ঈদুল ফিত্‌র


ঈদুল ফিত্‌র মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম। ঈদ ও ফিত্‌র দুটিই আরবী শব্দ। ঈদ এর অর্থ উৎসব বা আনন্দ। ফিত্‌র এর অর্থ বিদীর্ণ করা, উপবাস ভঙ্গকরণ, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাওয়া। পবিত্র রমযান মাসে সিয়াম সাধনা ও সংযম পালনের পর শাওয়াল মাসের ১লা তারিখে সিয়াম ভঙ্গ করে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে যাওয়ার আনন্দময় দিবসটি ঈদুল ফিত্‌র নামে অভিহিত। পবিত্র রমযানের নতুন চাঁদ দেখে সিয়ামের (রোযার) মাস শুরু হয় এবং শাওয়াল মাসের নূতন চাঁদ দেখে রোযা ভঙ্গ করা হয়। এ একমাস মুসলমানেরা ক্রোধ, কাম, মদ, মোহ, মাৎসর্য্য সকল কু-প্রবৃত্তিকে দমন করে রাখে। এ কারণে ফিত্‌র শব্দটি বিজয় অর্থেও ব্যবহূত হয়।

পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মে যে সব প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদযাপিত হয় সেগুলির মধ্যে ঈদুল ফিত্‌র হচ্ছে কনিষ্ঠতম। এ মহান পুণ্যময় দিবসের উদযাপন শুরু হয় আজ থেকে মাত্র ১৩৮০ সৌর বছর পূর্বে। ইসলামের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মদীনাতে হিজরত-এর অব্যবহিত পরেই ঈদুল ফিত্‌র উৎসব পালন শুরু হয়। হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, নবী করিম (সা.) মদীনা আগমন করে দেখলেন মদীনাবাসীগণ দুই দিবসে আনন্দ-উল্লাস করে থাকে। মহানবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এ দিবসদ্বয় কি? ওরা বলল, জাহেলী যুগ থেকেই এ দুটি দিবসে আনন্দ-উল্লাস করে থাকি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে উক্ত দিবসদ্বয়ের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিবস দান করেছেন। দিবসদ্বয় হলো ঈদুল আযহার দিবস ও ঈদুল ফিত্‌রের দিবস। (সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল ঈদায়ন)’’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পারসিক প্রভাবে শরতের পূর্ণিমার নওরোয নামে এবং বসন্তের পূর্ণিমার মিহিরজান নামে উৎসব দুটি মদীনাবাসীরা বিভিন্ন ধরনের আনন্দ-আহ্লাদ, খেলাধুলা ও কুরুচিপূর্ণ রংতামাশার মাধ্যমে উদযাপন করত। উৎসব দুটির রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণরূপে ইসলামের আদর্শ পরিপন্থী। জরথুস্ত্র প্রবর্তিত নওরোয ছিল নববর্ষের উৎসব। কিন্তু এটি ছয়দিন ব্যাপী উদযাপিত হতো যার মধ্যে শুধুমাত্র একটি দিবস নওরোয-এ-আম্মা বা কুসাক ছিল সাধারণ মানুষের জন্য নির্দিষ্ট। অন্যান্য দিনগুলি ছিল সম্ভ্রান্ত ও উচ্চবিত্তের ব্যক্তিবর্গের জন্য সুনির্দিষ্ট। অনুরূপভাবে ৬ (ছয়) দিনব্যাপী মিহিরজান অনুষ্ঠানেও শুধুমাত্র একটি দিন সাধারণ, দরিদ্র মানুষেরা উপভোগ করতে পারত। শ্রেণি বৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য, ঐশ্বর্য-অহমিকা ও অশালীনতার পূর্ণ প্রকাশে কলুষিত ছিল এ দুটি উৎসব।

ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত আরববাসীরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশে শুরু করল ঈদুল ফিত্‌র ও ঈদুল আযহা উৎসব উদযাপন। জন্ম নিল শ্রেণি বৈষম্য বিবর্জিত, পঙ্কিলতা ও অশালীনতামুক্ত সুনির্মল আনন্দে ভরা সুস্নিগ্ধ, প্রীতি-সঘন মিলন উৎসব ঈদুল ফিত্‌র।

উল্লেখ্য যে, ইসলাম ধর্মীয় উৎসব বলে ঈদুল ফিত্‌র প্রধানত মুসলমানদের মধ্যেই সীমিত থাকে। তবে, ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম এবং ঈদের অর্থ আনন্দ বিধায় প্রকারান্তরে ঈদ সকল মানবের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে।

ঈদুল ফিত্‌র বাংলার প্রাচীন উৎসবগুলির অন্যতম। বাংলাদেশে এ দিবসটি খুবই জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়। সকলেই এদিন সাধ্যানুযায়ী ভালো পোশাক পরে এবং উন্নতমানের খাবার আয়োজন করে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাও এ আনন্দের অংশীদার হয়।

