সামরিক শাসন

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১৬:৪০, ১৯ মার্চ ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

সামরিক শাসন স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পূর্বে সামরিক শাসন ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে একটি অনিবার্য বাস্তবতা। স্নায়ু যুদ্ধোত্তর রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রবণতা অনেকটা কমে গেলেও, তা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় নি। এখনও আফ্রো-এশিয়ার অনেক দেশেই সামরিক শাসনের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। সামরিক বাহিনী কোনো কোনো দেশে প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। দুটো কারণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব স্নায়ুযুদ্ধকালীন অবস্থা থেকে দুর্বল হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রথমত, পৃথিবীর প্রায় প্রতি প্রান্তে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে; দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল বহুদেশের সামরিক বাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের স্বরূপ অন্বেষায় অবশ্যই আমাদের স্বাধীনতাপূর্ব যুগে ফিরে তাকাতে হবে। বাংলাদেশের সামরিক শাসন অধিকাংশ সময় পাকিস্তানি ধারায় পরিচালিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসন জারী হয় ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে। আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবিকে কেন্দ্র করে পাঞ্জাবের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে গভর্নর মিয়া মমতাজ দৌলতানা সামরিক আইন জারী করেন। রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ পরবর্তীতে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। এ কে  ফজলুল হক পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ফজলুল হক পূর্ববাংলাকে স্বাধীন করার বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিলে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা সচিব মেজর জেনারেল ইস্কান্দর মির্যাকে ১৯৫৪ সালের মে মাসে পূর্ব বাংলার বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্বভার অর্পন করেন। ইস্কান্দর মির্যাকে সরিয়ে সামরিক বাহিনীর প্রধান আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।

পাকিস্তানের গোড়ার দিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেশ পরিচালনার ব্যর্থতা থেকেই সম্ভবত সামরিক বাহিনীর উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দের মধ্যে এই ধারণার জন্ম হয়েছিল যে, পাকিস্তানকে শাসন করার জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন দরকার এবং এ ধরণের শাসন সামরিক বাহিনীই নিশ্চিত করতে পারে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন পাকিস্তানের দুই প্রদেশের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান তৈরি করে। সে সমস্যা থেকেই সম্ভবত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনে সামরিক হস্তক্ষেপ সংঘটিত হয়।

আইয়ুব খানের শাসনামল (১৯৫৮-১৯৬৯)  জেনারেল আইয়ুব খান দীর্ঘ সময় পাকিস্তানের শাসন কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকেন। আইয়ুবের রাজনীতিতে যোগদানের নেপথ্যে যে শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা কারণ হিসেবে কাজ করেছে তা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত সিয়াটো ও সেন্টো চুক্তিতে পাকিস্তানের যোগদানের ক্ষেত্রে আইয়ুবের নেতৃত্ব প্রদান মার্কিন স্বার্থের অনুকুলে ভূমিকা রাখে। আইয়ুবের এই ভূমিকার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সামরিক শাসনকে সমর্থন করে। কমিউনিজমের বিস্তার রোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হিসেবে আইয়ুব দীর্ঘ সময় ধরে তার ভূমিকা অব্যাহত রাখেন।

পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত বৈচিত্র্যকে আইয়ুব খান পাকিস্তানের অখন্ডতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতেন। সম্ভবত সে কারণে পশ্চিম পাকিস্তানকে একটি ইউনিটে পরিণত করা হয়। পশ্চিম এবং পূর্ব পাকিস্তানকে একত্রে শাসন করার জন্য তিনি একজন রাষ্ট্রপতির অধীনে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের ধারণা তুলে ধরেন। জেনারেল আইয়ুব তাঁর শাসনকার্যে বৈধতা প্রদানের জন্য দু’টি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তন করেন। এর প্রথমটি হচ্ছে মৌলিক গণতন্ত্র নামে একটি চারস্তর বিশিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। এর লক্ষ্য ছিল বহুবিধ; প্রথমত, গ্রামীন জনগোষ্ঠীকে সঞ্চালিত করা, দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থানীয় শাসনে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। মৌলিক গণতন্ত্রে এ সকল কর্মকান্ড অন্তর্ভূক্ত থাকলেও এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রপতি এবং জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ করা।

জেনারেল আইয়ুব রাজনীতিবিদদের পছন্দ করতেন না। তাই তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি The Elective Bodies Disqualification Ordinance (EBDO) জারী করেন। এর মাধ্যমে তিনি রাজনীতিবিদদের আট বছরের জন্য রাজনীতি থেকে বিরত রাখার বিধান অন্তর্ভুক্ত করেন। রাজনীতিবিদদের প্রতি আইয়ুবের অনাগ্রহের কারণেই তিনি তার প্রথম কেবিনেটে কোনো রাজনীতিবিদকে অন্তর্ভুক্ত করেন নি।

আইয়ুবের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শনের মূল কথা ছিল একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং কৃষি, শিল্প প্রতিটি ক্ষেত্রে এই অর্জনকে অব্যাহত রাখা। এই নীতির বাস্তবায়নের ফলে সম্পদের বিনিয়োগ প্রথমেই করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে, কারণ পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল বেশি। আর অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। তা ছাড়া উন্নয়নের অবকাঠামো ছিল এখানে প্রায় অনুপস্থিত।

