প্রজনন-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১৬:৪২, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

প্রজনন-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবা (Reproductive Healthcare Services)  প্রজনন সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সমস্যাসমূহের সমাধান ও প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রজনন স্বাস্থ্য ও কল্যাণে অবদান রাখে এমন স্বাস্থ্যসেবা। যেসব মানুষের প্রজননের এবং প্রজননক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখার সামর্থ্য রয়েছে, যেসব মহিলা গর্ভধারণে সক্ষম ও নিরাপদে সন্তান প্রসব করতে পারেন, এবং যেসব দম্পতি গর্ভধারণ ও যৌন সংক্রমণজনিত রোগের ভয় থেকে মুক্ত হয়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন, প্রজনন স্বাস্থসেবা মূলত তাদের জন্যই।

প্রজনন স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হলো পরিসেবা, বিশেষ করে, সেবা গ্রহিতাদের শারীরগত অবস্থা বিচারে সেবার উন্নত মান নিশ্চিত করা। কর্মসূচির লক্ষ্য মহিলা, যেহেতু তারাই এসব কর্মসূচির মুখ্য ভোক্তা এবং তাদেরকে স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ গ্রহণে বড় ধরনের সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। পুরুষের দায়িত্বজ্ঞান বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং এসব কর্মসূচিতে তাদেরকে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত করতে হবে।

প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার টার্গেট গ্রুপ হলো বিভিন্ন বয়সের মহিলা ও পুরুষ, এবং যুবক-যুবতী। মহিলাদের জীবনকালে প্রজনন বিষয়ক ঘটনাদিকে বহু ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে: প্রাক-গর্ভধারণ, গর্ভধারণ, প্রসব, প্রসবোত্তরকাল, আন্তঃগর্ভধারণ, পরিরজঃনিবৃত্তি ও প্রজনন ক্ষমতারোহিত ইত্যাদি। ১৯৯৪ সালে কায়রোতে অনুষ্ঠিত জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (International Conference on Population and Development/ICPD) সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি, পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবা, তথ্য শিক্ষাদান ও উপদেশদান, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনা, প্রাক-প্রসব ও প্রসবোত্তর তথ্য সেবা, নিরাপদ মাতৃত্ব, শিশুকে স্তনদুগ্ধদান ও মহিলাদের স্বাস্থ্যের যত্ন, প্রজননে অক্ষম স্ত্রী পুরুষ ও সংক্রমিত প্রজনন নালির চিকিৎসা ও বিপজ্জনক গর্ভপাত প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা, যৌন রোগ নির্ণয় ও সেসবের চিকিৎসা ও তদসম্পর্কিত তথ্য পরিবেশন, প্রজনন স্বাস্থ্য ও দায়িত্বপূর্ণ মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব বিষয়ে শিক্ষাদান ও পরামর্শদান, স্তন ক্যানসার ও প্রজনন নালির রোগ নির্ণয় ও রোগের চিকিৎসা, এইচআইভি (HIV) সংক্রমণের বিস্তার নিরোধ ও হ্রাস, এইচআইভি সংক্রমণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

এসব সেবা কর্মসূচি মানসম্মতভাবে পর্যাপ্ত যত্নের সঙ্গে মানুষের কাছে লভ্য হওয়া বাঞ্ছনীয় কিন্তু যথার্থ অবকাঠামো না থাকার কারণে বাংলাদেশে এসব পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। ফলে এখানে পরিষেবাসমূহ সীমিত পরিমাণে দেওয়া হচ্ছে। কারণ, প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা এমন পরিস্থিতিতে লভ্য হয় যেখানে গ্রহীতাদের চাহিদা থাকে সর্বাগ্রে এবং সেসব চাহিদা মেটাতে গিয়ে কর্মসূচি পরিচালনাকারী ব্যক্তি উদ্বুদ্ধ হয়ে সমন্বিত প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলির ব্যবস্থা করেন, যদিও বাংলাদেশে বিদ্যমান বর্তমান অবকাঠামো এসব পরিষেবা প্রদানের জন্য যথেষ্ট নয়।

ভৌতিক সুবিধার দিক থেকে দেশে প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের জন্য সন্তোষজনক সুবিধা এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছে। এখানে সাধারণত প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা বা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা তিন স্তর পদ্ধতিতে প্রদান করা হয়; জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন স্তরে। বর্তমানে জেলা স্তরে ৯৩টি মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র (MCWC), উপজেলা স্তরে ৩৪৯টি মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য (MCH) এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রায় ৩,০০০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদান করছে। এছাড়া সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতি ঘরে স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছানোর লক্ষ্যে প্রায় ৩০,০০০ স্যাটেলাইট ক্লিনিক বা উপক্লিনিক বসানোর আয়োজন রয়েছে।

বর্তমানে বিদ্যমান পরিষেবার মধ্যে মহিলাদের স্বাস্থ্য পরিষেবা, পরিবার পরিকল্পনা, নিরাপদ মাতৃত্বদান, আবশ্যকীয় প্রসূতি যত্ন, ও প্রসবোত্তর সেবা প্রদান করছে। বিপজ্জনক গর্ভপাত নিরোধের মধ্যে রজঃস্রাব নিয়ন্ত্রণ, অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ নিরোধ, গর্ভপাতজনিত জটিলতার চিকিৎসা, প্রসবোত্তর সময়ে করণীয় বিষয়ে পরামর্শদান, যাদের ক্ষেত্রে মাসিক নিয়ন্ত্রণের আবশ্যকতা থাকে সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও তাদেরকে উপদেশদান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।

