কলকাতা বন্দর


কলকাতা বন্দর  ভারতের আধুনিক বন্দরগুলির মধ্যে অন্যতম প্রাচীন বন্দর। রিভার ট্রাস্টের প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যর্থতার পর ১৮৭০ সালের অক্টোবর মাস থেকে বন্দরটি কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত হয়ে আসছে। অবশ্য এ বন্দরের ইতিহাস পোর্ট ট্রাস্টের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা অপেক্ষা অনেক প্রাচীন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক নৌ-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার আগে এটি ছিল তাঁতি ও কারিগর অধ্যুষিত ছোট একটি নদী বন্দর। ছোট তাঁতি বসতি থেকে পূর্ব ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা নগরের রূপান্তরে হুগলি তীরস্থ এ বন্দরটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। উত্তর-পূর্বে আসামের পার্বত্য অঞ্চল থেকে পশ্চিম দিকে গঙ্গা বিধৌত উত্তর ভারতের বিশাল সমভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত পূর্বভারতের বিশাল পশ্চাদভূমির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে ওঠা বন্দরটি ছিল সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশদের সৃষ্ট। আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে এর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলায় ব্রিটিশদের ক্ষমতা দৃঢ়ীকরণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

কলকাতা বন্দর, ১৯১৫

আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে কলকাতা বন্দরের উন্নতি মুগল বন্দর হুগলি অথবা পশ্চিম উপকূলীয় সুরাট বন্দরের অবনতি ব্যতীত অসম্ভব ছিল। কলকাতার উত্থানের সাথে জড়িত ছিল ভারত মহাসাগর এলাকায় বিদ্যমান আন্ত-এশীয় বাণিজ্য কাঠামোয় বড় ধরনের ভাঙন এবং পূর্ব ভারতে ইংরেজদের উত্থান। ব্রিটিশ কোম্পানি বাংলার শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রাক্কালে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যিক কাঠামোটি সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত। পরবর্তীকালে এর পুনরুত্থানের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে যায় যখন চূড়ান্তভাবে ইউরোপমুখী হওয়ার লক্ষ্যে ভারতীয় বৈদেশিক বাণিজ্য চীনের সাথে নতুনভাবে শুরু হয়। পরিশেষে, ভারতীয় আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ব্রিটিশদের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রাধান্য পেতে শুরু করে, আর এটি আবর্তিত হতে শুরু করে কলকাতা বা বম্বের মতো বন্দরগুলিকে কেন্দ্র করে।

অবশ্য বন্দর শহর হিসেবে  কলকাতার উত্থানের পেছনে নৌ-গুরুত্ব স্পষ্ট প্রতীয়মান, কেননা ষোল শতক থেকেই গঙ্গার ভাগীরথী- হুগলি প্রবাহ বরাবর এর ভাটির দিকে বাণিজ্য বসতি ক্রমশ গড়ে উঠছিল। কালক্রমে, গঙ্গার এককালের প্রধান শাখা হুগলি ক্রমশ বড় জাহাজের জন্য অকার্যকর হয়ে পড়ছিল এর পলিজনিত সমস্যার কারণে। কেননা নদীর পানির বিরাট অংশ প্রবাহিত হতো পূর্বমুখী শাখা নদীগুলি দিয়ে। সে সাথে হুগলির অাঁকা বাঁকা গতিপথ ছিল বড় বড় জাহাজ চলাচলের জন্য কঠিন। উপরন্তু, উজানের দিকে হুগলী ক্রমশ সরু হয়ে যাওয়ায় নৌ চলাচল আরও অসুবিধাজনক হয়ে ওঠে।

