সমবায় আন্দোলন

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১১:৪১, ১৯ মার্চ ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

সমবায় আন্দোলন অভিন্ন লক্ষ্যে সক্রিয় ও সংগঠিত অনুক্রমিক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ। সমবায় অমুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হলেও এর সদস্যরা নিজেদের অর্থনৈতিক সুবিধা ও সেবা গ্রহণের উদ্দেশ্যেই এটি গঠন করে। উনিশ শতকে ইংল্যান্ডে এর শুরু এবং ওই শতকেরই শেষ দশকে বাংলা অঞ্চলে সমবায় আন্দোলন আরম্ভ হয়। সর্বপ্রথম কিছু ব্রিটিশ সিভিলিয়ান তাদের কর্মস্থল জেলাগুলিতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করে। ১৯০৪ সালের কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটিজ অ্যাক্ট পাস করে বাংলা গভর্নমেন্ট সমবায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করে। ইউরোপের সমবায়ী জনসাধারণ যেখানে সক্রিয় ও সংগঠিতভাবে তাদের নির্দিষ্ট স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ত, এখানকার সরকারি কর্তৃত্বের অধীন সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি ছিল ঠিক তার বিপরীত। সমবায় আন্দোলনের তত্ত্বগত উৎস সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানা যায় রবার্ট ওয়েন, লুইস ব্ল্যাঙ্ক, চার্লস ফোরিয়ার এবং অন্যান্যদের লেখা থেকে।

ঔপনিবেশিক পর্যায় ঔপনিবেশিক পদ্ধতির চাপে দেশের পুরুষানুক্রমিক গ্রামীণ ঋণ প্রক্রিয়া বিপর্যস্ত হয়। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে মহাজনি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ঔপনিবেশিক বণিকপুঁজির প্রভাবে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ সমাজ ঋণভারে আরও জর্জরিত হয়। উনিশ শতকের শেষাবধি কৃষিজীবী এবং অন্যান্য পেশাজীবী শ্রেণির প্রায় সকলেই অত্যধিক চড়া সুদখোর মহাজনদের হাতে জিম্মি হয়ে যায়।

কৃষক ও পেশাজীবী শ্রেণির ওপর ঋণভার বেড়ে যাওয়ায় ঔপনিবেশিক সরকার তাদের নিজস্ব সর্বরোগহর ‘কো-অপারেটিভ সোসাইটিজ’ নিয়ে এগিয়ে আসে। ১৯০৪ সালের অ্যাক্ট অনুসারে প্রতি জেলায় গঠিতব্য কো-অপারেটিভ সোসাইটি ব্যবস্থাপনার জন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিধান করা হয়। সকল সদস্য সমন্বয়ে সাধারণ সভার ওপর সমুদয় কর্তৃত্ব অর্পণ করা হয়। সাধারণ সভা ব্যবস্থাপনা কমিটি ও একজন চেয়ারম্যান নির্বাচন করে। দায়দায়িত্ব, ধারদেনা, ঋণ, বিনিয়োগ, সুদ ইত্যাদি প্রশ্নে সকল সিদ্ধান্ত এই সাধারণ সভার ওপর বর্তায়। এই আন্দোলন শুরুর প্রথম বছরগুলিতে সরকারের কাছ থেকে ধার কিংবা বেসরকারি ব্যক্তির কাছ থেকে সোসাইটিগুলির জন্য অর্থসংস্থান করা হতো এবং সদস্যরা অর্থ গচ্ছিত রাখত। সরকারি ঋণ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পর্যন্ত সুদমুক্ত করা হতো। গ্রামভিত্তিক কৃষিঋণ সোসাইটি উপযুক্ত প্রার্থীকে ঋণ দিত। জেলে ও তাঁতি সম্প্রদায়, ভোক্তা এবং কিছু শহুরে কম্যুনিটির মধ্যেও কো-অপারেটিভ সোসাইটি গঠন করা হয়। কৃষক ও পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যে এই আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। অনেক থানা ও সকল মহকুমাতেই কো-অপারেটিভ সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। অর্থযোগানদার সংস্থা, বাজারজাতকরণ এবং ভোক্তাসমাজের পক্ষে নিয়ন্ত্রক সংগঠন নিযুক্তির মাধ্যমে তাদের কর্মকান্ডের সমন্বয় সাধনের জন্য ১৯১২ সালে নতুন কো-অপারেটিভ অ্যাক্ট জারি করা হয়। নতুন অ্যাক্ট অনুসারে সকল গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বন্দরে সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক স্থাপন করা হয়। ১৯১৮ সালে কলকাতায় বেঙ্গল কো-অপারেটিভ ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২ সালে এর পুনঃনামকরণ হয় প্রাদেশিক কো-অপারেটিভ ব্যাংক। ইন্ডিয়া অ্যাক্ট অব ১৯১৯-এর অধীনে কো-অপারেটিভগুলিকে প্রাদেশিক বিষয় বলে গণ্য করা হয়। ফলস্বরূপ, ১৯২০-এর দশকে কো-অপারেটিভ আন্দোলন বিরাট প্রেরণার বিষয় হয়ে ওঠে। ১৯০৬-০৭ সনে বাংলায় কো-অপারেটিভগুলির মোট সংখ্যা ছিল ২২২। ১৯২৮ সাল নাগাদ ১১৩টি সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংকসহ এই সংখ্যা বেড়ে হয় ১৯,৭৪২। এরপরই ১৯২৯ সালে ধস নামে। বাংলাও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পতিত হয়। প্রায় সব কয়টি কো-অপারেটিভ সোসাইটিই বড় ধরনের ঘাটতির শিকার হয় এবং ব্যবস্থাপনা সংকটে পড়ে। ঋণগ্রহীতারা পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হয় এবং ঋণদাতারা তাদের গচ্ছিত টাকা তুলে নেয়।