মুসলমানরা এদিন ঈদের দুই রাকাআত নামায পড়ে এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে। পদমর্যাদা কিংবা বয়স নির্বিশেষে সকলে কোলাকুলিসহ সালাম বিনিময় করে। আত্মীয়-স্বজন ও পুণ্যবানদের কবর যিয়ারত করে। বর্তমানে ঈদকার্ড বিনিময় একটি জনপ্রিয় প্রথায় পরিণত হয়েছে। এদিন মাথাপিছু নির্দিষ্ট হারে গরীবদের ফিত্রা বা অনুদান বিতরণ করা ধর্মীয় দিক থেকে বাধ্যতামূলক। তাছাড়া তাদের সাধ্যমত খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদিও দান করা হয়।

বাংলাদেশের সর্বত্র ঈদ উদযাপিত হয়। এ উপলক্ষে সাধারণত তিনদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। এর ফলে গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের শহরবাসীরা নিজ নিজ গ্রামে গিয়ে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ঈদ-উৎসব পালন করতে পারে। এ সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন-দর্শন, ঈদের তাৎপর্য ও ইসলামের আদর্শভিত্তিক মূল্যবান প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হয়। রেডিও-টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। শহর, গ্রাম সর্বত্র ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা মহানগরীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দান, বায়তুল মোকাররম কেন্দ্রীয় মসজিদসহ অন্যান্য মসজিদ ও ময়দানে ঈদের জামাআত অনুষ্ঠিত হয়। দেশের সর্ববৃহৎ জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ময়দানে। সেখানে প্রায় লক্ষাধিক মুসল্লি নামায আদায় করে।

গ্রামাঞ্চলেও ঈদ-উৎসবে প্রাণ-প্রাচুর্য থাকে অপরিমেয়। কোনো কোনো গ্রামে একেকটি পাড়া বা মহল্লা নিয়ে একেকটি দল থাকে। দলগত এ গোষ্ঠীকে বলা হয় ‘মালত’। প্রত্যেক মালতে একজন করে মোল্লা থাকেন। তিনি ওই মালতের লোকদের ঈদের নামায পরিচালনা করেন। তিনি মহল্লার সকল বাড়িতে দাওয়াত পান এবং সে সঙ্গে কিছু নজরানাও পেয়ে থাকেন। সকালে ঈদের নামায পড়ে প্রত্যেকে ঘরে ফেরে। সন্ধ্যায় এক বাড়ির লোক অন্য বাড়িতে শির্নী খেয়ে যায়। এভাবে মালতের প্রত্যেকে প্রত্যেকের বাড়ি যায় এবং শির্নী খায়। এ শির্নী খাওয়ার মধ্য দিয়ে পরস্পর পরস্পরের প্রতি মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ সময় গ্রামবাংলায় এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

ঈদ-উৎসবে গ্রামবাংলার অনেক স্থানে ঈদের মেলা বসে। মূলত পল্লীবাসীর এ এক মিলনমেলা। নদীতীরে, গ্রাম্য বাজারের নিকটে বটতলায় এসব মেলা জমে ওঠে। মেলায় আসে লোকশিল্পজাত নানা পণ্যদ্রব্য খাবার জিনিসও আসে, যেমন, চিড়া, মুড়ি, খৈ, মন্ডা, মিঠাই ইত্যাদি। নকশি পাখা, পুতুল, রঙিন হাঁড়ি-পাতিল ইত্যাদির দোকান বসে। বাঁশি, ঢোল, একতারা জাতীয় ছোটদের বাদ্যযন্ত্রও পাওয়া যায়। কোনো কোনো মেলায় নাগরদোলা, ছবির খেলা, পুতুলনাচ ইত্যাদি প্রদর্শিত হয়। এ ছাড়া ঈদমেলায় মারফতি, মুর্শিদি এবং অন্যান্য আধ্যাত্মসঙ্গীতেরও আসর বসে।

নদীবহুল বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে ঈদ উপলক্ষে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা প্রভৃতি নদীতে এ নৌকা বাইচ খুবই আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী নৌকাকে পুরস্কার প্রদানে উৎসাহিত করা হয়। গ্রামের ধনী ব্যক্তিরা এ পুরস্কার প্রদান করেন।

গ্রামবাংলার কোথাও কোথাও ঈদ উপলক্ষে খেলাধুলারও আয়োজন করা হয়। হা-ডু-ডু, কাবাডি, দাঁড়িয়াবান্ধা ইত্যাদি খেলা দর্শকদের পর্যাপ্ত আনন্দ দেয়। এর পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলারও আয়োজন করা হয়। এসব খেলা ঈদ-উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে। ঈদের আনন্দের পরে সকলে আবার নবোদ্যমে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ফিরে যায়। [শববীর আহমদ ও সৈয়দ আশরাফ আলী]