কদম শরীফ, মুর্শিদাবাদ


কদম শরীফ, মুর্শিদাবাদ  মুর্শিদাবাদ রেল স্টেশনের ৮ কিমি পূর্বে এবং কাট্রা মসজিদের প্রায় অর্ধকিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। এ কমপ্লেক্সের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন ১৭৮০-৮১ সালে বসন্ত আলী খান কর্তৃক নির্মিত একটি মসজিদ। তিনি প্রথমে মীরজাফর এবং পরবর্তীসময়ে তাঁর স্ত্রী মুন্নি বেগমের প্রধান খোজা ছিলেন। এ কমপ্লেক্সের অন্য একটি গুরুত্বপুর্ণ ভবন হলো একটি পবিত্র কক্ষ (shrine), যেটি মসজিদ নির্মাণের ৮ বছর পর ১৭৮৮ সালে নির্মিত হয়েছিল। এখানে মহানবী (স.)-এর পদচিহ্ন যুক্ত একটি পাথর রাখা আছে। এ পদচিহ্ন যুক্ত পাথর সিরাজউদ্দৌলা গৌড়ের কদম রসুল থেকে এখানে নিয়ে আসেন। পরে মীরজাফর এটিকে পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে দেন। অধিকন্তু এ দেয়াল ঘেরা কমপ্লেক্স এলাকা নওয়াবদের কিছু সংখ্যক পারিবারিক কবর, একটি অতিথিশালা এবং অন্যান্য কিছু স্থাপত্য ধারণ করে আছে।

কদম শরীফ, মুর্শিদাবাদ

মুর্শিদাবাদের অন্যান্য মসজিদের ন্যায় কদম শরীফ মসজিদও তিনটি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত, যেগুলি দেখতে শিরালো এবং বাল্ব-আকৃতির। পদ্ম পাপড়ি দ্বারা এদের নিম্নাংশ অলংকৃত। গম্বুজগুলির নিম্নাংশ অষ্টকোণাকার পিপার উপর ন্যস্ত, ফলে গম্বুজগুলি প্যারাপেট স্তর থেকে কিছুটা উচুঁতে অবস্থান করছে। চারটি অষ্টকোণাকার পার্শতবুরুজ ছাদের স্তরের উপরে উঠে গেছে এবং এদের শীর্ষ ভাগ ক্ষুদ্রাকৃতির গম্বুজ দ্বারা পরিশোভিত এবং এর গাত্র মল্ডিং ব্যান্ড দ্বারা নকশাকৃত। মসজিদটির পূর্বদিকের দেয়াল তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ ধারণ করে আছে, যেগুলি খাঁজকাটা খিলানে তৈরি ফ্রেমের মধ্যে স্থাপিত। কিবলা দেয়ালে তিনটি খাঁজ মিহরাব রয়েছে যার মধ্যে কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অন্য দুটির তুলনায় বড়।

মসজিদটির সম্মুখভাগ সাদামাটা, কেবল খিলানপথের উপর রয়েছে কার্টুশ নকশা খচিত ফ্রিজ এবং পাশে কুলুঙ্গি মোটিভ নকশার প্যানেল। ১৭৪৯-৫০ সালে নির্মিত মুর্শিদাবাদের ‘মতিঝিল মসজিদ’-এর সাথে এর সম্মুখভাগ সাদৃশ্যপূর্ণ। পূর্বদিকের প্রধান প্রবেশদ্বারটি অন্য দ্বারগুলি থেকে কিছুটা অভিক্ষিপ্ত এবং এর উভয় পাশে রয়েছে ‘গুলদস্ত’। এ তোরণ দ্বারের উপরে ফ্রিজ অলংকরণের মাঝখানে একটি  শিলালিপি রয়েছে। লিপিতে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী মসজিদটির নির্মাণকাল ১১৯৪ হি./১৮৮০-৮১ খ্রিস্টাব্দ।

মসজিদের বিপরীত দিকের ইমারতটিই মহানবী (স.)-এর পদচিহ্ন ধারণকারী পবিত্র কক্ষ। এর অভ্যন্তরভাগের পরিকল্পনা গৌড়ের  কদম রসুলএর সাথে প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ। কক্ষটিতে পায়ের ছাপ যুক্ত যে পাথর সংরক্ষিত আছে তা মূল পাথরের অনুরূপ একটি প্রতিকৃতি। অভ্যন্তরীণ কক্ষটি বর্গাকার এবং চারপাশ ১০ ফুট প্রশস্ত একটি ছাদযুক্ত বারান্দা দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং বাতাস চলাচলের জন্য ইমারতটিতে জালি স্থাপন করা হয়েছে। দক্ষিণ দিকের স্তম্ভ সারির উপর স্থাপিত পাঁচটি খিলান পথ দিয়ে এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করা যায়। একটি ছোট বাল্ব-আকৃতির গম্বুজ কক্ষটিকে আচ্ছাদিত করে আছে। অন্যথায় এটি একটি সমান্তরাল ছাদ বিশিষ্ট ইমারত। ৯৩৬ হি/১৫২৯-৩০ খ্রি. তারিখ উল্লিখিত সুলতান নাসিরউদ্দীন নুসরত শাহ-এর সময়কালের একটি শিলালিপি পবিত্র কক্ষটির পিছনের দেয়ালে লাগানো আছে। এ কমপ্লেক্সের সাথে লিপিটির কোনো সম্পর্ক নেই বলেই মনে হয়। এটি অনেক পূর্বের, গৌড় বা মুর্শিদাবাদের পার্শ্ববর্তী কোনো স্থান থেকে এটিকে নিয়ে আসা হয়েছে বলে মনে হয়।

মসজিদের দক্ষিণ দেয়াল সংলগ্ন একটি ছোট কক্ষ রয়েছে, যা সাধারণত তালা দেওয়া থাকে। আটটি শিলালিপি এ কক্ষের দক্ষিণ দেয়ালে নিবদ্ধ রয়েছে। সবগুলিই আরবি-ফারসি ভাষায়। এগুলিতে পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতি খোদাই করা আছে এবং সম্ভবত ধ্বংসপ্রাপ্ত গৌড় পান্ডুয়া বা অন্য কোনো স্থান থেকে এগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনটিতে ‘নাস্খ’ পদ্ধতিতে আয়াতুল কুরসী উৎকীর্ণ রয়েছে।  [সুতপা সিনহা]