মুখার্জী, শ্যামাপ্রসাদ

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৪:৪৫, ৫ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

মুখার্জী, শ্যামাপ্রসাদ (১৯০১-১৯৫৩)  পন্ডিত ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা। তিনি ১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা স্যার আশুতোষ মুখার্জী ও মাতা শ্রীমতী যোগমায়া দেবীর কাছ থেকে তিনি কিংবদন্তিতুল্য পান্ডিত্য ও ঐকান্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনা উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন। তাঁরা তাঁকে পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনে অনুপ্রাণিতও করেন। ১৯২১ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে সম্মান সহ বিএ ডিগ্রি লাভ করার পর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভারতীয় ভাষায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ১৯২৪ সালে বি.এল পরীক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ স্থান লাভ করেন।

ছাত্র থাকাকালীন শ্যামাপ্রসাদ তাঁর উপাচার্য বাবাকে শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করেন। ১৯২৪ সালে তাঁর বাবার মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটে তাঁর উপস্থিতি অপরিহার্য বলে বিবেচিত হত। ১৯৩৪ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কনিষ্ঠতম উপাচার্য হন।

শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক জীবনও উচ্চ আদর্শবাদ দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ছিল। ১৯২৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনী এলাকা থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদ এ নির্বাচিত হন। পরিষদে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু কংগ্রেস পরিষদ বর্জনের ডাক দিলে তিনি পদত্যাগ করেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবে পরিষদে পুনরায় যোগ দেন। ১৯৩৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি পুননির্বাচিত হন। মাধ্যমিক শিক্ষা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিল সমূহের পাস বাংলার শিক্ষা কাঠামোকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মন্ত্রিসভার পতন ঘটাতে শ্যামাপ্রসাদ কংগ্রেস নেতৃত্বকে প্রণোদিত করতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। সুতরাং তিনি অ-কংগ্রেসীয় ও অ-মুসলিম লীগ দলীয় জাতীয়তাবাদী শক্তিসমূহের সমর্থনের জন্য তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি  .কে.ফজলুল হক এর সঙ্গে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন যেখানে হক ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে তুলে নেন।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী

ওই সময় বীর সাভারকার তাঁর ওপর গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে। তিনি  হিন্দু মহাসভায় যোগদান করেন এবং ১৯৩৯ সালে এর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন।

ভারত ছাড় আন্দোলন শুরু হলে ব্রিটিশরা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে এবং কংগ্রেসের প্রায় সকল নেতাকে জেলে আবদ্ধ করে। বস্ত্তত, জাতীয় স্বার্থ তুলে ধরার মতো নেতা তখন কেউ ছিলেন না। সরকারের একজন সদস্য হওয়া সত্ত্বেও শ্যামাপ্রসাদ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জাতীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কেন্দ্রীয় সরকারকে নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে সম্মত করাতে ব্যর্থ হয়ে তিনি বাংলার মন্ত্রিসভা ত্যাগ করার এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জাতীয় শক্তিসমূহকে নেতৃত্ব দানের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ চলাকালে তাঁর মানব কল্যাণমূলক কার্যক্রম অনেক জীবন বাঁচিয়েছিল। ঐ মারাত্মক দুর্ভিক্ষের অল্পকাল পরে ভারত বিভক্তির অশুভ ছায়া জন-জীবনের স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন যে, যদি আদৌ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারতকে বিভক্ত করতে হয়, তাহলে ঐ একই কারণে বাংলা ও পাঞ্জাবকেও বিভক্ত করতে হবে।

এখানেও শ্যামাপ্রসাদ দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন এবং ভারত বিভক্তির চলমান স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর প্রচেষ্টা বিফল হয়। স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদ শিল্প ও সরবরাহ দফতরের মন্ত্রিত্বে যোগদান করেন। কিন্তু নেহরুর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধের কারণে তিনি মন্ত্রিত্বে ইস্তফা দেন। ভারতের পার্লামেন্ট ও সংবিধান সভায় তিনি হন প্রথম বিরোধী দলীয় সদস্য। যথার্থ গণতান্ত্রিক বিরোধী দল সৃষ্টিতে তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। এর ফলে ‘ভারতীয় জনসংঘ দল’ সৃষ্টি হয়। প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জনসংঘ মাত্র তিন জন সদস্য পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ নিজে। প্রথম লোকসভার সদস্য হয়ে সীমিত সংখ্যক সদস্যের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও অন্যান্য ক্ষুদ্র দলের সঙ্গে একত্রিত হয়ে তিনি পার্লামেন্টে ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক দল’ গঠন করেন এবং তিনি নিজে তাঁদের নেতা নির্বাচিত হন। লোকসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তাঁর ভূমিকার জন্য তিনি ‘পার্লামেন্ট এর সিংহ’ উপাধি পান। ১৯৫৩ সালে শ্রীনগরে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু হয়।  [রঞ্জিত রায়]