ঘরোয়া স্তরে গৃহ পরিসেবার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিসেবা। অনাক্রম্যকরণ, সংক্রামক ও অন্যান্য স্থানিক রোগ নিয়ন্ত্রণ যা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিসেবার জন্য প্রয়োজন এবং এসব পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ সহকারী (FWA) নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিজন সহকারীকে প্রায় ৩,৫০০ মানুষকে সেবাদান করতে হয়। পরিবার কল্যাণ সহকারীর অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৩,৫০০। এই পদের সংখ্যা এখন ২২,৫০০-তে বৃদ্ধি করা হয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের (H & FWC) স্টাফের সাহায্যে স্যাটেলাইট ক্লিনিক পরিচালিত হচ্ছে। দেশে প্রায় ৪,৫০০টি ইউনিয়ন রয়েছে এবং আনুমানিক ৩,২০০ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র সেবাদান করছে। এসব কেন্দ্র প্রসবপূর্ব যত্ন, নিরাপদ মাতৃত্বদান, স্বাস্থ্য শিক্ষা, শিশু যত্ন ও পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে পরিসেবা প্রদান করে।

উপজেলা স্তরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (UHC) প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-উত্তর যত্ন, নিরাপদ মাতৃত্বদান, পরিবার পরিকল্পনা, শিশু স্বাস্থ্যের যত্ন ও শিশুর চিকিৎসা সেবাদান করে থাকে। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা ৩১ এবং এগুলির মধ্যে ৬ টিকে শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য পরিসেবার জন্য চিহ্নিত করে রাখা হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯-১০ জন চিকিৎসক থাকেন এবং এঁরা প্রায় ২০০,০০০ মানুষকে পরিসেবাদান করেন। বাংলাদেশে উপজেলাগুলির মধ্যে ৩৮৪টি উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলি সক্রিয় রয়েছে।

গৌণ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য পরিষেবা: ৫৯টি জেলা সদরে স্থাপিত হাসপাতালগুলি আরোগ্যকর স্বাস্থ্য পরিসেবা প্রদান করছে। এসব হাসপাতালে ২০০-২৫০টি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তৃতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য পরিসেবা: বাংলাদেশের সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্নাতকোত্তর প্রাতিষ্ঠানিক হাসপাতাল (পাবলিক মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি) এবং সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন উভয় প্রকারের বিশেষজ্ঞ হাসপাতাল মিলে মোট ১৯টিতে স্বাস্থ্য পরিসেবা প্রদান করা হয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা এনজিও ও ব্যক্তি মালিকানাধীন সেক্টরগুলিও কমিউনিটিভিত্তিক চিকিৎসা পরিসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, গবেষণা ও মূল্যায়ন ও গর্ভরোধক সামগ্রীর সামাজিক বিপণন ইত্যাদির মতো কর্মকান্ডে নিয়োজিত রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের অধিকাংশ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মীকে ২০টি আঞ্চলিক কেন্দ্রে, ১২টি পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে এবং জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (NIPORT) প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

সরকার জনসাধারণের প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৯৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচি (HPSP) প্রবর্তন করেছেন। কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য, প্রসূতি ও শিশু মৃত্যু, সংক্রামক ব্যাধি, অবাঞ্ছিত প্রজনন ও সার্বিক প্রজননক্ষমতার হার কমানো, প্রথম সন্তান প্রসবকালে মহিলাদের বয়স কম রাখা ও মানুষের পুষ্টি স্ট্যাটাস পরিবর্তন ও সুস্থ জীবনধারণ পদ্ধতি প্রবর্তন এবং বাংলাদেশের অবহেলিত গ্রামীণ জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা পরিসেবা নিশ্চিত করা ইত্যাদি। কর্মসূচির জন্য প্রধান কৌশল হলো সেক্টর প্রতি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন, আবশ্যকীয় পরিসেবা প্যাকেজ প্রদান, ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ, কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন ও সহায়ক পরিসেবাদান ইত্যাদি। দেশে স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির অধীনে প্রায় ১৩,৫০০ সংগঠন থাকবে এবং ৩,১৭৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ ক্লিনিক বিদ্যমান থাকা সত্বেও আরও ৭৭৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ ক্লিনিক নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি ক্লিনিক প্রায় ৬,০০০ মানুষকে পরিসেবাদান করবে।

