপীয় পোশাকের মতো ঘাড়ের দিকে কখনও প্রশস্ত কখনও অপ্রশস্ত এবং কারুময় ফিতা, জরির ঝালর ও নানারকম অলঙ্কৃত পাড়যুক্ত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মিলের ছাপা কাপড়ে এবং একই উপাদান দিয়ে তৈরি শাড়ি ও ব্লাউজের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। সস্তা ও টেকসই বলে বেশির ভাগ মহিলাই প্রচলিত তাঁতের শাড়ি পরে।উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারীরা বিয়েতে ও উৎসবে জামদানি, দামি বেনারসি রেশমি শাড়ি পরে এবং ঘরে পরে মিহি তাঁতের শাড়ি। স্বল্প দামের কৃত্রিম রেশমি শাড়ির উদ্ভবের ফলে উৎসবাদিতে যাওয়ার জন্য সীমিত আয়ের নারীদের রয়েছে।

আশির দশকের দিকে তথ্যপ্রযুক্তি ও দৃশ্যমাধ্যম শাড়ির বহিরাঙ্গিকে পরিবর্তন ঘটায়। ভারতীয় শাড়ির ফ্যাশনের অনুপ্রবেশ দেশীয় বয়ন শিল্পে, রঙে ও অলঙ্করণে রূপান্তর ঘটিয়ে দেয়। নকশি শাড়ি, নকশি কাঁথার সূচিশিল্প, তুলির অাঁচড়ে চিত্রিত এবং ছোপ রঙের শাড়ি ফ্যাশনে পরিণত হয়। ব্লাউজেরও বৈচিত্র্য দেখা গেল, যেমন ইংরেজি ইউ (U) অক্ষরের মতো গলা যা শাড়ি পরিধানের ক্ষেত্রে অভিনবত্ব নিয়ে এলো, আবার প্রথানুগ গোল গলার ব্লাউজে কাঁধ ও ঘাড় খোলা রাখার ব্যবস্থা হলো যাতে সোনা ও রুপার অলঙ্কার পরা যায়।

নববইয়ের দশক থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়ে শাড়ির ক্ষেত্রে যে বিপ্লব সংঘটিত হয় তাতে ধ্রুপদী রীতির সঙ্গে সাম্প্রতিক রীতির মিলন ঘটে। বস্ত্রকল থেকে উৎপন্ন মিহি সুতি শাড়িতে দেখা গেল নতুন রং ও চমকপ্রদ নকশারীতি। এখন কর্মজীবী নারীরা কর্মস্থলে ব্যবহারের জন্য হাতের ছাপচিত্র বিশিষ্ট ও সূচিকাজের নানারকম শাড়ি পরছে। দিনে পরার উপযোগী মিহি ছাপা ও বাটিক শাড়ির পরেই রয়েছে সান্ধ্য অনুষ্ঠানে ও বিশেষ ভোজসভায় পরার উপযোগী ময়ূরকণ্ঠী ও ফিরোজা নীলের, মরচে ও লাল খয়েরি রঙের, ঘন সবুজ ও সোনালি-হলুদ রঙের বিখ্যাত ওজনদার রাজকীয় বলাকা সিল্ক শাড়ি। নববইয়ের দশক থেকে মেয়েদের পোশাকে একটি তাৎপর্যমন্ডিত অন্তর্ভুক্তি হলো শাল। স্বাচ্ছন্দ্যময় পোশাক হিসেবে মেয়েরা থ্রিপিস পরছে। এই (থ্রিপিস) ত্রিখন্ডিত পোশাক সকল বয়সের মেয়েদের কাছে জনপ্রিয়। বিবাহিত মেয়েদের জন্য একসময় নিষিদ্ধ সালোয়ার-কামিজ এখন বিদ্যালয়ে, মহাবিদ্যালয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীরা, গৃহবধূরা এবং বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত মেয়েরা পরছে।আরও অধিক কর্মমুখর বাইরের জীবনে কাজকর্ম ও চলাফেরার সুবিধার্থে মেয়েরা এই পোশাক গ্রহণ করেছে। সুতি শাড়ি ও সালোয়ার-কামিজে ছাপচিত্রের ধরনসমূহ, যেমন ব্লকপ্রিন্ট হাতের ও মেশিনের সূচিকর্ম, স্ক্রিন-ছাপ ইত্যাদি শৈলী বহুবিধ সুতি কাপড়ের উৎপাদন বাড়াচ্ছে।

