কারখানা


কারখানা  সুলতানি ও মুগল আমলে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত উৎপাদন কেন্দ্র এবং বর্তমানকালে উৎপাদন ও সংযোজন স্থলের প্রচলিত নাম। ভারতের গ্রামীণ অবকাঠামো এবং জীবিকা সংস্থানের অর্থনীতির প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে উৎপাদন ও যোগানের ভিন্নতর পটভূমি থেকে আগত মুসলিম শাসকগণ রাজপরিবার ও সরকারি দপ্তরে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও নিয়ন্ত্রিত কারখানা পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। দিল্লির সুলতান  মুহম্মদ বিন তুগলক (১৩২৫-১৩৫১) এ ধরনের বহু কারখানা স্থাপন করেন বলে শোনা যায়। তাঁর উত্তরসূরি সুলতান  ফিরুজ শাহ তুগলক এসব কারখানাকে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও পরিণত করেন। দাসে পরিণত অনেক যুদ্ধবন্দিকে চারু ও কারুশিল্প সামগ্রী উৎপাদনের প্রশিক্ষণের জন্য এসব কারখানায় ভাগ করে দেওয়া হতো।  আকবর এর সময় (১৫৫৬-১৬০৫) কারখানাগুলি ‘দিউয়ান-ই-বুয়ুতাত’ ও  ‘মীরসামান’ (খান-ই-সামান)এর অধীনে নিয়মিত বিভাগ ছিল। তাঁর সময়ে এসব কারখানায় শিক্ষানবিশদের প্রশিক্ষণের উপরই বেশি নজর দেওয়া হতো। তরুণ শিক্ষানবিশদের শিল্পকর্ম শেখার জন্য একজন ওস্তাদের অধীনে ন্যস্ত করা হতো যাতে তারা ভবিষ্যতে একাজে কুশলী হয়ে উঠতে পারে। একজন উচ্চপদস্থ রাজকীয় কর্মকর্তা তার অধীনস্ত কর্মচারীদের (মুস্তাশরীফ) সহায়তায় এসব কারখানার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। কারখানাগুলি ছিল বিভিন্ন ধরনের যেমন, ধাতব সরঞ্জাম তৈরি, খনি খনন,  টাকশাল, বস্ত্রশিল্প, অস্ত্রনির্মাণ, অলঙ্কার প্রস্ত্তত প্রভৃতি। ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার সতেরো শতকের শেষে মুগল সাম্রাজ্যে কারখানার সমৃদ্ধি লক্ষ করেছেন। বাংলার কারখানাগুলি প্রধানত দেশীয় ও বিদেশি রাজরাজাদের জন্য সূক্ষ্ম ও উৎকৃষ্ট মানের বস্ত্র বয়নের জন্য পরিচালিত হতো। কথিত আছে যে, রাজরাজড়া ও সম্ভ্রান্তব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও দামি বস্ত্র বাংলার কারখানাগুলিতেই প্রস্ত্তত হতো। এসব কারখানা থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কারিগরদের মধ্যে বেতন ও পারিতোষিক হিসেবে বিতরণ করা হতো। আঠারো শতকে মুগল শাসন ও মুগল আভিজাত্যের অবক্ষয়ের সাথে সাথে এসব কারখানারও ক্রমাবনতি ঘটে এবং কোম্পানি আমলে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়।  [সিরাজুল ইসলাম]