পাদুকা শিল্প

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৪:০৮, ৫ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

পাদুকা শিল্প  বাংলাদেশে আধুনিক পাদুকা শিল্পের সূচনা ১৯৮০-র দশকে ঘটলেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলেই এ অঞ্চলে পাদুকা শিল্পের প্রসার ঘটেছিল। আর ১৯৯০-এর দশকে এসে বাংলাদেশ পাদুকা সামগ্রী রপ্তানি শুরু করে। ব্রিটিশ আমলে পূর্ববঙ্গে যেসব পাদুকা নির্মাণ কারখানা ছিল সেগুলি ছিল নেহায়েৎই ক্ষুদ্র এবং সেগুলিকে সংগঠিত শিল্প না বলে কুটির পর্যায়ের কারখানা বলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। এ জাতীয় কিছু কারখানা মূলত কয়েকটি জেলা শহরে গড়ে ওঠে। কলকাতা একসময় পাদুকা শিল্পে বেশ সমৃদ্ধ ছিল এবং ১৯৪৭-এর পূর্বপর্যন্ত কলকাতাই ছিল পূর্ববঙ্গের মানুষের ব্যবহারের পাদুকা সামগ্রী আমদানির প্রধান উৎস। ১৯৪৭-এর পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এ এলাকায় পাদুকা আমদানি শুরু হয়। বাটা সু কোম্পানি টঙ্গীতে জুতা কারখানা প্রতিষ্ঠা করে ১৯৬২ সালে এবং এটিই ছিল বাংলাদেশ এলাকার বৃহদায়তন পাদুকা উৎপাদনের প্রথম শিল্প প্রতিষ্ঠান। এরপর ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইস্টার্ন প্রোগ্রেসিভ সু ইন্ডাস্ট্রিজ। দুটি প্রতিষ্ঠান একত্রে যা উৎপাদন করত তা স্থানীয় বাজারে যেমন প্রচুর পরিমাণে যোগান বৃদ্ধি করে তেমনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোশ্লোভাকিয়া ও ইংল্যান্ডসহ বহু দেশে রপ্তানিও করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কারখানা দুটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে স্বাধীনতার পর এগুলিকে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়, সেই সঙ্গে নতুন নতুন অনেক পাদুকা কারখানাও গড়ে ওঠে। নতুন তৈরি হওয়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পাদুকা শিল্প প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এপেক্স ফুটওয়ার, এক্সেলসিওর সু’জ এবং প্যারাগন লেদার অ্যান্ড ফুটওয়ার ইন্ডাস্ট্রিজ।

বর্তমানে বাংলাদেশে দুই হাজারেরও বেশি পাদুকা শিল্পকারখানা রয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ২৩টি মোটামুটি বৃহদায়তন এবং যান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন পরিচালনা করে। অন্যগুলিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের পাদুকা শিল্পের মোট উৎপাদনক্ষমতা ৩ কোটি ২০ লক্ষ জোড়া। তবে এই সংখ্যা চামড়া, প্লাস্টিক, রাবার সব উপাদান দিয়ে তৈরি পাদুকার সর্বমোট হিসাব। মোট উৎপাদন ক্ষমতার ২ কোটি ৫০ লক্ষ জোড়া উৎপাদনের ব্যবস্থা আছে যান্ত্রিক প্রযুক্তিমূলক কারখানায়, বাকিটা তৈরি হয় হস্তশিল্প কারিগরদের নিয়ে গড়া ছোটখাটো কুটির শিল্প জাতীয় ঘরগুলিতে। পাদুকা খাতের বড় ও মাঝারি শিল্প-কারখানাগুলি দৈনিক ৭৫০ থেকে ৩,০০০ জোড়া জুতা উৎপাদন করে। আর উৎপাদনের বৃহদাংশই যায় স্থানীয় বাজারে, যদিও একটি অংশ রপ্তানিও হয়। পাদুকা শিল্পে প্রায় ২৫,০০০ লোকের সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে, যদিও এর কাঁচামালের যোগান, বিজ্ঞাপন ও বিপণন নেটওয়ার্ক বিবেচনায় আনলে এ শিল্পে কর্মসংস্থানের সংখ্যা দাঁড়াবে এর কয়েকগুণ। সরাসরি কর্মসংস্থানের অর্ধেকেরও বেশি নিয়োজিত রয়েছে যান্ত্রিক উৎপাদন পরিচালনার বড় ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিতে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প জাতীয় কারখানাগুলিতে যারা কাজ করে তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মহিলা। দেশের সব পাদুকা কারখানার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি অবস্থিত ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এ দুই জায়গার বড় বড় কয়েকটি কারখানাই মাত্র নিয়মিত ব্যবহারের জন্য বা খেলাধুলার জুতা অথবা বিবিধ মান ও ডিজাইনের ট্রেনিং শু, কেডস, চামড়া বা ক্যানভাসের স্যান্ডেল, চপ্পল অথবা অন্যান্য কারখানাকে যোগান দেওয়ার মতো সোল, সু-আপার ইত্যাদি তৈরির ক্ষমতা রাখে।

