অশোক

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ২৩:৫৩, ৪ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

অশোক (খ্রি.পূ ২৬৯-২৩২)  প্রথম পূর্ব ভারতীয় শাসক যিনি উপমহাদেশের বৃহত্তর অংশে তাঁর রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। অশোকের সময়ে পুন্ড্রবর্ধন (বর্তমান উত্তরবঙ্গের বগুড়া) মৌর্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ বা প্রশাসনিক বিভাগ ছিল। সম্ভবত বিন্দুসার অথবা তাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারী অশোক এ অঞ্চলকে মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেন। খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩-২৭২ অব্দে বিন্দুসারের মৃত্যুর পর রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর পুত্রদের মধ্যে প্রায় দীর্ঘ চার বছর যুদ্ধের পর অশোক খ্রিস্টপূর্ব ২৬৯-৬৮ অব্দে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। তিনি ২৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজ্য শাসন করেন। শাসনের প্রথম পর্বে অশোক উপমহাদেশের প্রায় অধিকাংশে তাঁর রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটান; কিন্তু রক্তক্ষয়ী কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অশোকের রাজনৈতিক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে আমূল পরিবর্তন আসে। অশোকের প্রস্তর ও স্তম্ভলিপির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, কী করে কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তবন্যা তাঁকে একজন নীতিবান ব্যক্তিতে পরিণত করেছে।  ওই সময় থেকেই তিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিশ্বশান্তি ও ন্যায়নিষ্ঠ শাসন প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। জীবনের অবশিষ্ট সময় অহিংস  ধম্মই তাঁর পথপ্রদশ©র্কর ভূমিকা পালন করে।

অশোক পাটলীপুত্র (বর্তমান পাটনা বা এর কাছাকাছি কোনো স্থান) হতে তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করতেন। ঐতিহাসিকদের মতে, রাজকীয় তহবিল এবং ধম্ম প্রচারের ব্যয় নির্বাহের অর্থের প্রধান উৎস ছিল গঙ্গা উপত্যকা থেকে সংগৃহীত রাজস্ব।

