জেল কোড


জেল কোড  কারাগার ও অধস্তন কারাগারের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রণীত আইনবিধান। কারাগার আইন ১৮৯৪ এবং এ আইনের ৫৯ ও ৬০(ক) ধারার অধীনে প্রণীত বিধিসমূহ, কারাবন্দি আইন ১৯০০ এবং কারাবন্দি শনাক্তকরণ আইন ১৯২০-এর বিধান সমন্বয়ে জেল কোড গঠিত।

কারাগার আইন, ১৮৯৪  এ আইনে কারাগারের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে যে, সরকারের সাধারণ অথবা বিশেষ আদেশ অনুযায়ী কয়েদিদের স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে আটক রাখার জন্য যে কয়েদখানা বা স্থান ব্যবহূত হয় তাকে কারাগার বলা হয়। প্রতিটি কারাগার কারা মহাপরিদর্শকের সাধারণ নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানে একজন সুপারিন্টেন্ডেন্ট, একজন মেডিক্যাল অফিসার, একজন মেডিক্যাল সহকারি, একজন কারারক্ষক এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা পরিচালিত হয়। কয়েদিদের কারাগারে ভর্তি, অপসারণ ও খালাস দেয়া, শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থাগ্রহণ ও শাস্তিপ্রদান, নিয়োগদান, চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্য, পরিধেয় ও শয্যার ব্যবস্থা এ আইনের বিধান অনুযায়ী করা হয়। এখানে পুরুষ কয়েদি ও মহিলা কয়েদিদের আলাদাভাবে রাখার বিধান রয়েছে। তাছাড়া অপ্রাপ্ত বয়স্ক কয়েদিদের প্রাপ্ত বয়স্ক কয়েদিদের থেকে আলাদা এবং দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদি ও বিচারাধীন কয়েদিদের পৃথকভাবে রাখার বিধান রয়েছে। দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের একত্রে অথবা পৃথকভাবে রাখার বিধান আছে। এ ধরনের কয়েদিকে সেলে নির্জন কারাবাস এবং মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত কয়েদিকে পৃথকভাবে সেলে নির্জন কারাবাসে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। বিচারাধীন কয়েদি এবং সাধারণ আসামীদের সঙ্গে আইনি পরামর্শদাতাসহ দর্শকদের দেখা করার অনুমতি প্রদানের ব্যবস্থা আছে। কোনো বিপজ্জনক কয়েদি অথবা যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদিকে লোহার শিকল, ডান্ডাবেড়ি অথবা হাতকড়া লাগিয়ে রাখার বিধান রয়েছে।

কারাবন্দি আইন, ১৯০০  এ আইন অনুযায়ী সরকার কর্তৃক অধস্তন কারাগার হিসেবে সাধারণ অথবা বিশেষ আদেশে ঘোষিত যেকোন স্থান কারাগারের অন্তর্ভুক্ত। এ আইনে কারাগারের ভারপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা আদালত কর্তৃক প্রদত্ত কোনো কয়েদিকে গ্রহণ করতে ও আটক রাখতে এবং আইনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে যতদিন ওই  কয়েদি খালাস না পায় অথবা সেখান থেকে সরিয়ে না নেওয়া হয় ততদিন ওই  কয়েদিকে তাঁর হেফাজতে রাখতে আইনত ক্ষমতাবান। নৈতিকতা সংস্কারমূলক স্কুলে আটককৃত ব্যক্তিকেও কারাগারে আটক কয়েদি হিসেবেই গণ্য করা হয়। সরকারের অথবা মহা-কারাপরিদর্শকের আদেশে কয়েদিকে এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরিত করা যায়। কোনো দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদি উন্মাদগ্রস্ত হলে তাঁর নিরাপদ হেফাজত ও চিকিৎসার জন্য কারাগার থেকে সরিয়ে উন্মাদাগার অথবা অন্য কোনো স্থানে নেয়া যাবে, এবং তাঁর চিকিৎসার পর তাঁর দন্ডাদেশের মেয়াদ বাকি থাকলে কারাভোগের জন্য তাকে কারাগারে ফিরিয়ে আনার বিধান রয়েছে। তবে উন্মাদাগারে থাকার সময়কাল আদালত কর্তৃক প্রদত্ত আটকাদেশ অথবা কারাদন্ডের আদেশের সময়ের অংশ বলে গণ্য হবে। কয়েদিদের আদালত প্রক্রিয়া অনুসরণের অংশ হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান অথবা অভিযোগের জবাব দানের জন্য তাদের দেওয়ানি অথবা ফৌজদারি আদালতে হাজির থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে কয়েদিদের জেল থেকে স্থানান্তর করে আদালতে সাক্ষ্য প্রদানের উপর যদি সরকারের কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকে অথবা শারীরিক বৈকল্য অথবা অন্য কোনো কারণে তাদের আদালতে হাজির করতে কারা কর্তৃপক্ষ বিরত থাকেন, সেক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক গঠিত কমিশনের নিকট ঐসব কয়েদির শুনানী গ্রহণের বিধান রয়েছে।