তদুপরি বেঙ্গল কো-অপারেটিভ অ্যাক্ট ১৯৩৫ এই অন্দোলনে আরেকটি আঘাত হানে। এই অ্যাক্টের অধীনে ভিবেট সেটেলমেন্ট বোর্ড বসানো হয়। এই বোর্ড কো-অপারেটিভ সোসাইটিগুলিসহ ঋণগ্রহীতাদের ঘাড়েই দাতাদের ঋণ পরিশোধের দায় চাপায়। পুনরায় সোসাইটিগুলি মানিলেন্ডার্স অ্যাক্ট ১৯৩৯-এর অধীনে ভোগান্তির মুখে পড়ে। এই অ্যাক্টে কো-অপারেটিভগুলিকে মানিলেন্ডিং এজেন্সি হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পেশাদার মূলধন বিনিয়োগকারীরা এই বিধিনিষেধগুলি কৌশলে এড়িয়ে যেতে পারত, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগত কারণেই সোসাইটিগুলির পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। এতসব ঘটনাবলির পুঞ্জীভূত ফল হিসেবে ১৯২০-এর দশকের দ্রুত বর্ধিষ্ণু কো-অপারেটিভ আন্দোলন জড়তাগ্রস্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এভাবে ১৯২৮-২৯ সালে কো-অপারেটিভ ঋণের পরিমাণ যেখানে ছিল ১৬.৯ মিলিয়ন, ১৯৩৫-৩৬ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২.৩ মিলিয়নে। এই আন্দোলন আরেক দফা দুর্বল হয়ে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় এবং ১৯৪৩-এর মহামন্বন্তর ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে।

রাউল্যান্ড কমিটি (১৯৪৫) কো-অপারেটিভ আন্দোলনকে মৃতপ্রায় বলে ঘোষণা করে। এরপরই ক্রেডিট ইনকোয়ারি কমিশন (১৯৫০) প্রাণহীন দেহের গায়ে ‘মৃতের’ লেবেল এঁটে দেয়।

পাকিস্তান পর্যায় কো-অপারেটিভ আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ১৯৪৮ সালে একটি শীর্ষ কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্যাংক ২৬ হাজার গ্রামীণ কো-অপারেটিভ সোসাইটি বিলুপ্ত করে সেস্থলে সীমিত দায়দায়িত্বের বহুমুখী ইউনিয়ন কো-অপারেটিভ সোসাইটি চালু করে। কিন্তু কো-অপারেটিভ আন্দোলনের এই নতুন ধারণা প্রত্যাশিত ফল দেয় নি। প্রাথমিক কো-অপারেটিভ সোসাইটিগুলির সংখ্যা ৩২,৪১৮ (ইস্ট বেঙ্গল) থেকে সংকুচিত হয়ে দেশ বিভাগের সময় থেকে ১৯৬০ সালে ৫,৫৮৯-এ এসে দাঁড়ায়।

কুমিল্রার কোটবাড়িতে বাংলাদেশ একাডেমী ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট (বার্ড) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে কো-অপারেটিভ আন্দোলনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। পল্লী উন্নয়নে কো-অপারেটিভ আন্দোলনের নতুন মডেল উপস্থাপিত হয়। কুমিল্লা মডেলটি কৃষি মন্ত্রক, সমবায় বিভাগ এবং বৈদেশিক উৎসগুলি থেকেও সমর্থন পায়। এখানে অর্জিত সাফল্যে সরকার ত্রিশ হাজার কৃষকের কো-অপারেটিভ সংগঠিত করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সকল ক্ষেত্রে সমবায়ীদের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের অঙ্গীকার করে। সরকারের এই সমর্থন প্রধান-অপ্রধান সকল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কো-অপারেটিভ গঠনকে উৎসাহিত করে। ফলত, কো-অপারেটিভগুলির সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। ১৯৭০ সালে ১১টি জাতীয় পর্যায়ের, ২৪৯টি অপ্রধান ক্ষেত্রের এবং ২.৪৯ মিলিয়ন ব্যক্তিগত সদস্য সংখ্যাসহ ৩৩,৩০৬ সংখ্যক প্রাথমিক সোসাইটি গঠিত হয়।

