ইসলিংটন কমিশন, ১৯১২


ইসলিংটন কমিশন, ১৯১২ ব্রিটিশ ভারতের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করার জন্য এ রাজকীয় কমিশন গঠিত হয়েছিল। এ কমিশনের সভাপতি ছিলেন লর্ড ইসলিংটন। তিনজন ভারতীয়সহ দশজন সদস্য নিয়ে গঠিত এ কমিশনকে উচ্চতর বেসামরিক চাকরিতে ভারতীয়দের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একই সময়ে ভারতেও পরীক্ষা গ্রহণের দাবি যাচাই করে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কমিশন তিনটি প্রধান বিবেচনা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল: প্রথমত, ব্রিটিশ ভারতে বেসামরিক প্রশাসনের উঁচু মান বজায় রাখা; দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ শাসনের সার্বভৌমত্বের স্বার্থ রক্ষা করা এবং তৃতীয়ত, ভারতীয়দের যুক্তিসঙ্গত আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও সুশাসনের জন্য ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। ১৯১৫ সালে কমিশন তার প্রতিবেদন সম্পূর্ণ করে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে ১৯১৭ সালের আগে এটি প্রকাশ করা হয় নি।

কমিশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরীক্ষা করে উচ্চতর বেসামরিক চাকরি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছিল। এ কমিশন জাতি বা বেতনের ভিত্তিতে না করে কাজের ভিত্তিতে উচ্চতর ও নিম্নতর বিভাগে সিভিল সার্ভিসকে পুনর্গঠনের এবং অন্য কোনো কৃত্রিম পার্থক্য না রাখার পরামর্শ দিয়েছিল। আই.সি.এস.-দের বিষয়টি ছাড়া অন্য সব বেসামরিক কর্মচারী একবার নিম্নতর থেকে উচ্চতর পদে উন্নীত হলে তারা সমান সুবিধা ভোগ করবে এবং সরাসরিভাবে নিযুক্ত কর্মচারীদের মতো তাদের সঙ্গে একই রকম ব্যবহার করতে হবে এবং তাদের সে চাকরির পূর্ণ-সদস্যরূপে বিবেচনা করতে হবে। বেসামরিক দায়িত্বে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রসঙ্গে কমিশন চিকিৎসা, পূর্ত, রেল ইত্যাদির মতো কয়েকটি বিভাগ ছাড়া অন্য শাখায় তাদের নিয়োগদান বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছিল। কমিশন অবশ্য দক্ষতার কারণে ডাক, লবণ, অর্থ, শুল্ক ইত্যাদির মতো বিশেষ বিভাগগুলিতেও উচ্চতর প্রশাসনিক পদে আই.সি.এস কর্মকর্তাদের নিয়োগের বিদ্যমান রীতি অনুমোদন করেছিল।

বেসামরিক চাকরিসমূহকে রাজকীয়, কেন্দ্রীয়, প্রাদেশিক এবং অধস্তন এ চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল। বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োগ দানের ক্ষেত্রে স্থান, বেতন নির্ধারণ এবং ভারতীয়দের অনুপাতের দৃষ্টিকোণ থেকে বিদ্যমান সমস্যাবলি পরীক্ষা করা হয়। নিয়োগের স্থান সম্পর্কে কমিশন উচ্চতর চাকরিসমূহকে চার শ্রেণিতে ভাগ করে। প্রথমত, শুধু ব্রিটিশ ভারতে নির্বাচিত করা হবে এমন চাকরি; দ্বিতীয়ত, ভারতীয় সিভিল সার্ভিস ও ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের জন্য প্রধানত ব্রিটেনে লোক নির্বাচন করা হবে, যদিও প্রথমবারের মতো ভারতেও কিছু লোককে নির্বাচন করা হবে। তৃতীয় শ্রেণিতে ছিল শিক্ষা, চিকিৎসা, পূর্ত, প্রকৌশল ইত্যাদির মতো চাকরির জন্য নীতি ও দক্ষতার ভিত্তিতে কিছু লোককে নির্বাচিত করা হবে ব্রিটেনে এবং কিছু লোককে ভারতে। চতুর্থ শ্রেণিতে কিছু বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত চাকরি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদেরকে ব্রিটেন ও ভারত উভয় স্থানেই নির্বাচন করা হবে। কমিশন আশা করেছিল যে, এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতীয়করণ প্রক্রিয়া যথেষ্ট বৃদ্ধি পাবে এবং উচ্চতর চাকরির বিভিন্ন শাখায় অধিকতর সংখ্যায় ভারতীয়দের নিয়োগ নিশ্চিত হবে।

কমিশন অবশ্য একই সঙ্গে ভারতেও পরীক্ষা গ্রহণের ভারতীয় দাবি সমর্থন করে নি। ভারতের বিভিন্ন শ্রেণী, সম্প্রদায় ও প্রদেশে মানসম্পন্ন শিক্ষার অসম বিকাশের মতো নির্দিষ্ট কিছু কারণে কমিশন এ দাবি অগ্রাহ্য করে। তাছাড়া, কমিশন প্রশাসনের ব্রিটিশ চরিত্র এবং এর উঁচু মানের দক্ষতা ও সততা বজায় রাখার উপরই বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছিল।

উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ভারতীয় দাবি সম্পর্কে কমিশন এ যুক্তি প্রদর্শন করেছিল যে, শিক্ষার উন্নতি হলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে, যা অনেক সুবিধা এনে দেবে। কমিশন মনোনয়ন থেকে প্রতিযোগিতায় হঠাৎ পরিবর্তনও সমর্থন করে নি, তবে উচ্চতর বেসামরিক চাকরিকে ভারতীয়করণের লক্ষ্যে কিছু সুপারিশ করেছিল। আই.সি.এস কর্মকর্তাদের ৭৫% ইংল্যান্ডে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এবং বাকি ২৫% ভারতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যথাযথ অনুপাতে মনোনয়নের মাধ্যমে নির্বাচন করার প্রস্তাব কমিশন দিয়েছিল। এ পদ্ধতি ভারতীয়দের আগের চেয়ে বেশি সংখ্যক উচ্চতর পদ অধিকার করতে সাহায্য করবে বলে কমিশন অভিমত প্রকাশ করে। ভারতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা পদ্ধতি গ্রহণের উপযুক্ত সময় এখনও আসে নি বলে কমিশন মত প্রকাশ করে এবং কমিশন মনোনয়ন পদ্ধতিকে শ্রেয় মনে করে। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ আশঙ্কা করেছিল যে, মনোনয়ন পদ্ধতি বিভিন্ন অপব্যবহার ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করবে।

কমিশন অবশ্য যুক্তি দেখিয়েছিল যে, এর সম্ভাব্য অপব্যবহারের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে মনোনয়ন পদ্ধতি নিরপেক্ষভাবে কার্যকর করা হবে। তারা এ মত পোষণ করে যে, নির্বাচন এজেন্সির নিরপেক্ষতা হবে প্রশ্নাতীত। অধিকতর ভালো ও বৃহত্তর সংখ্যক প্রার্থীদের আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে পূরণযোগ্য পদগুলির পর্যাপ্ত প্রচার হতে হবে। প্রার্থীদের প্রশংসা-পত্রগুলি দক্ষতার সঙ্গে নিরীক্ষা করা হবে। নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের ওপর বাইরে থেকে কোনো চাপ প্রয়োগ করতে দেওয়া হবে না। নির্বাচিত সকলকেই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি সদস্যদের নিয়ে গঠিত নির্বাচন পরিষদের সহায়তায় মনোনয়ন প্রদান করা হবে। সম্ভাব্য সকল প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে এবং মেধার ভিত্তিতে নির্বাচিত করা হবে।

এছাড়া কমিশন বিভিন্ন শ্রেণির বেসামরিক কর্মকর্তাদের বেতন-কাঠামো সংক্রান্ত সমস্যা পরীক্ষা এবং এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ও সংবিধিবদ্ধ ভারতীয় কর্মকর্তাদের বেতনের হার সম্পর্কে সুপারিশ করেছিল। জীবন যাত্রার উচ্চতর মান বিবেচনা করে এবং ইংরেজদের এ চাকরিতে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যেও কমিশন একই চাকরিতে ইউরোপীয়দের জন্য উচ্চতর বেতন-হারের পরামর্শ দিয়েছিল। সম্পূর্ণভাবে ভারতে নির্বাচিত চাকরির জন্য ভারতীয় অবস্থা-অনুসারে একই বেতন দেওয়া হবে। কমিশন অবশ্য স্বীকার করে যে, একই দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তাদের সমান বেতন দেওয়ার সুবিধাসমূহ ছিল সুস্পষ্ট। কিছু কিছু চাকরির ক্ষেত্রে জাতিগত কারণে বেতনের কোনো পার্থক্য করা হবে না। ইউরোপে নির্বাচিত ভারতীয় প্রার্থী ইউরোপীয়দের মতো একই সুযোগ-সুবিধা লাভ করবে। সংক্ষেপে বলা যায় যে, বেতন স্কেলের সংশোধন শুধু সাধারণ মূল্যবৃদ্ধির ভিত্তিতেই করা হবে না, জাতিগত কারণেও করা হবে। ভারতীয়রা বেতন কাঠামোতে প্রবর্তিত জাতিগত বৈষম্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং সমমানের কাজের জন্য সমমানের বেতন দাবি করে।

কমিশন চাকরির অন্যান্য শর্ত সংশোধনেরও সুপারিশ করেছিল। কমিশন বিভিন্ন শ্রেণির চাকরির বিধিমালা সহজতর এবং ভাতাদি যুক্তিসঙ্গত করা এবং ইউরোপীয় ও ভারতীয়দের জন্য ছুটির আলাদা নিয়ম করার পরামর্শ দেয়। অবসরভাতা সংক্রান্ত বিধিমালাও উদার করা হয়।

তবে উচ্চতর চাকরিতে অধিকতর ভারতীয় প্রতিনিধিত্বের কমিশন প্রদত্ত সুপারিশ ভারতীয়দের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। মোটের উপর, ভারতীয় জনমত এবং ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমান নেতৃবৃন্দ বেশ কিছু সুপারিশে সন্তুষ্ট হতে পারে নি। তাঁরা সুপারিশমালার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং একে সম্পূর্ণ অন্যায্য, অর্থনৈতিকভাবে অসন্তোষজনক এবং রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক রূপে গণ্য করেন। প্রকৃত পক্ষে, কমিশনের প্রতিবেদন উচ্চতর চাকরির ভারতীয়করণ এবং প্রশাসনে অধিকতর সংখ্যায় ভারতীয় অংশীদারিত্বের ব্যাপারে ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকারের মনোভাবে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়।

মন্টেগু-চেমস্ফোর্ড রিপোর্ট এক-তৃতীয়াংশ পদে ভারতীয়দের নিয়োগের প্রস্তাব করলে প্রতিবেদনের সুপারিশসমূহ ১৯১৮ সালে বাতিল হয়ে যায় এবং ১৯২২ সালে একই সঙ্গে লন্ডন এবং নতুন দিল্লিতে আই.সি.এস পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।  [এ.বি.এম মাহমুদ]

-