মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্ট


মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্ট  প্রকাশিত হয় ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশসমূহে আংশিক দায়িত্বশীল সরকার প্রবর্তনের লক্ষ্যে ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মকালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় জনগণের সক্রিয় অবদান, ১৯১৬ সালের লক্ষ্ণৌ চুক্তির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সমঝোতা এবং ১৯০৯ সালের সংস্কারের অপর্যাপ্ততার প্রতিকার সাধনের জন্য ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের ক্রমবর্ধমান চাপের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সচিব এডউইন মন্টেগু (১৯১৭-১৯২২) ১৯১৭ সালের ২০ আগস্ট কমন্স সভায় গুরুত্বপূর্ণ এক ঘোষণা দেন। এতে বলা হয় যে, ব্রিটিশ সরকারের নীতি হচ্ছে দায়িত্বশীল সরকারের ক্রমবাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ভারতে প্রশাসনের প্রত্যেকটি শাখায় ভারতীয়দের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলির ক্রমউন্নয়ন সাধন করা।

ঘোষণায় বর্ণিত নীতির অনুসরণে ১৯১৭-১৮ সালের শীতকালে মন্টেগু ভারতের ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডের (১৯১৬-১৯২১) সাথে ভারত সফর করেন। এ সফরের ফলাফল এবং মতবিনিময়ের রিপোর্টই মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্ট নামে ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মকালে প্রকাশিত হয়। এ রিপোর্টটি ভারত সরকারের সার্বিক সমস্যাবলির উপর তখন পর্যন্ত প্রস্ত্তত করা প্রথম সমন্বিত সমীক্ষা হিসেবে বিবেচিত। রিপোর্টের সুপারিশগুলি ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনে যথার্থভাবে সন্নিবেশিত হয়। এ আইন প্রদেশসমূহে আংশিক দায়িত্বশীল সরকার প্রবর্তন করে।

যদিও রিপোর্টটি খোলাখুলিভাবে ভারতীয় জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের পশ্চাৎমুখিতা স্বীকার করে, তবুও এতে অভিমত ব্যক্ত করা হয় যে, প্রাদেশিক আইনসভায় পরোক্ষ নির্বাচনের পরিবর্তে যতদূর সম্ভব সম্প্রসারিত ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা উচিত। এটি রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবীদেরকে নতুন রাজনৈতিক জীবন এবং বিশেষ করে উন্নয়নের পথে অন্তরায়স্বরূপ সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বাধাসমূহ ভেঙ্গে ফেলার জন্য সার্বিকভাবে তাদের দেশকে শিক্ষিত করে তোলার মতো কাজে নিয়োজিত হতে অনুপ্রাণিত করে। ইংল্যান্ডে প্রচলিত ধারণা ছিল, হিন্দু-মুসলমান বিভেদের কারণে সংসদীয় সরকার ভারতে অকার্যকর। হিন্দু-মুসলমান বিভেদের বিষয়টি যথার্থভাবে পর্যালোচনা করে এর বাস্তব সমাধান হিসেবে ১৯০৯ সালের আইন দ্বারা প্রবর্তিত আলাদা নির্বাচক মন্ডলী ব্যবস্থা চালু রাখার পক্ষে এই রিপোর্টে মত প্রকাশ করা হয়।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল দ্বৈত শাসন নীতির প্রবর্তন, যার দ্বারা সরকারের কর্মকান্ডসমূহ উল্লম্বভাবে ‘সংরক্ষিত’ এবং ‘হস্তান্তরিত’ বিভাগসমূহের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। ‘সংরক্ষিত’ বিভাগগুলি রাজার নিকট দায়ী সপরিষদ গভর্নর কর্তৃক পরিচালিত হবে এবং ‘হস্তান্তরিত’ বিভাগগুলি মন্ত্রীদের পরামর্শানুযায়ী গভর্নর পরিচালনা করবেন। এ মন্ত্রীরা আইনসভার নির্বাচিত সদস্য এবং উক্ত সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলেন। মন্ত্রীদের নিকট হস্তান্তরিত প্রধান বিভাগগুলি ছিল কৃষি, শিল্প, গণপূর্ত (সেচ ব্যতীত), স্থানীয় সরকার, জনস্বাস্থ্য এবং শিক্ষা। এ দ্বৈত-শাসন নীতি ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের পূর্ব পর্যন্ত বলবৎ ছিল, যা ১৯৩৭ সালে কার্যকারী হয়েছিল।  [এনায়েতুর রহিম]