ইটখোলা


ইটখোলা  বিশেষ মানের কাদামাটি পুড়িয়ে ইট তৈরির কারখানাকে ইটভাটা বা ইটখোলা বলা হয়। বাংলাদেশে নির্মাণ কাজে ব্যবহারোপযোগী পাথর সুলভ না হওয়ায় এবং দেশের অধিকাংশ অঞ্চল পলিগঠিত হওয়ায় নির্মাণ-উপাদান হিসেবে কাদামাটির তৈরি ইটের ওপর নির্ভরতা অত্যধিক। প্রাচীনকালেও নির্মাণকাজে ইটের ব্যাপক ব্যবহারের কথা জানা যায়। খ্রিস্টপূর্ব চার শতকে নির্মিত নগরী  পুন্ড্রবর্ধন বা  মহাস্থানগড়এর বিভিন্ন নির্মাণকাজে পোড়ানো ইট এবং কাদামাটির তৈরি রোদে শুকানো ইট ব্যবহূত হয়েছিল। সে সময়ে ইট জোড়া দেওয়ার কাজে চুন এবং চিটাগুড়ের মিশ্রণ ব্যবহূত হতো। এ প্রযুক্তি শত শত বছর ধরে ইটের তৈরি স্থাপনাগুলিকে অনড় করে রেখেছে।

ইটখোলা

বাংলাদেশে প্রায় ৬,০০০ ইট প্রস্ত্ততকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশে বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ইট তৈরি হয় বলে ধারণা করা হয়। ইটখোলাগুলি ক্ষুদ্র এবং স্বতন্ত্র উৎপাদনক্ষেত্র হিসেবেই পরিচিত। অধিকাংশ ইটখোলা কেবল শুষ্ক মৌসুমে সচল থাকে। শহরে বা বড় মাপের নির্মাণ কাজের কাছাকাছি জায়গায় সাধারণত ইটখোলাগুলির অবস্থান। প্রতিবছর একই অবস্থানে ইটখোলা গড়ার চেষ্টা করা হয়। কোনো কোনো ইটখোলার নিজস্ব স্থায়ী কারখানার ছাউনি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা আছে। সাধারণত বড় বিনিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় কারখানা-সুবিধাসম্পন্ন ইটখোলার বড় বড় প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলকভাবে উন্নতমানের ইট প্রস্ত্তত করা হয়।

ইটখোলায় ব্যবহূত কাদামাটি সচরাচর সংলগ্ন মাঠ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু উপযুক্ত মাটি দূরবর্তী স্থান থেকেও বয়ে আনা হয়। স্বয়ংক্রিয় কারখানা ব্যতিরেকে সাধারণ ইটখোলাগুলিতে কাদামাটি দিয়ে হাতে তৈরি ইট রোদে শুকানোর জন্য প্রাথমিকভাবে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। ৫ থেকে ১২ দিন রোদে শুকানোর পর ইটখোলা ইটভাটার  ভেতরে পোড়ানোর জন্য সাজানো হয়। ভাটার ভিতরে ইট পোড়ানোর সময় তাপের অপচয় রোধের জন্য ইটের গুড়া দিয়ে আস্তরণ দেওয়া হয়। জ্বালানি গ্যাসের সংযোগবিহীন ইটখোলাগুলিতে ইট পোড়ানো শুরু হয় জ্বালানি কাঠ দিয়ে এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলিতে কয়লা ব্যবহূত হয়। অপেক্ষাকৃত সস্তা হওয়ায় ইটখোলায় ব্যবহারের জন্য ভারত থেকে কয়লা আমদানি করা হয়। কয়লার বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠের গুড়া, ফার্নেস অয়েল এমনকি গাড়ির বাতিল টায়ারও পোড়ানো হয়।  ঢাকাচট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার গ্যাস নেটওয়ার্কের কাছাকাছি অবস্থানের প্রায় ২০০টি মাত্র ইটখোলা জ্বালানি হিসেবে  প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে।

ইটখোলায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়ানো আইনত নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে ব্যাপকভাবেই ইটখোলাগুলিতে কাঠ পোড়ানো হয়। ইটখোলাগুলিতে মানের বিবেচনায় সাধারণত তিন ধরনের ইট উৎপাদিত হয়। ব্যবহূত প্রধান কাঁচামাল, ইট পোড়ানোর মান এবং তৈরি ইটের আকৃতি, ইটের গায়ে ফাটল ইত্যাদি মান নিয়ন্ত্রণের বিবেচ্য উপাদান। প্রথম শ্রেণির ইট ভবন, সড়ক, সেতু ইত্যাদি নির্মাণে, দ্বিতীয় শ্রেণির ইট অপেক্ষাকৃত দুর্বল স্থাপনা নির্মাণে এবং তৃতীয় শ্রেণির ইট অস্থায়ী নির্মাণকাজে ব্যবহূত হয়। স্বয়ংক্রিয় ইট কারখানায় তৈরি ইট প্রধানত প্রথম শ্রেণির ইট, সিরামিক ইট এবং রিফ্রাক্টরি ইট। এগুলি মানসম্মত নির্মাণকাজ ও উচ্চতাপের বয়লারে এবং বিশেষায়িত শিল্পকারখানায় ব্যবহূত হয়। ইটখোলার কারণে শুষ্ক মৌসুমে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পায়। মূলত নিচু মানের জ্বালানি ও অনুপযুক্ত চিমনি ব্যবহারের কারণে ইটখোলাগুলি সন্নিহিত পরিবেশের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। ইটখোলার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে ছাই, ধুলা ও সালফার-ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস। আক্রান্ত এলাকায় এসিড বৃষ্টির মতো ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ ছাড়া ইটভাটাগুলি শস্যহানি, ধাতব পদার্থে মরচে সৃষ্টি, বর্ণক্ষয়, ভূমিক্ষয় ও ভূমির উর্বরতা হ্রাসে ইন্ধন যোগায়। ইট পোড়ানোর জায়গা দীর্ঘ সময়ের জন্য কৃষিকাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।  [মুশফিকুর রহমান]