কৃষি আবহাওয়া


কৃষি আবহাওয়া (Agrometeorology)  কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত আবহাওয়া বিজ্ঞানের বিশেষ এক শাখা। বায়ুমন্ডল, আবহাওয়া ও জলবায়ুসহ এর দৃশ্যমান বিষয়াবলি সম্পর্কে এ বিজ্ঞান আলোচনা করে। কৃষি আবহাওয়া একদিকে আবহাওয়া এবং পানি সংক্রান্ত কার্যকারণ ও কৃষিবিজ্ঞানের মধ্যে আন্তঃক্রিয়ার পাশাপাশি উদ্যানতত্ত্ব, পশুপালনসহ ব্যাপক অর্থে সার্বিক কৃষির সঙ্গে জড়িত।

কৃষি আবহাওয়া স্থানীয় আবহাওয়া এবং  জলবায়ু নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করে। সাধারণভাবে বলতে গেলে আবহাওয়া বায়ুমন্ডলের তাৎক্ষণিক অবস্থা, বিশেষত বিকিরণ, তাপমাত্রা, বায়ুর চাপ, প্রবহমান বায়ু, আর্দ্রতা, মেঘাচ্ছন্নতা, বৃষ্টিপাত, বাষ্পীভবন, শিশির এবং দৃষ্টিগোচরতা সম্পর্কে তথ্যের যোগান দেয়। অন্যদিকে জলবায়ু একটি নির্দিষ্ট স্থানের, দীর্ঘসময়কালের, সাধারণত ক্রমাগত কয়েক দশকের আবহাওয়ার উপাদানসমূহের পরিসংখ্যায়ক সমষ্টিজাত উপাত্তকে নির্দেশ করে। শুধু আবহাওয়ার উপাদানসমূহের গড় অথবা মধ্যমানই জলবায়ুর অন্তর্ভুক্ত থাকে না, এসবের পরিবর্তনশীলতাও এর অন্তর্ভুক্ত থাকে। এভাবে একদিক থেকে অন্যদিকে আবহাওয়ার তারতম্য ঘটে এবং জলাবায়ু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভিন্নতর হয়ে থাকে। দেশের কোথায় কোনো কোনো ফসল উৎপন্ন করা যায় তা নির্ধারণ করে জলবায়ু, আবহাওয়া নির্ধারণ করে প্রধানত উৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণ।

বাংলাদেশে কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত কার্যক্রম খুব সীমিত। সম্প্রতি বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশব্যাপী ১২টি কৃষি আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন করেছে যেখানে কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত কিছু কিছু উপাত্ত সংগৃহীত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর  কৃষি কাজের সুবিধার্থে তিন ধরনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের কাজ করে থাকে। সেগুলি হচ্ছে ১. অল্পপরিসরের পূর্বাভাস (৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত), ২. মধ্যমমাত্রার পূর্বাভাস (১০ দিন পর্যন্ত) এবং দীর্ঘসময়ের পূর্বাভাস (১০ দিনের অধিক)। প্রত্যেকটিরই খামার কর্মকান্ডে এবং কৃষি-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের পরিকল্পনা প্রণয়নে ভূমিকা রয়েছে।  বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ফিলিপাইনে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট যৌথভাবে ১৯৭৬ সালে দেশের জলবায়ুর প্রকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করার জন্য বাংলাদেশের কৃষি জলবায়ু সম্বন্ধীয় জরিপের (Agroclimatic Survey of Bangladesh) এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহযোগিতায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ১৯৮৮ সালে ‘বাংলাদেশের ভূমি সম্পদের মূল্য নিরূপণ’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশের কৃষি জলবায়ু সম্বন্ধীয় অঞ্চলসমূহের চিত্রসহ বর্ণনা এবং সীমারেখা নিরূপণ করা হয়েছে।

প্রতিটি কৃষি জলবায়ু অঞ্চলের রয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্যের সম্মিলন। দেখা যায় কৃষি প্রতিবেশগত এলাকাসমূহ এবং উপঅঞ্চলসমূহের উপরিস্থাপন এ অঞ্চলগুলিতে মোট ৫৩৫টি কৃষি প্রতিবেশগত একক (ইউনিট) সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ভূমি সম্পদের মূল্য নিরূপণ সংক্রান্ত কৃষির বিভিন্ন দিকের ওপর প্রাপ্ত সাম্প্রতিক উপাত্ত থেকে বর্তমানে  কৃষি প্রতিবেশ এলাকা AEZ/GIS প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদে কৃষির বিভিন্ন দিক হালনাগাদ করার কাজ চলছে।

জমির ব্যবহারকে উন্নততর করা, অধিক পরিমাণে খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করা এবং ভূমিসম্পদের অপব্যবহার রোধ করাসহ কৃষিকাজের সব দিকেই কৃষি আবহাওয়াগত জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। খামার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধিকরণে, ফসল এবং গবাদি পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিশ্চিতকরণে এবং উৎপাদিত দ্রব্যের পরিমাণ ও বিপণন কর্মকান্ড উন্নয়নে কৃষি আবহাওয়া তথ্যাদি এক অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।  [মোঃ সিরাজুল ইসলাম]

আরও দেখুন কৃষি প্রতিবেশ এলাকা