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসনামলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামোতে বাঙালিদের সমান অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিশেষ করে সামরিক বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সীমিত অংশগ্রহণের ফলে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রগুলোতে বাঙালিদের অবস্থান খুবই দূর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ঐক্যের মাধ্যম হিসেবে ইসলামকে ব্যবহার করার কৌশলটিও ব্যর্থ হয়।

আইয়ুবের উন্নয়ন নীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল ব্যবসায়ী শিল্পপতি শ্রেণীকে উৎসাহিত করে তাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বাহন হিসেবে গড়ে তোলা। তিনি যে সকল বড় শিল্পপতিদের উৎসাহিত করেন তারা ছিলেন ব্যবসায়ী সম্প্রদায় মেমন, বোহরা এবং চিনিওটি-এর সদস্য। এই ব্যবসায়ী গ্রুপ ব্যক্তিগত এবং কর্পোরেট খাতে ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগের অংশীদার ছিল। ব্যবসায়ী পুঁজিবাদকে সহায়তার জন্য আইয়ুব শিল্প নীতিমালার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পরিধি সীমিত রেখে ব্যক্তিখাতে বিকাশের মাধ্যমে শিল্পায়নে উদ্যোগী হন।

১৯৫১ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে আইয়ুব সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে তার অবস্থানকে সুসংহত করেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে সামরিক সরকারের প্রধান হয়ে তিনি তার অবস্থানকে সংহত করতে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতাকে খর্ব করেন। করাচীভিত্তিক পুঁজিপতিদের ক্ষমতাকে দুর্বল করার জন্য রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে পাঞ্জাবভিত্তিক নতুন পুঁজিপতি শ্রেণী গড়ে তুলেন। ভূমি মালিকদের একটি অংশকে তার পক্ষে নিয়ে এসে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ক্ষমতার মেরুকরণের মাধ্যমে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেন। অন্যদিকে সম্পদের বন্টন এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের উপর বৈষম্য করা হয়। পাকিস্তানের দুই অংশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে ইসলামের ব্যবহার বিপরীত ফল নিয়ে এসেছিল। আইয়ুবের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক আন্দোলনের দাবি ছিল সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন শুরু হয় যার ভিত্তি ছিল ১৯৬৬ সালে প্রণীত ছয় দফা। এই ৬ দফার মূল ভিত্তি ছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং পররাষ্ট্র নীতিতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিকতর স্বায়ত্তশাসন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৯৬৮ সালের শেষদিকে এবং ১৯৬৯ সালের প্রথমদিকে পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিস্ফোরণ ঘটে। এই আন্দোলন দমনে ব্যর্থ হয়ে তিনি ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

ইয়াহিয়া খানের শাসনামল (১৯৬৯-১৯৭১)  ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনের লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে রক্ষা করা। কারণ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন একদিকে সামরিক বাহিনীর মর্যাদা এবং অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের উপর পাঞ্জাবীদের নিয়ন্ত্রণের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন মোকাবেলায় তিনি কিছু সমঝোতামূলক নীতি গ্রহণ করেন। তিনি ছাত্রদের জন্য নতুন শিক্ষানীতি এবং শ্রমিকদের জন্য নতুন বেতন স্কেল ঘোষণা করেন। তার দেয়া নতুন বেতন স্কেল পেশাজীবীদের অবস্থার উন্নতি ঘটায়। বাঙালিদের প্রতি সমঝোতার উদ্যোগ হিসেবে তিনি ‘এক ইউনিট’ পদ্ধতি বাতিল করে জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধিত্বকে জনসংখ্যা নীতির উপর প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে জাতীয় পরিষদে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

আইয়ুব রাজনীতিবিদদের প্রতি অনাগ্রহী হলেও ইয়াহিয়া খান রাজনীতিবিদদের গুরুত্ব অনুধাবন করতে সক্ষম হন। তাই তিনি বিবদমান রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মাঝে মধ্যস্থতার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন না। তার লক্ষ্য ছিল শাসক শ্রেণীর স্বার্থকে রক্ষা করা। ইয়াহিয়া একটি সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ঘোষণা করেন এবং নির্বাচনী কর্মকান্ড পরিচালনা সহজতর করার জন্য ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরুর অনুমতি প্রদান করেন। ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের মার্চে তাঁর আইনগত কাঠামো আদেশে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক ব্যবস্থা তুলে ধরেন। এই দলিলে পাকিস্তানকে একটি গণতান্ত্রিক এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়, এবং প্রদেশগুলোতে সর্বোচ্চ আইনগত প্রশাসনিক এবং আর্থিক ক্ষমতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ ইয়াহিয়ার এই ব্যবস্থা মেনে নিয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। এই নির্বাচনে ৯টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, আর প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসনে বিজয়ী হয়। পাকিস্তান পিপল্স পার্টি জাতীয় পরিষদে ৮১টি আসন পায়। এই দল পাঞ্জাবে ১৮০ আসনের মধ্যে ১১৩ এবং করাচীতে ৬০ আসনের মধ্যে ২৮টি আসনে জয়লাভ করে। এই নির্বাচনের ফলে পশ্চিম এবং পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে মেরুকরণ চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা থাকলেও ভুট্টো এবং পিপল্স পার্টি এ ব্যাপারে টালবাহানা শুরু করে। ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়। কিন্তু ভূট্টো কেন্দ্রের ক্ষমতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করতে নারাজ ছিলেন। তিনি এই অধিবেশন বয়কটের হুমকি দেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব দেন। ভুট্টোর এই প্রস্তাব শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যাখ্যান করেন। ভুট্টোর চাপে ইয়াহিয়া খান ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।

