বিজয় গুপ্ত

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১২:০২, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

বিজয় গুপ্ত (১৫ শতক)  মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। পদ্মাপুরাণ নামক মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করে তিনি মঙ্গলকাব্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। তাঁর কাব্যের ভণিতা থেকে কাব্য রচনার কাল পাওয়া যায় ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দ। এ থেকে অনুমান করা হয় যে, বিজয় গুপ্ত পনেরো শতকের মধ্যভাগে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বরিশালের ঘাঘর ও ঘণ্টেশ্বরী নদীর মধ্যবর্তী ফুল্লশ্রী গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সনাতন এবং মাতার নাম রুক্মিণী।

মনসামঙ্গলের শতাধিক কবির মধ্যে কানা হরিদত্ত প্রথম এবং বিজয় গুপ্ত দ্বিতীয়। হরিদত্তের কাব্য ভাবে-ভাষায় দুর্বল। তাই বিজয় গুপ্তের পদ্মাপুরাণই সমধিক পরিচিত ও সমাদৃত। বিজয় গুপ্ত মনসাদেবীর স্বপ্নাদেশ লাভ করে কাব্যরচনায় ব্রতী হন। দেবীর মাহাত্ম্য ও পূজা প্রচার এ কাব্যের প্রধান উপজীব্য। কবির ভাষায় এ কাব্য পাঠ করলে দরিদ্রের ধনলাভ ও সন্তানহীনের সন্তানলাভ হয় এবং রোগীর রোগমুক্তি ও বন্দির বন্ধনমুক্তি ঘটে।

মনসা ও চাঁদ সদাগর কাব্যের দুই প্রধান চরিত্র। মনসা অত্যাচারী সামন্তদের প্রতিনিধি, আর চাঁদ সওদাগর প্রতিবাদী বিদ্রোহী চরিত্র। মনসা নানা কৌশল অবলম্বন ও ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে শিবভক্ত চাঁদ সওদাগরের পূজা আদায় করেন। ‘কাজির সহিত যুদ্ধ’ পালায় কাজির দুই পুত্র হাসান ও হোসেন রাখাল বালকদের পূজার মনসাঘট ও বেদী ধ্বংস করলে দেবী ক্ষুব্ধ হয়ে কাজির নগর আক্রমণ ও নগরবাসীকে পর্যুদস্ত করেন। কাজি মনসাকে পূজা দিয়ে কুলে-ধনে-জনে রক্ষা পান। এ কাহিনীর দ্বারা কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তখন মুসলিম সমাজেও মনসাদেবীর প্রভাব ছিল।

সর্পদেবী মনসার মাহাত্ম্য ও পূজা প্রচারের মাধ্যমে বিজয় গুপ্ত হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর ইসলাম ধর্মের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ত্রিশটি পালায় বিভক্ত করে ত্রিশদিন ধরে পূজামন্ডপে মনসা-চাঁদ-বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের কাহিনী গীত ও পঠিত হতো। সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধাভরে তা শুনত এবং ধর্মভাবে উদ্দীপিত হতো। এভাবেই বিজয় গুপ্ত এবং মঙ্গলকাব্যের অন্যান্য কবি ইসলামে ধর্মান্তরী হওয়া থেকে হিন্দুদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন।

বিজয় গুপ্ত তাঁর কাব্যে তৎকালীন বাংলার অনেক ঐতিহাসিক ও সামাজিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। কাব্যের রাজপ্রশস্তিতে তিনি সুলতান হোসেন শাহের (১৪৯৩-১৫১৯) উল্লেখ করেছেন। কবির দৃষ্টিতে হোসেন শাহ ছিলেন ‘সমরে দুর্জয়’ এবং ‘দানে কল্পতরু’। তাঁর সুশাসনে প্রজারা সুখে জীবনযাপন করত। এসব ঐতিহাসিক ও সামাজিক তথ্য থাকার কারণে পদ্মাপুরাণ একখানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।  [ওয়াকিল আহমদ]