মেকলে, টমাস বেবিংটন

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৪:৪৮, ৫ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

মেকলে, টমাস বেবিংটন (১৮০০-১৮৫৯)  রথলি-র প্রথম ব্যারন, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য, ট্রিনিটি কলেজ (কেমব্রিজ)-এর ফেলো, এডিনবার্গ রিভিউ পত্রিকা নিয়মিত লেখক, ব্যবহারশাস্ত্র বিশারদ, কমিশনার ও বোর্ড অব কন্ট্রোলের সচিব (১৮৩২) এবং ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার সদস্য (১৮৩৯-৪১)। ১৮৫৪ সালে মেকলেকে রথলি-র ব্যারন করা হয়। ব্রিটিশ রাজনীতি ও সাহিত্যে তাঁর অসাধারণ অবদানের সম্মানে তাঁকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়েছে। সমসাময়িক ইউরোপে লর্ড মেকলে উদারনৈতিক চিন্তাধারার একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর ইতিহাস বিষয়ক রচনাবলির মধ্যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য রচনা হলো History of England (১৮৩৯), Laws of Ancient Rome (১৮৪২), এবং History, (চার খন্ড, ১৮৫৫)। তাঁর রচনাসমগ্র বহু খন্ডে প্রকাশিত হয়।

মেকলে ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের আইন সংক্রান্ত সদস্য ছিলেন। এদেশে কোম্পানি সরকারের শিক্ষানীতি প্রণয়নে অসাধারণ অবদান রাখেন তিনি। ভারতীয় দন্ডবিধি প্রণয়নের রূপকার তিনি। ১৮২০-এর দশক ও তার পরে কোম্পানি সরকারের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে শিক্ষানীতি নিয়ে বিতর্ক চলে।

সরকার সনাতন ধারার ভারতীয় শিক্ষা পদ্ধতিকে গ্রহণ ও সমর্থন করবেন নাকি ব্রিটিশ ভারতে পাশ্চাত্য ধারার বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করা হবে- এ নিয়ে যে দীর্ঘ বিতর্ক চলে তাতে নীতি নির্ধারকরা ইংরেজি ও পাশ্চাত্য পদ্ধতির শিক্ষাপন্থী এবং প্রাচ্যদেশীয় শিক্ষাপন্থী- এ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েন। ইংরেজিভিত্তিক ব্রিটিশ শিক্ষা পদ্ধতির সমর্থকগণ ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষাদানের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, প্রাচ্যদেশীয় শিক্ষার সমর্থকগণ দেশীয় ভাষায় প্রাচ্যদেশীয় পদ্ধতির শিক্ষাদানের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। মেকলে ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষাপদ্ধতির অনুসারী গ্রুপের নেতৃত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে যে সব যুক্তিতর্ক উত্থাপন করেন তা এতই জ্ঞানগর্ব ছিল যে, এখনো শিক্ষা বিষয়ে গবেষণায় তা স্বাভাবিকভাবে চলে আসে।ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে প্রবর্তনে এবং ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রদানের পক্ষে তিনি গভর্নরের কাউন্সিলকে প্রভাবিত করেন। এ বিষয়ে প্রাচ্যবাদী শিক্ষা পদ্ধতির প্রবক্তা প্রিন্সেপ এর সঙ্গে তাঁর সুদীর্ঘ ও সিদ্ধান্তমূলক যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়, তা কেবল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলই নয়, সেটির একটি বিরাট সাহিত্যমূল্যও রয়েছে।

টমাস বেবিংটন মেকলে

বাকচাতুর্য ও নাটকীয়তায় এ দলিল ব্রিটিশ হাউজ অব কমন্সে ভারতীয় বিষয়াবলির ওপর এডমন্ড বার্ক প্রদত্ত ভাষণগুলির সঙ্গে তুলনীয়। তবে পার্থক্য এই যে, বার্ক-এর বাগ্মিতার লক্ষ্য ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার কর্মচারীরা। আর মেকলের বক্তব্য ছিল ভারতের ইতিহাস ঐতিহ্য ও প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে।

