এজেন্সি হাউস


এজেন্সি হাউস  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লাইসেন্সসহ বাংলায় বাণিজ্যের কর্তৃত্বাধিকার প্রাপ্ত ইউরোপীয় বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান। নির্ধারিত অঙ্কের নজরানার বিনিময়ে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজকীয় সনদ আইনের আওতায় উত্তমাশা অন্তরীপের পূর্বদিকের জলভাগে বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার লাভ করে। অন্য কোনো ব্রিটিশ প্রজার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লাইসেন্স ছাড়া এ অঞ্চলে প্রবেশাধিকার ছিল না। ব্রিটেনের তৎকালীন সামুদ্রিক বাণিজ্যে নিয়োজিত সংঘসমূহের নিকট এ ধরনের লাইসেন্সপ্রাপ্তগণ ‘মুক্ত বণিক’ নামে অভিহিত হতো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর কদাচিৎ এ ধরনের কোনো ‘মুক্ত বণিক’কে এদেশে তাদের কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে দিয়েছে। তবে বাংলার দীউয়ানি গ্রহণ ও পরে বাংলায় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অবস্থা বদলে যায়। বাংলার বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ ও মূল্য ক্রমেই দ্রুত বাড়তে থাকে। কোম্পানির জনবল বা চলতি পুঁজিবল কোনোটিই নতুন নতুন সুযোগ কাজে লাগাবার বা অবস্থা সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। অসৎ উপায়ে উপার্জিত অর্থবিত্ত নিরাপদে ও গোপনে দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে কোম্পানির কর্মচারীগণ, যারা তখন এদেশের মনিব, বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হয়। মহাদেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে এ ধরনের অর্থ পাঠানো সবসময় নিরাপদ ও লাভজনক ছিল না। এ ছাড়া, আরও একটি বাস্তব সমস্যা ছিল। অনেক ইংরেজ আমলা ও সামরিক কর্মকর্তা চাকুরি থেকে অবসর নেওয়ার পর সওদাগর ও ব্যবসায়ী হিসেবে ভারতেই থেকে যেতে চাচ্ছিল। এ অবস্থায় কোম্পানি এ সুযোগ নেওয়ার জন্য কিছু সংখ্যক ইউরোপীয় ব্যবসায়ীকে লাইসেন্স প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়।

১৭৬০-এর দশকে সীমিতসংখ্যক মুক্ত ব্যবসায়ী নিজেদের উদ্যোগেই ব্যবসায়-বাণিজ্য পরিচালনার জন্য কোম্পানির কাছ থেকে লাইসেন্স লাভ করেছিল। তারা কোম্পানির কর্মচারীদের কাছ থেকে দস্তক কিনে নিয়ে দেশের ভেতরে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার লাভজনক ক্ষেত্রে প্রবেশ করে। অবশ্য, ১৭৬৭ সালে এ ধরনের সুবিধাযুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হলে, তারা রপ্তানি বাণিজ্যে মনোনিবেশ করে। বাংলার পণ্য বিশ্ববাজারে বাজারজাত করার বিষয়টি বেসরকারি ব্যবসায়ীদের জন্য একটা সুবর্ণসুযোগ এনে দেয়। সে কারণে, মুক্ত ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকে। ১৭৭৫ সাল থেকে দেশি দাদনি ব্যবসায়ীদের বদলে নির্ধারিত ঠিকাদারদের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ করার কোম্পানির নতুন বাণিজ্যিক নীতি বেসরকারি ব্যবসায়ীদের জন্য আরও একটি সুযোগের স্বর্ণদ্বার উন্মোচিত করে দেয়।