প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবা (Maternity health services)  বাংলাদেশে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব’ ঝুকিহীন নয় এবং প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় পয়ত্রিশ লক্ষ শিশু জন্মগ্রহণ করে এবং এই জন্ম সংখ্যার প্রতি হাজারে কমপক্ষে প্রায় পাঁচজন প্রসূতি অন্তঃসত্ত্বাকালীন এবং শিশু জন্মদানের সময়কালীন জটিলতার কারণে মৃত্যুবরণ করে। এক হিসাব থেকে জানা যায় যে প্রতি বছর গর্ভধারনের পর চল্লিশ লক্ষ মহিলার মধ্যে প্রায় ছয় লক্ষ মহিলার দেহে জটিলতা দেখা দেয়। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রসব সুযোগ সুবিধার যথাযথ ব্যবহার এখনও পর্যন্ত সুপারিশকৃত ‘ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য মাত্রা’র অনেক নীচে অবস্থান করছে। সুযোগ সুবিধা প্রত্যাশি প্রায় পাঁচ লক্ষ প্রসবসংক্রান্ত জটিলতার মধ্যে মাত্র পাঁচ শতাংশ চিকিৎসা সুবিধাদি পেয়ে থাকে। মোট অন্তঃসত্বা মহিলাদের মধ্যে মাত্র ২৭.৫ শতাংশ কিছু প্রাক প্রসবকালীন যত্ন পেয়ে থাকে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সুবিধা লাভ করে মাত্র ৩.৫ শতাংশ এবং দশ শতাংশের চেয়েও কমসংখ্যক প্রসূতি প্রশিক্ষিত চিকিৎসা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহযোগীতা পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শতকরা ছিয়ানববই ভাগ প্রসবের ব্যবস্থা বাড়িতে করা হয় এবং মাত্র ছাবিবশ শতাংশ প্রসব পরিচালনা করার জন্য ধাত্রী বা ট্রেইনড বার্থ এটেনডেন্ট (TBA) নিয়োগ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রসবের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ধাত্রীদের মাত্র ছয় শতাংশ ব্যবহার করা হয়।

দেশে প্রসূতির মৃত্যু প্রতিরোধ এবং প্রসূতির স্বাস্থ্য উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো প্রসূতির স্বাস্থ্য চিকিৎসার সেবার সকল প্রকার মৌলিক উন্নতিসাধন করা। মহিলারা যখন গর্ভধারণ করে তখন থেকে প্রাক প্রসবকালীন যত্ন শুরু হয় এবং প্রসব মুহূর্তের পূর্ব পর্যন্ত এই সেবা প্রদান চলতে থাকে। এই জাতীয় সেবার মধ্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরামর্শ এবং যেকোন অভিযোগের ভিত্তিতে চিকিৎসা ও টিকা প্রদান অন্তর্ভূক্ত। প্রসবের পরে স্বাভাবিক প্রসূতিক অবস্থা সাধারণত ছয় সপ্তাহ হয়ে থাকে যে সময়ে প্রসূতির শারীরিক অবস্থা প্রাক-অন্তঃসত্ত্বা পর্যায়ে উপনীত হয়। এ সময়ে প্রসূতির তত্ত্বাবধানকে প্রসবোত্তর সেবা বলা হয়ে থাকে। প্রসবোত্তর সেবা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ এই সময়ে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে।

সাধারণত থানা এবং জেলা পর্যায়ের প্রসূতি এবং শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলি থেকে প্রাক-প্রসবকালীন সেবা প্রদান করা হয়। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রাক-প্রসবকালীন রোগীদেরকে জেলা হাসপাতাল বা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে যাওয়ার সুপারিশ প্রদান করা হয়। তবে প্রসবোত্তর যত্ন প্রদান এবং প্রসবোত্তর যেকোন জটিল অবস্থায় রোগীকে জেলা হাসপাতাল ও চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করা হয়।

প্রসূতির যত্ন প্রদানের আরও একটি উপায় হলো সামাজিক পর্যায়ে প্রসূতি সেবার বন্দোবস্ত করা। এই ধরনের যত্ন সাধারণত অধিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবের ঘটনাগুলোকে যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে পরিবার কল্যান কর্মী এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীদের দ্বারা সম্পন্ন করা হয়। প্রসব ঘটনার শতকরা প্রায় পঁচিশ ভাগ ধাত্রীদের দ্বারা করা হয় এবং তা সত্ত্বেও এটি মোট প্রসব ঘটনার পাঁচ শতাংশের চেয়েও কম। বাংলাদেশে ১৯৭৯ সাল থেকে সনাতন ধাত্রীগণকে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সর্বমোট ৪২,২৮৫ জন ধাত্রী প্রশিক্ষণ লাভ করেছে। বর্তমানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীর মোট সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি।

সাম্প্রতিককালে দেশে প্রসূতি সেবা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার জন্য সরকার ইউনিসেফ এবং ইউএনএফপিএ (UNFPA) থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সহযোগীতায় জরুরিভিত্তিক প্রসবকালীন সেবা (Emergency Obstetric Care/EOC) প্রদানের কার্যক্রম শুরু করেছে।