আইন কমিশনের সভাপতি হিসেবে মেকলে ভারতের ফৌজদারি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদান রাখেন। দন্ডবিধির ওপর তাঁর রচিত প্রতিবেদন এক বিরাট কীর্তি। এই রচনায় তিনি তাঁর উদারনৈতিক চিন্তাধারা ও মহান বিচার শাস্ত্রীয় অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই আইন প্রণয়ন ও ফৌজদারি আইনের পাশ্চাত্যকরণ সম্পর্কিত সভার কার্যবিবরণীতে তিনি বাঙালি ও অন্যান্য ভারতীয়দের জাতীয় চরিত্র সম্পর্কে বহু অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, যদিও তাঁর আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সেসব আদৌ সম্পর্কিত ছিল না। তিনি বলেন যে, বাঙালিরা দৈহিক দিক থেকে ভঙ্গুর ও দুর্বল, নৈতিক দিক থেকে কাপুরুষ। তাঁর মতে, বাঙালিরা অভ্যাসগতভাবে মিথ্যাবাদী, প্রতারক, যোগসাজশকারী ও জালিয়াত। তিনি বাঙালির এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, শতকের পর শতক সামন্তবাদী স্বৈরতন্ত্রের কবলে থাকার ফলে বাঙালির এ ধরনের চারিত্রিক অবক্ষয় ঘটেছে। ঐ সময়ে ইউরোপীয় মুক্তবণিক ও উদারনৈতিক চিন্তাবিদ মহলে ভারতের কোম্পানি শাসনকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা এক চলতি ফ্যাশন হয়ে উঠেছিল। তবু তিনি অন্যদের তুলনায় ব্যতিক্রমধর্মীভাবে কোম্পানি প্রশাসনের মাঝেও অনেক ভাল বিষয় লক্ষ্য করেছেন। ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংস এর ওপর তাঁর রচনায় মেকলে তাঁদের বহু কাজের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁদেরকেই স্বীকৃতি দিয়েছেন ভারতে ইউরোপীয় সভ্যতার প্রদীপধারী হিসেবে। ভারতে কোম্পানি শাসনের ফলে সেখানে সভ্য-সুশীল সমাজের প্রভাব পড়েছে বলে যারা মনে করেন, তিনি তাঁদের সঙ্গে একমত।

একজন উদারনৈতিক চিন্তাবিদ ও অত্যন্ত উঁচুস্তরের বুদ্ধিজীবী হওয়া সত্ত্বেও মেকলে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতীয়দের সমস্যাগুলি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভারতীয় ভাষা তিনি জানতেন না, ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশের সাধারণ মানুষের সমস্যাবলির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল না। আর এই পটভূমিকায় ভারতীয়দের চরিত্র সম্পর্কে তিনি যে তীব্র-তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছেন, তাতে সস্তা ও অতিঅহং-এর প্রবণতাই প্রতিফলিত হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষেত্রে তাঁর অর্জন অসাধারণ। কিন্তু তবু অ-ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রতি তৎকালে যে মনোভাব প্রচলিত ছিল, জাতিগোষ্ঠীগতভাবে তিনি তার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। বস্ত্তত, এ এক পরিহাস যে, আজকের দক্ষিণ এশীয় পন্ডিত ব্যক্তিগণ যত না ভারতীয় দন্ডবিধির উন্নয়নে তাঁর বিরাট অবদানের কথা স্মরণ করেন, তার চেয়েও অনেক বেশি উল্লেখ করেন প্রাচ্যদেশীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর নেতিবাচক মনোভাবের। সে মনোভাবে ছিল না কোন সমস্যার গভীরতর উপলব্ধি, ছিল না কোন প্রজ্ঞাসুলভ পরিমিতিবোধ।  [সিরাজুল ইসলাম]