কারা প্রশাসন


কারা প্রশাসন  আদালত কর্তৃক দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আটক রাখার সুনির্দিষ্ট স্থান বা কারাগারের প্রশাসনব্যবস্থা। বস্ত্তত ১৮৬৪ সালের আইনের উপর ভিত্তি করে কারা প্রশাসনের সূত্রপাত। ওই বছর বঙ্গীয় সরকার একটি বিস্তারিত জেল কোড প্রণয়ন করে। ইতঃপূর্বে কারা প্রশাসনের কার্যক্রম সময়ে সময়ে জারিকৃত সার্কুলার ও আদেশ বলে পরিচালিত হতো। কার্যত তখন কারাগারের কার্যপ্রণালীর মধ্যে তেমন সঙ্গতি ছিল না। প্রদেশের কারাগার ও অধস্তন কারাগারের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার জন্য সময়ে সময়ে জারিকৃত বিধিবিধান সমন্বয়ে ১৮৬৪ সালে ‘দি বেঙ্গল জেল কোড’ সংকলিত হয়। সংকলনটির দুটি অংশ ছিল। প্রথম অংশের শিরোনাম ‘দি বেঙ্গল জেল কোড’ এবং দ্বিতীয় অংশের শিরোনাম ‘দি বেঙ্গল সাবসিডিয়ারী জেল কোড’।

১৮৬৪ সালের বেঙ্গল জেল কোড বাংলাদেশে চালু আছে। এ কোডের সঙ্গে অবশ্য যোগ হয়েছে কারাগার আইন ১৮৯৪, কারাবন্দি আইন ১৯০০, কারাবন্দি শনাক্তকরণ আইন ১৯২০ এবং আরও কিছু আইনের বিভিন্ন ধারা। এসব আইনের মূল লক্ষ্য ছিল কারাগারের ব্যবস্থাপনা, কারাবন্দিদের যথাযথভাবে আটক রাখা, তাদের প্রতি আচরণ এবং বন্দিদের মধ্যে শৃঙ্খলা বিধান। দি বেঙ্গল জেল কোডে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, দীউয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮, ফৌজদারি দন্ডবিধি ১৮৯৮, এবং দন্ডবিধি ১৯৬০-এর ধারায় কারাবন্দিদের আটক রাখা, দন্ড কার্যকর করা, কয়েদিদের আপিল, উন্মাদ কয়েদি এবং অনুরূপ বিষয় সম্পর্কিত যে নির্দেশাবলি রয়েছে তাও অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশে কারাগার চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছে কেন্দ্রীয় কারাগার যেখানে ৬ মাস ও তদুর্ধ্ব মেয়াদের সশ্রম দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদি এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের রাখা হয়। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে জেলা সদর দপ্তরে অবস্থিত জেলা কারাগার যেখানে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার কয়েদিদের রাখা হয়। তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে অধস্তন কারাগার যেগুলি সাবেক মহকুমা সদরে অবস্থিত ছিল এবং এখানে ফৌজদারি দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের রাখা হয়। কিন্তু ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে মহকুমা বিলুপ্ত হওয়ার পর বর্তমানে কোনো কোনো উপজেলায় এরূপ অধস্তন কারাগার রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণিতে রয়েছে বিশেষ কারাগার যেখানে বিশেষ শ্রেণির কয়েদিদের আটক রাখা হয়। জেলা কারাগারগুলিকে আবার প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এক বছরে কারাগারে আটক কয়েদিদের গড় সংখ্যার উপর ভিত্তি করে এ শ্রেণিবিভাগ করা হয়।

দেশের সকল কারাগারের নিয়ন্ত্রণ এবং তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা মহা-কারাপরিদর্শকের উপর ন্যস্ত। প্রতিটি কারাগারে তাকে সাহায্য করেন একজন তত্ত্বাবধায়ক, একজন মেডিক্যাল অফিসার (কোনো কোনো কারাগারে তিনি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন), একজন অধস্তন মেডিক্যাল অফিসার, একজন কারাধ্যক্ষ এবং সরকারের প্রয়োজন মতো অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এ ছাড়াও একজন অথবা একাধিক উপ-মহাকারাপরিদর্শক থাকেন। সাধারণ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মহাকারাপরিদর্শকের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। জেলের অভ্যন্তরীণ অর্থব্যবস্থা, শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মহা-পরিদর্শকের নির্দেশ সকল ম্যাজিস্ট্রেট এবং জেল কর্মকর্তাদের মেনে চলতে হয়। এক্ষেত্রে যে কোনো বিচ্যুতি বা লঙ্ঘন তিনি সরকারের গোচরীভূত করেন।

জেলা প্রশাসক জেলা কারাগারের উপর কিছুটা তদারকি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। দি বেঙ্গল জেল কোড অনুযায়ী তিনি প্রয়োজনবোধে কারাগারের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন। তবে এধরনের পরিস্থিতিতে তার পদক্ষেপের কারণ জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মহা-কারাপরিদর্শককে অবহিত করতে হয়। তদুপরি জেল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তত্ত্বাবধায়কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তাকে ১৮৯৪ সালের কারাগার আইন বা এর অধীনে প্রণীত বিধির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন বিষয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশ মেনে চলতে হয়। জেলা প্রশাসকের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কারাগারের উপর প্রযোজ্য হতে পারে যদি কারাগারটি তার জেলার আওতাধীন থাকে। তবে জেলা প্রশাসকের ক্ষমতার উপর কিছু নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি কারা তত্ত্বাবধায়কের অধস্তন কোনো কর্মকর্তা বরাবরে পত্র বা নির্দেশ পাঠাতে পারেন না। তার সকল নির্দেশ লিখিত হতে হবে এবং সাধারণত তা কারাগারে রক্ষিত পরিদর্শক বহিতে লিপিবদ্ধ করতে হবে। জেল ব্যবস্থাপনার খুঁটিনাটি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করাও জেলা প্রশাসকের কাজ নয়। এ ছাড়া অধস্তন কর্মকর্তা ও কয়েদিদের উপর তত্ত্বাবধায়কের এক্তিয়ার ক্ষুণ্ণ হতে পারে এমন সব কাজ জেলা প্রশাসককে পরিহার করতে বলা হয়েছে। জেল তত্ত্বাবধায়কের পদ শূন্য হলে বা তত্ত্বাবধায়ক ছুটিতে কিংবা সদরের বাইরে থাকলে সেক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক জেল তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব সম্পাদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। দি বেঙ্গল জেল কোড উনিশ শতকের শেষদিকে প্রণীত হলেও এটি অদ্যাবধি কারা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ রূপরেখার বিস্তৃত ও ব্যাপক দলিলরূপে পরিচিত। [এ.এম.এম শওকত আলী]