এছাড়াও সান্ধ্য পোশাক হিসেবে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জরি, লেস, ব্রোকেড, ভেলভেট ইত্যাদি। পোশাকের ম্যাচিং অনুযায়ী জামদানি দোপাট্টা, টাঙ্গাইলের তাঁতের দোপাট্টা এবং মসলিন দোপাট্টা ও ওড়না পরিধান করা হয়।

আশির দশক থেকে কেশবিন্যাসের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। সাধারণত নারীরা তাদের লম্বা চুল খোঁপা করে বাঁধে এবং তরুণীরা ফিতে দিয়ে চুল বেঁধে ও বিনুনি করে কেশ পরিচর্যার বিচিত্র শৈলীর পরিচয় দেয়। প্রচার মাধ্যমে স্থান পাওয়ার সুবাদে একুশ শতকের প্রবণতার উপযোগী করে অন্যান্য ফ্যাশন ও বিউটি পারলারগুলি পরিপাটি করে ছাঁটা ও ঢেউ খেলানো কেশসজ্জার ব্যবস্থা করেছে।

নাগরিক মহিলাদের পোশাক-ফ্যাশনে প্রতিবছর পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে শাড়ির অবস্থান অটুট।

আদিবাসী পোশাক-পরিচ্ছদ বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায় নিজেদের বস্ত্র মূলত নিজেরাই তৈরি করে। এজন্য তাদের প্রায় প্রতি পরিবারের রয়েছে নিজস্ব তাঁত। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীরা চরকা ও তাঁতের সাহায্যে অত্যন্ত চাকচিক্যপূর্ণ বস্ত্র তৈরি করে। এর মধ্যে চাদর, গামছা, পরিধেয় বস্ত্র, কার্পেট, থলে ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল সাধারণত জুম ক্ষেতে উৎপাদিত তুলা ও প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে তৈরি হলেও বর্তমানে বাজার থেকে কেনা মিলের সুতা ও রং-এর ব্যবহার ব্যাপক। পুরুষদের পোশাক-পরিচ্ছদে নকশার বৈচিত্র্য কিছুটা কম। নারীদের পোশাক-পরিচ্ছদে থাকে বর্ণাঢ্য রং ও নকশার সমাবেশ।

চাকমা মেয়েদের পোশাক

চাকমা মেয়েদের নিম্নাংশের পোশাক ‘পিনন’ অনেকটা লুঙ্গির মতো। এতে কোন সেলাই থাকে না, দৈর্ঘ্যে ৪.৫ হাত এবং প্রস্থে ২.৫ হাত। পিননের একদিকে নকশাসমৃদ্ধ অাঁচল থাকে যাকে চাবুকি বলা হয়। চাকমাদের পিননের জমিন সাধারণত কালো; উপরে ও নিচে চওড়া রঙিন পাড় থাকে। অাঁচলে বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। পিনন পরিধানের সময় চাবুকি বাঁ দিকে থাকে। চাকমা রমণীদের উপরের অংশের পোশাক খাদি বা বক্ষবন্ধনী দৈর্ঘ্যে ৩.৫ হাত এবং প্রস্থে ২.৫ হাত। খাদি দুই ধরনের: রাঙাখাদি এবং চিবিকটানা খাদি। রাঙাখাদিতে বিভিন্ন নকশা তোলা হয়। এ ধরনের খাদি যুবতীরাই পরিধান করে। আটপৌরে ব্যবহারের চিবিকটানা খাদিতে সাধারণত কোন নকশা হয় না। বর্তমানে চাকমা রমণীরা পিনন এবং খাদির সঙ্গে ব্লাউজের মতো জামা পরিধান করে। অনেক চাকমা মহিলা মাথায় খবং ব্যবহার করে। চাকমা পুরুষদের পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে তেমন বৈচিত্র্য নেই। এরা জামা (জুন্নাছিলুম), খবং এবং ধুতি জাতীয় কাপড় পরিধান করে। চাকমারা আলাম নামে একটি কাপড়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী নকশা সংরক্ষিত করে রাখে। আলামের অনুকরণে পরবর্তী বংশধররা তাদের পোশাকে নকশা করে।

মারমা মেয়েদের প্রধান পোশাক থামি। নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নকশায় থামির কারুকার্যে রং ও নকশার বৈচিত্র্য থাকে। মেয়েরা থামির আঙ্গি পরে। পুরুষরা মোটা কাপড়ের লুঙ্গি এবং কয়েকটি পকেটযুক্ত কলারবিহীন জামা পরে।

