বাজেট

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১২:৪৮, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

বাজেট (সরকারি) একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য সরকারের ব্যয় ও রাজস্বসমূহের একটি পূর্বাভাষ। বাংলাদেশ সরকারের একটি বাজেটের সময়কাল হচ্ছে একটি অর্থবৎসর, যা একটি বৎসরের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বৎসরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিস্তৃত। সরকারি বাজেটে কর ও মুদ্রাসংক্রান্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারি অর্থের আহরণ, আবণ্টন ও বিতরণ করা হয়। তবে এক্ষেত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াকে যথাযথ বিবেচনায় নেওয়া হয়। বাংলাদেশে যেসব বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে বাজেটের উদ্ভব হয়েছে, সেগুলির মধ্যে রয়েছে আইনগত অপরিহার্যতা, অর্থনীতির ব্যবস্থাপনাগত প্রয়োজনীয়তা, রীতি, কার্যপরিচালনার সুবিধা এবং স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতাসহ হিসাব ও নিরীক্ষার আবশ্যকতা।

বাংলাদেশের সংবিধানে অবশ্য বাজেট শব্দটি ব্যবহার করা হয় নি। এর পরিবর্তে সমরূপ শব্দ ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট অর্থবৎসরের জন্য প্রাক্কলিত সরকারের প্রাপ্তি ও ব্যয়সমূহ দেখানো হয়। আমাদের দেশের সরকারি বাজেটের দুটি অংশ: রাজস্ব ও উন্নয়ন। প্রথমটি চলতি রাজস্ব ও ব্যয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট, অর্থাৎ স্বাভাবিক অগ্রাধিকার সংরক্ষণ ও আবশ্যকীয় সেবা প্রদান। আর পরবর্তীটি করা হয় উন্নয়নমূলক কাজের জন্য। দুটি বাজেট প্রণয়নে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তাদের অর্থায়ন এবং বিভিন্ন স্তরে ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্পিত কর্তৃত্বও ভিন্ন ধরনের। রাজস্ব বাজেটের প্রাপ্তিসমূহ হলো: দেশজ প্রাপ্তিসমূহ (কর ও কর-বহির্ভূত); বৈদেশিক অনুদান; মূলধনজাতীয় প্রাপ্তিসমূহ (বৈদেশিক ঋণ); দেশজ মূলধন (সরকারি হিসাবসমূহের নীট চলতি প্রাপ্তি ও ব্যয়সমূহ); বাজেট-বহির্ভূত সম্পদসমূহ (স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসমূহের ঋণপত্র, তাদের স্ব-অর্থায়ন ও পুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত, এবং মজুত পণ্যসমূহ); এবং দেশজ ঋণ ও অগ্রিমসমূহ (নীট)। উন্নয়ন বাজেটের প্রাপ্তিসমূহকে সরকারি ও বেসরকারি প্রাপ্তিসমূহে ভাগ করা হয়। সরকারি প্রাপ্তিসমূহের মধ্যে রয়েছে রাজস্ব উদ্বৃত্ত (রাজস্ব ব্যয়ের অতিরিক্ত রাজস্ব আয়), নতুন কোন উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে আয় (যেমন নতুন করারোপের মাধ্যমে), নীট দেশজ মূলধন এবং বাজেট বহির্ভূত সম্পদসমূহ। সরকারি প্রাপ্তিসমূহের একটি বিশেষ ধরন হলো বৈদেশিক সাহায্য (প্রকল্প সাহায্য, পণ্য সাহায্য থেকে প্রতিরূপ তহবিল এবং নীট খাদ্য সাহায্য)। উন্নয়ন বাজেটের জন্য বেসরকারি খাতের প্রাপ্তিসমূহ আসে প্রত্যক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কর্জ গ্রহণ এবং বৈদেশিক বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। রাজস্ব বাজেট প্রস্ত্তত করে অর্থ বিভাগ এবং উন্নয়ন বাজেট প্রস্ত্ততকারী সংস্থা হলো পরিকল্পনা কমিশন।

