অবতার


অবতার  হিন্দুশাস্ত্রমতে মনুষ্য বা মনুষ্যেতর প্রাণিরূপে বিষ্ণু বা ঈশ্বরের পৃথিবীতে আগমন। পৃথিবীর পাপভার মোচন, অধর্ম নাশ এবং ধর্মসংস্থাপনের উদ্দেশ্যে ঈশ্বর বিভিন্ন সময়ে অবতাররূপে পৃথিবীতে আগমন করেন। ভগবদ্গীতা ও দেবীমাহাত্ম্যে বিষ্ণু ও জগজ্জননীর এরূপ আবির্ভাবের কথা বলা হয়েছে। অবতার দু রকমের: অংশাবতার ও পূর্ণাবতার। বিষ্ণু আংশিকভাবে অবতীর্ণ হলে অংশাবতার এবং পরিপূর্ণরূপে অবতীর্ণ হলে বলে পূর্ণাবতার।

বিভিন্ন গ্রন্থে অবতারের সংখ্যা চার, ছয়, দশ, ষোলো, বাইশ, তেইশ এমকি ঊনচল্লিশও বলা হয়েছে। তবে বিষ্ণুর দশ অবতারের কথাই অধিক প্রচলিত। এ দশ অবতার হচ্ছে: মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ ও কল্কি।

মৎস্য  বিষ্ণুর প্রথম অবতার। এ সময় তিনি মৎস্যাকৃতি ধারণ করে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। মহাপ্লাবনের সময় বিষ্ণু শৃঙ্গধারী মৎস্যরূপে মনুর নিকট উপস্থিত হন এবং নিজের শৃঙ্গের সঙ্গে সর্পরজ্জুর দ্বারা মনুর নৌকা বেঁধে রাখেন। পরে প্লাবন থেমে গেলে মনুকে পুনরায় সৃষ্টি প্রক্রিয়া শুরু করার উপদেশ দিয়ে তিনি স্বস্থানে গমন করেন। এদিকে মনু ঘোর তপস্যার দ্বারা প্রাণিজগৎ সৃষ্টি করেন এবং হয়গ্রীব দৈত্যকে বধ করেন।

কূর্ম  বিষ্ণুর দ্বিতীয় অবতার। কূর্ম অর্থ কচ্ছপ বা কাছিম। পুরাণের ব্যাখ্যা অনুসারে প্লাবনে নিমজ্জিত পৃথিবীর দ্রব্যসমূহ উদ্ধারের জন্য বিষ্ণু সত্যযুগে কূর্মরূপে অবতীর্ণ হন। তিনি ক্ষীরসাগরের নিচে নিজেকে স্থাপন করে মন্দার পর্বতকে পৃষ্ঠদেশে ধারণ করেন। অনন্তনাগ বাসুকীকে রজ্জু করে দেবতা ও দানবরা মন্দার পর্বতের সাহায্যে সমুদ্রকে মন্থন করলে অমৃতসহ অনেক ধনসম্পদ উঠে আসে। এভাবে বিষ্ণু কূর্মরূপ ধারণ করে পৃথিবীকে রক্ষা করেন।

বরাহ  বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার। হিরণ্যাক্ষ নামক এক দানব পৃথিবীকে সমুদ্রতলে নিয়ে গেলে বিষ্ণু বরাহরূপে এক হাজার বছর যুদ্ধ করে তাকে বধ করেন এবং পৃথিবী উদ্ধার করেন।

নৃসিংহ  বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার। ব্রহ্মার বরে অজেয় দানব হিরণ্যকশিপু বিষ্ণুভক্ত পুত্র প্রহ্লাদকে বধ করতে উদ্যত হলে বিষ্ণু নৃসিংহরূপে আবির্ভূত হয়ে হিরণ্যকশিপুকে হত্যা ও প্রহ্লাদকে রক্ষা করেন।

বামন  বিষ্ণুর পঞ্চম অবতার। ত্রেতাযুগে দৈত্যরাজ বলি তপস্যাবলে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল দখল করে অত্যন্ত গর্বিত ও অত্যাচারী হয়ে ওঠে। তখন তার হাত থেকে দেবতা ও মানবদের রক্ষার জন্য বিষ্ণু বামনরূপ ধারণ করে বলির নিকট তিন পদক্ষেপ পরিমাণ ভূমি প্রার্থনা করেন। বিষ্ণুকে একজন সাধারণ মানুষ মনে করে বলি এ তুচ্ছ প্রার্থনা পূরণে সম্মত হয়। বামনরূপী বিষ্ণু তখন স্বমহিমায় আবির্ভূত হয়ে এক পদক্ষেপে স্বর্গ এবং অন্য পদক্ষেপে মর্ত্য অধিকার করেন। বলি তখন নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং বামনরূপী বিষ্ণুকে চিনতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনাপূর্বক তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে। বিষ্ণু তখন বলির প্রতি কৃপাবশত তৃতীয় পদক্ষেপের দাবি প্রত্যাহার করেন এবং বলি পাতালে চলে যায়।

