ভূমি প্রশাসন

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৪:৩৭, ৫ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

ভূমি প্রশাসন  বর্তমান বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রদ্বয় নিয়ে গঠিত উপমহাদেশের রাজনৈতিক ক্রমবিকাশের সাথে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার একটি যোগসূত্র রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত এ দেশে তিনিই হতেন জমির মালিক যিনি জঙ্গল পরিষ্কার করে তা চাষযোগ্য করে তুলতেন। উৎপাদিত শস্যের একটি অংশ রাজাকে দেওয়া হতো জমির মালিক হিসেবে নয়, রাজা সার্বভৌম ক্ষমতাবলে চাষাবাদকারীকে নিরাপদে জমি ভোগদখলের নিশ্চয়তা বিধান করতেন বলে। এভাবেই কৃষকের সাথে রাজা বা সার্বভৌম ক্ষমতার সাথে জমির মালিকানার ব্যাপারে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাজা-প্রজার এই সম্পর্ক রায়তওয়ারি পদ্ধতি নামে পরিচিত।

পদ্মা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র এই তিনটি প্রধান নদীর অববাহিকায় একটি বদ্বীপ আকারে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ। এছাড়াও দেশের সর্বত্র অসংখ্য নদ-নদী, শাখা নদী, উপনদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে। প্রতি বছরই এ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আবার নদীতে চর পড়ে নতুন ভূমিখন্ডের সৃষ্টি হয়। দেশের এই অভিনব ভৌগোলিক পরিবেশের জন্যই মুগল সম্রাটগণ সুবা বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) রায়তওয়ারি প্রথা প্রচলন করতে বাধাপ্রাপ্ত হন। তারা এ দেশে রায়তওয়ারি প্রথা প্রবর্তনের পরিবর্তে ভূমি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব জমিদার নামে পরিচিত কিছু লোকের নিকট প্রদান করাই লাভজনক ও নিরাপদ বলে মনে করেন। জমিদারগণ জমির মালিকানা দাবি করতে পারতেন না, তারা শুধু সম্রাটের এজেন্ট হিসেবে নির্দিষ্ট এলাকার রাজস্ব আদায় করতেন।

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুগল সম্রাট শাহ আলমের নিকট থেকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব প্রদানের অঙ্গীকারে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ানি বা ভূমি রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা লাভ করেন। কোম্পানি এ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজস্ব আদায়ের জন্য কালেক্টর পদবিধারী কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। এই এলাকাগুলিকে পরবর্তীকালে জেলায় রূপান্তর করা হয়।

ভূমিরাজস্ব আদায় এবং ভূমিরাজস্ব সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির প্রশাসনে কালেক্টরদের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করার জন্য ব্রিটিশ শাসন আমলে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে বোর্ড অব রেভিনিউ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৫০ সালের বেঙ্গল বোর্ড অব রেভিনিউ অ্যাক্টের আওতায় এই বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। ১৯১৩ সালের বেঙ্গল বোর্ড অব রেভিনিউ অ্যাক্ট দ্বারা তা সর্বশেষ পুনর্গঠন করা হয়।

পাকিস্তান শাসন আমলে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের অধীনে রেভিনিউ ডিপার্টমেন্ট নামে একটি ডিপার্টমেন্ট সৃষ্টি করা হয়। বোর্ড অব রেভিনিউ এবং তার অধীনস্থ অফিসসমূহ এই ডিপার্টমেন্টের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের সচিব মর্যাদাসম্পন্ন ৩ বা ৪ জন সদস্য সমন্বয়ে বোর্ড অব রেভিনিউ গঠিত হতো। সদস্যদের মধ্যে একজনকে সিনিয়র সদস্য বলা হতো। কালেক্টরকে তার কাজে সহায়তা করার জন্য প্রতি জেলায় একটি অতিরিক্ত বা যুগ্ম কালেক্টর (রাজস্ব) এবং একটি রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টরের পদ, প্রতি মহকুমার জন্য একটি করে মহকুমা ম্যানেজারের পদ এবং প্রতি থানার জন্য একটি করে সার্কেল অফিসারের পদ সৃষ্টি করা হয়। সাধারণত দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত প্রতিটি তহসিলের জন্য একজন করে তহসিলদার নিয়োগ করা হয় এবং তার সাহায্যকারী হিসেবে এক বা দুই জন সহকারী তহসিলদার নিযুক্ত করা হয়।