রাজস্ব বাজেট প্রণয়ন একটি সময়সূচি অনুসারে বাস্তবায়িত বহুস্তরবিশিষ্ট প্রক্রিয়া। প্রথম স্তর হলো বিভাগীয় প্রাক্কলনসমূহের মুদ্রণ, যা সংশ্লিষ্ট হিসাব কর্মকর্তাকে প্রদানের জন্য বাজেট ফরম (প্রাক্কলন কর্মকর্তার ফরম) মুদ্রণ ও বিতরণের পরে করা হয়। সংশ্লিষ্ট হিসাব কর্মকর্তা তার নিয়ন্ত্রণাধীন সকল অফিসমূহের প্রাক্কলন দিয়ে বাজেট ফরম পূরণ করে এবং এরপর একীকৃত প্রাক্কলন অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। অর্থ মন্ত্রণালয় উক্ত প্রাক্কলনসমূহ পরীক্ষা করে, নতুন ব্যয়ের তফশিলসমূহ এবং সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানসমুহ বিগত ছয় মাসের প্রকৃত ব্যয়ের তথ্য গ্রহণ করে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে নতুন প্রাক্কলনসমূহের সমীক্ষা করে এবং বাজেট ও নতুন ব্যয়ের তফশিলের একটি খসড়া সংস্করণ প্রস্ত্তত করে। অর্থ মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশন থেকে বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা ও উন্নয়ন কর্মসূচির পূর্বাভাষও সংগ্রহ করে এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধনের পর আলোচনা ও অনুমোদন লাভের জন্য  জাতীয় সংসদে উত্থাপন করার জন্য বাজেট-সংক্রান্ত দলিলপত্র তৈরি করে।

বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন বাজেট একটি চলমান প্রক্রিয়ার ফল, যার মধ্যে রয়েছে নতুন প্রকল্প চিহ্নিতকরণ, প্রকল্প ধারণাপত্র (PCP)-এর সমীক্ষা এবং মন্ত্রণালয়ে ও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (ECNEC) প্রকল্পসমূহের অনুমোদন। সাধারণত ডিসেম্বরের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) ‘সাহায্য স্মারক’ প্রস্ত্তত করে তা মন্ত্রণালয়গুলিতে মন্তব্য প্রদানের জন্য বিলি করে। উক্ত মন্তব্য এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের দেশজ সম্পদ আহরণের পূর্বাভাষের ভিত্তিতে ERD ‘সাহায্য স্মারক’ সংশোধন করে। উক্ত দলিল তখন অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। এরপরই রাজস্ব ব্যয়ের জন্য সম্পদের অবস্থা ও বাজেট প্রাক্কলন করা হয় এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (ADP)-তে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কার্যক্রম প্রণয়ন কমিটি উপযুক্ত প্রকল্পসমূহ চূড়ান্ত করে। প্রকৃতপক্ষে ADP হচ্ছে উন্নয়ন বাজেট, যার জন্য রাজস্ব বাজেটের মতো সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন।

সরকারি বাজেটের দুটি অঙ্গাঙ্গি উপাদান হলো একীকৃত তহবিল (ফান্ড) এবং সরকারি হিসাবসমূহ (একাউন্ট)। এগুলির পৃথক সত্তা নেই, তবে প্রাপ্তি-বিতরণে পার্থক্য থাকার জন্য তাদেরকে আলাদা করা হয়। উভয় খাতের লেনদেনের মাধ্যমে ‘সরকারি অর্থভান্ডার’ হিসেবে পরিচিত একটি উৎস থেকে তহবিলের আগমন ও নির্গমন হয়ে থাকে। ফান্ড ও একাউন্টের যৌথ মোট প্রাপ্তি ও ব্যয়ের পার্থক্য দ্বারা বাজেটের সর্বশেষ জের ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত হিসাব দেখানো হয়।

একীকৃত তহবিলের মধ্যে রয়েছে সরকারের সকল প্রাপ্তিসমূহ, দেশি-বিদেশি উৎস থেকে প্রাপ্ত সকল ঋণ ও অনুদান, এবং প্রদত্ত ঋণ ও তার ওপর ধার্যকৃত সুদের আদায়। ফান্ড থেকে রাজস্ব ও উন্নয়ন উভয় খাতের সকল অর্থ বিতরণ করা হয়। রাজস্ব ব্যয়ের একটি অংশকে বলা হয় ‘প্রভারিত ব্যয়’ (চার্জড এক্সপেনডিচার), যার সম্পর্কে সংসদে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু ভোটগ্রহণ আবশ্যক নয়। প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবসমূহের প্রাপ্তিগুলি সরকারি অর্থভান্ডারের একটি অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়, যা একীকৃত তহবিলের সঙ্গে যুক্ত হয় না। এই ব্যবস্থা মূলত সেসব লেনদেনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যেগুলির ক্ষেত্রে সরকার জিম্মাদার বা অছি ব্যাংকার হিসেবে কাজ করে। উক্ত প্রাপ্তিসমূহের মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের ভবিষ্য তহবিল, ডাকঘর সঞ্চয় আমানতসমূহ, অন্যান্য আমানত হিসাবসমূহ (স্থানীয় তহবিলসমূহ, বিচারিক আমানতসমূহ, বৈদেশিক সাহায্য আমানতসমূহ ইত্যাদি), এবং কিছু কিছু সমন্বয় খাত, যেমন সাসপেন্স হিসাব এবং প্রবাসীদের অর্থপ্রেরণ। এসব লেনদেনের কতিপয় আবার শুধুই বুক-ট্রান্সফার। ব্যয়সমূহ অর্থছাড় নিয়ে গঠিত, যেগুলিকে প্রাপ্তির বিপরীতে বাদ দেওয়া হয়। এগুলি প্রাপ্তি-ব্যয়ের পার্থক্য দ্বারা নগদ সম্পদের নীট বৃদ্ধি বা ক্ষয় নির্দেশ করে।