পরিকল্পনা পর্যায় পরিকল্পনা কার্যক্রম
জেলা ব্যাপক EOC, সকল মৌলিক EOC কার্যাবলী, সিজারিয়ান, রক্ত প্রদান
থানা মৌলিক EOC, অক্সিটক্সিক (ইনজেক্টেবল), অ্যান্টিবায়োটিক (ইনজেক্টেবল), অমরা অপসারণ, যোনিপথে প্রসবে সহায়তা, যানবাহনের পরামর্শ ও ব্যবস্থা প্রদান, ভ্যাকুয়াম এসপিরেশন।
ইউনিয়ন প্রসবকালীন প্রাথমিকসেবা, অ্যান্টিবায়োটিক (ইনজেক্টেবল), যানবাহনের পরামর্শ ও ব্যবস্থা প্রদান, ভ্যাকুয়াম এসপিরেশন
সমাজ (community) সামাজিক শিক্ষা, জটিলতা চিহ্নিতকরণ, চিকিৎসা সুবিধা প্রদানের যথার্থ সময় নির্বাচন, চিকিৎসা সুবিধা, যানবাহন এবং অর্থের বন্দোবস্ত করা, রক্তদাতার বন্দোবস্ত করা।

১৯৯৫ থেকে ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রসূতি মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস করার জন্য নিম্নলিখিত পরিকল্পনা উপাদান সুপারিশ করা হয়।

জরুরিভিত্তিক প্রসবকালীন সেবা কার্যক্রমের আওতায় আরও অধিক সংখ্যক এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ‘জরুরি প্রসবকালীন সেবা শক্তিশালীকরণ’ নামাঙ্কিত আরেকটি পরিকল্পনা কার্যক্রম কয়েকটি জেলায় শুরু করা হয়েছে। ইউনিসেফের আর্থিক সহযোগিতায় এই কার্যক্রমটি চালু রয়েছে এবং সরকার এগারটি জেলা হাসপাতালে ব্যপক EOC সেবা, আটষট্টিটি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৌলিক জরুরিভিত্তিক প্রসবকালীন সেবা এবং পরিকল্পনা কার্যক্রম এলাকায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলিতে EOC প্রাথমিক সেবা কার্যক্রম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

প্রসূতি মৃত্যুহার (Maternal mortality)  প্রতি এক লক্ষ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে বছরে যত জন নারী মৃত্যুবরণ করে সেটিই প্রসূতি মৃত্যুর হার। গর্ভাবস্থায় অথবা প্রসবের ৪২ দিনের মধ্যে কোন নারীর মৃত্যু হলে, সেটি যতদিনেরই গর্ভধারণ হোক না কেন এবং গর্ভ বা গর্ভকালীন জটিলতার ফলে যদি কোন মায়ের মৃত্যু হয়, সেটি এ হিসেবে ধরা হয়। কোন দুর্ঘটনা বা অন্য কোন ঘটনায় মৃত্যু হলে তা এ গণনায় নেওয়া হয় না। বাংলাদেশে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতিহাজারে ২ দশমিক ৯ মা মারা যায়। এখনো ৮৫ শতাংশেরও বেশি শিশুর জন্ম বাড়িতে, অপ্রশিক্ষিত ধাত্রীদের হাতে হয় বলে ’সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র একটি বড় লক্ষ্য ২০১৫ সালের মধ্যে প্রসবকালীন মৃত্যুর হার প্রতি এক লাখে ৩৪৮ থেকে ১৪৩ জনে কমিয়ে আনতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর পাঁচ লক্ষ নারী গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মদানকালে মৃত্যুবরণ করে, এর মধ্যে প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ মৃত্যুই উন্নয়নশীল দেশে ঘটে। একটি সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট নারী জনসংখ্যা হচ্ছে ৬০.৪ মিলিয়ন এবং এর মধ্যে প্রায় ৮২ ভাগই গ্রামাঞ্চলে বাস করে। আর বিবাহিতা মেয়েদের মধ্যে ২৪.৫ মিলিয়নের বয়স গর্ভধারণের উপযুক্ত। ২০০৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩৫ মিলিয়নে দাঁড়াবে বলে অনুমান করা হয়েছিল। বাংলাদেশে ১৯ বছর বা তার নিচের বয়সের শতকরা ৫০ ভাগ মেয়েই বিবাহিতা এবং গড় মধ্যক ১৮ বছরের কাছাকাছি। আরও হিসাব করা হয়েছে যে এসব গর্ভধারণের মধ্যে শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ অপরিকল্পিত এবং শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ গর্ভধারণই অবাঞ্ছিত। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মায়েরই প্রসবপূর্ব যত্ন লাভের কোন সুযোগ নেই এবং তিন চতুর্থাংশ মা গর্ভকালীন সময়ে সন্তান প্রসবপূর্ব যেসব সেবা যত্ন প্রয়োজন তা পায় না। এমনকি যারা এই যত্ন পেয়ে থাকে তাদের মধ্যেও শতকরা ২০ ভাগ ডাক্তারদের কাছ থেকে, শতকরা ৭ ভাগ নার্সদের বা মহিলা ধাত্রী বা পারিবারিক স্বাস্থ্য কল্যাণ পরিদর্শকদের কাছ থেকে এবং শতকরা ১ ভাগ মহিলা প্রচলিত দাইদের কাছ থেকে প্রসবপূর্ব সেবা বা পরামর্শ পেয়ে থাকে।

