কদম রসুল


কদম রসুল একটি পবিত্র স্থান যেখানে নবী (সাঃ) এর পদচিহ্ন সংবলিত পাথর খন্ড সংরক্ষিত থাকে। মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন দেশে এ রকম পবিত্র স্থানের প্রতি ভক্তি প্রদর্শন করা হয়। মুসলমানদের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে যে, মুহম্মদ (স.) পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় সেখানে তাঁর পদচিহ্ন থেকে যায়। মক্কা ফেরত অনেকেই এ ধরনের পদচিহ্ন সংবলিত পাথর খন্ড নিয়ে আসতেন। তাঁরা শ্রদ্ধার সঙ্গে এগুলি বিভিন্ন সৌধে, বিশেষ করে মসজিদের অভ্যন্তরে সংরক্ষণ করতেন, যা কদম রসুল আল্লাহ বা কদম শরীফ বা কদম মোবারক নামে পরিচিত।

কদম রসুল মসজিদ, মুর্শিদাবাদ

আরব বিশ্বে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে এ রকম পবিত্র স্থানের ধারনা পূর্বে ছিল। মুসলমানদের আগমনের পূর্বে ও পরে দক্ষিণ-পশ্চিম বংলায় ‘ধর্ম-পাদুকার’ (ধর্ম ঠাকুরের পায়ের চিহ্ন) পূজা হত। ভারতেও দেবতা বা দেবীর পবিত্র পদচিহ্নের পূজা প্রথা দেখা যায় বৌদ্ধ ও হিন্দু যুগে। বেশকিছু সংস্কৃত লিপিতে এমন কয়েকটি নাম পাওয়া যায় যা দিয়ে পবিত্র পা পূজা প্রচলনের প্রমান পাওয়া যায়। যেমন, বি পদগিড়ি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন সূত্রেও অনুরূপ ‘বুদ্ধ পদ’ নাম পাওয়া যায়। মুসলমানদের রসুল (সা.) এর পদ চিহ্ন সবসময়েই পবিত্র হিসেবে পরিগণিত। রসুল (সা.) এর প্রাচীনতম পদচিহ্ন সংবলিত সৌধটি হচ্ছে জেরুজালেম এর ‘ডোম অব দি রক’। বলা হয়ে থাকে, এখান থেকে মহানবী (স.) মিরাজে গমন করেছিলেন। মিরাজে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে তাঁর পা পাথরে ছাপ সৃষ্টি করেছিল। এধরনের আরও কিছু পদচিহ্ন সংরক্ষিত আছে দামেস্কের মসজিদ-ই-আকদাম-এ, যেখানে মুসা নবী(আ:) এর পবিত্র পদচিহ্ন আছে বলে ধারণা করা হয়। আরও রয়েছে, মিশরের কায়রো, তুরস্কের ইস্তান্বুলে এবং সিরিয়ার দামেস্কে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বেশ কয়েকটি কদম রসুল রয়েছে। যেমন, দিল্লি ও বাহরাইচ (উত্তর প্রদেশ), আহমদাবাদ (গুজরাট), কটক (উড়িষ্যা) এবং পশ্চিম বাংলার গৌড় ও মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলে। বাংলাদেশে নবীগঞ্জ এর কদম রসুল (নারায়ণগঞ্জ জেলা) এবং চট্টগ্রামে কদম মোবারক (রসুল নগর) এবং বাগিচা হাট মসজিদ, বিখ্যাত।

কদম রসুল প্রবেশদ্বার, নারায়ণগঞ্জ

বাংলার প্রাচীনতম কদম রসুল কমপ্লেক্সটি গৌড়ে অবস্থিত। এটি ১৫৩০-১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান  নুসরত শাহ নির্মাণ করেন। জনশ্রুতিমতে তেরো শতকের সাধক জালালউদ্দীন তাবরিজি(রঃ)এর পান্ডুয়ায় ইবাদতখানায় এ পদচিহ্ন সংবলিত পাথরটি পাওয়া যায়। নুসরাত শাহের পিতা সুলতান  হোসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯) এ পাথরটি গৌড়ে নিয়ে এসেছিলেন। গৌড়ের কদম রসুল সৌধটি বাংলার আঞ্চলিক স্থাপত্যিক রীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। সুলতানি যুগে এ রীতি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেছিলো। কুঁড়েঘর আকৃতির এ সৌধের মাঝে রয়েছে বর্গাকৃতির একটি কক্ষ, যার তিনদিকে রয়েছে বারান্দা। কেন্দ্রীয় গম্বুজ-কক্ষটিতে পদচিহ্ন সংবলিত কালো পাথরটি রক্ষিত আছে।