পরশুরাম  বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। ত্রেতাযুগে ক্ষত্রিয়দের উৎপীড়ন দমনার্থে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। পরশু (কুঠার) তাঁর অস্ত্র, তাই তাঁর নাম হয় পরশুরাম। নৈতিকতার প্রশ্নে পিতা জমদগ্নির আদেশে তিনি কুঠারাঘাতে মা রেণুকাকে হত্যা করেন। এতে মাতৃহত্যা তথা নারীহত্যার আপরাধে কুঠার তাঁর হাতে লেগে যায় এবং তীর্থস্নানে পাপমুক্ত হলে তা হাত থেকে মুক্ত হয়।

একবার পিতার হোমধেনুর বৎস হরণের অপরাধে পরশুরাম ক্ষত্রিয় রাজা কার্তবীর্যকে হত্যা করলে তাঁর পুত্ররা পরশুরামের পিতা জমদগ্নিকেও হত্যা করে। এতে ক্ষুব্ধ পরশুরাম তাদের ও তাদের অনুগত ক্ষত্রিয়দের হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেন। এভাবে তিনি একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেন বলে কথিত হয়।

রাম  বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। ত্রেতাযুগে তিনি অযোধ্যার রাজপুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেন এবং রাবণসহ আরও অনেক দুরাত্মাকে হত্যা করে পৃথিবীতে সত্য, ন্যায় ও শান্তি স্থাপন করেন। তাঁর জীবনকাহিনী অবলম্বনে রচিত হয় বিখ্যাত মহাকাব্য রামায়ণ

কৃষ্ণ  বিষ্ণুর অষ্টম ও পূর্ণাবতার। দ্বাপরযুগে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। এ সময় তিনি বহুমুখী কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। পৃথিবীর ভারমোচন তাঁর প্রাথমিক দায়িত্ব হলেও রাজনীতি, সমাজ, সংসার ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাঁকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই কর্তব্য পালন করতে দেখা যায়। তিনি নিজেও ছিলেন একজন রাজা এবং রাজকার্যে অন্যকেও তিনি সাহায্য করেন। তিনি অত্যাচারী রাজা কংস (সম্পর্কে তাঁর মাতুল) ও শিশুপালকে হত্যা করেন এবং দুরাচার দুর্যোধনসহ শতভাই ও তাদের সমর্থকদের হত্যায় সহায়তার মাধ্যমে সমাজে শান্তি স্থাপন করেন।

বুদ্ধ  বিষ্ণুর নবম অবতার। খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে তিনি আবির্ভূত হন এবং ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লীলা সংবরণ করেন। তিনি রাজপুত্র হয়েও সকল প্রকার সুখভোগ ত্যাগ করে মানুষের মুক্তিপথের সন্ধানে কঠোর সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। দীর্ঘ সাধনার পর তিনি বলেন, মানব জীবন দুঃখময় এবং অহিংসার মাধ্যমে এ দুঃখ অতিক্রম করা যায়। সকল জীবের প্রতি মৈত্রী ও করুণা প্রদর্শন তাঁর দর্শনের মূল কথা।

কল্কি  বিষ্ণুর দশম ও শেষ অবতার। কল্কিপুরাণসহ অন্যান্য পুরাণ ও মহাভারতে বলা হয়েছে যে, কলিযুগের শেষে পৃথিবী যখন পাপে পূর্ণ হবে এবং সকল মানব একবর্ণ হয়ে যাবে তখন বিষ্ণু সম্ভল গ্রামে বিষ্ণুযশার পত্নী সুমতির গর্ভে কল্কিরূপে জন্মলাভ করবেন এবং দুপক্ষযুক্ত শ্বেত অশ্বে আরোহণপূর্বক জ্বলন্ত অসি ও চক্র দ্বারা দুষ্কৃতদের দমন করে ধর্মরাজ্য স্থাপন করবেন। তখন আবার সত্যযুগের শুরু হবে।

এই যে অবতারতত্ত্ব এর মূলে রয়েছে হিন্দুদের নানারকম বিশ্বাস ও ভক্তি। হিন্দুদের ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব গভীর। তবে দশ অবতারের মধ্যে রাম ও কৃষ্ণের প্রভাবই সর্বাধিক। হিন্দুদের ধ্যানে-জ্ঞানে, এমনকি দৈনন্দিন জীবনেও এ দুজনের গভীর প্রভাব লক্ষণীয়। কোথাও কোথাও হিন্দুদের সামাজিক উৎসবেরও অঙ্গ হয়েছে এ দশাবতার। যেমন ফরিদপুরের কোনো কোনো অঞ্চলে দশ অবতারের রূপ ও লীলা অবলম্বনে চড়ক ও গম্ভীরা উৎসবে মুখোশ পরিহিত অবস্থায় ‘অবতার’ নামক  লোকনৃত্য পরিবেশিত হয়।  [দুলাল ভৌমিক]

আরও দেখুন লাঙ্গলবন্দ; রামচন্দ্র; কৃষ্ণ; বৌদ্ধধর্ম