রোডেন্ট

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১২:১৭, ১০ মার্চ ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

রোডেন্ট  সাধারণভাবে ইঁদুর, কাঠবিড়ালী, সজারু, চিকা ইত্যাদি নামে পরিচিত স্তন্যপায়ীদের এক বড় দল। এদের প্রজাতি ও প্রাণী সংখ্যা পর্যাপ্ত, পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তৃত, মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য প্রভূত ক্ষতিকর। সুমেরু ও কুমেরু এবং অতি উঁচু পর্বতচূড়া ছাড়া এগুলি স্থলভাগের প্রায় সর্বত্রই বিস্তৃত। শ্রেণিবিন্যাসে Rodentia বর্গের অন্তর্গত এই প্রাণীর গোত্র সংখ্যা ৩০, প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ২০০০। এই বর্গে আছে অ্যাগৌতি, বিভার, ক্যাপিবারা, ছিনছিলা, ছিপমুঙ্ক, ডরমাইস, হ্যামস্টার, গারবিল, গফার, গিনিপিগ, জার্ড, জারবোয়া, লেমিং, ম্যারা, ছুঁচো, সজারু, প্রেইরি-কুকুর, খরগোশ, কাঠবিড়ালী, উড-চুখ ও ভোল।

চর্বণপেশী, অক্ষিকোটর ও দাঁতের বিন্যাসের ভিত্তিতে রোডেন্টরা তিনটি সুচিহ্নিত দলে বিভক্ত। তিনটি দলই বাংলাদেশে দেখা যায়। ছোটবড় সব জাতের রোডেন্টেরই অভিন্ন বৈশিষ্ট্য এদের সুবিকশিত, লম্বা, বাটালির মতো ছেদন দাঁত, দুটি উপরের ও দুটি নিচের চোয়ালে। ছেদন দাঁতের আকার ও আকৃতি সঠিক রাখার জন্য সব ধরনের রোডেন্টকেই সারা জীবন কিছু-না-কিছু কামড়াতে হয়। অন্যথায় দাঁতগুলি অস্বাভাবিক রকমের বড় হতে থাকে এবং বেঁকে বা মোচড়ে যায়, আর তাতে জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া এদের চোয়ালের কর্তনদন্তহীন জায়গাটায় ডায়াস্টেমা নামের একটি ফাঁক রয়েছে। এসব বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাপ্তব্য ও ব্যবহার্য যেকোন উদ্ভিজ্জ খাদ্যবস্ত্ত এরা একনাগাড়ে চিবোতে পারে। বীজ সাধারণ খাদ্য হলেও এসব প্রাণী কান্ড, মূল, পাতা এবং ফুলও খেয়ে থাকে। অধিকন্তু, নানা ধরনের কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য অমেরুদন্ডীও এদের খাদ্য। কেউ কেউ আবার ছোট সরীসৃপ ও ছোট পাখিদের শিকার করে ও স্তন্যপায়ীদের ছানা খায়। এদের পতঙ্গভুক প্রজাতিগুলির নাক-মুখ লম্বা, পেষণ দন্তের ডগা চোখা।

উদ্ভিদভোজী প্রজাতিদের আছে চওড়া কর্তন দন্ত, পেষণ দন্ত ও পুরু করোটি। সর্বভুক প্রজাতিগুলির অবস্থান দুয়ের মাঝামাঝি। কর্তন দন্তের সম্মুখতলে কঠিন এনামেল ঢাকনি থাকার সুবাদে এরা দাঁত সর্বদা ধারালো রাখতে পারে। গর্ত-খোঁড়া, লাফিয়ে চলা, গাছে-চড়া ও ভেসে-চলায় অভ্যস্ত হতে গিয়ে রোডেন্টদের কয়েকটি দল বিশেষ দেহকাঠামো অর্জন করেছে। মোটামুটি সবারই আছে সুগঠিত লেজ, কান, চোখ এবং তীক্ষ্ণ শ্রুতিশক্তি, ঘ্রাণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি। এদের অনেকেই নিশাচর এবং সেজন্য শব্দ ও গন্ধের উপর নির্ভরশীল। গন্ধ আবার সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহূত হয়। রোডেন্টরা থাকে মাটির নিচে ও উপরে, পানিতে, গাছে, বাড়িঘরে এবং কখনও গৃহপালিত পশুর সঙ্গী হিসেবে। অনেকগুলি প্রজাতি, বিশেষত নেংটি ও ধেড়ে ইঁদুর মানুষের মাধ্যমে ব্যাপক ছড়িয়েছে। গৃহবাসী নেংটি ইঁদুর পৃথিবীর সর্বত্রই আছে।

