কুমার বা কুম্ভকার


কুমার বা কুম্ভকার  বিশেষ ধরনের মাটিকে পাত্র তৈরির উপযোগী করে গৃহস্থালির তৈজসপত্র, খেলনা ইত্যাদি নির্মাণকারী একটি পেশাজীবী শ্রেণি। কুমার বা কুম্ভকার হলো এদের বর্ণ নাম। অতীতে  মৃৎশিল্প একচেটিয়াভাবে হিন্দুদের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। মাটি দ্বারা নির্মিত গৃহস্থালির অসংখ্য তৈজসপত্রের মধ্যে রয়েছে কলসি, হাঁড়ি, জালা, সরাই/ঢাকনা, শানকি, থালা, কাপ, বদনা, ধূপদানি প্রভৃতি। মাটি নির্মিত নানারকম খেলনা এবং তাল, কলা, কাঁঠাল কিংবা আম ইত্যাদি পণ্য আধুনিক মেলা বা উৎসবে জনপ্রিয় শিল্পপণ্য হয়ে উঠেছে।

কুমার বা কুম্ভকার

প্রাচীন কিংবা আধুনিক যুগের সব কুমাররাই মাটি দ্বারা তৈজসপত্র নির্মাণে সাধারণ কৌশল অবলম্বন করে থাকে। প্রথমে ভূমি থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাকে হাত ও পায়ের সাহায্যে বা কাঠের অথবা পাথরের পিটনা দিয়ে থেতলে পাত্র তৈরির উপযুক্ত করে তোলা হয়। এসব কাজের সুসংবদ্ধ ধাপগুলি হচ্ছে কাদামাটি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, উৎপাদনের জন্য মাটিকে প্রস্ত্তত করা, পাত্রের আকার ও আকৃতি প্রদান করা, সূর্যের তাপে পাত্রটিকে শুকানো এবং সবশেষে তা আগুনে পোড়ানো ও প্রয়োজনে তাতে রং লাগানো।

প্রাচীনকালে কেবল মাটির সাথে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পানি মিশিয়ে এবং অতিরিক্ত কোনো উপাদান ব্যবহার না করেই জিনিসপত্র তৈরি করা হতো। এক ধরনের নিখাদ কাদামাটিকে ছোট ছোট খন্ড করে গোলাকার পাত্র বানানো হতো। অনেক সময় কাদামাটিকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বস্ত্ততে রেখে আকৃতি প্রদান করা হতো। কুমারের চাকা তুলনামূলকভাবে অনেক পরের আবিষ্কার। আজকের দিনের কুমারেরা প্রায় সবাই চাকা ব্যবহার করে থাকে। অনেক এলাকায় এ চাকাকে বলা হয় চাক। চাকের মাধ্যমে তারা মাটির পাত্রাদির প্রয়োজনীয় বিভিন্ন আকার দিয়ে থাকে।

রোদে শুকানোর পর তা পাঞ্জা বা চুলাতে পোড়ানো হয়। মাঝখানে ক্ষুদ্র কীলকবিশিষ্ট চাকাটির আকার একটি ক্ষুদ্র গোল চাকতির ন্যায়। মাটিতে বসে একজন কুমার এর চারপাশে অনায়াসে হাত ঘোরাতে পারে। চাকটি ঘোরাতে ঘোরাতে যখন পাত্রটি কাঙ্ক্ষিত আকৃতি ধারণ করে তখন একে সরিয়ে ফেলা হয় এবং শুকানোর জন্য একপাশে রাখা হয়। গোলাকার গলাবিশিষ্ট সব পাত্রেরই ঘাড় ও কাঁধ চাকার সাহায্যে নির্মাণ করা হয়, কিন্তু দেহের কাঠামোটি নির্মিত হয় হাত দ্বারা। শক্ত মাটি ভিতরে রাখা হয় এবং বাইরে থেকে একটি কাঠের পিটনা দিয়ে পিটিয়ে প্রয়োজনমাফিক আয়তন ও আকৃতি প্রদান করা হয়।