ইংল্যান্ডে এ মুক্ত বাণিজ্যের লাইসেন্সের জন্য জোর প্রতিযোগিতা ছিল যদিও লেডেনহল স্ট্রীটস্থ কোম্পানির সদর দপ্তরের প্রভাবশালী মহলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন লোকই প্রকৃতপক্ষে এ লাইসেন্স পেয়েছিল। তারা কলকাতায় মুক্ত ব্যবসায়ী বা চুক্তিভুক্ত নাবিক হিসেবে আসে। এসব মুক্ত ব্যবসায়ী ও নাবিক ব্যক্তিগতভাবে বাংলায় আসত এবং তখন তাদের হাত প্রায়শই শূন্য থাকত। কিন্ত অল্পদিনের মধ্যেই তারা বড় বড় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কোম্পানি কর্মচারীদের সঞ্চয়ই তাদের পুঁজির প্রধান উৎস ছিল। মুক্ত বণিকদের অধিকাংশই এজেন্সি হাউস প্রতিষ্ঠা করে। গোড়ার দিকে তাদের প্রধান ব্যবসা ছিল বেসামরিক আমলা ও সামরিক অফিসারদের সঞ্চয় সংগ্রহ করা এবং সে অর্থ কোনো লাভজনক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করা। এ সব ব্যবসার মধ্যে সবচেয়ে মুনাফাজনক ছিল বাংলার অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য। তাদের অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যকলাপের মধ্যে ছিল: স্থানীয় হাট-বাজার থেকে কোম্পানির এজেন্ট হিসেবে তাদের জন্য পণ্য সংগ্রহ, গাঁট বেঁধে সে পণ্য জাহাজে তুলে পাঠানো, কোম্পানির যে পণ্য বাইরে থেকে বাংলায় আসত সেগুলি জাহাজ থেকে খালাস করা, কোম্পানির কর্মচারীরা অসৎ উপায়ে যা উপার্জন করত সে অর্থ পণ্য ও বাণিজ্যিক বিলের আকারে প্রেরণ করা, ইঙ্গ-ভারতীয়দের জমাকৃত অর্থ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জামানত ও মূলধন বিনিয়োগ করা। এজেন্সি হাউসগুলি এ ভাবে, দালালি করে ও অন্যদের অর্থ বিনিয়োগ করে মুনাফা করত। উনিশ শতকের গোড়ার দিক থেকে, বিশেষ করে, ১৮১৩ সালের পরে ব্রিটিশ ভারত যখন অবাধ বিশ্ব বাণিজ্য বলয়ে প্রবেশ করে তখন এ সব এজেন্সি হাউস বিবিধ বাণিজ্যক্ষেত্রে তাদের তৎপরতা সম্প্রসারিত করে। এগুলির মধ্যে ছিল: আফিম, নীল, জাহাজনির্মাণ, উপকূল বাণিজ্য, ব্যংক, বীমা, বাষ্পীয় পোত চলাচল, ঢালাই কারখানা, সাংবাদিকতা ও এ রকম আরও অনেক কিছু।

১৭৭৫ সাল নাগাদ সকল মুক্ত ব্যবসায়ী ও মুক্ত নাবিক পাঁচটি এজেন্সিতে সংগঠিত হয়। ১৭৯০-এ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়ায় পনেরোতে ও ১৮১৩-তে বত্রিশে। এজেন্সিগুলির মধ্যে অধিকাংশই ছিল ব্রিটিশ, বিশেষত, স্কটিশ-ব্রিটিশ। আর এগুলিতে যারা অংশীদার ছিল তারা প্রায় সকলেই বাংলা প্রেসিডেন্সিতে নিয়োজিত সাবেক শ্বেত আমলা কিংবা সামরিক কর্মকর্তা। ১৮৩০-এর দশকে অধিকতর আনুষ্ঠানিক অর্থপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পর এজেন্সি হাউসের আধিপত্য ও প্রতিপত্তি হ্রাস পায়। বস্ত্ততপক্ষে, এ সব অর্থপ্রতিষ্ঠানগুলি মূলত সাবেক এজেন্সি হাউসগুলির পরিবর্তিত রূপ বিশেষ। এজেন্সি হাউসের অভ্যুদয় বানিয়া প্রতিষ্ঠানগুলির অবসান সূচনা করে। ১৭৭০-এর দশক থেকে এ এজেন্সি হাউসগুলি যে সব কাজ করে আসছিল সেগুলিই তাদের আগে করত স্থানীয় বা দেশিয় বেনিয়ারা। তারা ইউরোপীয় নৌবাণিজ্য পার্টিগুলির একমাত্র দালাল হিসেবে কাজ করত।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্থানীয় পর্যায়ে বাণিজ্যিক লেনদেনের কাজে বেনিয়া নিয়োগ করত। প্রত্যেক কোম্পানির কর্মচারী ব্যক্তিগত পর্যায়ের ব্যবসাসহ নিজ নিজ ব্যবসার লেন-দেন পরিচালনার জন্য বেনিয়া রাখত। স্পষ্টত, ইউরোপীয় এজেন্সিগুলির উন্নতি ও সমৃদ্ধি দেশিয় বেনিয়া উদ্যোক্তাদের অবক্ষয় সূচনা করে। এ বেনিয়ারা ছিল সবচেয়ে সম্ভাবনাময় আধুনিক পুঁজিপতি। কিন্ত এজেন্সি হাউসের মাধ্যমে ইউরোপীয় পুঁজি মাঝখানে বাধার সৃষ্টি করায় বেনিয়ারা তাদের উদ্যোগী প্রয়াস থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। পরে, সাবেক বেনিয়াদের প্রায় সকলেই তাদের জমাকৃত মূলধন দিয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভিত্তিতে জমিদারি ক্রয় করে। [সিরাজুল ইসলাম]