প্রাচীন সভ্যতার বিস্তৃতি ও গভীরতার বিষয়টি প্রাচ্যবিদদের দ্বারা উন্মোচিত না হওয়া পর্যন্ত পুরাণ সাহিত্যের কয়েকটি অসম্পূর্ণ তথ্যের উপরই অশোক সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমাবদ্ধ ছিল। পুরাণ সাহিত্যে অশোককে মৌর্য রাজবংশের একজন নগণ্য শাসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৮৩৭ সালে জেমস প্রিন্সেপ অশোকের বেশ কয়েকটি প্রস্তরলিপির পাঠোদ্ধার করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, পুরাণ সাহিত্যে বর্ণিত সম্রাট অশোককে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বড় মাপের সম্রাট ছিলেন তিনি। প্রিন্সেপই প্রথম প্রকাশ করেন যে, অশোক নিজে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং তিনি ধম্মকে কেন্দ্র করে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন। অশোকের আরো বেশ কিছু লিপি পরীক্ষা করে প্রিন্সেপ সিদ্ধান্ত দেন যে, তিনি কলিঙ্গ যুদ্ধের পরেই রাজ্যজয়ের নীতি বর্জন করেন। তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর দেবনামপিয় পিয়দসি (পিয়দসি, অর্থাৎ দেবতাদের প্রিয়জন) শীর্ষক ধর্ম- রাজকীয় উপাধি গ্রহণ করেন এবং নিজেকে শান্তি ও মানবজাতির কল্যাণের কাজে নিবেদিত করেন। পরবর্তী সময়ে অশোকের বেশ কিছু প্রস্তরলিপি এবং স্তম্ভে উৎকীর্ণ রাজকীয় আদেশ বা ডিক্রি আবিষ্কার এবং এদের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে অশোকের সাম্রাজ্য ও জীবনাচরণ, রাজনীতি ও নৈতিকতা সম্পর্কে  আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। উনিশ ও বিশ শতকে আবিষ্কৃত অশোকের অসংখ্য প্রস্তরলিপির পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে শুধু নৃপতি হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনই নয়, তাঁর রাজত্বকালের ঘটনাবলী এবং প্রশাসনের প্রকৃতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। অশোক তাঁর তেরোতম লিপিতে নিজের জীবন দর্শন, রাজনীতি ও ধর্ম সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। প্রাচীনকালের রাজকীয় চিন্তাধারা ও কর্মকান্ড সম্পর্কে এত সরল ও ব্যাপকভাবে উপস্থাপিত দলিল সম্রাট অশোকের রাজত্বের পূর্বে বা পরে আর পাওয়া যায় না। তিনি তাঁর লিপিসমূহে মানুষের শান্তি ও কল্যাণের উপর যুদ্ধ কী ধরনের প্রভাব ফেলে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কলিঙ্গ যুদ্ধই তাঁকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে, মানব সংঘ, কল্যাণ ও শান্তির ক্ষেত্রে যুদ্ধ কতটা ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি যুক্তি দিয়ে প্রমানও করার প্রয়াস পেয়েছেন যে, ধর্মীয়, নৈতিক ও রাজনীতি এর কোনো প্রেক্ষিতেই যুদ্ধ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সমাজ এবং ব্যক্তি স্তরে যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব প্রত্যক্ষ করে অশোক বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে যুদ্ধের পথ পরিহার করে শান্তি ও সামাজিক সৌহার্দ্য গড়ে তোলার দায়িত্ব কাঁধে নিতে পারলে মানুষের কল্যাণ সাধন সম্ভব। তিনি তাঁর রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় নীতির নতুন ধারণার ব্যাখ্যা দেন ধম্ম -এর উপর ভিত্তি করে, যা ছিল সম্পূর্ণই ধর্ম ও নৈতিকতা সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব চিন্তা। তিনি তাঁর এ ধারণা প্রস্তরখন্ডে এবং স্তম্ভের গায়ে উৎকীর্ণ করে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং সাধারণের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বর্ণনা দেন, কী করে কলিঙ্গ যুদ্ধ তাঁর চিন্তাধারায় পরিবর্তন এনেছিল এবং শান্তির জগৎ ও সামাজিক সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিল। কলিঙ্গ যুদ্ধ তাঁর মনোজগতে যে পরিবর্তন এনেছিল, তেরোতম প্রস্তরলিপিতে তার বর্ণনা নিম্নরূপ:

