বেতার নাটক

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৪:৩২, ৫ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

বেতার নাটক  বেতারে প্রচারিত বা প্রচারোপযোগী নাটক। টেলিভিশনে নাটক প্রচারিত হওয়ার পূর্বে বেতার নাটক ছিল বেতারের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানমালার অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় একটি শাখা। মঞ্চনাটকে অভিনেতা- অভিনেত্রীদের সরাসরি উপস্থিতি এবং টেলিভিশন নাটকে তাদের প্রতিবিম্বের প্রতিফলন দর্শকরা উপভোগ করে। কিন্তু বেতার নাটকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কোনরূপ শারীরিক উপস্থিতি প্রত্যক্ষ নয়, শুধুমাত্র তাদের কণ্ঠনিঃসৃত সংলাপ শুনেই তাদের বয়স, পারিবারিক সামাজিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, নাটকীয় দ্বন্দ্ব সংঘাত, ইত্যাদি অবগত হওয়া যায়। বেতার নাটকে কায়িক অভিনয়ের কোনো সুযোগ নেই; শিল্পীরা শুধুমাত্র বাচিক অভিনয়ের মাধ্যমেই স্বস্ব চরিত্র রূপায়িত করে। বেতার নাটকের বিস্তৃতি অনেক, কারণ তা একই সময়ে শহর বন্দর গ্রাম সর্বত্র অগণিত শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়।

পূর্বে বেতার নাটক সরাসরি সম্প্রচারিত হতো, কারণ তখন ধারণ করার কোনো প্রযুক্তি ছিল না। ফলে শিল্পীদের বিশেষ সর্তকতার সঙ্গে অভিনয় করতে হতো। কোনোরূপ ভুল হলে তা সংশোধনের কোনো উপায় ছিল না। রেকর্ডিং প্রথা চালু হওয়ার পর সে অসুবিধা দূর হয় এবং ফলে বেতার নাটকের মান অনেক বৃদ্ধি পায়; অভিনয়ে ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা কমে এবং শব্দ, সুর ও সঙ্গীত সংযোজনের সুযোগ ঘটে। এর পাশাপাশি রেকর্ডকৃত নাটক পুনঃপ্রচার করারও সুযোগ সৃষ্টি হয়।

১৯৬৪ সালের পূর্বে যখন এদেশে টেলিভিশন ছিল না এবং গ্রামে গঞ্জে বিদ্যুৎ যায়নি, তখন দেশের অসংখ্য মানুষের চিত্তবিনোদনের মাধ্যম হিসেবে বেতার নাটক খুবই জনপ্রিয় ছিল। সাধারণ মানুষকে নাট্যশিল্প সম্পর্কে উৎসাহিত করা এবং নাট্যাভিনয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে তৎকালের বেতার নাটক।

১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এর উদ্বোধনী দিনেই প্রচারিত হয় প্রথম নাটক কাঠঠোকরা।  বুদ্ধদেব বসু রচিত ও সুদেব বোস প্রযোজিত এ নাটকে অভিনয় করেন রমাকৃষ্ণ রায়, খগেশ চক্রবর্তী, সুধীর সরকার, মায়া বোস, বিপুল দত্তগুপ্ত, আমোদ দাশগুপ্ত, সাবিত্রী ঘোষ, সুনীল চট্টোপাধ্যায়, বীরেশ্বর বোস এবং পারুল দেবী। নাটকটির প্রচার সময় ছিল ৪৫ মিনিট।

১৯৪০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা কেন্দ্রের প্রথম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন উপলক্ষে প্রচারিত হয় শরৎচন্দ্রের দেবদাস। এতে প্রখ্যাত অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়া অভিনয় করেন। তৎকালে প্রমথেশ বড়ুয়ার অত্যন্ত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র দেবদাস-এর পান্ডুলিপিটি হুবহু ব্যবহার করা হয়েছিল। সে সময় ভারতের স্বাধীনতাকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বেতারে প্রচারিত হয়েছিল টিপু সুলতান, সিরাজউদ্দৌলা,  মীর কাসিম, তিতুমীর ও মজনু শাহ-র মতো বীরযোদ্ধাদের কাহিনী এবং সূর্যসেনের ফাঁসিতে আত্মহত্যার ইতিহাস সম্বলিত নাটক। বেতারে প্রচারিত শরৎচন্দ্রের পথের দাবী, নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা, তারাশঙ্করের পথের ডাক, নাজির আহমেদের চেঙ্গিস খান প্রভৃতি নাটক মানুষের জীবন সংগ্রামের উৎস সন্ধানে এবং মানব কল্যাণমুখী রাজনৈতিক চেতনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৪৪ সালের শেষ দিকে ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলা নাটকের পাশাপাশি উর্দু নাটকের প্রচার শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক  আন্দালীব সাদানী রচিত ও প্রযোজিত প্রথম উর্দু নাটক ছিল চাঁদিকে টুকরো। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৭-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রচারিত পূর্ণাঙ্গ বেতার নাটকের সংখ্যা ১৫২টি। এর মধ্যে মৌলিক নাটক ১০০টি এবং রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ও নজরুলের উপন্যাস ও গল্পের বেতার নাট্যরূপ ৫২টি।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ঢাকা কেন্দ্রের নাম হয় পাকিস্তান ব্রডকাস্টিং সার্ভিস এবং ১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে এটি ‘রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা’ নামে প্রচার শুরু করে। এ সময়ে প্রচারিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলির মধ্যে রয়েছে বন্দে আলী মিয়ার কুমারের গল্প, জসীমউদ্দীনের সোজন বাদিয়ার ঘাট, বেদের মেয়ে, হাবিবুর রহমানের এই মোহনায়, মোহাম্মদ কাশেমের যারা কাঁদে, কাজী মকবুল হোসেনের সরাইখানা, নাজমুল আলমের সারেং, কবীর আনোয়ারের মেক আপ, আশকার ইবনে শাইখের বিদ্রোহী পদ্মা, নূরুল মোমেনের নেমেসিস, সায়ীদ সিদ্দিকীর নির্জন ইত্যাদি। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রচারিত পূর্ণাঙ্গ বেতার নাটকের সংখ্যা ১১৫২টি। এর মধ্যে মৌলিক নাটকের সংখ্যা ১০০০টি  এবং রূপান্তর ও গল্পের নাট্যরূপ ১৫২টি।