কারাবন্দি শনাক্তকরণ আইন, ১৯২০  এ আইনে দন্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দির দৈহিক মাপ ও আলোকচিত্র এবং বিচারাধীন কারাবন্দির শুধু দৈহিক মাপ নেওয়ার বিধান আছে। কোনো কারাবন্দি যদি অনুরূপ তদন্ত অথবা মামলার ব্যাপারে পূর্বে গ্রেফতার হয়ে থাকে, তাহলে ফৌজদারি দন্ডবিধির অধীন তদন্ত ও মামলা পরিচালনার উদ্দেশ্যে পুলিশ কর্তৃক তাঁর দৈহিক মাপ অথবা আলোকচিত্র গ্রহণের জন্য একজন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ জারি করতে পারেন। বিচারাধীন কারাবন্দি যদি আদালত কর্তৃক খালাস পায় অথবা নির্দোষ প্রমাণিত হয়, পূর্বে অন্য কোনো অপরাধে এক বছর অথবা তার অধিক সময়ের জন্য সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত না হয়ে থাকে, তাহলে ওই  কারাবন্দির গৃহীত দৈহিক মাপ বা আলোকচিত্র বিনষ্ট করার বিধান রয়েছে।

কারাগারের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনা বিধি  কারাগারের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রণীত বিধি অনুসারে কারাগারগুলোকে কেন্দ্রীয় কারাগার, জেলা কারাগার, অধস্তন কারাগার ও বিশেষ কারাগারে শ্রেণীবিভক্ত করা হয়েছে। কোনো কারাবন্দির ১৪ দিনের উর্ধ্বে কারাদন্ডের আদেশ হলে এবং মহা-কারাপরিদর্শক অন্য কোনো প্রকার ঘোষণা না দিলে ওই  কারাবন্দিকে অধস্তন কারাগার থেকে জেলা কারাগারে প্রেরণ করতে হয়। জেলা কারাগারের উপর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (বর্তমানে ডেপুটি কমিশনার) সাধারণ নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ সাপেক্ষে সার্বিক ব্যবস্থাপনার উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে সুপারিন্টেন্ডেন্টের। যেখানে কোনো কেন্দ্রীয় কারাগার একটি জেলা কারাগারও বটে সেক্ষেত্রে ওই  জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কারাবন্দিদের ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ থাকবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে সপ্তাহে একবার জেলা কারাগার পরিদর্শনে যেতে হয় এবং তিনি কোনো কারণে একাজে অসমর্থ হলে তাঁর অধীনস্থ কোনো ম্যাজিস্টেটকে এ কাজে পাঠাতে পারেন। মহা-কারাপরিদর্শকের নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কারাগারের শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সকল বিষয়ে তদন্ত করবেন এবং তিনি যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন তা মহা-কারাপরিদর্শককে অবহিত করবেন। সরকারি ও বেসরকারি পরিদর্শকদের কারাগার পরিদর্শন এবং পরিদর্শনকালে যেসব ঘটনা তাদের নজরে আসবে সে সম্পর্কে তাদের মন্তব্য লিপিবদ্ধ করার বিধান রয়েছে, এবং তাদের দেওয়া পরামর্শ ও সে সম্পর্কে সুপারিন্টেন্ডেন্ট কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ পরিদর্শকদের কার্যবিবরণী বইতে লিপিবদ্ধ করতে হবে।