‘‘যখন তিনি (অশোক) ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র, রাজা পিয়দসি আট বছর অতিবাহিত করলেন, তখন কলিঙ্গ জয় হল। এতে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার  লোক গৃহহীন হয়, এক লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং তারও কয়েক গুণ বেশী মানুষ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর যখন কলিঙ্গ তাঁর রাজ্যভুক্ত হয়, তখন ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র ঐকান্তিকতার সঙ্গে ‘ধম্ম’ পালন করেন, তাঁর একমাত্র কাম্য হয়, ধম্ম প্রচার। কলিঙ্গ জয়ের পরে ঈশ্বরের প্রিয়জন অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকেন। কারণ, যখন একটি স্বাধীন দেশ বিজিত হয় তখন হত্যা, মৃত্যু এবং নির্বাসিত মানুষগুলি ঈশ্বরের প্রিয়পাত্রের মনকে ভারাক্রান্ত করে। আরো অনুশোচনা হয় যখন সেখানে বসবাসকারী  ব্রাহ্মণ, শ্রমন, অন্ধ যে কোনো বর্ণের লোক অথবা যারা তাদের উপরস্থদের প্রতি অনুগত, বাবা মায়ের প্রতি অনুগত, শিক্ষকের প্রতি অনুগত ও ভালো ব্যবহার করে, এবং বন্ধু, সহকারি, আত্মীয়, দাস ও ভৃত্যদের প্রতি সহনুভূতিশীল প্রত্যেকেই তাদের প্রিয়জনের প্রতি হিংস্রতা, হত্যা এবং বিচ্ছিন্নতায় কষ্ট পায়। এমনকি যে ভাগ্যবানেরা যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং যাদের ভালোবাসা কমে নি (যুদ্ধের নির্দয় প্রভাবেও) তারাও তাদের বন্ধু, সহকারি, সহকর্মী এবং আত্মীয়দের দুর্ভাগ্য দেখে কষ্ট পায়। সকল মানুষের এ ধরণের কষ্ট পাওয়ার বিষয়টি ঈশ্বরের প্রিয়পাত্রের মনের উপর ভারী বোঝা হয়ে জেঁকে বসে। ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র বিশ্বাস করেন যে, যারা ভুুল কাজ করে তাদের যতদূর সম্ভব ক্ষমা করে দেয়া উচিত। ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র বনবাসী অপরাপর গোত্রদের তাঁর সাম্রাজ্যে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন যে, প্রত্যেক মানবগোষ্ঠীকে নির্বিঘ্নে, স্বনিয়ন্ত্রিত হয়ে মানসিক শান্তিতে এবং ভদ্রভাবে বাস করতে দেয়া উচিত... (এশিয়া ও ইউরোপের যেসকল দেশে ‘ধম্ম’-এর প্রচারণায় তিনি বার্তাবহ পাঠিয়েছেন তাদের বর্ণনা) ধম্ম-এর এই সকল লিপি খোদাই করে রাখা হয়েছিল, যাতে কোনো পুত্র বা প্রপৌত্রদের ব্যাপারে নতুন বিজিত ভূখন্ড প্রাপ্তির বিষয়ে ভাবনার কিছু না থাকে... তারা সত্যিকার এবং স্থায়ী জয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শুধুমাত্র ধম্ম-এর মাধ্যমে জয় করার বিষয়টিই বিবেচনা করবে এবং ধম্ম-এর আনন্দই হবে তাদের পরিপূর্ণ আনন্দ। কারণ এ আনন্দই পার্থিব জগৎ এবং পর জগতের জন্য মূল্যবান।’’ [Ashoka and the Decline of the Mauryas, Oxford University Press 1997, paperback, pp 255-57,  থেকে রমিলা থাপার কর্তৃক অনুদিত]।

অশোকের রাজত্বকাল বেশ কয়েকটি বৌদ্ধসংঘ পুনর্গঠনের কারণে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ অব্দে সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং সহায়তায় পাটলীপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বৌদ্ধধর্মের থেরাবাদী সম্প্রদায়কে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন এবং সংঘকে ভিন্নমতাবলম্বীদের সেখান থেকে বহিষ্কার করার নির্দেশ দেন। এ সম্মেলন থেকেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, ধর্মান্তরের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মকে এশিয়ার প্রত্যেক অংশে এমনকি এশিয়ার বাইরেও কার্যকর করে তোলার। অশোক তাঁর লিপিতে ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের নামোল্লেখ করেছেন যাদের সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক এবং অন্যান্যদের সঙ্গে ধর্মপ্রচারক বিনিময় করেন। সাধারণত স্থানীয় ভাষায় অশোকের লিপি উৎকীর্ণ করা হতো। ব্রাহ্মী লিপিতে প্রাকৃত ভাষা অশোকের লিপির প্রধান মাধ্যম হলেও সব ভাষাভাষি মানুষের কাছে বৌদ্ধ ধর্মকে পরিচিত করে তুলতে তাঁর লিপিতে স্থানীয় মানুষের উপযোগী দক্ষিণ ভারতীয় এবং হেলেনীয় ভাষারও ব্যবহার করা হতো।