বিভিন্ন পরিদপ্তর, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় তাদের প্রাক্কলিত তহবিলের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সরকারের কাছে অনুদান আকারে দাবি করে। প্রতিটি সেবার জন্য দাবিসমূহকে মহা হিসাবনিয়ামক ও নিরীক্ষক (C&AG) কর্তৃক ইস্যুকৃত খাতের অধীনে দেখানো হয়। হিসাব খাত C&AG-এর অনুমোদন ব্যতিরেকে পরিবর্তন করা যায় না। কোন অনুদানের দাবিকে রাষ্ট্রপতির পূর্ব অনুমোদন ছাড়া সংসদে পেশ করা যায় না। সংবিধানের ৯২(খ) অনুচ্ছেদে অপ্রত্যাশিত ব্যয় নামে অনুদান দাবি করার একটি বিধান আছে। এটি একটি পৃথক অনুদান, যা থোক হিসাবে দেখানো হয়। অর্থ কিভাবে উত্তোলন করতে হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত নিয়মাবলি রয়েছে। এ হিসাব থেকে উত্তোলিত অর্থ সংশোধিত বাজেট/সম্পূরক বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। তহবিলের পুনঃউপযোজন কর্তৃত্ব অর্পণের আদেশ অনুসরণ করে কার্যকরী করা যাবে। উক্ত আদেশে অফিস প্রধান, পরিদপ্তর প্রধান এবং বিভাগ ও মন্ত্রণালয়সমূহ কী পরিমাণে ও কোন কোন বিষয়ে তহবিলের পুনঃউপযোজন করতে পারবে তা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা আছে।

বাংলাদেশে বাজেট প্রণালীর ধাপগুলি হলো: প্রস্ত্ততকরণ, অনুমোদন, বাস্তবায়ন ও অনুসরণ। বাজেটের পলিসি উপাদানগুলি হলো: ক. কর ব্যবস্থাসমূহ বা রাজস্ব নীতি; খ. সরকারের মৌলিক কার্যাবলির জন্য প্রস্তাবিত ব্যয়, অর্থাৎ রাজস্ব বা চলতি ব্যয়; গ. উন্নয়ন বা সরকারি বিনিয়োগ, অর্থাৎ ADP; ঘ. মুদ্রা বাজেট, যাকে সাধারণত জমা ও তারল্য কর্মসূচি বলে; এবং ঙ. এসব কর্মপন্থার বাস্তবায়নের কর্তৃত্ব প্রদান।

বর্ধনীয় বাজেট প্রণয়নের সনাতনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাজস্ব বাজেট তৈরি করা হয়। প্রাক্কলনসমূহ পূর্ববর্তী বৎসরের ব্যয় ও তাদের ঐতিহাসিক ধারার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়। উন্নয়ন বাজেট পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (FYP) কাঠামোর আওতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেগুলি প্রধানত অবকাঠামো তৈরি এবং উৎপাদন ও সেবার জন্য বাড়তি ব্যবস্থা সংক্রান্ত কর্মকান্ড নিয়ে গঠিত। উন্নয়ন বাজেটের আবণ্টনসমূহ প্রতিটি প্রকল্প দলিলে প্রদর্শিত বার্ষিক আবণ্টনসমূহ ও সম্পদের বাস্তবতার আলোকে করা হয়ে থাকে।

