গৌড় প্রাসাদ


গৌড় প্রাসাদ  গৌড় নগর দুর্গের অভ্যন্তরভাগে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এ প্রাসাদ সুলতানি আমলে মুসলিম শাসকদের দ্বারা নির্মিত। বর্তমানে এটি ধবংসপ্রাপ্ত ও বিলুপ্ত প্রায়। প্রাসাদটি সুউচ্চ প্রাচীরবেষ্টিত এবং এ প্রাচীর লোকমুখে বাইশগজী প্রাচীর নামে পরিচিত। প্রাচীরটির বিশাল উচ্চতার জন্যই ‘বাইশ গজ’ প্রতীকী অর্থে এর এরূপ নামকরণ হয়েছে। প্রাচীরটি বর্তমানে চারটি খন্ডাংশে দাঁড়িয়ে আছে, পূর্ব দিকে তিনটি এবং উত্তর দিকে একটি। এ খন্ডাংশ থেকেই ব্যাস ও উচ্চতায় এর শক্তি ও দুর্ভেদ্যতার প্রমাণ মেলে এবং বাংলায় মধ্যযুগীয় দুর্গের সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করা যায়।

গৌড় প্রাসাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশ

সম্ভবত ইলিয়াসশাহী বংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা সুলতান  নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ কর্তৃক প্রথম প্রাসাদটি নির্মিত হয় এবং সমগ্র সুলতানি আমলে এটি ব্যবহূত হয়ে আসছিল। দুর্গের লুকোচুরি দরওয়াজা এবং অভ্যন্তরভাগে অপরাপর মুগল নিদর্শন থেকে বোঝা যায় যে, প্রাসাদটি সম্ভবত মুগল সুবাহদার শাহ সুজা কর্তৃক ব্যবহূত হয়ে থাকবে।

ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রাসাদটি পূর্ব পশ্চিমে লম্বা সমান্তরাল প্রাচীর দ্বারা তিনটি অঙ্গনে বিভক্ত ছিল। মুসলিম বিশ্বের অপরাপর প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে তুলনা করে কতকটা নিশ্চিতভাবে অনুমান করা যায় যে, উত্তর দিক থেকে প্রথম অঙ্গনটি ছিল দরবারকক্ষ। স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, এ অঙ্গন খাজাঞ্চিখানা বা কোষাগার। যেহেতু  উত্তর দিক থেকে দাখিল দরওয়াজা দিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করা হতো এবং অতঃপর চাঁদ দরওয়াজা ও নিম দরওয়াজা অতিক্রম করতে হতো, তাই এ সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, এ অঙ্গনে জনগণ বা বিদেশি অভ্যাগতদের অভ্যর্থনা জানানো হতো। স্পেনের বিখ্যাত আলহামরা প্রাসাদে (চৌদ্দ শতকে নির্মিত) অনুরূপ একটি অর্ভ্যথনা কক্ষকে রাজদূতদের কক্ষ বলে আখ্যাত করা হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অঙ্গনকে যথাক্রমে ব্যক্তিগত একান্ত নিবাস এবং মহিলাদের আবাসকক্ষ বলে সাধারণত মনে করা হয়ে থাকে। আলহামরা প্রাসাদেও এ অঙ্গনগুলিকে অনুরূপ নামকরণ করা হয়েছে। অবশ্য এতেও একটি পার্থক্য রয়েছে। গৌড় প্রাসাদের অঙ্গনগুলির প্রত্যেকটিতে একটি করে পুকুর ছিল, আলহামরা প্রাসাদের অঙ্গনগুলির প্রতিটিতে ছিল পানি নির্গমনের নলবিশিষ্ট একটি করে ফোয়ারা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে তথা আট শতকের গোড়ার দিকে উমাইয়া শাসনামল থেকে প্রাসাদকে দুটি বা তিনটি অঙ্গনে বিভক্ত করার রীতি চলে আসছে এবং পরবর্তী শতকগুলিতে ভারতসহ এ রীতি অব্যাহত ছিল। মনে হয়, এ রীতির অগ্রগতিতে বাংলার অবদান হচ্ছে অভ্যন্তরভাগে পুকুর খনন (ভূতাত্ত্বিক ও আবহাওয়ার অবস্থার কারণে যা মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর ভারতে অকল্পনীয় ছিল)। সম্ভবত খাজাঞ্চিখানা নামের সমার্থক হিসেবে প্রথম অঙ্গনের পুকুরের স্থানীয় নাম হয়েছে টাকশাল দিঘি। প্রাসাদের তলদেশ দিয়ে নিম দরওয়াজা পর্যন্ত  প্রবাহিত একটি জলধারা সম্পর্কে সুলতান বারবক শাহের শিলালিপিতে উল্লেখ রয়েছে। এ শিলালিপি অনুসারে তিনি ৮৭১ হিজরিতে (১৪৬৬ খ্রি.) প্রবেশদ্বারটি নির্মাণ করান। শিলালিপির একটি উৎকীর্ণ অংশে বলা হয়েছে, ‘সালসাবিল (বেহেশ্ত)-এর নহরের অনুকরণে প্রাসাদের তলদেশে প্রবাহিত পানির নহরটি অবলোকন কর’। শিলালিপির এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, পরকালে পুণ্যবানদের জন্য ধর্মগ্রন্থে প্রতিশ্রুত পুরস্কার হিসেবে ‘প্রবহমান জলধারার’ উপর কতোটা গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।  [এ.বি.এম হোসেন]