পুতুলনাচ


পুতুলনাচ লোকনাট্যের একটি প্রাচীন মাধ্যম। ইংরেজিতে একে বলা হয় পাপেট, পাপেট্রি, পাপেট শো বা পাপেট থিয়েটার। নাটকের মতোই এতে ছোট বা মাঝারি আকারের একটি মঞ্চ আবশ্যক। এক বা একাধিক ব্যক্তি কখনও প্রকাশ্যে আবার কখনও নেপথ্যে থেকে হাতের নিপুণ কুশলতায় মানুষরূপী  পুতুল বা প্রাণিকুলের ক্ষুদ্র প্রতিকৃতিকে পরিচালনার মাধ্যমে নাটকীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে।

পুতুল নাচের পুতুলগুলি সাধারণত চার ধরণের হয়ে থাকে: তারের পুতুল, লাঠিপুতুল, বেণীপুতুল ও ছায়াপুতুল। তারের পুতুল সূক্ষ্ম তার বা সুতার সাহায্যে এবং লাঠিপুতুল লম্বা সরু লাঠির সাহায্যে নাচানো হয়; আর দুই বা ততোধিক পুতুল যখন একসঙ্গে বেঁধে হাত দিয়ে নাচানো হয় তখন তাকে বলে বেণীপুতুল।

পুতুল নাচ

যেকোনো গল্প বা কাহিনী অবলম্বনে পুতুলগুলি দর্শকদের সামনে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন চরিত্র রূপায়িত করে। চরিত্রানুযায়ী পোশাক-পরিচ্ছদ, রূপসজ্জা এবং নানাবিধ উপকরণ সংযোজন করে পরিচালক পুতুলের অভিনয়শৈলী তুলে ধরেন। মানুষের মতোই পুতুলগুলি হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, রাগ-দুঃখ ইত্যাদির অভিনয় করে। সাধারণ নাটকে স্থানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও পুতুলনাচে তার বিস্তৃতি অনেক। জলের প্রাণী, আকাশের পাখি, ডাঙ্গার মানুষ, বনের পশু সবই কাহিনীর প্রয়োজনে একমঞ্চে এক সঙ্গে অভিনয় করে। নির্বাক পুতুলসহ সব প্রাণীই নিজস্ব আচার-আচরণের পাশাপাশি মানুষের ভাষায় কথা বলে। ফলে পুতুলনাচ হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও আনন্দময় এবং সব বয়স ও শ্রেণীর দর্শকরা তা সানন্দে উপভোগ করে।

বিশ শতকে আধুনিক শিল্পকলা হিসেবে পুতুলনাচ স্বীকৃত হয় এবং টেলিভিশন আবিষ্কারের পর তা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে। চারু ও কারুকলা শাখার প্রায় সব কয়টি ফর্মের ব্যবহার ও প্রয়োগ একে টোটাল আর্ট ফর্মের পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