বাজেট দলিল চূড়ান্তকরণের সকল স্তরে অর্থাৎ সংগ্রহ, মন্ত্রণালয়ে পেশের পর পরীক্ষা ও সংসদে পাস হওয়া থেকে তার চূড়ান্ত প্রকাশ পর্যন্ত, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগ। অর্থবিভাগের বাজেট উইং ও উন্নয়ন উইং যথাক্রমে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের তদারকি করে এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ কর ব্যবস্থার প্রস্তাবসমূহ প্রস্ত্তত করে।

অর্থমন্ত্রী জুন মাসে সংসদে বাজেট পেশ করেন। বাজেটের সাথে একটি ভূমিকা বক্তব্য থাকে, যাকে বাজেট বক্তৃতা বলে। বাজেট বক্তৃতার দুটি অংশ। প্রথম অংশে থাকে দেশে বিদ্যমান সামগ্রিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা, বিগত এক বৎসরে সরকারের অর্থনৈতিক কর্ম সম্পাদনের বিবরণ, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচিসমূহ এবং বাজেটভুক্ত আবণ্টনসমূহ। দ্বিতীয় অংশে থাকে কর-সংক্রান্ত পদক্ষেপসমূহ। বাজেট আলোচনার পর অর্থ বিল, সম্পূরক বিল, এবং উপযোজন বিল সংসদে পেশ করা হয়। যদি কোন কারণে উপযোজন বিল ৩০ জুনের আগে পাস করা সম্ভব না হয়, তবে সংসদে হিসাব বিলের ওপর একটি ভোট উত্থাপন করতে হয়। সাধারণত এ বিলের মাধ্যমে দুই মাসের সমপরিমাণ অর্থের বরাদ্দ দেওয়া হয়।

অনুমোদিত বাজেটের বাস্তবায়ন সাধারণ আর্থিক বিধিমালা (GFR), ও কোষাগার বিধিমালায় (TR)-এ উল্লেখিত বিভিন্ন বিধি ও আদেশের এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগ কর্তৃক ইস্যুকৃত আর্থিক আদেশ অর্পণের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়। উপযোজন আইনে ক্ষমতাবলে বাজেটে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি হয়। আর বিভিন্ন স্তরে নির্বাহী কর্তৃপক্ষ দ্বারা ছাড়করণ এক ধরনের ভারার্পিত আর্থিক ক্ষমতার ধরন অনুসরণ করে।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের আয়-ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনয়নও জড়িত। আয়ের আদায় সংক্রান্ত ব্যবস্থাসমূহ, আয়ের পরিমাণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রসমূহ বিভিন্ন সংস্থার অর্থব্যবস্থাপনাকে এবং বিভিন্ন উপার্জনশীল ব্যক্তি ও পরিবারকে বাজেট বৎসরে বিভিন্নভাবে আক্রান্ত করে।

আর্থিক নিয়ন্ত্রণ দায়িত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। এই নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগের উদ্দেশ্য হলো: এরকম প্রতীতি সৃষ্টি করা যে, বাজেট প্রাক্কলনে বরাদ্দকৃত অর্থের চেয়ে বেশি পরিমাণ বিতরণ করা হয় নি, ব্যয় নির্ধারিত উদ্দেশ্যেই নির্বাহ করা হয়েছে, এবং এতে আর্থিক স্বত্বাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। C&AG এ বিষয়ে প্রহরীর ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রজাতন্ত্রের হিসাব সংরক্ষণের জন্য ফরম ও পদ্ধতি নির্ধারণ করেন। তিনি হিসাব সংকলন ও সময়ানুগ নিরীক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করেন, প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেন। রাষ্ট্রপতি এগুলি সংসদে উপস্থাপনের ব্যবস্থা নেন। এটি একটি বাৎসরিক কাজ এবং এর জন্য দুধরনের হিসাব সংকলন করা হয়: অর্থ হিসাবসমূহ এবং উপযোজন হিসাবসমূহ।

অর্থ হিসাবসমূহ, যাকে সরকারের বার্ষিক হিসাবও বলা হয়, সংকলন করেন মহা হিসাবনিয়ন্ত্রক (CGA)। এতে সরকারের প্রাপ্তি ও ব্যয়সমূহের ব্যাপক হিসাব থাকে। এতে সরকারি হিসাবসমূহের অনুমোদিত সকল খাতের সঙ্গে মিলিয়ে লেনদেনসমূহকে সংশ্লিষ্ট খাতে শ্রেণিবদ্ধ করা হয় এবং এটি দুটি অংশে বিন্যস্ত করা হয়। প্রথম অংশের মধ্যে থাকে মোট প্রাপ্তি ও ব্যয়ের হিসাবসমূহ, উদ্ভূত রাজস্ব উদ্বৃত্ত বা ঘাটতি, স্বল্পমেয়াদি ও স্থায়ী দেনার সাথে সম্পর্কিত লেনদেনসহ মূলধনি ব্যয়সমূহ, আমানত লেনদেনসমূহ, এবং মুদ্রা সমন্বয়সমূহ। দ্বিতীয় অংশে দেনার হিসাবসমূহ, আমানত লেনদেনসমূহ এবং মুদ্রার প্রেরণসমূহ প্রদর্শিত হয়। হিসাবসমূহ শুরু হয় C&AG-এর একটি সনদ নিয়ে, যার মাধ্যমে CGA-র প্রতিবেদন ও হিসাবসমূহ উপস্থাপন করা হয় ও সেগুলিকে প্রামাণিক করা হয়।