ষোল শতকের প্রথম দিকে বাংলার এ অঞ্চলের সাথে ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রথম যোগাযোগ স্থাপনকারী পর্তুগিজদের আগমণের পূর্ব থেকেই হুগলি নদীর উজানে বাণিজ্য বসতি থেকে গৃহীত শুল্ক গঙ্গার নৌ ব্যবস্থায় পরিবর্তন সূচিত করে। সরস্বতী ও ভাগীরথী নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত সমৃদ্ধশালী সাঁতগাও বন্দরটি সমুদ্রগামী মালবাহী জাহাজের জন্য ক্রমশ অপ্রবেশযোগ্য হয়ে পড়ছিল। ষোল শতকের শেষের দিকে পর্তুগিজদের বড় বড় জাহাজগুলি বেতরে (Betor) এসে থেমে যেত। বেতর ছিল কলকাতার উপকণ্ঠস্থ একটি স্থান। সাঁতগাও থেকে ছোট জাহাজে করে পণ্যসামগ্রী ভেতরে এনে বড় বড় জাহাজগুলিতে বোঝাই করা হতো। ১৫৭০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা তাদের বাণিজ্যকুঠি সাঁতগাও থেকে সরিয়ে কয়েক মাইল ভাটিতে হুগলিতে স্থানান্তরিত করে। শীঘ্রই সাঁতগাও-এর পরিবর্তে হুগলি এ অঞ্চলের সমুদ্র নির্গম পথ হিসেবে জায়গা করে নেয়।

সমগ্র সতেরো শতকে হুগলি তার গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখে। অল্প কয়েক দশক পরে ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মুগলদের দ্বারা পর্তুগিজগণ এ অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরে ওলন্দাজ ও ইংরেজগণ এখানে তাদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। অধিকন্তু, হুগলির বাণিজ্য আরও ভাটির দিকে, বিশেষ করে সুতানুটি ও গোবিন্দপুর পর্যন্ত, ছোট বাণিজ্য কেন্দ্র ও বসতিগুলির বৃহত্তর কর্মকান্ডের পরিধিকে পূর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি করতে উৎসাহিত করে। পরবর্তীকালে এ সুতানটি ও গোবিন্দপুরই ইংরেজ কোম্পানির বন্দর শহর কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। সাঁতগাও থেকে সুতানটিতে শেঠ ও বসাকদের অভিবাসন কলকাতার উত্থানের পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে। কলকাতায় বসতি স্থাপনের পূর্ব থেকেই ইংরেজগণ জানত যে, ‘সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচল উপযোগী স্থানগুলির মধ্যে কলকাতা ছিল গোবিন্দপুর থেকে গার্ডেন রীচ পর্যন্ত পূর্ব তীর বরাবর সবচেয়ে গভীর জলরাশির এলাকা’ এবং এ অঞ্চলে অতি সহজে বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচল করতে সক্ষম ছিল।

আঠারো শতকে বন্দর শহর হিসেবে কলকাতার উত্থান অনেকাংশেই সহজতর হয়েছিল ইংরেজদের দ্বারা ভারতীয় নৌ-বাণিজ্যের দিক পরিবর্তনের কারণে। মুগল ভারত সাফাভি ইরান এবং অটোম্যান তুরস্কের রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে পশ্চিম-এশীয় বাণিজ্যবলয়কে আরও প্রাচ্যাভিমুখে সম্প্রসারিত করে। ভারতীয় বাণিজ্যের উদ্দিষ্ট স্থান হিসেবে ইউরোপের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে সমগ্র আঠারো শতক। একই সাথে কলকাতা ভিত্তিক ব্যক্তি মালিকানাধীন ইংরেজ নৌ-বাণিজ্যেও উল্লেখযোগ্য উত্থান পরিলক্ষিত যা এ নব-প্রতিষ্ঠিত বন্দর শহরটিকে ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করে।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যর ভর দুপুর তখন কলকাতার আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য একটি ভিন্ন আঙ্গিকে আরও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। অবশ্য এ বাণিজ্য বেশিরভাগটাই ব্রিটেনের সাথে সংযোজিত ছিল। এ বাণিজ্যের ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি উদ্বৃত্ত তৈরি করতে থাকে, যা ছিল মাদ্রাজ ও বোম্বের তুলনায় অনেক বেশি। কলকাতার বিশাল রপ্তানি সামগ্রী, প্রধানত কৃষি ও আধাপ্রস্ত্তত পণ্যসামগ্রী একটি সুবিধাজনক বাণিজ্যিক ভারসাম্য তৈরি করে। প্রায়শই ‘হোম চার্জ’ হিসেবে সংগৃহীত রাজনৈতিক কর ছাড়াও ব্রিটিশ মালিকানাধীন কোম্পানির সঞ্চয় ও বাণিজ্যিক লাভ এবং ব্রিটিশ ব্যাংক ও ইন্সুরেন্স কোম্পানির ‘সার্ভিস চার্জ’ হিসেবে অফিসীয় ও ব্যক্তিগতভাবে ব্রিটেনে প্রেরিত অর্থের দ্বারা বাণিজ্যিক সমতাবিধান করা হতো। আর এটি স্বতঃসিদ্ধ যে, ঔপনিবেশিক শাসনের শুরু থেকেই শোষণমুখী রপ্তানি প্রক্রিয়া কলকাতা বন্দরকে ব্রিটিশদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তারপরও বন্দরের পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ১৮৭০ সালে কলকাতা বন্দর কমিশন গঠিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যদিও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সমাপ্তির ফলে ভারতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এক প্রবল গতিবেগ। এতে অবশ্য কলকাতার সামুদ্রিক বাণিজ্যে বাস্তবিক ক্ষেত্রে একটি সঙ্গতিপূর্ণ প্রসার ঘটালেও অপরিকল্পিত জেটি ও ডক নির্মাণের ফলে বন্দরের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে একরকম সেকেলে ভাবই থেকে যায়।