সমসাময়িক বৈদিক, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মীয় বিশ্বাসের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলির প্রতিক্রিয়া হিসেবে ধম্ম-এর ধারণার সৃষ্টি হয়। একটি নতুন ভাবাদর্শ সৃষ্টির লক্ষ্যে অশোক প্রচলিত বিশ্বাস ও চিন্তা থেকে তাঁর মূল্যবোধ গ্রহণ করেন এবং ধম্ম-এর সঙ্গে এর সংশ্লেষ ঘটান। ফলে অশোকের বিশাল সাম্রাজ্যে বহুবিধ ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক এবং সামাজিক ব্যবস্থার সংমিশ্রণ ঘটে এবং তাঁর রাজ্যে মিশ্র জনগণ প্রত্যেকেই তাদের স্ব স্ব অবস্থানে নিরাপদ ছিলেন। ধম্ম-এর মূলনীতিই এমন ছিল যে, প্রত্যেক ধর্ম, বর্ণ এবং মতাবলম্বীদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। ধম্ম-এর মূল বাণী ছিল ‘সহনশীলতা’। অশোকের মতে প্রত্যেক মানুষ এবং তাদের বিশ্বাস ও ভাবধারার মাঝে সহনশীলতার ধারণা সম্প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন। অশোকের দৃষ্টিতে সহনশীলতা হলো দাস ও ভৃত্যের প্রতি দয়া প্রদর্শন, শিক্ষকের প্রতি সম্মান দেখানো, বাবা-মায়ের প্রতি আনুগত্য, বন্ধু সহকর্মী এবং আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন, ব্রাহ্মণ এবং শ্রমণদের সম্মান করা এবং তাদের অর্থ সাহায্য দান এবং সকল প্রাণীর প্রতি সদয় থাকা। অশোক তাঁর দ্বাদশ প্রস্তরলিপিতে ঘোষণা করেছেন যে, কেবল নিজের জন্যই নয়, একজন মানুষের জীবনের প্রধান দায়িত্ব হলো সকল ধর্মের কল্যাণ ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করা।

সম্রাট অশোক তাঁর রাজত্বের ত্রয়োদশ বছরে পঞ্চম প্রস্তরলিপির মাধ্যমে ধম্ম-এর আদর্শের প্রচারণা শুরু করেন। এ লিপিতে অশোক বন্দীদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের জন্য রাজকর্মচারীদের নির্দেশ দেন। যে সকল বন্দীর সন্তান-সন্ততি আছে, যারা বৃদ্ধ, দুর্বল এবং অসুস্থ তাদের তিনি মুক্ত করে দেন। তিনি তাঁর একাধিক লিপিতে মানবজাতির কল্যাণের ও সুখ শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন এবং সে লক্ষ্যে পৌঁছাবার উপায় তিনি তাঁর ষষ্ঠ প্রস্তর লিপিতে বর্ণনা করেন। তাঁর ধম্ম-এর চিন্তার মূলে ছিল প্রত্যেক ধর্ম এবং ধর্মাচরণের প্রতি সহনশীলতা ও ভালোবাসা। তিনি তাঁর দ্বিতীয় লিপির মাধ্যমে শুধু মানুষ, পশু এবং পাখির প্রতি দয়া প্রদর্শন নয়, বরং উদ্ভিদ জগতের প্রতিও সহনশীল হওয়ার নির্দেশনা দেন। তিনি ফলদায়ক বৃক্ষ, ঔষধি লতাগুল্ম, এবং জ্বালানির জন্য বৃক্ষ রোপনের এবং উদ্ভিদকূলের স্বাভাবিক বর্ধণ ব্যাহত না করার নির্দেশ দেন।

রাজুক বা সাম্রাজ্যের আঞ্চলিক কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত সংঘ ছিল ধম্ম-এর প্রচারণার আরেকটি সাংগঠনিক উপায়। রাজুক ঢাক পিটিয়ে জনগণের মধ্যে সমন জারি করত এবং ঘোষণা করত যে, ‘বাবা-মাকে এবং শিক্ষককে অবশ্যই মান্য করতে হবে, জীবিত সকল প্রাণীর প্রতি সদয় হতে হবে, এবং সবসময় সত্যি কথা বলতে হবে।’ [Minor Rock Inscriptions, tr. R. Thapar, Ashoka and the Decline of the Maurya, p. 259].

রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে অশোকের দর্শন কয়েক শতকব্যাপী যৌক্তিক অনুসন্ধান ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা করে। প্রাথমিক পর্যায়ের আর্যদের যাযাবর  গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে মৌর্যদের অধীনে স্থায়ী ও নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে উত্তরণ মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে। জৈন ও বৌদ্ধ চিন্তাধারা ব্রাহ্মণ সংস্কৃতির বিসর্জনমূলক ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের ঐতিহ্য থেকে মৌর্যযুগের গভীর ও বিমূর্ত চিন্তাধারা রূপায়নে গভীর  প্রভাব ফেলেছিল। এটি নিঃসন্দেহে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, ধর্মীয় বিসর্জন থেকে সম্প্রীতি ও  এবং সহনশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক অসাধারণ মহতী উত্তরণ।

এটা সর্বজনবিদিত যে, পিতা বিন্দুসারের মৃত্যুর পর অশোক যখন উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তখন তিনি স্পষ্টত বৌদ্ধ ছিলেন না। মৌর্য সিংহাসনে আরোহনের পরই বৌদ্ধধর্মের প্রতি তাঁর আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ইতিহাসকারদের অধিকাংশই একমত যে, উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্বে অশোক রাজসভার ব্রাহ্মণ সভাসদগণের তেমন সমর্থন পাননি এবং এ বিষয়টিই সম্ভবত তাঁকে বিকল্প হিসেবে বৌদ্ধ দর্শনের দিকে ঠেলে দেয়। তাছাড়া বণিকশ্রেণীর উত্থান এবং হেলেনীয় বিশ্বের সঙ্গে তাদের ক্রমবর্ধমান যোগাসূত্রের ফলে যে সামাজিক পরিবর্তন এসেছিল, তাও সম্ভবত সম্রাট অশোককে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণে প্রভাবিত করেছিল।

এভাবেই অশোক ধম্ম-এর ধারণা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য নতুন অর্থনৈতিক পরিবেশকে এক ধরণের সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করেন। সম্ভবত বৃহত্তর রাজ্যসীমায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজনৈতিক ইউনিটসমূহকে সমন্বিত করাই ছিল অশোকের ধম্ম-এর নতুন রাষ্ট্রনীতি। কলিঙ্গ যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি না করে মৌর্য স্বার্বভৌমত্বের মধ্যে বিপুল সংখ্যক স্বার্বভৌম রাষ্ট্রের একত্রিকরণেই হয়তো তাঁর স্বপ্ন আবর্তিত হয়েছে। শার্লামেন এবং কনস্টান্টাইন কর্তৃক খ্রিস্টধর্মের নামে ইউরোপের রাজনৈতিক একত্রীকরণের স্বপ্নের সঙ্গে তাঁর স্বপ্নের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ইতিপূর্বে ব্রাহ্মণ কর্তৃক যেসকল বৌদ্ধ স্বীকৃতি লাভ করেন নি, তারাই এখন ধম্ম-এর নামে একটি শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক অবস্থান লাভ করেন।

সম্রাট অশোকের বিশ্বরাষ্ট্রের ধারণা বিশ্লেষণে পন্ডিতগণ সমসাময়িক বৌদ্ধধর্মীয় চক্রবর্তিন  বা বিশ্বজনিন সম্রাটের ধারণার উপর গুরুত্ব দেন। সম্রাট হবেন পাপমুক্ত এবং করুণার প্রতীক। সমসাময়িক জৈন ধর্মীয় দিগ্বিজয়ী ধারণার সঙ্গে এ বিশ্বজনীন রাজার ধারণার মিল রয়েছে। কিন্তু অশোক তাঁর প্রস্তরলিপিতে কখনোই নিজেকে চক্রবর্তী বা দিগ্বিজয়ী হিসেবে দাবি করেন নি।  [সিরাজুল ইসলাম]