বিভিন্ন কারনে প্রসূতি মৃত্যুর আপেক্ষিক শতকরা হিসাব

প্রসবপূর্ব সেবা যত্নের ব্যাপারে শহরাঞ্চলে ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে পার্থক্য বিরাট। শহরাঞ্চলে শতকরা ৫৮ ভাগ জন্মের ক্ষেত্রে মায়েরা চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা পেয়ে থাকেন। এর তুলনায় গ্রামাঞ্চলে মাত্র শতকরা ২৩ ভাগ এটি পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক তদারকিতে সন্তান প্রসব হয়ে থাকে মাত্র শতকরা ৫ ভাগ ক্ষেত্রে এবং বাকী সকলেই বাড়ীঘরে সনাতন দাই অথবা বয়স্ক মহিলাদের উপস্থিতিতে সন্তান জন্ম দিয়ে থাকে। প্রসবের সময় শতকরা ৬৭ ভাগ মায়ের ক্ষেত্রে আনাড়ি লোকজন এবং ৩২ ভাগের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত লোকজনের সহায়তা পেয়ে থাকে। শতকরা ১.৬ ভাগ প্রসবের ক্ষেত্রে কোন সহায়তাই পায় না। প্রসূতি মৃত্যুর হার একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা এবং একটি বিশাল সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ।

সরকারি হিসাব মতে প্রতি ১,০০০ জীবন্ত প্রসবের ক্ষেত্রে প্রসূতি মৃত্যুর বর্তমান হার ৪.৭ অর্থাৎ প্রতি বছর জাতীয়ভাবে ২৮,০০০ প্রসূতির মৃত্যু হয় যা কিনা ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের তুলনায় ১০০ গুণ বেশি। প্রসূতি মৃত্যুর প্রধান কারণগুলির মধ্যে প্রসবের পরে সংঘটিত রক্তক্ষরণ, গর্ভপাত, প্রসবকালীন প্রতিবন্ধকতা, ক্ষতজনিত পচন, একলেমশিয়া এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা।

প্রসূতি মৃত্যু ছাড়াও গর্ভবতী মায়ের ব্যধিগ্রস্ততার অন্যান্য অসংখ্য কারণ আছে। এদের মধ্যে আছে অপুষ্টি এবং রক্তশূন্যতা, সংক্রমণ, রক্তনালি ও যোনিপথের ঘা, পায়ুপথ ও যোনিপথের নালি ঘা, জরায়ুর স্থানচ্যুতি, ডায়াবেটিস, নিরাপদ প্রসবের অভাব এবং হাতুড়ে লোকের দ্বারা সংঘটিত গর্ভপাত। মৃত্যুর তথ্যসমূহ কেবল ঘটনার ভয়াবহতার আংশিক চিত্র মাত্র। কারণ মৃত্যুর ঘটনা বেশির ভাগই অজানা থাকে। প্রসবকালীন মৃত্যু বা গর্ভজনিত ব্যধিগ্রস্ততার সংখ্যা কমানোর প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে নিরাপদ মাতৃত্বের পরিসেবা বৃদ্ধি বা নিশ্চিত করে ও পরিবার পরিকল্পনার অগ্রগতি সাধন করে এবং নিরাপদ ও সহায়ক সেবা প্রদান নিশ্চিত করে। জনসাধারণের বিশেষ করে প্রান্তীয় বা সামাজিক পর্যায়ে জরুরী প্রসূতিবিদ্যা বিষয়ক সেবা যত্ন যাতে সহজলভ্য হতে পারে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি পায় সে ব্যবস্থা করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শিশু মৃত্যুহার (Perinatal mortality)  বাংলাদেশে মা ও শিশু মৃত্যু একটি মারাত্মক সমস্যা। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ মৃত্যু ঘটে থাকে এই বয়স সীমার মধ্যে। নবজাতক, এক বছরের কম বয়সী এবং পাঁচ বছরের নীচের শিশুদের মৃত্যুহার মোটামুটি প্রতি হাজার জীবিত জন্মগ্রহণকারী শিশুর ক্ষেত্রে ৮০, ৬৬ এবং ১১২ জন। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর প্রাথমিক কারণগুলি হচেছ অপুষ্টি, ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের তীব্র প্রদাহ, নবজাতকের ধনুষ্টংকার এবং হাম (measles)। ছয় মাস থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের শতকরা ৯৪ জনই ভোগে নানা ধরনের অপুষ্টিতে। নতুন জন্মগ্রহণকারী শতকরা ৩০ থেকে ৫০ জন শিশু জন্মগ্রহণ করে আড়াই কেজির চেয়ে কম ওজন নিয়ে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শতকরা ২০ ভাগের মৃত্যুর কারণ হলো শ্বাসতন্ত্রের তীব্র সংক্রমণ, বিশেষ করে নিউমোনিয়া। এ সঙ্গে শতকরা প্রায় ১৭ জন শিশু মৃত্যুবরণ করে ভ্যাকসিন দ্বারা প্রতিরোধ করা যায় এমন রোগ থেকে।