ঔপনিবেশিক যুগের প্রথম দিকে মাস্টার অ্যাটেন্ডেন্ট কর্তৃক পরিচালিত কোম্পানির নৌ দফতরের অধীনে বন্দর প্রশাসনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রগামী জাহাজগুলিতে পাইলট সার্ভিস প্রদান করা। নদীর নাব্যতা সম্পর্কে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য মাস্টার অ্যাটেন্ডেন্ট নিয়মিতভাবে নদী জরিপের কাজও পরিচালনা করত। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বন্দরের ডকিং সুবিধাদির অভাব বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কেননা জাহাজগুলিকে মেরামতের জন্য বোম্বে নেওয়া হতো। ১৭৯০ সালে বাঁকশাল ঘাটের নিকটে প্রথম ডক নির্মাণ করা হয়। ইতোমধ্যেই ১৭৮১ সালে একটি ভাসমান ডক নির্মাণের জন্য কর্নেল ওয়াটসনকে বন্দরের দক্ষিণ সীমানায় একটি জায়গা প্রদান করা হয়। ওয়াটসন খিদিরপুরে একটি মেরিন ইয়ার্ড স্থাপন করেছিলেন এবং ১৭৮১ সালে ভাসমান ডক নির্মাণের কাজও শুরু করেছিলেন, কিন্তু গোকুল ঘোষালের পরিবারের সাথে আইনগত দ্বন্দ্ব শুরু হলে তাকে বাধ্য হয়ে এ প্রকল্প বন্ধ করতে হয়। ওয়াটসন পরবর্তীকালে শিপইয়ার্ডের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং ব্যবসা থেকে তার অবসর গ্রহণের পূর্বে এখান থেকে অল্প কয়েকটি জাহাজ নির্মিত হয়েছিল। ওয়াটসনের পরে কলকাতায় জাহাজ নির্মাণ কারখানা গড়ে তোলার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তবে সেগুলির কোনোটিই বোম্বের পারসি এন্টারপ্রাইজের জাহাজ নির্মাণ কর্মকান্ডের সাথে তুলনীয় ছিল না। যাহোক, উনিশ শতকের প্রথম দিকে ব্রিটিশ পোতসমূহের জন্য ভারতীয় পোতসমূহকে স্থান ছেড়ে দিতে হয়।

১৮২০-এর দশকে কলকাতা ও ডায়মন্ড হারবারে ভাসমান ডক নির্মাণের ব্যাপারে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়, কিন্তু সেগুলির কোনোটিই বাস্তবায়িত হয় নি। ১৮৪২ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় কলকাতা বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলির ব্যাপক ক্ষতি সাধন করলে এ বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। কিন্তু কলকাতা বন্দরের আধুনিকীকরণের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায় ১৮৬০-এর দশকে মাতলাতে নতুন একটি বন্দর প্রতিষ্ঠার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টায়। উদ্যোগ গ্রহণকারীদের একটি বিকল্প চিন্তা থেকে পোর্ট ক্যানিং স্কিম প্রণয়ন করা হয়। কেননা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাদের ধারণা ছিল নদীর পলিজনিত সমস্যা অকালেই কলকাতা বন্দরের মৃত্যু টেনে আনবে, ঠিক যেভাবে তিনশ বছর আগে এ হুগলির তীরবর্তী সাঁতগাও বন্দরটির মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে কলকাতা ব্রিটিশদের কাছে এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, একে ছেড়ে যাওয়া তত সহজ ছিল না। কলকাতা বন্দরের ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা আনয়নের লক্ষ্যে সরকার পোর্ট ট্রাস্ট গঠনে সক্রিয় হয়, যা কিনা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্যকে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান করে।