কারা সুপারিন্টেন্ডেন্ট কারারক্ষক ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সহায়তায় কারাগারের শৃঙ্খলা, শ্রম, ব্যয়, শাস্তি ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং মহা-কারাপরিদর্শকের আদেশ সাপেক্ষে ওয়ার্ডেন ও হেডওয়ার্ডেনের নিয়োগদান ও তাদের বরখাস্ত করতে পারবেন। সুপারিন্টেন্ডেন্টের নিয়ন্ত্রণ এবং মহা-কারাপরিদর্শকের সাধারণ নিয়ন্ত্রণ সাপেক্ষে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কারাগারের স্বাস্থ্যরক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বে থাকবেন এবং কারাবন্দিদের স্বাস্থ্য ও কারাগারের সার্বিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয় তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তিনি মাঝেমধ্যে কয়েদিদের খাদ্যতালিকা পরিবর্তন করবেন এবং অসুস্থ, বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য বিশেষ খাদ্য সরবরাহের নির্দেশ দিতে পারবেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তিকৃত কয়েদিদের প্রতিদিন দেখাশুনা করেন, অসুস্থ কারাবন্দিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন এবং প্রয়োজনবোধে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করেন। কারাগারের সকল কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের যেসকল সদস্য কারাগারের সীমানার মধ্যে বাস করেন তাদের চিকিৎসার দায়িত্বও স্বাস্থ্য কর্মকর্তার। মেডিক্যাল সহকারি হাসপাতালে কারাবন্দিদের চিকিৎসা ও পরিচর্যা সংশ্লিষ্ট কাজ এবং কম্পাউন্ডার ও সেবাদানকারী অনুষঙ্গীদের কাজের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা কর্মকর্তাকে সহায়তা করেন। তাকে কারাগারের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত অবস্থা নিশ্চিত করতে হয় এবং খাবারের মান নিশ্চিতকরণকল্পে প্রতিদিন খাদ্য ভান্ডার ও রন্ধনশালা পরিদর্শন করতে হয়।

কারাগারে আসার পর প্রত্যেক কারাবন্দিকে একটি করে ইতিবৃত্ত টিকিট প্রদান করা হয় এবং এ টিকিটে ওই  কারাবন্দি সম্পর্কিত বিস্তারিত বিবরণ এবং তাঁর কারাজীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা লিপিবদ্ধ করতে হয়। কোনো দন্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি আপীল আদালতে আপীল রুজু করতে চাইলে কারা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাঁর পক্ষ থেকে আপীলের দরখাস্ত তৈরি করে পাঠাবার বিধান রয়েছে। দিউয়ানি মামলার কারাবন্দি, বিচারাধীন কারাবন্দি, মহিলা কারাবন্দি, বিভিন্ন বয়সের পুরুষ কারাবন্দিদের পৃথকভাবে রাখার ব্যাপারে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। কারাগারে কারাবন্দিদের শৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রাত্যহিক রুটিন সম্পর্কেও বিস্তারিত বিধান আছে।

কারাগারে কোনো কারাবন্দি জঘন্য অপরাধ করলে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে আদালতে পাঠাবে এবং আদালত তাঁর অপরাধের জন্য শাস্তি প্রদান করবে, কারণ সুপারিন্টেন্ডেন্ট তাকে শাস্তি প্রদান করতে পারেন না। সেলে থাকা কারাবন্দির সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও বিধিবিধান রয়েছে। কোনো কারাবন্দির সদাচরণ, শ্রম ও তাঁর দৈনন্দিন কাজ যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য তাঁর দন্ডের অংশ মওকুফ করার এবং কোনো কারাবন্দি কর্তৃক বিশেষ সেবা প্রদানের জন্য তাকে বিশেষ ক্ষমা প্রদর্শনেরও বিধান রয়েছে।

অধস্তন কারাগারের তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনা বিধি  দন্ডপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন কারাবন্দিদের অবরুদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যে সাবেক মহকুমাগুলির (বর্তমানে জেলায় উন্নীত) সদরদপ্তরে দন্ডবিধির ৫৪১ ধারার অধীনে অধস্তন কারাগার স্থাপন করা হয়। যেসব কারাবন্দিকে ১৪ দিনের অধিক সময়ের জন্য দন্ডিত করা হয় তাদের সাধারণত অধস্তন কারাগারে রাখা হয় না, ১৪ দিনের মধ্যে তাদের জেলা কারাগারে পাঠাতে হয়।

সকল অধস্তন কারাগারের সাধারণ নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব মহা-কারাপরিদর্শকের উপর ন্যস্ত, এবং অধস্তন কারাগারের অভ্যন্তরীণ মিতব্যয়িতা, শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত সকল বিষয়ে তিনি যে আদেশ জারি করেন তা সকল ম্যাজিস্ট্রেট ও অধস্তন কারাগারের কর্মকর্তাদের মেনে চলতে হয়। মহা-কারাপরিদর্শক অধীনস্থ কারাগারের সকল ব্যয়ের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রয়োগের অধিকারী। অধস্তন কারাগারের সুপারিন্টেন্ডেন্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ পালন করেন এবং অধস্তন কারাগারের জন্য ক্ষতিকর কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাকে অবহিত করেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর এখতিয়ারভুক্ত প্রত্যেকটি অধস্তন কারাগার বছরে অন্তত একবার পরিদর্শন করবেন এবং ওই  অধস্তন কারাগারের অবস্থা সম্পর্কে মহা-কারাপরিদর্শকের নিকট প্রতিবেদন পেশ করবেন।  [কাজী এবাদুল হক]