বোর্ড অব রেভিনিউর কার্যাবলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল পরিচালক, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ-এর অধীন সেটেলমেন্ট অপারেশন তত্ত্বাবধান করা, ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত জেলাসমূহের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা চিহ্নিতকরণ পরিবীক্ষণ করা, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভূমি প্রশাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা তদারক করা, ভূমি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন তত্ত্বাবধান করা এবং কমিশনার, কালেক্টর ও অন্যান্য রাজস্ব কর্মকর্তার আদেশের বিরুদ্ধে আনীত সকল আপিলের শুনানি ও চূড়ান্ত আদেশ প্রদান। এছাড়া ১৮৭৯ সালের কোর্ট অব ওয়ার্ডস অ্যাক্টের বিধান অনুসারে কোর্ট অব ওয়ার্ডস হিসেবে দায়িত্ব পালন করাও বোর্ডের কার্যাবলির অন্তর্ভুক্ত ছিল। বস্ত্তত, বোর্ড অব রেভিনিউ ছিল সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য রাজস্ব কর্তৃপক্ষ।

স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের রেভিনিউ ডিপার্টমেন্টের স্থলে আইন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার বিভাগ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীকালে এই বিভাগকে পূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মর্যাদা দেওয়া হয়। ১৩ মার্চ, ১৯৭৩ তারিখে জারীকৃত আইএম-১০/৭২/১১৫(৫)আরএল নম্বর আদেশবলে বোর্ড অব রেভিনিউ এবং অধীনস্থ অফিসসমূহ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। বোর্ডের কার্যাবলি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করা হয়। রাজস্ব অফিসসমূহ তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শন করার জন্য মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবকে পদাধিকারবলে ভূমি সংস্কার কমিশনার নিয়োগ করা হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে রাজস্ব অফিসসমূহ পরিদর্শনের জন্য মন্ত্রণালয়ের ৪ জন উপ-সচিবকে পদাধিকারবলে উপভূমি সংস্কার কমিশনার নিয়োগ করা হয়। ভূমি সংস্কার কমিশনার এবং উপভূমি সংস্কার কমিশনারগণ ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়ে থেকেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ হচ্ছে নীতি নির্ধারণ করা। তাছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ, শত্রু সম্পত্তি ও পরিত্যক্ত সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা প্রভৃতিও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভুক্ত হওয়ায় এর কার্যপরিধি বেশ বেড়ে যায়। ফলে সেটেলমেন্ট অপারেশন, দিয়ারা জরিপ, খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান, আন্তঃরাষ্ট্র সীমানা চিহ্নিতকরণ প্রভৃতি বিষয় তদারকি করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকন্তু, ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব পালনের ফলে মন্ত্রণালয় ভূমি সংস্কার কার্যক্রম তত্ত্বাবধান ও ভূমিসংক্রান্ত আপিলের শুনানি দিয়ে নিষ্পত্তি করতে বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হয়। দেশে মুখ্য কোন রাজস্ব কর্তৃপক্ষ না থাকায় বিভাগীয় কমিশনারগণ, জেলা প্রশাসকগণ, ভূমি সংস্কার কমিশনার, ভূমি রেকর্ড ও জরিপের পরিচালক এবং অন্যান্য রাজস্ব কর্মকর্তা ভূমি প্রশাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রয়োজনীয় উপদেশ, আদেশ-নির্দেশ ও দিক-নির্দেশনা লাভে ব্যর্থ হয়ে তাদের দায়িত্বাধীন বিষয়াদি নিষ্পত্তিতে বিশেষ অসুবিধা ভোগ করেন। এসব অসুবিধা উপলব্ধি করে সরকার মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন সাবেক বোর্ড অব রেভিনিউ-এর মতো একটি সংস্থা স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ভূমি প্রশাসন বোর্ড আইন, ১৯৮০ (১৯৮১ সালের ১৩ নম্বর আইন) প্রণয়ন করে। এই আইনের ৩ ধারার (২) উপ-ধারার বিধান অনুযায়ী সরকার কর্তৃক একজন চেয়ারম্যান ও দুইজন সদস্য সমন্বয়ে ভূমি প্রশাসন বোর্ড গঠিত হয়। উক্ত আইনের ৩(২) ধারায় বিধান করা হয়েছিল যে, এই বোর্ড তার ওপর সরকার কর্তৃক অথবা কোন আইনের দ্বারা কিংবা আইনের অধীনে অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবে।

