ওয়াইজ, জেমস

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১২:১৭, ৭ জুলাই ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

ওয়াইজ, জেমস উনিশ শতকের ষাটের দশকে ঢাকার সিভিল সার্জন ও লেখক। শুধু চিকিৎসাশাস্ত্রেই নয় ইতিহাসেও তাঁর আগ্রহ ছিল। ব্লকম্যানের কন্ট্রিবিউশনস টু দি জিওগ্রাফি অ্যান্ড হিস্ট্রি অব বেঙ্গল-র জন্য তিনি বেশ কয়েকটি শিলালিপির ছাপ পাঠিয়েছিলেন। আলেকজান্ডার কানিংহাম যখন  সোনারগাঁওবিক্রমপুর সফরে আসেন তখন ওয়াইজ শুধু তাঁর জন্য নৌকা ও হাতির ব্যবস্থাই করেন নি, তাঁর সফরসঙ্গীও হয়েছিলেন। ওয়াইজের পান্ডিত্য ও সাহচর্য কানিংহামের সফরকে ফলপ্রসূ করেছিল।

উনিশ শতকে ঢাকা শহরে তিনজন ওয়াইজ পরিচিত ছিলেন। একজন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ, একজন সিভিল সার্জন এবং একজন নীলকর। পূর্ববঙ্গে নীলকর ওয়াইজের বিস্তৃত জমিদারি ছিল। তাঁরই নামানুসারে বুড়িগঙ্গা নদী তীরের ওয়াইজ ঘাটের নাম করা হয়েছিল। নীলকর ওয়াইজের এ ভবন থেকেই বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর যাত্রা শুরু। পরবর্তীকালে সিভিল সার্জন জেমস ওয়াইজও এ বাড়িতে বাস করতে শুরু করেন। অনেকেই সিভিল সার্জন ওয়াইজকে নীলকর ওয়াইজ বলে ভুল করেন। ডা. ওয়াইজের পুরো নাম ছিল জেমস ফওনস নর্টন ওয়াইজ। তাঁর রচিত গ্রন্থ ও প্রবন্ধে তিনি শুধু নামের প্রথম ও শেষাংশ ব্যবহার করেছেন।

ওয়াইজ রচিত গ্রন্থের নাম নোটস অন রেসেস, কাস্টস অ্যান্ড ট্রেডস অব ইস্টার্ণ বেঙ্গল। গ্রন্থের মালমসলা ডা. ওয়াইজ ঢাকায় থাকতেই জোগাড় করেছিলেন। পরবর্তীকালে লন্ডনে অবসর জীবন যাপন কালে পান্ডুলিপি রচনা করে তিনি তা মুদ্রণ করেন। ১৮৮৩ সালে লন্ডনের সেন্ট মার্টিনস লেনের ‘হার ম্যাজেস্টিস প্রিন্টার হ্যারিসন অ্যান্ড সন্স’ থেকে এটি মুদ্রিত হয়। নামপত্রে মুদ্রিত হয়েছিল ‘নট পাবলিশড’। সুতরাং গ্রন্থটি অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য। সম্প্রতি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ নামে এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া নোটস অন সোনারগাঁও এবং নোটস অন বারো ভূঁইয়াস নামে ডা. ওয়াইজের দুটি প্রবন্ধ জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-এ ১৮৭৪ সালে ছাপা হয়।

‘মুহামেডান’, ‘রিলিজিয়াস সেক্টস অব দি হিন্দুজ’, ‘হিন্দু কাস্টস অ্যান্ড অ্যাবরিজিনাল রেসেস’, ‘আর্মেনিয়ানস’ ও ‘পর্তুগিজ ইন ইস্টার্ণ বেঙ্গল’ এ পাঁচ ভাগে গ্রন্থটি বিভক্ত। তিনি ‘রেস’ শব্দটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহার করেছেন। ‘কাস্ট’ শব্দ দ্বারা তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের ‘বর্ণ’ প্রথাকে বুঝিয়েছেন। ওয়াইজ মুসলমান সম্প্রদায়েও আশরাফ-আতরাফ ভেদাভেদের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি হিন্দুদের ধর্মীয় সম্প্রদায় শৈব ও বৈষ্ণবদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাঙালি জাতি গঠনে তিনি আদিবাসীদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসের ওপর অনার্য প্রভাবের ছাপ যে কত গভীর তাও তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। বাংলার হিন্দু ধর্মের ওপর স্থানীয় গ্রামদেবতা, মাটি ও জলের দেবতা, বনদেবতা ইত্যাদির প্রভাব তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে। ওয়াইজ উল্লেখ করেছেন যে, বাংলায় বৈষ্ণবদের এগারোটি শাখা ছিল। এসব শাখার অনেকগুলিই এখন লুপ্ত। সুতরাং এ সম্পর্কে ওয়াইজের জরিপের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি নিম্নবর্গের মধ্যে ত্রিনাথ পূজা ও ত্রিনাথ মেলার জনপ্রিয়তার কথা বলেছেন। নিম্নবর্গের জনসাধারণের ওপর ব্রাহ্মণদের প্রভাব কমে আসার বিষয়টিও তাঁর গোচরে এসেছে। আর্মেনীয় ও পর্তুগিজগণ কিভাবে বাংলায় এলো এবং বাংলায় তারা কীভাবে বসবাস করেছে তাও তাঁর গ্রন্থে সংক্ষেপে আলোচিত হয়েছে।

ওয়াইজের বইটি মুদ্রিত হয়েছে একশ বছরেরও আগে। ওই সময় যে নৃতাত্ত্বিক চর্চা শুরু হয়েছিল, এখন তা অনেক দূর এগিয়েছে, অনেক প্রত্যয় ও সংজ্ঞা বদলে গেছে। ফলে, বর্তমানে একজন সমাজবিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক ওয়াইজের রচনায় অনেক সীমাবদ্ধতা খুঁজে পাবেন। তা সত্ত্বেও, এ গ্রন্থটির মূল্য খাটো করে দেখার উপায় নেই। ওয়াইজের রচনা সমসাময়িক তো বটেই, পরবর্তীকালেও অনেক নৃতাত্ত্বিক, সমাজবিজ্ঞানী বা ঐতিহাসিককে প্রভাবিত করেছে। ওয়াইজকে বাংলাদেশের নৃতত্ত্বচর্চার পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। পূর্ববঙ্গের মানুষের পেশার যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিবরণে বাংলার সামাজিক ইতিহাস লেখার গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা পাওয়া যায়। [মুনতাসীর মামুন]