এর প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ১ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলনের তীব্রতায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কার্যত পূর্ব পাকিস্তানের উপর তাদের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে ঢাকার বুকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা লুণ্ঠন ও ধর্ষণে লিপ্ত হয়। সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সংকটের সমাধান প্রচেষ্টা বাঙালিদের চূড়ান্ত স্বাধীনতার পথে ঠেলে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। নয় মাস যুদ্ধের পর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

বাংলাদেশে সামরিক শাসন: পটভূমি স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র এবং জাতিগঠন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করলেও বেসামরিক আমলা এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দুটি অংশের মধ্যে বিভাজন চলমান থাকার ফলে এ দু’টো প্রতিষ্ঠানই অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল রয়ে যায়। পাকিস্তান ফেরত অনেক সিনিয়র আর্মি অফিসারকে গুরুত্বহীন পদে নিয়োগ দেয়া হয়। সামরিক বাহিনীর নৈতিক বল আরও দুর্বল হয়ে যায় যখন সরকার রক্ষী বাহিনী নামে একটি আলাদা প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠন করে। রক্ষীবাহিনীর নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ অব্যাহত গতিতে চলতে থাকলেও সামরিক বাহিনীর সুবিধা প্রদান পিছিয়ে পড়ে। সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা যেখানে ২৬,৫০০ ছিল সেখানে শক্তিশালী প্যারামিলিশিয়ার সংখ্যা ছিল ২৯,০০০। সামরিক বাহিনীর মধ্যে হতাশা আরও বৃদ্ধি পায় যখন চোরাই অস্ত্র এবং দ্রব্যাদি উদ্ধারে সরকার তাদের ব্যবহার করতে থাকে। দু’জন মেজরকে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে চাকুরি থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। নিয়মিত বাহিনীতে নিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, অথচ রক্ষীবাহিনীর নিয়োগ বৃদ্ধি পায়। সামরিক বাহিনীর প্রতি ক্ষমতাসীন সরকারের বৈরী দৃষ্টিভঙ্গি সামরিক বাহিনীর প্রতিটি স্তরে সরকারের প্রতি ক্ষোভের জন্ম দেয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট জাতীয় ব্যয়ের ১৩ শতাংশ কখনও অতিক্রম করে নি। পরবর্তী ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে এরূপ প্রতীয়মান হয় যে, সামরিক বাহিনীর বিকল্প শক্তি হিসেবে রক্ষীবাহিনী গড়ে তোলা হয় যার লক্ষ্য ছিল সরকার বিরোধীদের নির্মূল করা।

কালক্রমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিরোধীদের বিষয়ে অসহিষ্ণু হয়ে উঠে। বিরোধী দলকে দমনের জন্য ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার Special Power Act অনুমোদন করে। এর মাধ্যমে, যদি কোনো দলের কার্যক্রম জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয় সেই রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা সরকারকে দেয়া হয়। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং সকল মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়। সরকারের কর্তৃত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারিতে সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। এই সংশোধনী দ্বারা সরকার সংসদীয় সরকারের পরিবর্তে একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। বাকশাল পদ্ধতি তৎকালীন সংকট নিরসনে একটি বিকল্প হিসেবে ভাবা হলেও এরূপ বিশ্বাস করা হয় যে, এই সংশোধনী ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের সূচনা ঘটায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যস্তরের ৬ জন অফিসার (যাদের অধিকাংশই মেজর) এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কয়েকশত সৈনিক ভোর হওয়ার পূর্বেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। অভ্যুত্থানকারী অফিসারগণ সরকারের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে এই অভ্যুত্থানকে একটি ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। কেউ এই অভ্যুত্থানকে ‘মুজিব সমর্থক’ অভ্যুত্থান হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ এই অভ্যুত্থানকে সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিপুল সংখ্যক সৈন্য ঢাকার রাস্তায় নেমে সমাজ বিপ্লবের পক্ষে বিপ্লবী শ্লোগান দিতে থাকে। তারা ক্ষমতা দখল প্রক্রিয়ায় খালেদ মোশাররফ ও তার সহযোগীদের হত্যা করে। এই ঘটনাবহুল সময়ের মধ্য দিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন।