কলকাতা কর্পোরেশনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে প্রথমদিককার পরীক্ষামূলক রিভার ট্রাস্টটি ব্যর্থ হওয়ার পর ১৮৭০ সালের অক্টোবর মাস থেকে যখন পোর্ট ট্রাস্ট তার কাজ শুরু করে তখন কলকাতা বন্দরে জেটির সংখ্যা ছিল মাত্র চারটি ও মাল খালাসের জন্য ঘাট ছিল একটি, যেখানে ৫২টি জাহাজ নোঙ্গর করতে পারত এবং তার মোট ধারণ ক্ষমতা ছিল ৪৮,০০০ টন। ১৮৭১-৭২ সালের মধ্যে জেটির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬টিতে, আর সেখানে জাহাজ নোঙ্গর করতে পারত ১৪৩টি এবং মাল ধারণ ক্ষমতাও বেড়ে দাড়ায় ২২২,০০০ টনে। জাহাজ ঘাটের দৈর্ঘ্যও বৃদ্ধি পায় লক্ষ্যণীয়ভাবে। এ ঘাটে প্রধানত পণ্যসামগ্রী যেমন, শষ্য, বীজ এবং কাঁচামাল ও আধ্যপ্রস্ত্তত পাটজাত দ্রব্য ওঠানামা করত। ১৮৮৬ সালে বজবজ পেট্রোলিয়াম ঘাটটি চালু হয়। আসাম ও উত্তর বাংলা থেকে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া চা রপ্তানির কারণে ১৮৭০-এর দশকে স্ট্রান্ড ব্যাংক দ্বীপে একটি গুদাম ঘর নির্মাণ করতে হয়।

উনিশ শতকের শেষ ভাগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ১৮৯২ সালে খিদিরপুরে ডক নির্মাণ। এটি ছিল কলকাতার বণিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগতভাবে দাবির ফল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব বিশ বছরে কলকাতা বন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর ক্রমোন্নতি পরিলক্ষিত হয়। উপকূলীয় বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ ঘটে, বিশেষ করে কয়লা রপ্তানিতে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ব বাংলা ও আসাম সরকার কলকাতার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ঘটালেও তা তেমন ফলপ্রসূ হয় নি।

দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে মহামন্দার প্রভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও এ অঞ্চলে আধুনিক শিল্পকারখানার উন্নয়নের সাথে সাথে কলকাতা বন্দরেরও আধুনিক রূপায়ন ঘটতে থাকে। তারপরও মহামন্দা শুরুর আগে থেকেই গার্ডেন রিচ-এর কিং জর্জ ডক ১৯২৯ সাল থেকে চালু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যা তুলনামূলকভাবে কলকাতা বন্দর উন্নয়নে স্থবিরতার জন্য চিহ্নিত, তা ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি কিছু সময়ের জন্য বাণিজ্যিক পুনরুদ্ধারে কাজে বিঘ্ন ঘটায়। ভারতের স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এ ধারাসমূহ পুনর্জীবীত হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূতিকাগার হিসেবে কলকাতার গুরুত্ব যেমন ছিল, ঠিক তেমনি ব্রিটিশ শাসনের অবসানে এর ক্রমাবনতিও ঘটে।  [ভাস্কর চক্রবর্তী]

গ্রন্থপঞ্জি  Nilmani Mukherjee, The Port of Calcutta: A Short History, Calcutta, 1968; PJ Marshall, East Indian Fortunes: The British in Bengal in the Eighteenth Century, London, 1976; Asin Dasgupta, Merchants of Maritime India, Variorum, 1994; Satyesh Chakrabarti (ed), The Port of Calcutta: 125 years, Calcutta, 1996.