বাংলাদেশে জন্মকালীন শিশু মৃত্যুর পরিসংখ্যান মোটেও সহজ লভ্য নয়। এ থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গবেষণার অভাব রয়েছে। জন্মকালীন শিশু মৃত্যুতে ধরা হয় গর্ভস্থ ২৮ সপ্তাহের বেশি বয়সী শিশু এবং জন্মের সাত দিনের মধ্যে মৃত্যুবরণকারী নবজাত শিশু। জন্মকালীন শিশু মৃত্যুর কারণসমূহকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলি হলো গর্ভ পূর্ববর্তী, গর্ভকালীন এবং গর্ভ পরবর্তী। গর্ভ পূর্ববর্তী কারণগুলি হলো ১. মায়ের উচচরক্তচাপ, হূদরোগ, ডায়াবেটিস, যক্ষ্মা, রক্তস্বল্পতা; ২. তলপেটের রোগ - জরায়ূর সংক্রমণ, এন্ডোমেটরিয়োসিস (endometriosis), ডিম্বাশয়ের টিউমার; ৩. শারীরিক বৈকল্য - মাতৃগর্ভের অস্বাভাবিকতা, অসম্পূর্ণ জরায়ূর মুখ; ৪. এন্ডোক্রাইন (endocrine) অস্থিতি এবং মাতৃগর্ভের অপর্যাপ্ত প্রস্ত্ততি; ৫. ব্লাড গ্রুপ ম্যাচ না করা; ৬. অপুষ্টি; ৭. গর্ভকালীন বিষক্রিয়া; ৮. প্রসব পূর্ব (anti-partum) রক্তক্ষরণ; ৯. জন্মগত বিকৃতি এবং ১০. কম বয়সে মা হওয়া। গর্ভকালীন মৃত্যুর কারণগুলি হলো জন্মকালীন আঘাত, শ্বাসকষ্ট; জন্মের দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রসবকালীন জটিলতা। গর্ভ পরবর্তী কারণগুলি হলো শিশুর অপরিপক্কতা; শ্বাস আটকে যাওয়া; শ্বাসতন্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণ এবং জন্মগত বিকৃতি।

উপরে উল্লিখিত কারণসমূহ শিশুমৃত্যুকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করলেও জন্মকালীন শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ ১. মাতৃগর্ভে শ্বাসকষ্ট, ২. জন্মের সময় শ্বাসকষ্ট, ৩. জন্মকালীন কম ওজন, ৪. জন্মকালীন আঘাত এবং ৫. নবজাতকের সংক্রমণ।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি হাজার জীবিত জন্মগ্রহণকারী শিশুর মধ্যে ১২ জন শিশু মারা যায় জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে, তাদের মধ্যে ৮ জন শিশু মারা যায় জন্মের সময় আঘাতজনিত কারণে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তিকৃত ৬৯৫ জন নবজাত শিশুর মধ্যে ২৩১ জন বা শতকরা ৩৩ জন শিশু মারা গেছে জন্মের সময় শ্বাসকষ্টজনিত কারণে। [সৈয়দা ফিরোজা বেগম]

গর্ভপাত (Abortion)  সন্তান প্রসবের পূর্বে গর্ভাবস্থার পরিসমাপ্তি। চিকিৎসাবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী সর্বশেষ স্বাভাবিক রজঃস্রাবকালের প্রথম দিন থেকে শুরু করে প্রথম ২৮ সপ্তাহ গর্ভকাল পর্যন্ত সময়ের ভিতরে ভ্রূণ বিনষ্টিকে গর্ভপাত বলা হবে। তলপেট খিঁচুনি ও কখনও কখনও কোষ পিন্ড বা টুকরোসহ যৌনাঙ্গ থেকে রক্তপাত ক্ষরণ ইত্যাদি গর্ভপাতের উপসর্গ। গর্ভপাতের নানা কারণ রয়েছে। এসবের মধ্যে ভ্রূণের ত্রুটিপূর্ণ বিকাশ, অমরার অস্বাভাবিকতা, অন্তঃস্রাবী গ্রন্থির কর্মকান্ডে বিশৃংঙ্খলা, তীব্র সংক্রামক ব্যাধি, মারাত্মক আঘাত ইত্যাদি সাধারণ কারণসমূহের অন্যতম। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে বংশগতিক ও অনাক্রম্যতার ফ্যাক্টর, জরায়ু সম্পর্কিত সমস্যাসমূহ এবং নির্দিষ্ট কতকগুলি ওষুধ ব্যবহার ইত্যাদি। গর্ভপাত দুই ধরনের: স্বতঃস্ফূর্ত বা প্রাকৃতিক অর্থাৎ যে গর্ভপাত ইচ্ছাকৃত হস্তক্ষেপ করার মাধ্যমে হয় না; এমনকি বাহ্যিক কারণ, যেমন, আঘাত, দুর্ঘটনা বা রোগের কারণে হলেও তা পা্রকৃতিক গর্ভপাত হিসেবে গণ্য হয়; এবং সংঘটিত গর্ভপাত, এক্ষেত্রে যে কোন উপায়ে গর্ভধারিণীর স্বীয় ইচ্ছাক্রমে তারই হস্তক্ষেপে বা অন্য কারো দ্বারা গর্ভধারণের পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়। সচরাচর জরায়ুগ্রীবার প্রসারণ ঘটিয়ে ও জরায়ু খালি করে স্বেচ্ছাকৃত গর্ভপাত করানো হয়।