বৃহত্তম রোডেন্ট হলো ক্যাপিবারা Hydrochaeris hydrochaeris, মাথা ও ধড় প্রায় ১৩০ সেমি, লেজ ৫২ সেমি, ওজন প্রায় ৫০ কেজি, দক্ষিণ আমেরিকার বাসিন্দা, আর ক্ষুদ্রতমটি ইউরোপীয় নেংটি ইঁদুর Micromys minutus, ওজন ৫-৭ গ্রাম, ধড় ৫.৫-৭.৫ সেমি, লেজ ৭ সেমি।

স্থলচর মেরুদন্ডীদের মধ্যে রোডেন্টদের সম্ভবত প্রজনন ক্ষমতা বেশি। স্ত্রী নেংটি ইঁদুর ২১ দিন বয়সেই প্রজননক্ষম হয়, গর্ভধারণকাল ১৯-২১ দিন, প্রত্যেক কিস্তিতে ২-৬টি বাচ্চাসহ বছরে ৬-৮ বার প্রসব করে। অনুকূল পরিস্থিতিতে এরা সারা বছরই বাচ্চা দেয়। বড় আকারের প্রজাতি, কাঠবিড়ালী ও শজারুরা বছরে  একবারই গর্ভধারণ করে, আর ধেড়ে ইঁদুর ও অন্যরা বছরে কয়েকবার। মোট বাচ্চা ১ থেকে কয়েকটি। অনেক প্রজাতি গাছের কোটরে বা ফাটলে বাসা বানায়, অন্যরা আবাস বা বাসা তৈরির জন্য একটি বিস্তৃত সুড়ঙ্গপ্রণালী খোঁড়ে। ধেড়ে ইঁদুর ও কাঠবিড়ালীর বাসা বেশ বড়সড়, তাতে থাকে বাচ্চাদের জন্য বিশেষ কামরা। অধিকাংশ  রোডেন্টের বাচ্চাই উদোম ও দৃষ্টিহীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু শজারু ও উড়ুক্কু কাঠবিড়ালীর নবজাতকরা থাকে লোমবিশিষ্ট ও চক্ষুষ্মান।

বাংলাদেশের বাসিন্দা প্রায় ২৫ প্রজাতির রোডেন্টের মধ্যে নেংটি ইঁদুর Mus musculus সবচেয়ে ছোট (মাথা ও ধড় ৫-৮ সেমি, লেজ ৫-৮ সেমি, ওজন ১৮ গ্রাম) এবং শজারু Hystrix indica (মাথা ও ধড় ৯০ সেমি, লেজ ১০ সেমি, ওজন প্রায় ২০ কেজি) সবচেয়ে বড়। শজারুর শরীর রূপান্তরিত রোম তথা লম্বা ও চোখা কাঁটায় ঢাকা। এদেশে রোডেন্টদের মধ্যে উলে­খযোগ্য ইঁদুর Rattus rattus, ধেঁড়ে ইঁদুর Bandicoota indica, মেঠো ইঁদুর Bandicoota bengalensis, কালচে কাঠবিড়ালী Ratufa bicolor, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালী Petaurista petaurista, ডোরাকাটা কাঠবিড়ালী Funumbalus penanti এবং বাদামি কাঠবিড়ালী Callosciurus pygerythrus

এক সময়ে শজারু এদেশে বনেবাদাড়ে ঝোপজঙ্গলে সর্বত্রই ছিল। এখন আছে শুধুই বনাঞ্চলে। কালচে কাঠবিড়ালী শালবন থেকে লোপ পেয়েছে, অল্প সংখ্যায় আছে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে। বাদামি কাঠবিড়ালীরও অভিন্ন অবস্থা, দেখা যায় খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের কোন কোন বিছিন্ন এলাকায়। পদ্মার পূর্বপারের এই জাতের কাঠবিড়ালীরা ঢাকার চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে বসতি গড়ছে। কয়েক প্রজাতির ইঁদুর বাড়ছে বিপজ্জনক হারে।  [আলী রেজা খান]

রোডেন্ট নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশী কৃষকদের ব্যবহূত বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ কৌশলের মধ্যে রয়েছে বিষটোপ, প­াবিতকরণ, গর্তখোঁড়া, ফাঁদে-ফেলা ও ধূপনবিষ (fumigant) প্রয়োগ। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাড়িতে বা মাঠে বা উভয় স্থানে অনেক কৃষক বিষটোপ (৭৪%) ব্যবহার করে।বর্ষাকালে মৌসুমি বন্যা ইঁদুরের উৎপাত ও বিস্তার নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করে।

প্রবল বৃষ্টিপাতে মেঠো-ইঁদুরের গর্তগুলিতে পানি ঢুকলে ওদের বাচ্চাগুলি মারা যায়। বনবিড়াল, বাগডাস, শিয়াল, পেঁচা, বাজপাখি, সাপ, গুইসাপ ও বিড়ালের মতো বিভিন্ন শিকারি প্রাণী ইঁদুর খেয়ে থাকে।