জেনারেল জিয়ার শাসনামল (১৯৭৫-১৯৮১)  ক্ষমতায় এসেই জেনারেল জিয়া তার অবস্থানকে সংহত করতে সফল হন। অন্যান্য সামরিক শাসকদের মত তিনিও বেসামরিকীকরণ এবং গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থায় তার ব্যক্তিগত শাসনকে কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর জিয়াউর রহমান কিছু সামরিক বিধি জারী করেন। এই সামরিক বিধির অন্যতম দিক ছিল, যারা ভবিষ্যতে সামরিক বাহিনীতে বিদ্রোহে উস্কানি দিবে তাদের জন্য মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা। জিয়ার শাসনামলে সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্র আবারও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট সায়েম ৭ সদস্যের একটি পরামর্শক পরিষদ নিয়োগ দেন যাতে তিন বাহিনী থেকে ৩ জন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং চারজন আমলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পর্ষদে টেকনোক্র্যাট সদস্যদের সংখ্যা পরবর্তীকালে দ্বিগুণ করা হয়। এই পর্ষদে এমন অনেক আমলা এবং টেকনোক্র্যাটদের নিয়োগ দেয়া হয় যাদের আইয়ুব খান এবং ইয়াহিয়া খানের আমলে সামরিক বেসামরিক আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন পরিচালনায় যথেষ্ট দক্ষতা ছিল।

১৯৭৫ সালের আগস্ট এবং নভেম্বর মাসের ঘটনা প্রবাহ একটি বিষয় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, সামরিক বাহিনী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল অধিকমাত্রায় বিভিন্ন পক্ষে বিভক্ত, মেরুকৃত, রাজনীতি প্রভাবিত এবং কতকটা বিপ্লবী ধ্যান ধারণায় উদ্বুদ্ধ। জিয়া যদিও সামরিক বাহিনীর সাংগঠনিক স্বার্থ রক্ষা এবং বাহিনীকে উন্নীত করেন, কিন্তু তার সময়েও অনেকগুলো অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালের ৩১ মে চট্টগ্রামে একটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান নিহত হন। জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সরকারি কর্মকর্তাদের মন জয়ের জন্য ১৯৭২ সালের The Presidential Order No. 9 বাতিল করেন। এই বিধির ব্যবহার করে যেকোন সময় যেকোন সরকারি কর্মকর্তাকে চাকুরি থেকে কোনো কারণ ছাড়াই অব্যাহতি দেয়া যেত। এমনকি ভুক্তভোগীদের আদালতে আবেদনের কোনো সুযোগ দেয়া হতো না। যারা এই বিধির অধীনে চাকুরি হারান তিনি তাদের আপিল করার সুযোগ দেন। কিছু সিনিয়র কর্মকর্তা যারা বেসামরিক সরকার দ্বারা চাকুরিচ্যুত হন জিয়াউর রহমান তাদের ফিরিয়ে এনে প্রভাবশালী পদে নিয়োগ দেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রণ বিধি জারী করেন। এই বিধির আওতায় সীমিত আকারে ঘরোয়া রাজনীতির সুযোগ দেয়া হয়। এই সুবিধা প্রদান সরকার কর্তৃক রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচীর অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল ছিল। রাজনৈতিক দলের লাইসেন্সের জন্য বিধি জারী করা হয়।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে বস্ত্তত জিয়াই দেশ শাসন করছিলেন। ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি রাষ্ট্রপতি এ.এস.এম সায়েমকে সরিয়ে নিজেই প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। দক্ষিণ পন্থীদের সাথে নিয়ে একদিকে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দুর্বল করা এবং অন্যদিকে তার ক্ষমতার বৈধতা আদায়ের জন্য জিয়া ১৯৭৭ সালের মে মাসে গণভোটের আয়োজন করেন। কিন্তু এই গণভোটে ৮৮.৫ শতাংশ ভোট পড়ে যার মধ্যে ৯৯.৮৮ ভাগ হ্যাঁ ভোট ছিল অবাস্তব। ১৯৭৮ সালের জুন মাসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জিয়াকে সমর্থন দেয়ার জন্য একটি ছয় দলীয় নির্বাচনী জোট জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিরোধী জোট গণতান্ত্রিক ঐক্যফ্রন্ট থেকে জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম.এ.জি ওসমানী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই নির্বাচনে ৭৬.৬৭ শতাংশ ভোট পান জিয়া আর ২১.৬৩ শতাংশ ভোট পান ওসমানী। আর বাকী ১.৭০ শতাংশ ভোট পান রাজনৈতিকভাবে অপরিচিত অন্যান্য প্রার্থীরা। জিয়া যখন এই নির্বাচন করেন, তখনও তার গায়ে সামরিক উর্দি ছিল। ওই বছরের শেষদিকে জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বি.এন.পি) গঠন করেন। এই দলটি ছিল মৌলবাদী থেকে শুরু করে অতিবাম রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সমষ্টি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয় এবং বি.এন.পি গঠনের মাধ্যমে জিয়া তার শাসনের বৈধতার সংকট দূর করার চেষ্টা করেন এবং সামরিক শাসন থেকে বেসামরিকীকরণের পথে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বি.এন.পি জাতীয় সংসদের ২০৭টি আসন লাভ করে। জিয়া তার বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়ায় আইয়ুব খানকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করেন।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সামরিক শাসনের মতই বাংলাদেশের সামরিক শাসকদেরও সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধার করতে হয়েছিল। জিয়া সামরিক বাহিনীর কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় অতিশয় তৎপর ছিলেন। জিয়া সরকার সামরিক বাহিনীতে চাকুরিরতদের মর্যাদা এবং সুবিধাদি যেমন, পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি, ভর্তুকিপ্রাপ্ত রেশন এবং উন্নত গৃহায়নের ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত সামরিক অফিসারদের রক্ষার জন্য Indennity Ordinance জারী করা হয়। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে লোভনীয় পদে নিয়োগ করা হয়। এই সময়ে সামরিক বাজেট বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৫-৭৬ সালে রাজস্ব বাজেটের শতকরা ৩২ ভাগ ছিল সামরিক খাতে বরাদ্দ এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তা অব্যাহত থাকে। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সামরিক বাজেট ১৮৬ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সামরিক বাহিনীতে নতুন ব্যাটেলিয়ান এবং ব্রিগেড বৃদ্ধি করা হয়। প্রায় বিশ হাজার রক্ষীবাহিনীকে নিয়মিত বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। জিয়া সামরিক অফিসারদের লাভজনক ব্যবসায়িক লাইসেন্স এবং পারমিট এবং ঢাকা শহরের জাকজমকপূর্ণ এলাকায় প্লট বরাদ্দ দেন।