ত্রিপুরা রমণীদের পোশাক

ত্রিপুরা নারীরা পরেন রিনাই, দৈর্ঘ্যে ৪.৫ হাত এবং প্রস্থে ২.৫। রিনাই-এ চাকমাদের পিননের মতো অাঁচল (চাবুকি) থাকে না তবে উপরে ও নিচে চওড়া পাড় থাকে। রিনাই-এর জমিন সাধারণত লাল এবং পাড় কালো রঙের হয়। রিসা  ত্রিপুরা নারীদের বক্ষবন্ধনী। এতে কোন সেলাই থাকে না, দৈর্ঘ্যে ৩ হাত এবং প্রস্থে ১ হাত বা ০.৫ হাত। রিসা নানান রঙের জমিনের উপর পাখি, প্রজাপতি ও ফুল, লতাপাতার বর্ডার নকশায় সমৃদ্ধ। অাঁচলের দুই প্রান্তে অনেক সময় পুঁতির ঝালর যুক্ত থাকে। বয়স্ক ত্রিপুরা মহিলারা মাথায় সাদা কাপড় বেঁধে রাখে। পুরুষরা ধুতি ছাড়াও নিজস্ব তাঁতে তৈরি গামছা পরিধান করে এবং মাথায় পাগড়ির মতো সাদা কাপড় বেঁধে রাখে।

তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা অদ্যাবধি পিনন, খাদি, জুন্নাছিলুম, ফা-ধরি এবং খবং এই পাঁচ ধরনের পোশাক পরিধান করে আসছে। এর জমিন লাল ডোরাকাটা নকশায় সমৃদ্ধ। পিননের উপরে ও নিচে থাকে কালো চওড়া পাড়। চাকমাদের পিননের চেয়ে তঞ্চঙ্গ্যাদের পিননের প্রস্থ কিছুটা ছোট। নারীদের বক্ষবন্ধনী খাদি, দৈর্ঘ্য-প্রস্থে চাকমাদের খাদির অনুরূপ। এদের খাদি দুই ধরনের ফুলখাদি এবং রাঙাখাদি।

রাখাইন মহিলাদের পোশাক

তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা পিনন ও খাদি ছাড়া ঊর্ধ্বাঙ্গে জুন্নাছিলুম ও কোমরবন্ধনী হিসেবে ফা-ধরি ব্যবহার করে। জুন্নাছিলুম গলায় ও কাঁধে সূক্ষ্ম কারুকাজ সমৃদ্ধ। চওড়া ধরনের বেল্ট আকৃতির ফা-ধরির দু্ই প্রান্ত হালকা রঙের সুতার কারুকাজে সমৃদ্ধ। সাধারণত পিননকে শক্ত করে ধরে রাখার জন্য এটি ব্যবহূত হয়। তঞ্চঙ্গ্যা নারীরা মাথায় পাগড়ির মতো খবং ব্যবহার করে। সাদা খবং-এর দুই প্রান্ত বিভিন্ন রঙের সূক্ষ্ম কারুকাজসৃমদ্ধ, দৈর্ঘ্যে সাধারণত ৩.৫ হাত এবং প্রস্থেহ ০.৫ হাত। তঞ্চঙ্গ্যা পুরুষদের পোশাক-পরিচ্ছদে তেমন বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায় না। এরা কারুকাজবিহীন জুন্নাছিলুম, গামছা এবং খবং পরিধান করে।

ম্রো মেয়েদের একমাত্র পোশাক ওয়ানক্লাই। প্রস্থে সাধারণত ৯ ইঞ্চি হয়ে থাকে। এই বস্ত্র ম্রো মেয়েরা কোমরে জড়িয়ে রাখে। কালো জমিনের একপাশে বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে তাঁতে নকশা তোলা হয়। মেয়েদের কোমরের মাপ অনুযায়ী এর দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়। ম্রো মেয়েরা বক্ষবন্ধনী ব্যবহার করে না। তারা অনেক সময় বাজার থেকে কিনে ওয়ানচা নামের চাদর গায়ে জড়িয়ে রাখে। ম্রো পুরুষ নেঙটির মতো দং নামের বস্ত্র পরে। এতে কোন নকশা থাকে না। দং শুধু লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার জন্য ব্যবহূত হয়ে থাকে। পুরুষরা মাথায় সাদা কাপড় জড়িয়ে রাখে। ম্রোরা কোমরতাঁতে তৈরি মোটা বস্ত্র তাপুং ব্যবহার করে। শিশুকে মায়ের কাঁধে ঝুলিয়ে রাখার জন্য এটি ব্যবহূত হয়।