১৯৭১ সালের ২৫ মে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কেন্দ্রের পাশাপাশি মুজিবনগরে চালু হয়  স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে দেশের জনগণ এবং রণাঙ্গণে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রচারিত হয়  কল্যাণ মিত্র রচিত রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক ধারাবাহিক নাটক জল্লাদের দরবার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই নাটকটির কাহিনী, সংলাপ, চরিত্রচিত্রণ ইত্যাদি যুদ্ধচলাকালীন সময়ের দাবিকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কণ্ঠ দিয়ে শত্রুবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেছিলেন অসংখ্য নাট্যশিল্পী। জল্লাদের দরবার নাটকে যাঁরা অভিনয় করেছেন তাঁরা হলেন রাজু আহমেদ, নারায়ণ ঘোষ, আজমল হুদা মিঠু, প্রসেনজিৎ বোস, জহুরুল হক, অমিতা বোস, ইফতেখারুল আলম, বুলবুল মহলানবীশ ও করুণা রায়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম বেতার নাটক প্রথম পদক্ষেপ প্রচারিত হয় ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি। আশীষ কুমার লোহ রচিত ও কাজী রফিক প্রযোজিত এ নাটকের শিল্পীরা ছিলেন  সুভাষ দত্ত, নারায়ণ ঘোষ, মালা চৌধুরী, খসরু নোমান, এস.এম মহসীন, দিলীপ বিশ্বাস, কালিপদ দাস, সৈয়দ হাফিজুর রহমান, মোঃ নজরুল ইসলাম, নীমা, উর্মি ও ইউসুফ ইমাম।

সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির কারণে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত প্রচারিত প্রায় প্রতিটি বেতার নাটকেই অত্যধিক আবেগধর্মিতা স্থান পায়। বিষয়বস্ত্ততে যুদ্ধজয়, হত্যা, লুণ্ঠন, পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক নারী ধর্ষণ, গোলাগুলির শব্দ ব্যবহারের প্রাচুর্য ইত্যাদির আধিক্য দেখা যায়। কিন্তু ১৯৭৩ সালের পর থেকে বেতার নাটকের ধারা পাল্টাতে শুরু করে। নাটকের বিভিন্ন দিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নতুন চিন্তা-চেতনার প্রয়োগ বেতার নাটককে সমৃদ্ধতর পর্যায়ে উন্নীত করে। একুশের ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ গড়ার অঙ্গীকার, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার চিত্র ইত্যাদি প্রতিফলিত হতে থাকে বিভিন্ন বেতার নাটকে। এসব পটভূমিতে রচিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলি হলো মমতাজউদদীন আহমদের কি চাহ শঙ্খচিল, আলাউদ্দিন আল আজাদের নিঃশব্দ যাত্রা, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর নাম না জানা ভোর, নীলিমা ইব্রাহিমের যে অরণ্যে আলো নেই, কাজী জাকির হাসানের কি পেলাম, সেলিম আল দীনের রক্তের আঙ্গুরলতা, আব্দুল্লাহ আল মামুনের ডিসেম্বর নামে মাস, জিয়া হায়দারের সাদা গোলাপে আগুন, সৈয়দ শামসুল হকের নূরুলদীনের সারা জীবন, কালীপদ দাসের জয়বাংলা, আ.ন.ম বজলুর রশীদের রক্ত কমল, জালালুদ্দীন রুমীর সংগ্রামী বাংলা, শহীদুল হক খানের রক্ত শপথ, হাবিব আহসানের এক বিকেলের দুঃখ, আবিদ আজাদের মানুষ ও কৃষ্ণচূড়ার গল্প ইত্যাদি। এসব নাটক সময়ের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।

প্রকৃতি অনুযায়ী বেতার নাটকগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় মৌলিক, রূপান্তরিত ও নাট্যরূপায়িত। এ যাবৎ বেতারে প্রচারিত নাটকের সংখ্যা চার সহস্রাধিক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় নাটকের সংখ্যা ছয় শতাধিক। ঢাকা কেন্দ্রসহ দেশের অন্যান্য ৬টি আঞ্চলিক কেন্দ্রে তিন হাজারের বেশি নাট্যশিল্পী বেতার নাটকের সঙ্গে জড়িত।  [জিল্লুর রহমান জন]