কানুনগো, কালিকারঞ্জন


কানুনগো, কালিকারঞ্জন (১৮৯৫-১৯৭২)  একজন ইতিহাসবেত্তা। ১৮৯৫ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়া গ্রামের এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতার নাম রাজমনি কানুনগো। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে কালিকারঞ্জন পিতৃহীন হন। রাজশাহী কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ ১৯১৫ সালে তিনি বি.এ ডিগ্রি, ১৯১৭ সালে  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এম.এ ডিগ্রি এবং ১৯১৮ সালে ল’ ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে  যদুনাথ সরকার এর অধীনে ‘শেরশাহ অ্যান্ড হিজ টাইমস’ (Sher Shah and His Times) শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য তিনি পি-এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

দিল্লির রামযশ কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে কালিকারঞ্জনের কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯২৩ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত তিনি লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। ১৯২৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে রীডার পদে যোগ দেন। ১৯৩৭ সালে তিনি প্রফেসর এবং বিভাগীয় প্রধান পদে নিযুক্ত হয়ে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগ দেন এবং সেখান থেকে ১৯৫৫ সালে অবসর নেন। ১৯৪৮ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে আর.পি নোপানি বক্তৃতা প্রদান করেন।

প্রফেসর কানুনগোর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল উপমহাদেশের মধ্যযুগের ইতিহাস। মুসলমান শাসক, রাজপুত এবং মারাঠাদের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। ফারসি, উর্দু, হিন্দি, আওধী, এবং বেশ কিছু স্থানীয় ভাষার ওপর দক্ষতা স্থানীয় পর্যায়ের উৎস অনুসন্ধানে তাঁকে প্রভূত সাহায্য করে। কালিকারঞ্জনের সর্বশ্রেষ্ঠ গবেষণামূলক গ্রন্থটির নাম Sher Shah And His Times (শেরশাহ অ্যান্ড হিজ টাইমস)। সমসাময়িক ফারসি উৎসের ভিত্তিতে রচিত গ্রন্থটিতে আফগান বীর শেরশাহের জীবনের মহত্বেবর বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়েছে। দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপনার সময়ে জাঠদের সম্পর্কে কালিকারঞ্জনের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে তিনি তাঁর গবেষণার পক্ষে অলিখিত এবং মৌখিক উপকরণ সংগ্রহের জন্য হরিয়ানা ও রাজস্থানের দূরবর্তী গ্রামে অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য জরিপ কাজ সম্পন্ন করেন। তাঁর রচিত স্টাডিজ ইন রাজপুত হিস্ট্রি এবং রাজস্থান কাহিনী গ্রন্থদুটিতে রাজপুতদের সম্পর্কে অত্যন্ত আকর্ষণীয় তথ্য রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত হিস্ট্রি অব বেঙ্গল (History of Bengal), দ্বিতীয় খন্ড প্রণয়নে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরিকালে তিনি হিস্ট্রি অব দি বেরোনিয়াল হাউস অব দিল্লি (History of the Baronial House of Delhi) গ্রন্থটি প্রণয়ন করেন। এ গবেষণায় তিনি প্রধানত স্থানীয় মহাফেজখানায় সংরক্ষিত সরকারি দলিলপত্র ব্যবহার করেন। কানুনগোর প্রধান প্রকাশনাগুলির মধ্যে দুটি তাঁর অবসর গ্রহণের পর প্রকাশিত হয়। গ্রন্থ দুটি হলো ইসলাম অ্যান্ড ইটস ইম্প্যাক্ট অন ইন্ডিয়া (১৯৬৮), এবং শাহজাদা দারা শিকোহ (১৯৮৬)। শেষোক্ত গ্রন্থটি ঢাকায় অবস্থানকালে রচিত হয়েছিল। এগুলি ব্যতীত তিনি গবেষণামূলক পত্র-পত্রিকায় অসংখ্য প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি প্রবাসী পত্রিকার একজন নিয়মিত লেখক ছিলেন। স্থানীয় সম্প্রদায়সমূহের ইতিহাস রচনায় স্থানিক উপকরণের ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ কানুনগোর ইতিহাস রচনার একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর মতে, মধ্যযুগে ভারতের ইতিহাসের প্রধান গুুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সামাজিক সংশ্লেষণ। তাঁর গবেষণাকর্মে ধর্ম ও বর্ণগত গোষ্ঠীসমূহের মধ্যে অধিকতর সমঝোতা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রকাশ পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে তাঁর গ্রন্থসমূহ যৌক্তিক রচনা এবং মধ্যযুগের ভারতের অত্যন্ত ফলপ্রসূ পুনর্গঠন বলে বিবেচিত হয়।

কালিকারঞ্জন কানুনগো ইতিহাস চর্চার জন্য বিভিন্নভাবে সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৪০ সালে (১৩৪৭ বঙ্গাব্দ) ইতিহাস গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক রামপ্রাণ গুপ্ত স্মৃতি স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। রাজস্থান কাহিনী শীর্ষক গ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে রবীন্দ্র পুরস্কার প্রদান করেন।

১৯৭২ সালের ২৯ এপ্রিল লক্ষ্ণৌর নিজস্ব বাসভবনে কালিকারঞ্জন কানুনগোর মৃত্যু হয়।  [সুনীতি ভূষণ কানুনগো]