খাজনা


খাজনা (জমা)  মুগল শাসনামলে ভারতবর্ষে রায়ত কর্তৃক সরকারকে প্রদেয় খাজনাকে ‘জমা’ বলা হতো। এ জমার ধরন ছিল খাজনার চেয়ে বরং রাজস্বেরই কাছাকাছি। বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর এ জমাকে ব্রিটেনে প্রচলিত খাজনার সঙ্গে অভিন্ন বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেনে প্রজাদের কাছ থেকে সংগৃহীত খাজনা বাংলায় রায়তদের কাছ থেকে আদায়কৃত জমার সমতুল্য নয়, কারণ বাংলার রায়তরা মোটেও প্রজা ছিল না। জমিতে তাদের ছিল চিরাচরিত অধিকার। জমির মালিক হিসেবে ব্রিটিশ জমিদাররা আর্থ-রাজনীতির প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুসারে প্রজাদের কাছে খাজনা দাবি করতে পারত। কিন্তু বাংলার জমিদার যেমন ব্রিটিশ জমিদারদের মতো মালিকশ্রেণী ছিল না, তেমনি রায়তরাও ছিল তৎকালীন ব্রিটেনের প্রজাদের থেকে ভিন্নতর। ব্রিটেনের জমিদারদের অধীনস্থ প্রজাদের প্রদেয় খাজনার হারে তারতম্য ঘটত এবং তাদের জমি থেকে উচ্ছেদও করা যেত। কিন্তু বাংলার রায়তগণ জমিদারকে ‘পরগণা নিরিখ’ অনুসারে অর্থাৎ প্রমিত হারে খাজনা দিত যা মোটেও পরিবর্তনযোগ্য ছিল না। পরগণা নিরিখ অনুসারে নিয়মিত খাজনা শোধ করলে তারা বংশপরম্পরায় ভূমি ভোগদখলের অধিকার লাভ করত।

হিন্দু শাসনামলে খাজনাকে বলা হতো রাজস্ব অর্থাৎ রাজার অংশভাগ। রাজকর্মচারীরা আইনানুসারে চাষিদের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করত এবং নিয়মিত রাজস্ব শোধ করলে কাউকেই জমি থেকে উচ্ছেদ করা যেত না। পারিভাষিক অর্থে হিন্দু রাজত্বের রাজস্বই মুগল আমলে জমা হিসেবে গণ্য হয়। অবশ্য রাজস্ব ও জমার মধ্যে মূলগত কোনো পার্থক্য ছিল না। শাসকবর্গ জমিতে চাষির চিরাচরিত অধিকার মেনে নিয়েছিলেন।

বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ানি লাভের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রায়তের জমা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালায়। তারা বাংলার জমার সঙ্গে ব্রিটেনের খাজনার তুলনার চেষ্টা করে এবং জমির অধিকার ও সুযোগ সুবিধা ভোগের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের ও বাংলার জমিদারদের সমপর্যায়ভুক্ত মনে করে। এ ধারণার বশবর্তী হয়েই কোম্পানি সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) প্রবর্তনের মাধ্যমে জমিতে জমিদারের নিরঙ্কুশ মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বিধির আওতায় বাংলার রায়তেরা পর্যবসিত হয় ব্রিটেনের প্রজার অবস্থানে, আর বাংলার জমিদার হন ব্রিটেনের জমিদারের অনুরূপ। ভূমির মালিক হিসেবে জমিদাররা রায়তের উপর প্রচলিত বাজার দরে খাজনা ধার্য করার অধিকার লাভ করে, আর রায়তরা আইনের বিধানে অপরিবর্তনযোগ্য প্রচলিত হারে খাজনা প্রদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

কিন্তু রায়তরা এ পরিবর্তন মেনে নিতে রাজি ছিল না। তারা নানাভাবে, কখনও প্রকাশ্য বিদ্রোহের মাধ্যমে তাদের অবস্থানের এ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। উনিশ শতকে দেশিয় জমিদারেরা ব্রিটিশ জমিদারদের ন্যায় রায়তদের নিকট খাজনা দাবি করলে তাদের সে অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে অনেক মামলা রুজু হয়। কিন্তু খাজনার ব্যাপারে সব দেওয়ানি আদালতের রায় অনুরূপ ছিল না। কোনো কোনো বিচারক জমিদারের পক্ষে আবার কোনো কোনো আদালত রায়তের পক্ষে রায় প্রদান করে। জমিদারদের নিযুক্ত উকিলরা আদালতে রিকার্ডো, ম্যালথাস, ওয়েস্ট প্রমুখ অর্থনীতিবিদদের মতবাদের আলোকে যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, জমি জমিদারের মালিকানাধীন একটি পণ্য এবং তারা বাজারদরে খাজনা ধার্যের অধিকারী। অধিকন্তু এ যুক্তির মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইতেন যে, প্রতিযোগিতামূলক হারে খাজনা প্রদান না করলে পুরনো রায়তকে উচ্ছেদ করার অধিকার জমিদারের রয়েছে।

ঘন ঘন খাজনা বৃদ্ধি এবং জমিদারের দাবি অনুযায়ী খাজনা পরিশোধ না করায় রায়ত উচ্ছেদের ফলে উনিশ শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলায় অনেকগুলো কৃষক বিদ্রোহ ঘটে। বাংলায় অনেক পরগনার রায়তরা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং জমিদারদের খাজনা বৃদ্ধির প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কৃষকের প্রতিরোধ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে প্রণীত হয় ১৮৫৯ সালের খাজনা আইন এবং ১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে ব্রিটিশ খাজনা তত্ত্ব বাতিল করা হয় এবং কৃষক জমি ভোগদখলের এবং পরগনা নিরিখের চিরাচরিত হারে খাজনা পরিশোধের অধিকার ফিরে পায়। ১৯২৮ ও ১৯৩৮ সালে প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধনীতে জমিতে রায়তের অধিকার বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৮ সালের পর রায়তরা কার্যত জমির মালিক এবং জমিদার শুধুই খাজনা আদায়কারীতে পরিণত হয়। তখন থেকে খাজনার হার কমবেশি অপরিবর্তিত থাকে।

১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, দ্বারা জমিদারি প্রথা বিলোপ করে জমিতে রায়তের মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা হয়েছে। এখন খাজনা বলতে জমাকেই বোঝায়। বর্তমানে শহরের জমি এবং অনেক এলাকায় গ্রামের জমির মূল্য অত্যধিক বৃদ্ধি পেলেও খাজনার পরিমাণ কিন্তু বলতে গেলে নামমাত্র।  [সিরাজুল ইসলাম]