মুর্শিদাবাদের কদম শরীফ কমপ্লেক্সটি ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে মীর জাফরের প্রধান খোজা বসন্ত আলী খান কর্তৃক নির্মিত একটি পুরাতন মসজিদের সঙ্গে সংযুক্ত। নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার সময় (১৭৫৬-১৭৫৭) গৌড় থেকে পাথরটি বাংলার শেষ রাজধানী মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসা হয়েছিলো। কিন্তু মীর জাফর সেটিকে পুনরায় গৌড়ে ফিরিয়ে নিয়ে যান। তবে কদম শরীফ কমপ্লেক্স-এ রয়েছে নওয়াব পরিবারের সদস্যদের কবর, একটি অতিথিশালা এবং অন্যান্য বেশ কয়েকটি অবকাঠামোগত নিদর্শন। কদম শরীফ মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এবং গম্বুজে রয়েছে প্যাঁচানো নকসা। মসজিদের চার কোনে রয়েছে চারটি অষ্টভূজাকৃতির কর্ণার টাওয়ার। মসজিদের পূর্ব দিকের দেয়ালে রয়েছে তিনটি প্রবেশদ্বার। অভ্যন্তরের কিবলায় রয়েছে তিনটি মিহরাব, এবং মধ্যের মিহরাবটি অপেক্ষাকৃত বড়। কক্ষের অভ্যন্তরের দক্ষিণ দেয়ালে আট খন্ড শিলালিপি সংস্থাপিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। আরবি এবং ফারসির সংমিশ্রনে রচিত এই লিপি গৌড় ও পান্ডুয়ার ধ্বংসাবশেষ থেকে সংগৃহীত হয়েছিল এবং এতে কোরানের বাণী উৎকীর্ণ।

বাংলাদেশে সুপরিচিত কদম রসুলটি নারায়ণগঞ্জের বিপরীতে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত নবীগঞ্জে। সতেরো শতকের প্রারম্ভে মির্জা নাথান কর্তৃক প্রণীত বাহারিস্তান-ই-গায়েবীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সম্রাট আকবর এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী আফগান নেতা মাসুম খান কাবুলী এ পদচিহ্ন সংবলিত পাথরটি একজন আরব বণিকের কাছ থেকে ক্রয় করেছিলেন। ঢাকার জমিদার গোলাম নবী ১১৯১ হিজরিতে (১৭৭৭-১৭৭৮ সালে) পবিত্র সৌধটি নির্মাণ করেন এবং এর অভ্যন্তরে পবিত্র পাথরটি সংরক্ষিত হয়েছে। এক গম্বুজ বিশিষ্ট সৌধটির সামনে রয়েছে বারান্দা, মধ্যের প্রকোষ্ঠে রয়েছে পবিত্র পাথরটি। সাধারণত এটি একটি ধাতব পাত্রে গোলাপজলে ডুবানো থাকে। পাথরের গায়ে ২৪ সেমি × ১০ সেমি জায়গা জুড়ে অগভীরভাবে পায়ের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। উপরের দিকে পায়ের আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্ট। সৌধের প্রধান ফটকটি গোলাম নবীর পুত্র গোলাম মুহম্মদ ১২২০ হিজরিতে (১৮০৫-১৮০৬ সাল) তৈরি করেছিলেন।

মুগল প্রশাসক ইয়াসিন খান ১৭১৯ সালে চট্টগ্রামে আরেকটি কদম রসুল নির্মাণ করেন। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি মসজিদ এবং দ‘ুদিকে দুটি কক্ষ। এর একটিতে হযরত মুহম্মদ (স.)-এর এবং অন্যটিতে বারো শতকের (বাগদাদের) সাধক আবদুল কাদের জিলানী (রা:) এর পদচিহ্ন রয়েছে। সম্পূর্ণ কদম রসুল কমপ্লেক্সটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান পভৃতি অবকাঠামো। এটি কদম মোবারক নামেই সুপরিচিত।

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার অন্তর্গত বাগিচা হাটে আরেকটি কদম রসুল রয়েছে ।  [পারভীন হাসান]