মন্ত্রীপরিষদের সামরিকায়ন জিয়ার দ্বারা শুরু হয় এবং তা এরশাদের সময়ে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। ১৯৭৫ সালে দশ সদস্য বিশিষ্ট পরামর্শক পর্ষদের মধ্যে সাতজনই সামরিক আমলা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হন। ১৯৮১ সালে ২৪ জন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী নিয়ে গঠিত কেবিনেটের ৬ জন ছিল সামরিক বাহিনী থেকে আগত। বেসামরিক প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ বৃদ্ধি পায়। সামরিক বাহিনীর সদস্যরা সচিবালয়ের বিভিন্ন পদসহ পুলিশ প্রশাসন এবং রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে। ১৯৮৭ সালে সামরিক বাহিনীর ১৫০০ সদস্য জনপ্রশাসনে যোগ দেয়। জেলা পর্যায়ের পুলিশ প্রশাসনকে সামরিকায়ন করা হয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ৬৪টি জেলার ৫৩ জন পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিল সামরিক অফিসার। অধিকন্তু বিদেশে বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে সিনিয়র আর্মি অফিসারদের নিয়োগ দেয়া হয়। পেশাজীবী আমলা ও কূটনৈতিকগণ এ ধরনের নিয়োগকে তাদের পেশাজগতের বাইরের চূড়ান্ত হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু সম্ভবত নির্যাতনের ভয়ে এই পেশাজীবী আমলা ও কূটনৈতিকগণ তাদের পেশায় সামরিক আমলাদের নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করা থেকে বিরত থাকেন। সামরিক কর্মকর্তাদের জনপ্রশাসনে অনুপ্রবেশ সামরিক শাসকদের নিম্নোক্ত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়। প্রথমত, এই অনুপ্রবেশ রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর সামরিক শাসকদের কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করে; দ্বিতীয়ত, এ উপায়ে সামরিক বাহিনীর ভেতর থেকে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রকারীদের দূর করা সহজতর হয়। অনেক সামরিক অফিসারদের কাছে জনপ্রশাসনের যেকোন পদে নিয়োগ কয়েকটি কারণে খুবই আকর্ষণীয়। প্রথমত এর মাধ্যমে জনসংযোগের সুযোগ পাওয়া যায়, যা সামরিক বাহিনীতে খুবই সীমিত। দ্বিতীয়ত এর মাধ্যমে সেনা অফিসারগণ সেনাবাহিনীর কঠোর অনুশাসনের হাত থেকে স্বস্তি লাভ করে; তৃতীয়ত জনপ্রশাসনে চাকুরি অনেক সামরিক অফিসারদের দুর্নীতির মাধ্যমে ভাগ্য তৈরির সুযোগ করে দেয়।

জিয়ার সামরিক শাসনামলে বেসামরিকীকরণের ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তার সরকার জনগণের মাঝে সমর্থন আদায়ে উদ্যোগী হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিলো দুটো। প্রথমত সরকারকে বৈধতার সংকটের গভীরতা থেকে রক্ষা করা; দ্বিতীয়ত সুসংগঠিত বিরোধিতা মোকাবেলার মাধ্যমে সরকারকে স্থিতিশীল রাখা। এই লক্ষ্যে জিয়া কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন যার অধিকাংশেরই লক্ষ্য ছিল ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীদের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করা। একটি Proclamation Order এর মাধ্যমে ‘বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ শব্দগুলোকে সংবিধানের Preamble এর উপরে স্থান দেয়া হয়। সংবিধানের মৌলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার স্থলে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর চূড়ান্ত আস্থা এবং বিশ্বাস’ সংযুক্ত করা হয়। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদটি যেখানে সকল ধরনের সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল, একটি ধর্মে বিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে, তা তুলে দেয়া হয়। অনুচ্ছেদ ৫(১) উপধারা (২)-এ বলা হয়, রাষ্ট্রকে ইসলামিক ঐক্যের ভিত্তিতে ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করা, সংরক্ষণ ও সুসংহত করার উপর জোর দেয়া হয়। এই পরিবর্তনগুলো সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে পরিবর্তন করে। সংবিধানে আরেকটি মূলনীতি সমাজতন্ত্রকে পুনঃসংজ্ঞায়ন করা হয় অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ন্যায়বিচার হিসেবে। কোলাবরেশন অ্যাক্ট (Collaboration Act) বাতিল করে দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে সহায়তা করা হয়। এমনকি জিয়া একটি প্রক্লেমেশন আদেশের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় দল গঠনের ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা তুলে দেন।

