মারান্ডী, ফাদার লুকাস

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১১:১২, ৪ মার্চ ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

মারান্ডী, ফাদার লুকাস (১৯২২-১৯৭১)  খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারক, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। ১৯২২ সালের ৪ আগস্ট দিনাজপুরের বেনীদুয়ার গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা মাথিয়াস মারান্ডী ছিলেন একজন ধর্মপ্রচারক এবং মাতা মারিয়া কিস্কু। জাতিতে লুকাসের পরিবার ছিল সাঁওতাল। জন্মের ৯ দিন পর লুকাস মারান্ডীকে ধর্মরীতি অনুযায়ী খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেয়া হয়। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন  শুরু হয় বেনীদুয়ার মিশন প্রাইমারি স্কুলে। তিনি ১৯৩৪ সালে দিনাজপুর সাঁওতাল মিডল স্কুলে (বর্তমানে সেন্ট ফিলিপস্ বোর্ডিং স্কুল) ভর্তি হন এবং প্রবেশিকা পাশ করার পর দক্ষিণ দিনাজপুরের সেন্ট আলবার্ট সেমিনারীতে দর্শনশাস্ত্রে অধ্যয়ন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ঐশীতত্ত্ব অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে তাকে ইতালি পাঠানো হয়। ঐশীতত্ত্ব বিষয়ে অধ্যয়ন শেষ করে লুকাস মারান্ডী দেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৫৩ সালের ১ ডিসেম্বর দিনাজপুর ক্যাথিড্রালে যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন। লুকাস মারান্ডী তাঁর  সাঁওতাল ২০ সমপ্রদায়ের ধর্ম প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন এবং সাঁওতালী নেতা মনোনীত হন।

ফাদার লুকাস মারান্ডী

যাজক হিসেবে লুকাস মারান্ডীর প্রথম কর্মস্থল ছিল বর্তমান দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার মরিয়মপুর মিশন। এ মিশনে থাকাকালে তিনি সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং নিম্নবর্গের অধিকার রক্ষার জন্য কাজ করেন। পরে তিনি সেন্ট ফিলিপস্ বোর্ডিংএ দায়িত্বে নিয়োজিত হন।

১৯৬৫ সালে লুকাস মারান্ডী দিনাজপুর ধর্ম প্রদেশের অন্তবর্তীকালীন পরিচালকের দায়িত্ব নেন। কিন্তু ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে সেখানে দায়িত্ব পালনে অসুবিধা দেখা দিলে তাঁকে অস্থায়ী যাজক হিসেবে ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়াতে নিয়োগ দেয়া হয়।  যাজকীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সেখানকার কৃষির উন্নতির জন্য দক্ষ নেতা নির্মাণের প্রয়াস চালান। এ উদ্দেশ্যে তিনি রুহিয়ায় একটি ছোট বোর্ডিং স্কুল চালু করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর রুহিয়া মিশনারীতে শরণার্থীরা আশ্রয় নেয়। লুকাস মারান্ডী এই অসহায় মানুষদের আশ্রয়ন ও খাবার সংস্থানের ব্যবস্থা করেন। তাঁর প্রেরণায় অনেক আদিবাসী যুবক প্রত্যক্ষ যুদ্ধে যোগদান করে। এছাড়া তিনি গোপনে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের ঔষধ ও চিকিৎসাসেবা দান করেন।

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ঔষধপত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে লুকাস মারান্ডী রুহিয়া থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের গয়াডাঙ্গা মিশনে এবং পরের দিন ইসলামপুর মিশনে যান।

দেশে ফিরে আসা বিপদজনক হলেও লুকাস মারান্ডী খ্রিস্টভক্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রুহিয়াতে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে এসে তিনি দেখতে পান রুহিয়ার জনগণ ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলোর উদ্দেশ্যে পালাতে শুরু করেছে।

এসময়ে ফাদার লুকাস মারান্ডীর কাছে সংবাদ পৌছে যে দিনাজপুরের চারটি মিশনারী পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁকেও রুহিয়া মিশন ছেড়ে  যাওয়ার জন্য সর্তক করা হয়। পরে ফাদার মারান্ডী তাঁর মিশনারীর লোকজন নিয়ে দেশত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে নাগর নদী অতিক্রম করে ভারতীয় সীমান্তে পৌছান। পরে ফাদার মারান্ডী একাই মিশনারীতে ফিরে আসেন।

১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি মিশনের সামনে এসে থামে এবং চারজন সৈন্য গাড়ি থেকে নামে। ফাদার লুকাস মারান্ডী চা-বিস্কুট সহকারে তাদের আপ্যায়িত করেন। পাকিস্তানি সৈন্যদের সন্দেহ ছিল মিশনের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়া হতে পারে। সৈন্যরা মিশনে তল্লাশী করে প্রথমে চলে যায় এবং তিন ঘন্টা পর আবার ফিরে আসে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ফাদারকে মিশনের  বাইরে  নিয়ে যায় এবং  তাঁর উপর অত্যাচার চালায়। এক পর্যায়ে তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ফাদারকে হত্যা করে।

শহীদ ফাদার লুকাস মারান্ডীর মৃতদেহ ভারতের ইসলামপুর মিশনে নিয়ে সমাহিত করা হয়। ফাদার লুকাস মারান্ডী ছিলেন তৎকালীন দিনাজপুর অঞ্চলের প্রথম দেশীয় যাজক। রুহিয়া মিশনে তাঁর স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। দিনাজপুর শহরের দক্ষিণে শহীদ ফাদার লুকাস মারান্ডীর নামে একটি সড়কের নামকরণ হয়েছে। বেনীদুয়ার মিশনে প্রতি বছর ২১ এপ্রিল ফাদার লুকাস মারান্ডী স্মরণে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়।  [ঊর্মি হোসেন]