চাক নারীরা পিননের মতো নাফিই নামের পোশাক পরিধান করে। এই পোশাকের জমিন কালো এবং উপরে ও নিচে সাদা রঙের বর্ডার থাকে। মহিলারা ব্লাউজের মতো বৈদই পুজু ব্যবহার করে। এ ধরনের জামা সাদা ও কালো সুতায় তৈরি। চাক নারীরা মাথায় বাংকেউবাং নামে এক ধরনের কাপড় জড়িয়ে রাখে। চাক পুরুষদের পোশাক লুঙ্গি ও জামা। এরা মাথায় খবং ব্যবহার করে।

লুসাই নারীদের নিম্নাঙ্গের পোশাক রিনাই, যা তারা লুঙ্গির মতো করে পরিধান করে। এর জমিনে সাধারণ সাদা কালো রঙের সুতার ডোরাকাটা নকশা তোলা হয়।

ত্রিপুরা নারীদের মতো লুসাই মহিলাদের বক্ষবন্ধনীও রিসা। এটি সাধারণত দশ ইঞ্চি চওড়া হয় এবং এতে রঙিন সুতা দিয়ে নানা ধরনের নকশা তোলা হয়। লুসাই নারীপুরুষ উভয়ই জামার মতো পোশাক জুন্নাছিলুম ব্যবহার করে।

মুরং নারীদের নিম্নাংশের পোশাক নয় থেকে এগার ইঞ্চি চওড়া ওয়াঙলাই। সংস্কারবশত  মুরং নারীদের ওয়াঙলাই পরিধান করার সময় বামদিকের কোমরের কাছে চার থেকে ছয় আঙুল পরিমাণ জায়গা খালি রাখে। এটি কালো মোটা সুতার তৈরি। বুকে রিসার মতো বক্ষবন্ধনী জড়িয়ে রাখে। পুরুষরা নেঙটি ব্যবহার করে। অনেককে লুঙ্গি পরতেও দেখা যায়।

রাখাইন পুরুষরা লুঙ্গি ও নারীরা আঙ্গি পরিধান করে। এসব পোশাকে নকশা থাকে। অনেক রাখাইন নারী আঙ্গি ব্লাউজের মতো জামা হিসেবে ব্যবহার করে।

গারো নারীদের পোশাক

গারো মহিলাদের প্রাচীন পোশাক গেনা। সেলাইবিহীন গেনা কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত হয়ে থাকে। এটি বিভিন্ন রঙের সুতায় ডোরাকাটা নকশায় সমৃদ্ধ। গারোদের পোশাক দাকমুন্দা বা গাননা দককা গেনা জাতীয়, তবে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত বর্ধিত। দাকমুন্দা তাঁতে নকশা তোলা একখন্ড কাপড় যা কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত লুঙ্গির মতো প্যাঁচ দিয়ে পরতে হয়। বর্তমানে বিভিন্ন রঙে বিভিন্ন নকশায় দাকমুন্দা তৈরি হয়। দাকমুন্দাতে যে চোখ ফুটিয়ে তোলা হয় তার মধ্যে আছে ধর্মীয় বিশ্বাস। গারো মেয়েরা প্রয়োজনে হাতাওয়ালা গেঞ্জির মতো পোশাকও ব্যবহার করে। দাকমুন্দা ও ব্লাউজের সঙ্গে গারো মেয়েরা গামছা বা ওড়না ব্যবহার করে থাকে। বর্তমানে সমতল ভূমিতে বসবাসকারী শিক্ষিত মেয়েরা শাড়ি পরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

সাঁওতাল নারীর ঐতিহ্যগত পোশাক পানচি ও পাড়হান। পানচি অনেকটা লুঙ্গির মতো। যা কোমর থেকে হাঁটুর অল্প নিচে ঝুলে থাকে। ওড়না জাতীয় কাপড় পাড়হান দ্বারা শরীর আবৃত করে রাখা হয়। পুরুষ ও ছোট ছেলেরা ধুতি ও নেঙটি ব্যবহার করে এবং গায়ে গেঞ্জি পরিধান করে।

