সাম্পান

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১৬:৫৪, ১৯ মার্চ ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

সাম্পান  সামান্য বাঁকানো কাঠামোয় চেপ্টা তলিযুক্ত নৌযান। এর সমুন্নত সম্মুখভাগ আন্নি নামে পরিচিত। সাম্পানের পশ্চাদ্ভাগ দেখতে প্রায় ইংরেজি বর্ণ ‘ইউ’-এর মতো। এক জোড়া হালিস (বৈঠা) দিয়ে মাঝি একাই সাম্পান বাইতে এবং একই সঙ্গে আবার হাল ধরতেও পারেন। অনুকূল বাতাসে সর (পাল) তুলে চলতে পারে এই জলযান। ডোল নামে খ্যাত একটি খাড়া এবং অপরটি আনুভূমিক দন্ড আড়াআড়ি জুড়ে খাটানো হয় পাল। ইঞ্জিন চালিত সাম্পানও আজকাল দেখা যায় নদীতে, লোকে এর নাম দিয়েছে ‘টেম্পো’। বর্ষাকালে যাত্রী ও মালামাল বৃষ্টির জল থেকে বাঁচাতে সাম্পানের মধ্যভাগ ঢেকে দেওয়া হয় ছোট পং (বাঁশ-খড়ের আচ্ছাদন) দিয়ে। সওয়ারি (যাত্রী) নেওয়ার জন্য ঘাটের (ওঠা-নামার ঘাট বা স্থান) চারপাশে সমবেত হয় সাম্পানগুলি এবং মাঝিরা নিজ নিজ গন্তব্যস্থানের নাম শোর করে দুবার পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন। ব্যক্তিগত বা দলবদ্ধ ভ্রমণের জন্যও সাম্পান ভাড়া করা যায়। ঘাট ত্যাগ করার সময় মাঝিরা বদরের নাম স্মরণ করেন, তিনি চট্টগ্রাম শহর এবং নৌযাত্রীদের অভিভাবক দরবেশ। পাথরঘাটা পয়েন্টে কর্ণফুলী পার হতে দশ থেকে বার মিনিট সময় লাগে সাম্পানের।

সাম্পান

সাম্পান একটি ক্যান্টনিজ শব্দ। যা সাম (তিন) এবং পান (কাঠের টুকরো) থেকে উদ্ভব; আভিধানিক অর্থ ‘তিন টুকরো কাঠ’। একটি সম্পূর্ণ কাঠের টুকরো দিয়ে চেপটা তল এবং তার দুপাশে আস্ত আরও দুখানা টুকরো জোড়া দিয়ে চীনা সাম্পানের কাঠামো তৈরি হয়। কিন্তু চট্টগ্রামের সাম্পান আস্ত কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি হয় না, বরং এখানে ব্যবহূত হয় কাঠের সরু ফালি। চট্টগ্রামের সাম্পানের কিছু উপাদানের নকশা হুবহু চীনা সাম্পানের মতো, বিশেষ করে এর কাঠামো, পশ্চাদ্ভাগ এবং বাঁশ-খড়ের আচ্ছাদন। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায় উন্নত সম্মুখভাগে (আন্নি), জোড়া বৈঠায় (হালিস) এবং ত্রিকোণী পালে (সর)।

বাংলাদেশ, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন এবং জাপানের গ্রামবাসীরা যাতায়াত ও পণ্য পরিবহণের কাজে সাধারণত সাম্পান ব্যবহার করে থাকে। গণপরিবহণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে চট্টগ্রামের লোকাচারে সাম্পানের ভূমিকা অনবদ্য। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামের মূল আকৃতিও গৃহীত হয়েছে পেছন থেকে দেখা সাম্পান থেকে।

বিভিন্ন ধরণের কাঠ দিয়ে সাম্পান বানানো যায়, যেমন: পীতরাজ, গামারী, জাম, গর্জন, ফুল কড়াই এবং হিঁয়রি। নদী তীরবর্তী কিছু গ্রামের স্থানীয় মিস্ত্রিরা সাম্পান বানানোর কাজে দক্ষতা অর্জন করেছে। কর্ণফুলী নদীর তীরে পরিচিত সাম্পান তৈরির কেন্দ্রগুলি রয়েছে চর পাথর ঘাটায়, পুরাতন ব্রিজ ঘাটে, তোতার বয়র হাটে, চর ইছা হাটে, শিকলবাহায়, দিঘির পাড়ায় এবং কালার পাড়ায়। ব্যবহারিক সুবিধা বিবেচনায় বিভিন্ন আকৃতির সাম্পান চট্টগ্রামের নদী-খালে চলাচল করে থাকে। স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের জন্য ব্যবহূত হয় ছোট আকারের সাম্পান, যা ৩.৬৬ থেকে ৪.২৭ মিটার লম্বা। একটি বড় সাম্পান (৮.৫৩ থেকে ৯.১৪ মিটার দীর্ঘ) ২০ থেকে ২৫ জন যাত্রী বা ১২০ মণ মাল পরিবহণ করতে পারে। প্রধান মিস্ত্রির বিবেচনায় একটি আদর্শ সাম্পান হবে দৈর্ঘ্যে ৬.০৯ মিটার,  প্রস্থে ১.৬১ মিটার এবং উচ্চতায় ০.৮৫ মিটার।  [শামসুল হোসাইন]