গল্প, কবিতা, নাটক, অভিনয়, গান, নৃত্যকলা, ভাস্কর্য এবং অন্যান্য দৃশ্যমান আর্টের সার্থক মিলন ঘটেছে পুতুলনাচে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পুতুলনাচ একটি পুরাতন শিল্পকলা হিসেবে পরিচিত। ইউরোপে পুতুলনাচের সবচেয়ে প্রাচীনতম ধারক জার্মানি। মধ্যযুগে ইটালিতে ‘পুলসিনেলো’ নামে আবির্ভাব ঘটে সুতা পাপেটের, ফ্রান্সে যার নতুন নাম হয় ‘পলসিনেল’। দস্তানা পাপেটের জনপ্রিয় চরিত্র হিসেবে জন্ম নেয় ‘পাঞ্চ’। এই পাঞ্চ চরিত্রের প্রতিরূপ দৃষ্ট হয় রাশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলে। জার্মানি ও সুইডেনে পাঞ্চের নাম ‘কাসপার’, হল্যান্ডে ‘ইয়ান ক্লাসেন’ এবং হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ায় ‘ভাসিলচে’। এছাড়াও মিশর, চীন, কোরিয়া, ফিলিপাইন, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং শ্রীলঙ্কায় পুরানো ও আধুনিক ধারার পুতুলনাচের অস্তিত্ব বিদ্যমান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্যালকাটা পাপেট থিয়েটার, পিপলস থিয়েটার, ডলস থিয়েটার এবং বর্ধমান পাপেট থিয়েটার আধুনিক ধারায় পুতুলনাচের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে পুতুলনাচের প্রায় হাজার বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। এখানে তারের পুতুল, লাঠিপুতুল ও বেণীপুতুল এই তিন ধরণের পুতুলনাচের প্রচলন আছে। এসব পুতুল তৈরি করা হয় শোলা এবং হালকা কাঠ দিয়ে। তাতে কাপড় ও বিভিন্ন  অলঙ্কার পরানো হয়। এক সময় হিন্দু-সম্প্রদায়ভুক্ত পেশাজীবী পুতুল-নাচিয়ে দল গ্রামে-গঞ্জে পুতুলনাচ প্রদর্শন করত এবং তারাই বংশপরম্পরায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পমাধ্যমটিকে বাঁচিয়ে রাখে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কয়েকটি দল পুতুলনাচের প্রাচীন ধারাকে আজও ধরে রেখেছে। এখন অনেক পেশাদার শিল্পী ধর্মনিরেপেক্ষভাবে পুতুলনাচের দল গঠন ও পরিচালনা করছেন।

বাংলাদেশে তারের পুতুল ও লাঠিপুতুলের চর্চাই বেশি হয়। এক্ষেত্রে শিল্পী দুহাতে সর্বোচ্চ তিনটি পুতুল ধরে সংলাপ বা সুরের তালে তালে পুতুলকে নাচান। পুতুলনাচে সাধারণত রাধাকৃষ্ণ, সীতাহরণ বা রামায়ণ-মহাভারতের অন্যান্য কাহিনী এবং লোকজীবনের বিভিন্ন  কিসসাপালাগান ইত্যাদি তুলে ধরা হয়। এছাড়া সমসাময়িক ঘটনাবলি, যেমন শিশু, নারী ও বয়স্ক শিক্ষা, সুখী পরিবার, দাম্পত্যজীবন, প্রেম-বিরহ, জামাই-শাশুড়ি ও বউয়ের কলহ ইত্যাদিও লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন মেলা ও লোকজ উৎসব-অনুষ্ঠানে পুতুল নাচের আসর বসে। এটি এখন লোকমনোরঞ্জনের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।

পুতুল নাচ

বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী এই পাপেট শিল্পকলার পুনরুজ্জীবন ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন চিত্রশিল্পী ও নন্দনতাত্ত্বিক মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পাপেট থিয়েটার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রদর্শনী করছেন। তাঁর নেতৃত্বে এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (ই.পি.ডি.সি) পাপেটশিল্পী সৃষ্টি, কুশলীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দান, পাপেটের মাধ্যমে শিশুকিশোরদের মধ্যে দেশাত্ববোধ জাগ্রতকরণ, দেশিয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচিতিকরণ ইত্যাদি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের লোকগাথা,  রূপকথা ও  লোকসঙ্গীত থেকে উপাদান নিয়ে ই.পি.ডি.সি আনন্দঘন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও প্রদর্শন করে আসছে। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অনুষ্ঠান হচ্ছে: পন্ডিত ও মাঝি, বহুরূপী, প্রবাদ বাক্য, আগাছা, লোভ, লিচুচোর, ছোট মেয়ে ও প্রজাপতি, খুকি ও কাঠবেড়ালি, মোমের পুতুল, শান্তির পায়রা, বকের কান্না, গাধা ও কচুরিপানা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের পাপেট মিডিয়া আজ আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে নরওয়েতে আন্তর্জাতিক পাপেট/ফিগার থিয়েটার ফেস্টিভাল এবং ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও সম্মেলনে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চসহ বিভিন্ন মঞ্চ, স্কুলপ্রাঙ্গণ ও টেলিভিশনে পাপেট থিয়েটার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ মাধ্যমটির আধুনিকায়নের কার্মকান্ডও এগিয়ে চলছে।  [শাহিদা খাতুন এবং জিল্লুর রহমান জন]