উন্নয়নশীল দেশে সাধারণত বিশেষজ্ঞ শল্যচিকিৎসক উন্নত চিকিৎসা ও ব্যবচ্ছেদের সাহায্যে স্বেচ্ছা গর্ভপাত ঘটিয়ে থাকেন। এর পাশাপাশি সনাতন চিকিৎসক, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা স্বয়ং গর্ভবতী মহিলা কর্তৃক সাবেক ক্ষতিকর কৌশল প্রয়োগ করেও স্বেচ্ছা গর্ভপাত ঘটানো হয়।

শল্যচিকিৎসার পদ্ধতিসমূহের মধ্যে রয়েছে vacuum aspiration, প্রসারণ, জরায়ুচ্ছেদন (hysterotomy) এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জরায়ুকর্তন (hysterectomy)। অভিশ্বসন পদ্ধতিতে জরায়ুতে একটি ছোট নল (cannula) ঢোকানো হয় এবং ৮ সপ্তাহের গর্ভধারণকালের মধ্যে একটি বায়ু শোষণকারী সিরিঞ্জ অথবা ১০-১২ সপ্তাহের গর্ভধারণকালের মধ্যে ছোট বিদ্যুৎচালিত মোটর পাম্পের সাহায্যে জরায়ুর ভিতরের বর্দ্ধিষ্ণু ভ্রুণকে টেনে বের করে আনা হয়। এক্ষেত্রে জরায়ুগ্রীবা নালির সামান্য প্রসারণ ঘটাতে হয়, এবং সাধারণত রোগীর অনুভূতি বিলোপ করার প্রয়োজন পড়ে না। গর্ভধারণের এক তৃতীয়াংশ সময় পূর্ণ হওয়ার পূর্বে অথবা প্রথম তিন মাস সময়ের মধ্যে দক্ষ চিকিৎসক দ্বারা এই গর্ভপাত সম্পন্ন করানো হয়। এটিকে গর্ভপাত ঘটানোর সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি বলেও বিবেচনা করা হয়। প্রসারণ পদ্ধতিতে রোগীর সার্বিক অনুভূতি বিলোপ করে এবং ধাতু নির্মিত ধারালো চাঁচন যন্ত্রের সাহায্যে জরায়ুগ্রীবা নালি প্রসারণপূর্বক গর্ভসঞ্জাত বস্ত্তসমূহ বের করে ফেলা হয়। স্বাস্থ্য পরিসেবা কেন্দ্রে অপারেশনের এই ইউনিট সাধারণত থাকে এবং কেন্দ্রগুলিতে হরহামেশা উপরিলিখিত পদ্ধতিতে গর্ভপাত ঘটানো হয়। এটি অভিশ্বসন পদ্ধতি থেকে অধিক কষ্টদায়ক, কারণ, এতে জরায়ুগ্রীবা নালির ব্যাপক প্রসারণ ঘটাতে হয়।

বাংলাদেশে কখনও কখনও আনাড়ি গর্ভপাতকারী ও গর্ভবতী মহিলারা নিজে বহু ধরনের অদক্ষ ও সচরাচর ক্ষতিকর পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে গর্ভপাতের চেষ্টা করে। পদ্ধতিগুলির মধ্যে থাকে উদ্ভিজ্জ উপাদানে তৈরি ভেষজ ও অন্যান্য ঔষধ যেমন, কুইনাইন, পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, আর্গট, পারদ, লেড অক্সাইড, জলপাইয়ের তেল ইত্যাদি। যৌনাঙ্গে সিরিঞ্জ বা ডুশ দিয়ে প্রবেশ করানো সাবান পানি বা গৃহের জীবাণুনাশক তরল পদার্থও অনেক সময় গর্ভপাতক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে গর্ভবতী মহিলার জরায়ুতে বাইরের জিনিস যেমন, গাছের কচি কান্ড, রাবার বা প্লাস্টিকের ফাঁপা নল, এমনকি তারের টুকরো পর্যন্ত ব্যবহার করার নজির আছে। গ্রামীণ গর্ভপাতকারী কর্তৃক ব্যবহূত অপর একটি পদ্ধতিতে হাত বা পা দিয়ে গর্ভবতী মহিলাদের তলপেটে ম্যাসেজ বা মর্দন করা হয়। মর্দনের ফলে রক্তপাত ঘটে এবং এতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে ভিতরের অঙ্গসমূহের ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশে দুটি শিক্ষাদানরত হাসপাতাল, দুটি জেলা হাসপাতাল ও চারটি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ৮ টি কেন্দ্রে ৬১০ জন মহিলার ওপর গবেষণায় দেখা যায় যে, বিপুল সংখ্যক মহিলা এই ধরনের বিপজ্জনক কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। গর্ভপাতে ব্যবহূত পদ্ধতিসমূহ হলো:

পদ্ধতি শতাংশ
জরায়ুতে কঠিন পদার্থ নির্মিত কাঠি ঢোকানো ৩২.৫
ইনজেকশন/টেবলেট/ক্যাপসুল/খাওয়ার বড়ি ২৬.৬
দেশিয় টেবলেট/মিশ্রণ ১৭.৫
অভিশ্বসন/মাসিক নিয়ন্ত্রণ ২২.১
প্রসারণ ও চাঁচন ৪.৬
জরায়ুর ভিতরে পরি-নিষেচন ২.৩
তলপেটে চাপদান ০.৬
অন্যান্য উপায়ে ২.৯