মন্ত্রণালয় ভূমি প্রশাসন বোর্ডের দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্ধারণ করে বিভিন্ন সময়ে আদেশ জারি করে। ১৯৮২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তারিখের আদেশে বোর্ডকে বিধিবদ্ধ আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তিকরণ, ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারি নীতি ও নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ের ভূমি অফিস কর্তৃক যথাযথ বাস্তবায়নের তত্ত্বাবধান এবং সরকারকে ভূমি-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চাহিদা মোতাবেক পরামর্শ প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ ও আদায়, নতুন তহসিল অফিস স্থাপন, খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান, অভ্যন্তরীণ অডিট অফিস নিয়ন্ত্রণ এবং কোর্ট অব ওয়ার্ডস-এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এই বোর্ডের ওপর অর্পিত হয়। মন্ত্রণালয়ের ৫ জুলাই, ১৯৮৩ তারিখের আদেশে অর্পিত সম্পত্তির (জমি ও ইমারত) ব্যবস্থাপনা ও তদারকি, পরিত্যক্ত সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পন্নকরণ, বিনিময় কেসে জড়িত সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বার্ষিক প্রশাসনিক প্রতিবেদন প্রণয়নের দায়িত্ব এই বোর্ডের ওপর ন্যস্ত করা হয়। মন্ত্রণালয় ৭ জুলাই, ১৯৮৩ তারিখের এক আদেশে মহাপরিচালক, ভূমি রেকর্ডস ও জরিপের নিয়ন্ত্রণাধীন সেটেলমেন্ট অপারেশন কার্যক্রম তত্ত্বাবধান, আন্তঃজেলা সীমানা চিহ্নিতকরণের পরিবীক্ষণ, জেলা পর্যায়ে তহসিল পর্যন্ত ভূমি প্রশাসন ইত্যাদি কাজকে উক্ত ভূমি প্রশাসন বোর্ডের দায়িত্বভুক্ত করা হয়। ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয় থেকে জারীকৃত ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৪ তারিখের এক আদেশে ভূমি প্রশাসন বোর্ডের দায়িত্ব ও কার্যাবলি পুনর্বণ্টন করা হয় এবং সেটেলমেন্ট ডিপার্টমেন্টের কার্যাবলি তদারক, আন্তঃরাষ্ট্র ও আন্তঃজেলা সীমানা চিহ্নিতকরণ পরিবীক্ষণ এবং অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত দায়িত্বাবলি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