পূর্বসূরী আইয়ুব খানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জিয়াউর রহমানও গ্রামীন ক্ষমতা কাঠামোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গ্রাম সরকার গঠন করেন। এর আরও উদ্দেশ্য ছিল সংকটের সময় এই শক্তিকে কাজে লাগানো।

জিয়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তার সরকারের ১৯ দফা কর্মসূচী তুলে ধরেন। এই কর্মসূচীর অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশে উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন। তার সরকারের আরেকটি লক্ষ্য ছিল পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচী এবং এ লক্ষ্যে জনশক্তি ও সম্পদকে যথার্থ ব্যবহার করার ব্যবস্থা নেয়া হয়।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সামরিক সরকারের বেসামরিকীকরণ সত্ত্বেও অর্থাৎ সাধারণ নির্বাচন, বেসামরিক রাজনীতিবিদদের অধিক সংখ্যায় মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভূক্তি এবং রাষ্ট্রপতির হাতে সংসদ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রধান নির্বাহীর কাছেই রয়ে যায়। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব পরবর্তী বছরগুলোতে বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৮ সালের দ্বিতীয় প্রোক্লেমেশন আদেশের (পঞ্চম সংশোধনী) মাধ্যমে সংসদকে রাষ্ট্রপতির কাছে অনুগত করা হয়। এই আদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদের সমর্থিত যে কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ছিলেন। এর অর্থ হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সমর্থন লাভকারী যে কাউকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে তিনি বাধ্য ছিলেন না। অধিকন্তু, রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভার এক পঞ্চমাংশকে সংসদ সদস্যদের বাইরে থেকে নিয়োগ দিতে পারতেন। তিনি যেকোন বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সংসদকে অবহিত না করেই জাতীয় স্বার্থে চুক্তি করতে পারতেন। তিনি সংসদে পাস করা যেকোন বিলে সম্মতি প্রদান স্থগিত রাখতে পারতেন (দ্বিতীয় প্রক্লেমেশন আদেশ নং ৪ (১৯৭৮), ১৮ ডিসেম্বর  ১৯৭৮)।

ক্ষমতা সুসংহত করণের পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র তাদের অর্থনৈতিক প্রজেক্ট নিয়ে এগোয়। এর লক্ষ্য ছিল সাধারণভাবে পুঁজিবাদী উন্নয়ন এবং সুনির্দিষ্টভাবে স্বাধীনতাপূর্ব ‘Sponsored Capitalism’ বাস্তবায়ন করা। এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সাহায্য দানে এগিয়ে আসবে।

১৯৭৫-৮১ পর্যন্ত পুঁজিবাদী উন্নয়নের লক্ষ্যে সামরিক সরকার নিম্নলিখিত উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপগুলো হলো: ক) কালো টাকাকে বৈধকরণ, খ) রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরাষ্ট্রীকরণ, গ) ব্যক্তিগত বিনিয়োগের মাত্রা বর্ধিতকরণ এবং উচ্ছেদকরণ, ঘ) ব্যক্তিগত বিদেশী বিনিয়োগের উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেয়া, ঙ) ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান। সামরিক শাসকের একটি প্রধান কাজ ছিল নব্য ধনিকশ্রেণীর আয়কে বিভিন্নভাবে বৈধতা দেয়া।

১৯৭৫ সালের ৭ ডিসেম্বর সরকার একটি পূনর্গঠিত বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ করে। বিভিন্ন সময়ে সংশোধিত আকারে এই নীতিটি বিদ্যমান থাকে। ব্যাপক হারে ব্যক্তিখাতের বিকাশ, sponsored পুঁজিবাদী নীতি গ্রহণ এবং বৈদেশিক সাহায্যের অনুপ্রবেশ, পাশাপাশি সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্রের স্বায়ত্তশাসন ভূমিকা বাংলাদেশের সমাজের শ্রেণী চরিত্রে পরিবর্তন ঘটায়। নব্য ধনিক শ্রেণী রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় নিজেদের লুম্পেন পুঁজিপতিতে পরিণত করে, যে শ্রেণীটি লুণ্ঠনের মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চয়ে আগ্রহী। জিয়া সরকারের সময়ে সাহায্যদাতা দেশ/সংস্থা কর্তৃক প্রবৃদ্ধিমুখী উন্নয়ন কৌশল বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের কাছে লাভজনক হলেও তা বাংলাদেশকে ঋণ জালে আবদ্ধ করে ফেলে এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি করে।