ইঁদুর মারার স্থানীয় ফাঁদ

কৃষকরা বেশ কয়েক ধরনের স্থানীয় ফাঁদ ব্যবহার করে। এর মধ্যে কাঁচিকল, কাঠের ফাঁদ, বাঁশের ফাঁদ, মাটির ফাঁদ ও খাঁচাফাঁদ উলে­খযোগ্য। কৃষকদের বসতবাড়িতে সর্বাধিক ব্যবহূত ফাঁদ হলো ‘কাঁচি কল’।

ঘরবাড়ি, পরীক্ষাগার ও গুদামে ইঁদুর ও নেংটি ইঁদুর দমনের জন্য আঠাযুক্ত বোর্ড অত্যন্ত কার্যকর। কার্ডবোর্ড (৩০  ৩০ সেমি), কাঠের তক্তা বা দস্তার প্রলেপযুক্ত লোহার পাতের টুকরায় ইঁদুর ধরার আঠা (rodent glue) লাগিয়ে উপদ্রুত স্থানে ইঁদুর চলাচলের পথে ফেলে রাখা হয়। আঠাযুক্ত বোর্ডের ওপর দিয়ে হাঁটা বা দৌড়ানোর সময় ইঁদুর তাতে আটকা পড়ে।

বাংলাদেশে গর্ত খুঁড়ে ইঁদুর ধরা অত্যন্ত জনপ্রিয়। এতে ইঁদুর নিধন ছাড়াও উপরি হিসেবে গর্তে লুকিয়ে রাখা ধান পাওয়া যায়। গর্তখোঁড়া অধিকতর কার্যকর ও নিশ্চিত কৌশল। মাঠে বা খামার বাড়িতে গর্তে পানি ঢেলেও ইঁদুর তাড়ানো যায়। গ্রামাঞ্চলে প্রায়ই নতুন গর্তে ধোঁয়া (মরিচসহ) ঢুকিয়ে সেখান থেকে ইঁদুর বের করা হয়।

রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে জিঙ্ক ফসফাইড, ব্রোডিফাকোয়াম (brodifacoum), ব্রোমাডিওলোন (bromadiolone), ফ্লোকোমাফেন (flocoumafen) ও ইউসিডিয়নের (yusidion) ব্যবহার। এগুলি হচ্ছে বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন নিবন্ধিত ইঁদুরনাশক (rodenticides)। জিঙ্ক ফসফাইড সাধারণত ২-৩% মাত্রায় ব্যবহার্য।

ইঁদুরনাশকগুলি সাধারণত জৈব বা অজৈব যৌগিক পদার্থ এবং প্রথাগতভাবে (কার্যকরতার ভিত্তিতে) ৪ শ্রেণিতে বিভক্ত: তীব্র একক মাত্রা বা অ-তঞ্চনরোধক, ক্রনিক বা বহু মাত্রা বা তঞ্চনরোধক, ধূপনবিষ ও বন্ধ্যাকর রাসায়নিক।

বাংলাদেশে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে কোন নিবন্ধিত বন্ধ্যাকর রাসায়নিক নেই। গর্তে, জাহাজে, গুদামে ও অন্যান্য অনুরূপ স্থানে ইঁদুর নিধনের জন্য অবশ্য কিছু ধূপনবিষ ব্যবহূত হয়। এগুলির মধ্যে উলে­খযোগ্য ক্যালসিয়াম সায়ানাইড, অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড ও কার্বন-মনোক্সাইড। অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইডের ০.৬ গ্রাম দানা বা ৩.০ গ্রাম বড়ি পাওয়া যায় যা বাতাসের আর্দ্রতা বা ভিজা মাটির স্পর্শে ফসফাইন গ্যাস অবমুক্ত করে। ধূসর গ্যাস উদ্গীরক গুঁড়া হিসেবে ব্যবহূত সায়ানাইড থেকে একইভাবে হাইড্রোজেন সায়ানাইড গ্যাস নির্গত হয়। প্রতিটি গর্তের মুখে ১-২টি অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড দানা বা বড়ি রাখলেই চলে। এটি বিভিন্ন বাণিজ্যিক নামে নিবন্ধিত ও বিক্রয় হয়, যেমন, অ্যাগ্রিফস (agriphos) ৫৭%, গ্যাসট্রোক্সিন (gastroxine) ৫৭%, সেলফস (selphos) ৫৭%, কুইকফস (quickphos) ৪৭%, অ্যালামফস (alumphos) ৫৭% ও  কুইকফাম (quickphum) ৫৭%।  [সন্তোষ কুমার সরকার]