১৯৮৭ সালের প্রথম দিকে ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ভূমি মন্ত্রণালয় করা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয় নীতি নির্ধারণ এবং ভূমি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন, তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণের দিকে অধিকতর দৃষ্টি দেওয়া সমীচীন মনে করে। এই সময়ে ভূমি সংস্কার অভিযান বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রপতিকে (রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান) সভাপতি করে জাতীয় ভূমি সংস্কার পরিষদ গঠন করা হয়। ভূমি সংস্কার সম্পর্কিত নীতি নির্ধারণ, জেলা ভূমি সংস্কার বাস্তবায়ন টাস্ক ফোর্স ও উপজেলা ভূমি সংস্কার কমিটির সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত প্রদান এবং ভূমি সংস্কার কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত প্রদান জাতীয় ভূমি সংস্কার পরিষদের কার্যপরিধির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভূমি প্রশাসন বোর্ড মাঠ পর্যায়ের অফিসসমূহের কার্যাবলি তদারক এবং ভূমি সম্পর্কিত মামলার যথাযথ নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতীয় ভূমি সংস্কার পরিষদ ভূমি প্রশাসন বোর্ড বিলুপ্ত করে তদস্থলে ভূমি আপিল বোর্ড এবং ভূমি সংস্কার বোর্ড নামে দুটি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ভূমি সংস্কার বোর্ড অধ্যাদেশ, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সালের ১ নং অধ্যাদেশ) এবং ভূমি আপিল বোর্ড অধ্যাদেশ, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সালের ২নং অধ্যাদেশ) জারি করা হয়। পরবর্তীকালে ভূমি সংস্কার বোর্ড আইন, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সালের ২৩ নং আইন) এবং ভূমি আপিল বোর্ড আইন, ১৯৮৯ (১৯৮৯ সালের ২৪ নং আইন) প্রণীত হলে উক্ত অধ্যাদেশদ্বয় রহিত করা হয়। ভূমি আপিল বোর্ড আইনের ৮(১) ধারায় ভূমি প্রশাসন বোর্ড আইন, ১৯৮০ রহিত করা হয়। ফলে ভূমি প্রশাসন বোর্ডের বিলুপ্তি ঘটে।

ভূমি আপিল বোর্ড আইনের ৪ ধারার ক্ষমতাবলে সরকার কর্তৃক একজন চেয়ারম্যান ও দুইজন সদস্য সমন্বয়ে ভূমি আপিল বোর্ড গঠন করা হয়। উক্ত আইনের ৫ ধারায় বোর্ডের এখতিয়ার সম্বন্ধে বিধান রয়েছে যে, বোর্ড তার ওপর সরকার কর্তৃক অথবা কোন আইনের দ্বারা কিংবা আইনের অধীন অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবে। ভূমি মন্ত্রণালয় ৯ অক্টোবর, ১৯৯০ ভূমি আপিল বোর্ড বিধিমালা, ১৯৯০ প্রণয়ন ও জারি করে। এই বিধিমালার ৩ বিধিতে বোর্ডের কার্যবণ্টন ও পদ্ধতি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বোর্ড ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূমিবিষয়ক সমুদয় আইনের অধীনে ভূমিসংক্রান্ত মামলা (রাজস্ব সম্পর্কীয়), নামজারি ও খারিজ মামলা, সায়েরাত ও জলমহাল সংক্রান্ত মামলা, ভূমি উন্নয়ন কর সম্পর্কিত সার্টিফিকেট মামলা, খাসজমি বন্দোবস্ত বিষয়ক মামলা, পি.ডি.আর অ্যাক্টের অধীনে দায়েরকৃত রিভিশন/আপিল মামলা, এবং অর্পিত, পরিত্যক্ত ও বিনিময় সম্পত্তি বিষয়ক মামলায় বিভাগীয় কমিশনারের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল/রিভিশন মামলা গ্রহণ ও শুনানি করে নিষ্পত্তি করতে পারে। উক্ত বিধিতে ভূমি আপিল বোর্ডকে অধস্তন ভূমি আদালতসমূহের কার্যক্রম পরিদর্শন, অনুবীক্ষণ ও মূল্যায়ন এবং ভূমিসংক্রান্ত আইন, আদেশ ও বিধি সম্পর্কে সরকার কর্তৃক প্রেরিত বিষয়াদিতে পরামর্শদান করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ পৃথক এবং এককভাবে পক্ষগণকে শুনানিক্রমে আপিল/রিভিশন ও পুনর্বিবেচনার আবেদনের ওপর আদেশ প্রদান করেন এবং উক্ত আদেশ বোর্ডেরও আদেশ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত কোন আদেশের পুনর্বিবেচনা মামলায় আইনগত জটিলতা বা আইনের ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দিলে চেয়ারম্যান বিষয়টি ফুল বোর্ডে (চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সমন্বয়ে গঠিত বোর্ড) বিবেচনার জন্য উপস্থাপনের আদেশ প্রদান করতে পারেন এবং ফুল বোর্ড শুনানির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। পক্ষগণ স্বয়ং অথবা নিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে আপিল/রিভিশন ও পুনর্বিবেচনার আবেদন দায়ের করতে পারেন। বোর্ড প্রদত্ত কোন আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার কোন বিধান নেই। ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ভূমি প্রশাসন আইন সম্পর্কিত মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তিতে ভূমি আপিল বোর্ড সর্বোচ্চ ভূমি আদালত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকে।

