উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী


উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী (Coastal Greenbelt)  উপকূল বরাবর বৃক্ষরোপণ এবং  বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে  উপকূলীয় ভাঙন প্রতিরোধ এবং অন্যান্য  প্রাকৃতিক দুর্যোগ হ্রাসের লক্ষ্যে গৃহীত ব্যবস্থা। বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং পূর্ব উপকুলীয় অঞ্চল প্রতিবছরই  জলোচ্ছ্বাস এবং উপকূলীয় ভাঙনের সম্মুখীন হয়ে থাকে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রচলিত পদ্ধতিতে সারিবদ্ধভাবে বৃক্ষরোপণ করে জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয় নি বরং উপকূলরেখার সম্মুখ বরাবর ব্যাপক বনায়নের মাধ্যমে এবং চর এলাকায়  গরান বনভূমি সৃষ্টির মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। রাস্তার ধার এবং  ভেড়িবাঁধ বরাবর বৃক্ষরোপণ নিঃসন্দেহেই সবুজবেষ্টনী গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি উপকুলীয় ক্ষয় প্রতিরোধেও অবদান রাখছে। তবে এটিই সবুজবেষ্টনী রচনার একমাত্র উদ্দেশ্য নয়।

সবুজবেষ্টনী রচনার দুটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো: (১) ভেড়িবাঁধের সম্মুখ ঢালকে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা করা, এবং (২) উপকূলীয় এলাকায় জান-মাল ও কৃষিজমিকে রক্ষা করা। এ ছাড়াও বনায়নের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং অনন্য গুরুত্বপূর্ণ গরান বন রক্ষা ও পুনর্বাসন করা। সমুদ্র এবং নদীর  বাঁধ বরাবর বহুবর্ষজীবী বৃক্ষ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী প্রকল্প দেশের ক্ষয়িষ্ণু বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

বাংলাদেশের উপকূলবতী এলাকাসমূহে সাইক্লোনের কারণে বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে ১৯৯১ সালে এক প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত হানে যেখানে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিমি আর সমুদ্র থেকে উঠে আসা বিশাল ঢেউগুলি ছিল প্রায় ৬ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট। ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় একলক্ষ ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। জনসাধারণের ঘরবাড়ি এবং অন্যান্য স্থাপত্যসহ মিলিয়ে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিমাণ সম্পত্তি বিনষ্ট হয়। এ ঝড় এবং এর পূর্ববর্তী অন্যান্য ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতা থেকেই প্রতীয়মান হয়েছে যে উপকূলবর্তী এলাকায় ব্যাপক বনায়ন বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ জাতীয় বৃক্ষ রোপন এসব ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। একানববই’র ঘূর্ণিঝড়ের পরেই বাংলাদেশ সরকার উপকূলীয় সবুজবেষ্টনী তৈরীর প্রকল্প হাতে নেয়।

প্রকল্পটি সূত্রবদ্ধকরণের কাজ চলে ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৪ সালের মার্চ পর্যন্ত এবং ১৯৯৫ সালের ২রা মার্চ এটি এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ঋণ বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখে। ২০০২ সনের ৩১ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করে ২৮ জুলাই থেকে প্রকল্পটি কার্যকর ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীকালে এ সীমারেখার সামান্য সংশোধন করে সমগ্র ভোলা জেলাকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ প্রকল্পে মোট ১০টি বনবিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে: (১) পটুয়াখালী বনবিভাগ (বরগুনা এবং পটুয়াখালী জেলা নিয়ে গঠিত), (২) চট্টগ্রাম বনবিভাগ (চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার নিয়ে গঠিত), (৩) ভোলা বনবিভাগ, (৪) লক্ষমীপুর বনবিভাগ, (৫) নোয়াখালী বনবিভাগ, (৬) ফেনী বনবিভাগ, (৭) পিরোজপুর বনবিভাগ, (৮) বাগেরহাট বনবিভাগ, (৯) বরিশাল বনবিভাগ, এবং (১০) ঝালকাঠি বনবিভাগ। উল্লিখিত বনবিভাগসমূহে প্রায় ৩০ লক্ষ হেক্টর জমি অন্তর্ভুক্ত যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত বাঁধে প্রায় ১৩০০ কিমি এলাকা জুড়ে ঘন বনায়নের পরিকল্পনা ছিল প্রকল্পটি শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রায় ১৩৯৪ কিমি এলাকায় বৃক্ষরোপণ শেষ হয়। রেললাইনের ধারে বাংলাদেশ রেলওয়েজ এর ২০ কিমি জমিতে, বিশ্বরোড এবং ‘রোডস্ অ্যান্ড হাইওয়েজ’ ডিপার্টমেন্টের অধীনস্ত ছোট রাস্তাগুলির প্রায় ৪১০ কিমি এলাকায়, সরকারি প্রকৌশল বিভাগের অধীনে ‘বি’ টাইপের ছোট রাস্তাগুলির ২৮০ কিমি অংশ এবং গ্রামাঞ্চলের ছোট রাস্তাগুলির প্রায় ৪০০০ কিমি এলাকায় বৃক্ষরোপণ এ প্রকল্পের পরিকল্পনাধীন ছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে সৃষ্ট ঘন বনাঞ্চল উপকূলীয় পরিবেশের উন্নয়নে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া এর ফলে জনগণের মধ্যে বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতাও সৃষ্টি হয়েছে। একেবারে তীরবর্তী অঞ্চলে আরও অধিক পরিমাণ বৃক্ষরোপণ করা গেলে তা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এসবের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর আরও এক প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ আঘাত হানে বাংলাদেশে। উপকূলবর্তী এলাকাসমূহে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। স্থানীয় কার্যালয়সমূহের বিবৃতি অনুযায়ী এ ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়কেও ছাড়িয়ে গেছে। পটুয়াখালী, বরগুনা এবং ঝালকাঠি এ জেলাসমূহে জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা ছিল ভয়াবহ। সুন্দরবনের এক চতুর্থাংশ প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। যার পুনরুদ্ধার করতে গবেষকদের মতে, সময় লাগবে নূন্যতম পক্ষে ৪০ বছর। প্রাণহাণির সংখ্যা ছিল প্রায় ৩,৪৪৭ যা ১৯৭১ এর তুলনায় অনেক কম। ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধের নিমিত্তে রোপিত বৃক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমূহকে জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা করেছে উপকূলীয় সবুজবেষ্টনীর উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যকীয় এতে করে দেশের উপকূলবর্তী এলাকাসমূহ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সাধিত ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।  [মাসুদ হাসান চৌধুরী এবং মো: তুহিন মোল্লা]