দেশের বাজারে পাদুকা সামগ্রী বিপণনে নিয়োজিত পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ে আনুমানিক ৫০,০০০ লোক কাজ করে। দেশের ভেতরে বিদেশি পাদুকা বিক্রয় করে কিছু আমাদানিকারক ও তাদের এজেন্ট আর স্থানীয় উৎপাদনকারীরা ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহর ছাড়াও জেলা বা থানা শহরভিত্তিক এজেন্ট ব্যবহার করে। আর দেশ থেকে বিদেশে পাদুকা সামগ্রী রপ্তানি হয় পাইকারি ক্রয়ে নিয়োজিত আঞ্চলিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।

বাংলাদেশ এক সময় প্রচুর পরিমাণে পাদুকা আমদানি করলেও এখন পাদুকা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং প্রচুর পাদুকা বিদেশে রপ্তানি হয়। ১৯৭২ সালেও বাংলাদেশ ১ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার পাদুকা রপ্তানি করেছে। তবে ১৯৯৭ সালে রপ্তানিকৃত পাদুকার মূল্য ছিল ১৯০ কোটি টাকা। রপ্তানি ক্ষেত্রে প্রকৃত অগ্রগতি ঘটেছে ১৯৯০-এর পর এবং ১৯৯০-৯১-এর তুলনায় ১৯৯৬-৯৭তে রপ্তানি বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৫২৭%। বাংলাদেশ থেকে এখন যেসব দেশে পাদুকা রপ্তানি হয় সেগুলির শীর্ষে রয়েছে জাপান (বাজার শেয়ার ৩৪%)। অন্যান্য দেশ হচ্ছে যুক্তরাজ্য (১১%), স্পেন (৯%), জার্মানি (৮%), রাশিয়া ৭%), ইতালি (৫%) এবং যুক্তরাষ্ট্র (২%)।

বাংলাদেশে পাদুকা ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণের সরকারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পাদুকা শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়ন ও রপ্তানি পাদুকা শিল্প বিকাশে এফবিবিসিআই (ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ) এবং ইপিবি (রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে পাদুকা শিল্পখাত এবং এই খাতে নিয়োজিত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখাশোনার প্রধান দুটি সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশ পাদুকা প্রস্ত্ততকারক সমিতি এবং বাংলাদেশ পাদুকা ব্যবসায়ী সমিতি। প্রথমটির প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৮৪ সালে এবং তা নিবন্ধিত হয় ১৯৮৮ সালে। ১৯৯৯ সালে এর সদস্য সংখ্যা ছিল ১৪৯। তবে বাটা, এপেক্স, এক্সেলসিওর ইত্যাদি বৃহদায়তন ও রপ্তানিকারক পাদুকা শিল্প প্রতিষ্ঠান এই সংস্থার সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্ট করে নি। বাংলাদেশ পাদুকা ব্যবসায়ী সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৩ সালে এবং বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪০০। চামড়াজাত পাদুকা তৈরিকারক এবং রপ্তানীকারকদের সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে সুন্দর বাণিজ্য পরিবেশ এবং দ্বিপাক্ষিক লাভজনক সম্পর্ক তৈরি করার জন্য চামড়াজাত পণ্য এবং পাদুকা শিল্প ও বাংলাদেশ রপ্তানি এসোসিয়েশন নামে এক সাথে এলএফএমইএবি নামে ২০০৩ সালে একটি সংগঠন তৈরি হয়।

২০০৬ সালে এপেক্স কোম্পানি পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং জাপানে পাদুকা রপ্তানি করে ৪২ মিলিয়ন ইউএস ডলার  আয় করে।  [ইশতিয়াক আহমেদ খান এবং মো ওয়াহিদুল হাবিব]