ভূমি সংস্কার বোর্ড আইনের ৪ ধারার ক্ষমতাবলে সরকার কর্তৃক একজন চেয়ারম্যান ও দুইজন সদস্য সমন্বয়ে ভূমি সংস্কার বোর্ড গঠন করা হয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভূমিসংস্কার কমিশনার এবং উপ ভূমি সংস্কার কমিশনারের পদসমূহ অবলুপ্ত করা হয়। ভূমি সংস্কার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকে ভূমি সংস্কার কার্যক্রম ও ভূমি ব্যবস্থাপনা তদারকি করার জন্য প্রতি বিভাগে একটি উপভূমি সংস্কার কমিশনারের পদ সৃষ্টি করা হয়। উক্ত আইনের ৫ ধারায় বোর্ডকে সরকার কর্তৃক অর্পিত ভূমি সংস্কার ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন এবং কোন আইনের দ্বারা বা আইনের অধীন অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ২৩ মে ১৯৮৯ তারিখে সরকার কর্তৃক দায়িত্ব অর্পণ করে একটি আদেশ জারি করা হয়। অর্পিত দায়িত্ব ও কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে: জেলা থেকে তহসিল পর্যায়ের সকল ভূমি অফিস ব্যবস্থাপনা, তত্ত্বাবধান এবং পরিবীক্ষণ, বিভাগীয় পর্যায়ে উপভূমি সংস্কার কমিশনারের কার্যালয়ের তত্ত্বাবধান, খাসজমি চিহ্নিতকরণ এবং সরকার কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা অনুযায়ী কৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদান এবং বেদখলি খাসজমি উদ্ধার, ভূমি উন্নয়ন করের দাবি নির্ধারণ ও আদায়, ভূমি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন, কোর্ট অব ওয়ার্ডস-এর ব্যবস্থাপনা ও তদারকি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রেকর্ড রুম স্থাপন, তদারকি ও পরিদর্শন এবং বোর্ডের সকল সংস্থাপন ও হিসাব সম্পর্কিত সাধারণ প্রশাসন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সাপেক্ষে ভূমি সংস্কার বোর্ড তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে থাকে।

কার্যকর ও দক্ষ ভূমি প্রশাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার পূর্বশর্ত হচ্ছে: প্রতিটি ভূমিখন্ডের ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিচিতি নম্বর প্রদর্শনপূর্বক নকশা প্রস্ত্ততকরণ, জমির মালিকানা, অংশ, পরিমাণ ও কর সম্পর্কিত তথ্যাদি সংরক্ষণ, মালিকের দখলিস্বত্ব প্রমাণের জন্য স্বত্বলিপি (খতিয়ান) প্রস্ত্তত ও প্রকাশকরণ এবং স্বত্বলিপি সংরক্ষণ ও মালিকানার পরিবর্তন হালনাগাদকরণ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ভূমি রেকর্ডস ও জরিপ অধিদপ্তরের দায়িত্ব হচ্ছে নকশা ও হালনাগাদ রেকর্ড বা স্বত্বলিপি প্রস্ত্ততকরণ। কিছুসংখ্যক পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, সেটেলমেন্ট অফিসার, সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বহুসংখ্যক কর্মচারীর সহযোগিতায় মহাপরিচালক ভূমি রেকর্ডস ও জরিপ অধিদপ্তরের ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের বিধান অনুসারে নকশা ও স্বত্বলিপি প্রস্ত্তত করেন এবং জেলা প্রশাসক বা কালেক্টরদের নিকট হস্তান্তর করেন। কালেক্টরগণ তা সংরক্ষণ করেন এবং হস্তান্তর, উত্তরাধিকার বা অন্যকোন কারণে কোন পরিবর্তন হলে তা সন্নিবেশ করেন।  [শামসুদ-দীন আহমদ]