আইএলও-র এশিয়ান কো-অপারেটিভ ফিল্ড মিশন (১৯৫৫), ক্রেডিট ইনকোয়ারি কমিশন (১৯৫৯), ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার কমিশন (১৯৬০) এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক এলিয়ট টেপার পাকিস্তান আমলের কো-অপারেটিভ আন্দোলনের সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে অনুসন্ধানী পর্যালোচনা ও গবেষণা করেন। এই সকল পর্যালোচনা একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, কো-অপারেটিভ আন্দোলন ঋণ বণ্টন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। সকলেই সরকার ও মাঠপর্যায় উভয়ের ব্যবস্থাপনা সমস্যাকে এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমবায় আইন এবং সমবায় বিভাগ সর্বদাই ছিল বিস্তার ও উৎসাহিতকরণের পরিবর্তে খুব বেশি নিয়ন্ত্রণমনস্ক। প্রাথমিক স্তরে দুর্নীতি ও অদক্ষতা ছিল সহজাত।

বাংলাদেশ পর্যায়  ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সময় সমবায়ী উদ্যোগগুলি প্রবল বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে সমবায়ী উদ্যোগকে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়। সমবায়ী মালিকানা ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রসঙ্গটি সংবিধানে স্থান পায়। ১৯৭২ থেকে দুই ধরনের সমবায়ী নীতি অনুসৃত ও অনুশীলিত হতে দেখা যায়: ১. সমবায় বিভাগের অধীনে চিরায়ত সমবায়, ২. সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির (IRDB) অধীনে দ্বিস্তরবিশিষ্ট নতুন সমবায়সমূহ। পরে এই কর্মসূচিকে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (BRDB) নামে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। আইআরডিপি কুমিল্লা মডেল অনুসরণ করে। দুই পদ্ধতির জন্যই বিপুল বিনিয়োগ বরাদ্দ করা হয়। ফলে, বাহ্যত প্রচুর সমবায় সমিতি গঠিত হতে থাকে। সমিতির সংখ্যা ৩,৩৫৬ (১৯৭১) থেকে বেড়ে ১,২৪,৬০৪ (১৯৮৮)-এ উন্নীত হয়। একক বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ৬৫,০০২টি (১৯৯৫) রেজিস্ট্রিকৃত কৃষক সমবায় সমিতি এবং একই সময়কালে ভূমিহীনদের সমিতি রেজিস্ট্রিভুক্ত হয়েছে ৩৪,৩৯৫টি, যার মধ্যে ২১,৫৫৪টিই হচ্ছে ভূমিহীন নারীদের সমিতি। বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেড শীর্ষ ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই সমবায় আন্দোলনের সহযোগী। এই ব্যাংক ২৫% সরকারি নিশ্চয়তার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় এবং তার অধিভুক্ত সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংকার্স, কো-অপারেটিভ ল্যান্ড মর্টগেজ ব্যাংকস এবং সেন্ট্রাল সুগারকেন-গ্রোয়ারস কো-অপারেটিভ সোসাইটিকে ধার দেয়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের সমবায় সমিতিগুলির সম্পদের মূল্যের পরিমাণ ছিল ৭.৯৬ বিলিয়ন, যার মধ্যে ২.৭৫ বিলিয়ন স্থাবর সম্পত্তি, ৩.৭৯ বিলিয়ন বিনিয়োগকৃত এবং ১.৪২ বিলিয়ন নগদ টাকা। সমিতিগুলি তাদের সমিতি অফিসের জন্য সরাসরি ৫০,৭২১ জন এবং মাঠকর্মী হিসেবে ১,৩৭,৪৬৪ জনকে নিয়োগদান করেছে। প্রাথমিক সমিতিগুলির বিনিয়োগে গচ্ছিত ১.০৪ বিলিয়ন এবং সংরক্ষিত তহবিল ১.৯৮ মিলিয়ন টাকা।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অভিমত এই যে, সমিতিগুলির ব্যবস্থাপক ও সদস্যদের সমবায়ী মানসিকতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত। সমবায় সমিতি, আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা এবং বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষত ইক্ষু ও দুধ উৎপাদক, জেলে ও তাঁতি এবং নারীদের সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি সমবায় আন্দোলনে বিশেষ সাফল্যের দৃষ্টান্ত।  [সিরাজুল ইসলাম]