যদিও সঠিক সংখ্যা জানা যায় না, অনুমিত হয় যে, পৃথিবীব্যাপী প্রতি বছর প্রজননক্ষম বয়সে ১,০০০ মহিলার মধ্যে ৪০-৭০ জনে গর্ভপাত হয় এবং সব গর্ভবতীর এক পঞ্চমাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশে গর্ভের পরিসমাপ্তি ঘটে। পৃথিবী জুড়ে প্রতি বছর অনুমিত ৩-৩.৫ কোটি গর্ভপাতের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে অর্ধেকেরও বেশি গর্ভপাত ঘটে। ল্যাটিন আমেরিকা ও এশীয় দেশগুলিতে জরিপে দেখা গেছে যে, প্রতি ৩ বা ৪ জন গর্ভবতী মহিলার মধ্যে অন্তত একজনে স্বেচ্ছা গর্ভপাত ঘটানো হয়। প্রায় ১৯টি দেশের জরিপ উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে দেখা গেছে যে, শুধু ল্যাটিন আমেরিকায় প্রতি বছর ৩৪ লক্ষের কাছাকাছি গর্ভপাত করানো হয়।

গর্ভবতী মহিলার জীবন বাঁচানো বা মারাত্মক বিপদ থেকে তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে গর্ভপাত আইনসঙ্গত। বাংলাদেশে যদিও স্বেচ্ছা গর্ভপাত অবৈধ, গর্ভবতী মহিলার জীবন বাঁচানো ছাড়া, হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড ও গ্রামীণ স্বাস্থ্য কর্মীদের জরিপের সূত্রে গর্ভপাত বহুদৃষ্ট হয় এবং দেখা যায় যে, গর্ভপাতই বিপুল সংখ্যক প্রসূতি মৃত্যুর জন্য দায়ী। যদিও বাংলাদেশে স্বেচ্ছা গর্ভপাতকে আইনভঙ্গজনিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এর জন্য কয়েক বছরের কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, কিন্তু বিগত শতকের শেষার্ধ জুড়ে এই আইন কদাচিৎ বলবৎ করা হয়েছে। সাধারণত স্বেচ্ছা গর্ভপাতের সংখ্যা গ্রামীণ মানুষের তুলনায় শহরবাসীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশি।

সারণি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া স্বাভাবিক ও স্বেচ্ছায় গর্ভপাতের রোগীদের মধ্যে নানা ধরনের সংক্রমণ বা অন্যান্য জটিলতার নমুনা

সংক্রমণের ধরন স্বাভাবিকগর্ভপাত (%) স্বেচ্ছাগর্ভপাত (%) সকলগর্ভপাত (%)
সংক্রমণ ঘটে না ৯০.০ ৭৫.০ ৭৯.০
স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত
অন্তর্জরায়ু প্রদাহ (শুধু জরায়ুতে) ৬.৯ ১৭.৬ ১৪.১
ডিম্বনালি-ডিম্বাশয় প্রদাহ ০.৭ ২.২ ১.৯
জীবন সংশয়ী সংক্রমণ
সেপটিসেমিয়াজনিত ক্ষত ১.২ ২.২ ১.৯
ধনুষ্টঙ্কার ও অন্যান ১.২ ৩.০ ৩.১
গর্ভপাতজনিত সার্বিক রোগীর সংখ্যা ৪১৯ ৮৫২ ১২৭১

উৎস  BAPSA  প্রতিবেদন ৫, জুলাই, ১৯৯১।

বাংলাদেশে গর্ভপাত সংক্রান্ত বাৎসরিক মৃত্যুর সংখ্যা আনুমানিক ৮,০০০ হাজার। দেশের গ্রামাঞ্চলে ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিচালিত জরিপ সূত্রে জানা যায়, উচ্চহারে সকল প্রসূতি মৃত্যুর জন্য গর্ভপাতজনিত জটিলতাই দায়ী। প্রায় ১,১০০ স্বাস্থ্যকর্মী পরিচালিত সাক্ষাৎকারে জানা যায় ১,৫৯০টি গর্ভপাতজনিত জটিলতায় প্রায় ৪৯৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায় যে, হাসপাতালে প্রসূতি ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগে ভর্তি হওয়া রোগীর শতকরা ১২-২৭ ভাগ গর্ভপাতজনিত। হাসপাতালের শতকরা প্রায় ৯ ভাগ শয্যা কেবল এদের জন্য বরাদ্দ করতে হয়।

বাংলাদেশে বিপজ্জনকভাবে গর্ভপাত ঘটানোর কারণে প্রসূতির ভয়াবহ ক্ষতি অব্যাহত রয়েছে, ফলে বার্ষিক প্রায় ৮,০০০ প্রসূতি মারা যায়। অধিকাংশ গবেষণায় দেখা যায় যে, গর্ভপাতজনিত জটিলতা এক-চতুর্থাংশ প্রসূতি মৃত্যুর জন্য দায়ী। বাংলাদেশে উচ্চহারে গর্ভপাতজনিত দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, বাল্যবিবাহ, স্বাস্থ্য সমস্যা ও অন্যান্য সামাজিক পরিস্থিতিও অবদান রাখে বলে মনে করা হয়।  [এস.এম হুমায়ুন কবির]