জেনারেল এরশাদের শাসনামল (১৯৮২-১৯৯০)  সামরিক বাহিনী প্রধান লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেত…ৃত্ব সামরিক বাহিনী নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এই অভ্যুত্থান সংঘঠিত হয় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। রাষ্ট্রযন্ত্রের সামরিকায়নে এরশাদের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। তিনি নীতি-প্রণয়নে সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকে সাংবিধানিক বিধিবদ্ধকরণের পক্ষে জোড়ালো অবস্থান নিয়েছিলেন। ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বেই এরশাদ রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিশ্চিতকরণের জন্য তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেন। ক্ষমতাসীন হয়েই এরশাদ জেলা পরিষদে সামরিক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা চালান। সিভিল সোসাইটির প্রতিরোধের মুখে তার এই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

১৯৮৬ সালে এরশাদ যে ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ ঘোষণা করেন তাতে মেজর জেনারেলের মর্যাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান, ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশনের চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সমান করা হয়। একই ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী তিন বাহিনীর প্রধানের মর্যাদাকে সচিব এমনকি প্রতিরক্ষা সচিবের উপরে স্থাপন করা হয়। এভাবেই সামরিক আমলাদের মর্যাদাকে সিভিল আমলাদের উপরে স্থান দেয়া হয়। এর ফলে সামরিক বেসামরিক আমলাদের মধ্যে সামরিক শাসনের প্রথমদিকে যে সুবিধার ঐক্য গড়ে উঠেছিল তা ভেঙ্গে পড়ে। রাজনৈতিক শক্তি, সাহায্যদাতা দেশ এবং সংগঠনের চাপে এরশাদের সামরিক সরকার বেসামরিকীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এরশাদ তাঁর সরকারের বৈধতা অর্জনের জন্য ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ গণভোটের আয়োজন করেন। এই গণভোটে ৭২ শতাংশ ভোট পড়ার দাবি করা হয় এবং ৯৪.১৪ শতাংশ হ্যাঁ ভোট এরশাদের পক্ষে পড়ে। দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকের হিসেবে ভোটের এই হার কোনভাবেই ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি হবে না। এরশাদ সমর্থকদের মতে এই গণভোট সরকারের বৈধতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিরোধীদের কাছে এটি ছিল একটি নিস্ফল উদ্যোগ।

১৯৮৩ সালে সরকার সমর্থিত রাজনৈতিক দল জনদলের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৬ সালে জনদলের নাম পরিবর্তন করে জাতীয় পার্টি রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের আগস্ট মাসে এরশাদ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। বৈধতা অর্জনের অব্যাহত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এরশাদ জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নেন। সকল প্রধান বিরোধী দল এই নির্বাচন বয়কট করে। বাস্তবে এই নির্বাচনে কোনো বিরোধী দলই ছিল না। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্যমতে এরশাদ এই নির্বাচনে ৮৩.৫৭ শতাংশ ভোট পান। বিরোধী জোট এই নির্বাচনকে একটি ‘তামাশা’ হিসেবে উল্লেখ করে ৩ শতাংশেরও কম ভোট পড়েছে বলে দাবি করে। এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকেন। এই অধিবেশনে তার সময়কালে সকল সামরিক আদেশ এবং প্রোক্লেমেশনের আইনগত বৈধতা দিয়ে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী পাশ হয়।

অসাংবিধানিক পথে এরশাদের ক্ষমতা দখল, সরকার ও প্রশাসনের দুর্নীতি এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার ক্ষতিসাধন প্রশ্নে ১৯৮৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগ, বি.এন.পি ও বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত তিন জোটের নেতৃত্বে এরশাদের পতনের আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলন প্রশাসন এবং অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি এরশাদের শাসনের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে। জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলো একই পথ অবলম্বন করে। এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে ১৯৮৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ বাতিল করেন এবং ১৯৮৮ সালের ৮ মার্চ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করেন। সকল প্রধান রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন বয়কট করে। ছোট ছোট অগুরুত্বপূর্ণ ৭০টি দল নিয়ে একটি সম্মিলিত বিরোধী দল গঠিত হয়। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। নির্বাচন কমিশনের দাবি অনুসারে নির্বাচনে ভোটের হার ৫২.৪৮ শতাংশ। কিন্তু বিরোধী দলের হিসেবে এটি ১ শতাংশের বেশি ছিল না। চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারচুপি অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে, যা এরশাদের পতনের আন্দোলনে একটি অন্যতম প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে।

নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এরশাদ জনগণের ধর্মীয় আবেগকে তার সরকারের সমর্থনের ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। ১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।

চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এরশাদ বিরোধী আন্দোলন বেগমান হতে থাকে। হরতাল, অবরোধ এবং ঘেরাও কর্মসূচী চলতে থাকে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ছাত্ররা অগ্রনী ভূমিকা পালন করে। ২২টি ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরিষদ গঠন করে। ছাত্র সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রচেষ্টায় তিন জোট এরশাদ পতনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়। তিন জোট ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের উপায় নিয়ে একটি যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করে। ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে সংবিধানে সকল মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়। সমাজের বিভিন্ন পেশার লোক আন্দোলনের সাথে সংহতি ঘোষণা করে। অবশেষে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। শাহাবুদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে জেনারেল এরশাদ সাড়ে আট বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। এরশাদের প্রতি সামরিক হাই কমান্ডের সমর্থন থাকার পরও আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে সামরিক বাহিনী এরশাদকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে নি।

জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ বিভিন্ন মাত্রায় সংবিধানের ৬টি সংশোধনী আনেন। কিন্তু কেউই সরকার ব্যবস্থা হিসেবে সংসদীয় পদ্ধতিকে বেছে নেন নি। রাষ্ট্র ক্ষমতা নিজেদের হাতে কুক্ষিগত রাখার জন্য সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন।

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে জিয়ার গ্রাম সরকার পদ্ধতি বাতিল করেন। পরিবর্তে তিনি আইয়ুব খান এবং জিয়ার পথ থেকে সরে এসে স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গ্রামীন জনগণকে অধিকতর ক্ষমতাবান করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে জনপ্রশাসকের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়। তিনি থানা পর্যায়ের প্রশাসনকে উন্নীত করে উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। উপজেলা চেয়ারম্যানের হাতে ন্যস্ত করে উপজেলাকে ক্ষমতা ও সম্পদ প্রদানের মাধ্যমে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার হিসেবে দাঁড় করানো হয়। এই উপজেলা শুধুমাত্র প্রশাসনের একটি ইউনিট হিসেবেই কাজ করেনি, নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান রাজনৈতিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যুক্ত ছিল। জেনারেল জিয়াউর রহমানের গ্রাম সরকার এবং জেনারেল এরশাদের উপজেলা পদ্ধতির মাধ্যমে প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ না হলেও এর মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সরকারের কাছে স্থানান্তর করা হয়। এর ফলে স্থানীয় সরকারের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তিশালী কর্তৃত্ব বজায় থাকে।

পাকিস্তান আমলে ১৯৫৩ সাল থেকে বাংলাদেশে ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাসকে আমরা দু’টি পর্বে ভাগ করতে পারি। প্রথম পর্বটি স্নায়ুযুদ্ধ সমাপ্তিকাল পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয় পর্ব ১৯৯০ সালে জেনারেল এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। স্নায়ুযুদ্ধ-পূর্ব কালে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের ধরণ ছিল প্রত্যক্ষ। এই হস্তক্ষেপ সংঘটিত হয় সামাজিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের কাছে অর্থনৈতিক লাভ পৌছানোর জন্য। সামরিক শাসনের মূল সুর দুটি: প্রথমত রাজনীতিকরা দেশ ধ্বংস করে দিয়েছে, তারা দুর্নীতি পরায়ণ, তাদের নির্মূল করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবাধ গণতন্ত্র বিশেষ করে পশ্চিমা গণতন্ত্র এদেশে অচল।

আইয়ুব খান থেকে শুরু করে জেনারেল এরশাদ পর্যন্ত প্রত্যেক সামরিক শাসক সংবিধানে পরিবর্তন এনে একজন ব্যক্তির কাছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। প্রত্যেক সামরিক শাসক সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকারকে উৎসাহিত করে রাষ্ট্রপতির হাতে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত করেছে। এমনকি সংসদও এক ব্যক্তির কথায় চলেছে। প্রতিটি সামরিক সরকার ক্ষমতায় এসে সামরিক বাহিনীকে তাদের স্থায়ী ক্ষমতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নানান সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করে, এমনকি জনপ্রশাসনে সামরিক অফিসারদের চাকুরির সুযোগ করে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে সামরিক অফিসারদের বাণিজ্যিক লাভজনক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ তাদের কর্পোরেট স্বার্থের স্ফীতি ঘটাচ্ছে।

সিভিলিয়ান রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে উপদলীয় কোন্দল, সামরিক বাহিনীর কর্পোরেট স্বার্থের উপর আঘাত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ঘটিয়েছে। সাধারণভাবে কেবলমাত্র জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাড়া আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জেনারেল এরশাদ গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করে রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রণোদনা কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিটি সামরিক শাসন জনতুষ্টিমূলক কিছু অস্থায়ী উদ্যোগ ছাড়া স্থিতিশীল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনে ব্যর্থ হয়েছে।  [সাববীর আহমেদ]

গ্রন্থপঞ্জি  Lawrence Ziring, Bangladesh : From Mujib to Ershad, An Interpretive Study, University Press Limited, Dhaka, 1994; Talukder Maniruzzaman, Politics and Security of Bangladesh, University Press Limited, 1994; Ali Riaz, State, Class and Military Rule, Nadi New Press, Dhaka, 1994;  Rounaq Jahan, Pakistam’s Failure in National Integration, The University Press Limited, 2001;  Zillur R. Khan, Martial Law to Martial Law: Leadership Crisis in Bangladesh, University Press Limited, Dhaka, 1984.