উপযোজন হিসাবসমূহ পৃথকভাবে প্রতিটি বাজেট অনুদানের জন্য ‘প্রভারিত ব্যয়’ ও ‘প্রভারিত ছাড়া অন্যান্য ব্যয়’ নির্দেশ করে। এটি নিয়ন্ত্রণকারী অফিসসমূহে প্রেরণ করা হয় বাজেটস্থ বিধানসমূহ ও উক্ত বিধানসমূহের ব্যয় এবং তাদের প্রভেদ (যদি থাকে), উল্লেখ করে এ সম্পর্কে মন্তব্য চাওয়া হয়। নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের মন্তব্য পাওয়ার পর, CGA হিসাবসমূহ তৈরি করে। উভয় হিসাবের ওপর নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রদানের দায়িত্ব C&AG-এর এবং এর মাধ্যমে অর্থ বিতরণকারী কর্তৃপক্ষসমূহ বিধিমালা ও সরকারি আদেশসমূহের দিকনির্দেশনা পালন করেছে কিনা তা দেখা হয়ে থাকে।

পাকিস্তানে গৃহীত ব্রিটিশ ভারতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিই বাংলাদেশে অনুসরণ করা হয়। ব্রিটিশ শাসন পর্যায়ে ১৯৩৫ সনে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন লাভের পর দুইসেট আর্থিক বিধিমালা ছিল: কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য সাধারণ আর্থিক বিধিমালা (GFR, ১৯২২) এবং বেঙ্গল আর্থিক বিধিমালা (BFR, ১৯৩৭)। ১৯৯৮ সনে GFR, ১৯২২ এবং BFR, ১৯৩৭-এর অধিক্রমণ ও দ্বিরুক্তি সমন্বয় করে নতুন BFR জারি করা হয়।

১৯৯০ সনে বাজেট প্রণয়ন ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সংস্কারের ওপর একটি কমিটি (CORBEC) গঠন করা হয় এবং এর সুপারিশের ভিত্তিতে বাজেট ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সংস্কার (RIBEC) নামে একটি কর্মসূচি সম্পাদন করা হয়। RIBEC মনে করে যে, বাজেট শ্রেণিবদ্ধকরণের সঙ্গে যুক্ত থাকে বাজেট ছকের পরিবর্তন, বাজেট চক্রের হ্রাস এবং সরকার ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার মধ্যে তহবিল প্রবাহ চিহ্নিতকরণ। উক্ত শ্রেণিবদ্ধকরণ প্রয়োজন হয় বাজেট প্রণয়ন, হিসাব সংরক্ষণ, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্লেষণের জন্য। ইতোমধ্যে কম্পিউটার-কেন্দ্রিক শ্রেণিবদ্ধকরণের বিকাশ ঘটেছে এবং ১৯৯৭-৯৮ অর্থবৎসর থেকে তার চর্চাও শুরু হয়েছে। এগুলি কোড বিভাজন ভিত্তিতে করা হয়েছে, যেমন- আইনগত কোড, কার্যভিত্তিক কোড, এবং অর্থনৈতিক কোড।

সরকারের আর্থিক বিষয়াদি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিসমূহের মাধ্যমে বাজেটের সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। এ কমিটিগুলি হলো: ক. সরকারি হিসাব সংক্রান্ত কমিটি (CPA); খ. প্রাক্কলন সংক্রান্ত কমিটি (CE); এবং গ. সরকারি সংস্থা সংক্রান্ত কমিটি (CPU)। এ-সংক্রান্ত বিচার্য বিষয়সমূহ বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে (বিধি নং ২২৩-CPA, বিধিমালা নং ২৩৫ ও ২৩৭-CE এবং বিধিমালা নং ২৩৮ ও ২৩৯-CPU)। [মোতাহার হোসেন]