কুমাররা তৈজসপত্র তৈরিতে বেলে ও কালো এঁটেল এ দু ধরনের মাটি ব্যবহার করে থাকে। বেলে মাটির সঙ্গে এঁটেল মাটির অনুপাত ১:২ করে মেশালে শক্ত ও উন্নতমানের  মৃৎপাত্র তৈরি করা যায়। লাল রঙের তৈজসপত্র তৈরিতে ভাওয়ালের লালমাটি ব্যবহার করা হয়। সাদা কিংবা কালো রঙের তৈজসপত্র তৈরিতে একই ধরনের মাটি ব্যবহার করা হয়। কালো পাত্র তৈরির ক্ষেত্রে চুলাকে কিছু সময় ঢেকে রাখা হয়। এক্ষেত্রে অনেক সময় চুলার আগুনে খৈল পোড়ানো হয়।

অনেক কুমার তাদের পাত্রের রং নির্বাচন কিংবা চাকচিক্যময় করতে পারে না। তারা পাত্রটি পুড়ে তৈরি হওয়ার পর তাতে রং লাগিয়ে নেয়। লাল সিসা থেকে লাল রং, আর্সেনিক থেকে হলুদ, দস্তা থেকে সবুজ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগের মিশ্রণে কালো রং তৈরি করা হয়। মাটির তৈজসপত্র ছাড়াও অনেক কুমার ইট, টাইলস, মূর্তি,  পুতুল ও খেলনা প্রভৃতি তৈরি করে।

গ্রামীণ জনপদে কুমারদের কারখানা একটি দর্শনীয় বিষয়। একই ছাদের নিচে দেখা যায় চুলা, গুদামঘর ও বসবাসের ঘর, দরজার সামনের খোলা জায়গাটুকু ব্যবহূত হয় কাদামাটি তৈরির স্থান হিসেবে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফরিদপুর, বগুড়া প্রভৃতি জেলা নিপুণ মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত। বর্ষাকালে এ সকল স্থান থেকে নদীপথে সারি সারি  নৌকা মাটির তৈরি জিনিসপত্র বোঝাই করে পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে ছড়িয়ে পড়ে।

এক সময়ের বাংলায় কুমারগোষ্ঠীর উপবর্ণগুলির মধ্যে ছিল বড়ভাগিয়া, ছোটভাগিয়া, রাজমহালা, খাটাইয়া প্রভৃতি। ঐতিহ্যগতভাবে  বিষ্ণু হলেন এ বর্ণের প্রিয় দেবতা। তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সমমর্যাদাসম্পন্ন হিন্দু শ্রেণির উৎসবাদি থেকে খুব বেশি ভিন্ন নয়। এ বর্ণের সামাজিক মর্যাদা মোটামুটি সম্মানজনক। এরা নবশাখ দলের সদস্য হিসেবে পরিগণিত। ব্রাহ্মণ শ্রেণি এদের হাতের পানি গ্রহণ করে। কুমারদের পেশা পারিবারিক ঐতিহ্যনির্ভর এবং নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করে।

বাংলাদেশে মৃৎশিল্প ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে চলছে। প্রাচীন শিলালিপি ও পুরাকীর্তিতে প্রাপ্ত বিভিন্ন নিদর্শন থেকে জানা যায়, এদেশে উন্নত ও গুণগতমানের মৃৎশিল্প বর্তমান ছিল। পরবর্তী সময়ে শৈল্পিক নৈপুণ্য ও সৃজনশীল ডিজাইনমন্ডিত মাত্রা যুক্ত হয়ে মৃৎশিল্প বিভিন্ন জাদুঘর ও চারু প্রদর্শনীতে স্থান করে নেয়। সময়ের আবর্তনে অন্যান্য বস্ত্ত, যেমন প্লাস্টিক বা ধাতুনির্মিত পণ্যের উদ্ভব ও ব্যবহার মৃৎশিল্পের ব্যাপক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে গ্রামীণ এলাকায় শুধু দরিদ্ররা মাটির তৈরি সাদামাটা ধরনের সস্তা তৈজসপত্র ব্যবহার করে। শহরের ধনীরা তাদের ড্রয়িং রুমের শো-পিস ও গৃহের অভ্যন্তরীণ ডেকোরেশনে মাটির পণ্যাদি ব্যবহার করে থাকে।  [গোফরান ফারুকী]