উইলকিন্স, স্যার চার্লস


স্যার চার্লস উইলকিন্স

উইলকিন্স, স্যার চার্লস (১৭৪৯-১৮৩৬)  প্রাচ্য ভাষাবিদ, কলকাতাস্থ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য এবং বাংলা ও  ফারসি মুদ্রাক্ষরের আধুনিক আকৃতির উদ্ভাবক। শিক্ষানবিশ কারণিক হিসেবে ১৭৭০ সালে  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সার্ভিসে যোগদান করেন। মালদহে কর্মরত থাকাকালে তিনি বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসিতে মোটামুটি পারদর্শিতা অর্জন করেন। বলা হয়ে থাকে যে, তিনি ছিলেন প্রথম ব্রিটিশ যিনি প্রাচ্যদেশীয় রীতিনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সংস্কৃত ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। ইউরোপীয়দের ব্যবহারের জন্য তিনি ১৭৭৯ সালের গোড়ার দিকে এ গ্রামার অব স্যান্সক্রিট গ্রন্থটি লেখেন। কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস-এর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। স্থানীয় পন্ডিতদের সহযোগিতায় তিনি প্রাচ্য পান্ডুলিপি, উৎকীর্ণ লিপি সংগ্রহ করে সেগুলির পাঠোদ্ধার ও অনুবাদ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রাচ্যদেশীয় ইতিহাসে উইলকিন্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এক ব্যক্তিত্ব, কারণ তিনিই হলেন প্রথম ইউরোপীয় প্রাচ্যভাষাবিদ যিনি প্রাচীন ইতিহাস পুনর্নির্মাণের জন্য সংস্কৃত লিপির পাঠোদ্ধার করেন। সংস্কৃত লিপির বিশদ ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম সার্থক প্রয়াস ছিল ১৭৮৫ সালে পাল বংশীয় রাজা নারায়ণপালের বাদল-স্তম্ভ লিপির (দিনাজপুর জেলা) পাঠোদ্ধার। পরবর্তীকালে বারাবার পাহাড়ের গুহায় (বিহার) প্রাপ্ত মৌখরী লিপি উইলকিন্সকে গুপ্ত শাসকদের লিপির পাঠোদ্ধারে সহায়তা করে।

প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা, কারণ উইলকিন্স কর্তৃক উৎকীর্ণ লিপির পাঠোদ্ধার পাল ও মৌখরী রাজবংশকে আবিষ্কার করে এবং এভাবে প্রাচ্যের লিপি ও লিপিবিজ্ঞান অধ্যয়নের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ওয়ারেন হেস্টিংসের পৃষ্ঠপোষকতায় উইলকিন্স ভগবদ্গীতা অনুবাদ করেন (১৭৮৫), বাংলা ও ফারসি মুদ্রাক্ষরের নমুনা প্রস্ত্ততের পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেন এবং পন্ডিত পঞ্চাননের সহায়তায় সাফল্যের সঙ্গে এ কাজ সম্পন্ন করেন। উইলকিন্স ছিলেন বাংলা ও ফারসি ভাষায় মুদ্রণের জন্য ছাপাখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে পথিকৃৎ। এর ফলে মুদ্রণ ও পুস্তক প্রকাশের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব সাধিত হয়। বাংলা বর্ণমালার মুদ্রাক্ষর দ্বারা মুদ্রিত প্রথম বই হলো এন.বি. হ্যালহেডের ‘A Grammar of the Bengali Language (১৭৭৮)। হ্যালহেড উষ্ণ আবেগময় ভাষায় উইলকিন্সের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। হ্যালহেডের ভাষ্যমতে বইটি প্রকাশনার ব্যাপারে উইলকিন্স ধাতুবিদ্যা বিশারদের নানাবিধ কাজ, যেমন নকশা খোদাইকারক, মুদ্রাক্ষর ঢালাইকর ও মুদ্রাকরের কাজের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেন।

উইলকিন্স কর্তৃক বাংলা ও ফারসি মুদ্রাক্ষর উদ্ভাবনের পূর্বে ভারতীয় ভাষাসমূহের জন্য সরকারের কোনো ছাপাখানা ছিল না। এর পরই উইলকিন্সের ছাপাখানা থেকে সরকারের বাংলা ভাষার প্রকাশনাসমূহ মূদ্রণ ও প্রকাশের কাজ শুরু হয়। উইলকিন্স নিজ উদ্যোগে ১৭৮৮ খ্রি. থেকে গবেষণা পত্রিকা এশিয়াটিক রিসার্সেস ( Asiatick Researches) প্রকাশ করা শুরু করেন। উইলকিন্সের ছাপাখানা থেকে তাঁরই তত্ত্বাবধানে ও মুদ্রণপূর্ব সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয় এশিয়াটিক রিসার্সেস। পরবর্তীকালে এটি এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক এর নিজস্ব মুখপত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর উইলকিন্স হিতোপদেশ (ফেবল্স অব পিলপাই) ও শকুন্তলা-র অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৭৮৮ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটি অব লন্ডন এর ফেলো নির্বাচিত হন। ১৮০০ সালে তাঁকে ইন্ডিয়া হাউস লাইব্রেরির প্রথম পরিচালকের পদ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এ লাইব্রেরি কালক্রমে বিশ্ববিখ্যাত ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে (বর্তমান ব্রিটিশ লাইব্রেরি-ওরিয়েন্টাল কালেকশন্স) পরিণত হয়। একজন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে তিনি ১৮০৬ সালে হেইলিবারি কলেজে যোগদান করেন। ১৮০৮ সালে উইলকিন্স আরও একটি সংস্কৃত ব্যাকরণ প্রকাশ করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ১৮০৫ সালে তাঁকে  ডি.সি.এল ডিগ্রি প্রদান করে। রাজা চতুর্থ জর্জ তাঁকে গুয়েলফিক অর্ডারের ‘ব্যাজ’ প্রদান করেন। ১৮৩৩ সালে তাঁকে ‘নাইট’ উপাধি দেওয়া হয়।  [সিরাজুল ইসলাম]