সাঁওতাল নারীদের পোশাক

মণিপুরী নারীদের নিচের অংশের পোশাক ফানেক, যা লুঙ্গির মতো প্যাঁচ দিয়ে পরতে হয়। এ পোশাকে খুব একটা নকশা থাকে না। মণিপুরী মেয়েরা সাধারণত ঘরে বা হাটে-বাজারে যাওয়ার সময় ফানেক ব্যবহার করে। মণিপুরী নারীদের শরীরের নিচের অংশের আরেকটি পোশাক কারুকাজময় লাইফানেক। এ পোশাকের জমিন সাধারণত সরু দুই রঙে ডোরাকাটা হয় এবং পাড়ে বিভিন্ন নকশা তোলা হয়। আগে পাড়ে সুতা দিয়ে হাতে নকশা তোলা হতো, বর্তমানে এ নকশা মেশিনে তোলা হয়। মণিপুরী নারীদের ব্যবহূত ব্লাউজ ফুরিত। এটি সাধারণ ব্লাউজের মতোই, তবে একটু লম্বা হয় যাতে ফানেকের নিচে গুঁজে রাখা যায়। মণিপুরীরা ব্লাউজের কাপড় নিজেরাই তাঁতে বুনে থাকে। অনেক সময় নারীরা ফুরিতে নিজের হাতে নকশা তোলে। মণিপুরী নারীরা ফুরিতের (ব্লাউজের) উপরে ফিফুপ নামের ওড়না পরে থাকে। ওড়না পরার পদ্ধতি একটু ভিন্ন ধরনের। প্রথম দৃষ্টিতে শাড়ি পরার মতোই মনে হয়। মণিপুরী এর সরু পাড় ও অাঁচল রয়েছে।বিয়ে বা উৎসব-অনুষ্ঠানে ব্যবহূত ফিদুপ সূক্ষ্ম সুতায় বোনা হয় এবং এতে তাঁতে রেখেই সূক্ষ্ম কারুকাজ করা হয়ে থাকে।

এর জমিন অনেকটা মসলিনের মতো সূক্ষ্ম হয়। বিয়ে ও নৃত্যের সময় মণিপুরী মহিলারা উজ্জ্বল রঙের কারুকাজময় পোশাক পলই ব্যবহার করে। পলই-এর নিচের দিকের চওড়া পাড়ের অংশে জরি ও চুমকি দিয়ে অত্যন্ত চাকচিক্যপূর্ণ নকশা তোলা হয়। পলই-এর সঙ্গে কারুকাজখচিত ফুরিত ও ফিদুপ ব্যবহার করা হয়। মণিপুরীদের ব্যবহারের তাঁতে বোনা চওড়া গামছার নাম খুদাই যা সাধারণত চেক কাপড়ের হয়। মণিপুরী পুরুষদের ব্যবহূত ধুতিকে ফেইজং বলা হয়। ধুতি সাধারণত হাটবাজার ও উৎসব-অনুষ্ঠানে ব্যবহূত হয়। পুরুষদের ফুরিত অনেকটা ফতুয়া ধরনের এবং সাধারণত তাঁতে বোনা কাপড় দিয়ে তৈরি। ফুরিত ছাড়া মণিপুরী পুরুষরা লম্বা সাদা শার্টও ব্যবহার করে। মণিপুরীদের বিয়ের অনুষ্ঠানে পুরুষরা কৈয়ত নামের পাগড়ি ব্যবহার করে। পুরুষদের ব্যবহূত পাঞ্জাবি ধরনের পোশাককে পুজাত বলা হয়।

কা-জিমপিন, জামাতা বা নিমাক্তি খাসি মেয়েদের পোশাক। বাজার থেকে কাপড় কিনে এ ধরনের পোশাক তৈরি করা হয়। মহিলাদের নিচের অংশের পোশাক কা-জৈনসেম বা চুসেম। লুঙ্গির মতো প্যাঁচ দিয়ে এ পোশাক পরিধান করা হয়। এ ধরনের পোশাক ছাপা বা চেক কাপড়ের হয়ে থাকে। পূর্বে উৎসবে ব্যবহূত কা-জৈনসেম সিল্ক বা মুগাসুতা দিয়ে তৈরি হতো। নারীরা হাত কাটা এবং পা পর্যন্ত লম্বা সেমিজের মতো যে পোশাক ব্যবহার করে তাকে জামাপো বলা হয়। এ ধরনের পোশাক সাধারণত এক রঙের সুতি কাপড়ে তৈরি হয়।

খাসি নারীদের ওড়না জাতীয় কাপড় চুসুত। চুসুত এক খন্ড কাপড় যা ডান হাতের নিচ দিয়ে এবং বাম কাঁধের পিছন দিক থেকে এনে বাম কাঁধের উপর গিরো দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।

ফুঙ্গ মারুং খাসি পুরুষদের জামা। ফুঙ্গ মারুং-এর সাথে পুরুষরা লুঙ্গি ব্যবহার করে। নারী ও পুরুষ উভয়কেই বেল্ট ব্যবহার করতে দেখা যায়। পূর্বে পুরুষরা এক ধরনের টুপি ও পাগড়ি ব্যবহার করত। বিত্তবান পুরুষরা নিকার বুকার, মোজা, বুট, ওয়েস্টকোট ও ক্যাপ পরিধান করত। [পারভীন আহমেদ এবং জিনাত মাহরুখ বানু]