মৃৎপাত্র

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১১:৪৭, ৫ মার্চ ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

মৃৎপাত্র  আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে বাংলায় এক বিশেষ শিল্প হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে। নদীমাতৃক দেশ বাংলার ভূতাত্ত্বিক গঠনে পলিমাটি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। যৌক্তিক কারণে এদেশের প্রাচীন অধিবাসীরা মৃৎপাত্র তৈরিতে প্রকৃতির এই সম্পদকে যথাযথ কাজে লাগিয়েছে। পশ্চিম বাংলার সুপ্রসিদ্ধ প্রত্নকেন্দ্র পান্ডু রাজার ঢিবি, মহিষদল, ভরতপুর, মঙ্গলকোট, চন্দ্রকেতুগড়, তমলুক, রাজবাড়ীডাঙ্গা, বাণগড় এবং বাংলাদেশের মহাস্থানগড়, গোবিন্দ ভিটা, ভাসুবিহার, উয়ারী-বটেশ্বর, রাজা হরিষচন্দ্রের বাড়ি, ময়নামতীপাহাড়পুর থেকে অনেক ধরনের মৃৎপাত্র আবিষ্কৃত হয়েছে; যেমন, কালো-লাল মৃৎপাত্র, উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, রুলেটেড মৃৎপাত্র, অ্যামফোরা, কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র, নব্ড (নব্ যুক্ত) মৃৎপাত্র প্রভৃতি। তাম্রপ্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে আদি ঐতিহাসিক যুগের মৃৎপাত্রগুলির বিশেষ শনাক্তীকরণ বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকলেও প্রাক মধ্যযুগ, মধ্যযুগ এবং পরবর্তী মধ্যযুগের মৃৎপাত্রের মধ্যে সেরকম কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত। এরকম ঘটনার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো যে, পরবর্তীকালে সহজপ্রাপ্য ধাতব এবং অন্যান্য আসবাবপত্র ধর্মীয় ও দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত ঐতিহ্যবাহী মৃৎপাত্রের জায়গা দখল করেছে। বাংলায় প্রাপ্ত মৃৎপাত্রের প্রধান ধরণগুলির বর্ণনা দেয়া হলো।

কালো-লাল মৃৎপাত্র  এগুলির শনাক্তীকরণ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলির অভ্যন্তর ভাগ এবং বহির্দেশের উপরের অংশ কালো রং এবং বহির্দেশের অবশিষ্ট অংশের রং লাল হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, বিশেষ ধরনের চুল্লীতে পোড়ানোর ফলে মৃৎপাত্রের রং এরকম হয়েছে। অনেকে অবশ্য দুবার পোড়ানোর কথাও বলেন। প্রায় সমস্ত কালো-লাল মৃৎপাত্র চাকার মাধ্যমে তৈরি, তবে পান্ডু রাজার ঢিবিতে কিছুসংখ্যক হাতে তৈরি নমুনা পাওয়া গিয়েছে। এই শ্রেণির মৃৎপাত্রের বুনন মাঝারি মানের, তবে আদি এবং শেষ পর্যায়ে কিছু সংখ্যক নিম্নমানের কালো-লাল মৃৎপাত্র পরিলক্ষিত হয়। বলা হয়ে থাকে যে, পাত্র তৈরির সময় মাটিকে ভালভাবে মথিত করা হতো এবং সূক্ষ্ম বালু মিশিয়ে দেওয়া হতো। অধিকাংশ মৃৎপাত্রে উভয়দিকে প্রলেপ দেওয়া হতো, তবে ভাজন (vase) জাতীয় মৃৎপাত্রে বহির্দেশের সমগ্র অংশে এবং অভ্যন্তরে গলা পর্যন্ত তা করা হতো। ঘষা-মাযার ফলে কিছুসংখ্যক মৃৎপাত্রের খন্ডাংশ মসৃণ ও উজ্জ্বল হয়েছে। পোড়ানোর তারতম্যের কারণে কোন কোন মৃৎপাত্রের অভ্যন্তর সম্পূর্ণভাবে কালো এবং বহির্দেশ লাল রঙের পাওয়া যায়; তবে কিছুসংখ্যক মৃৎপাত্রের উভয়দিক অংশত কালো এবং অংশত লালও হয়। কোন কোন পাত্রের অভ্যন্তরে চিত্রাঙ্কণও পরিলক্ষিত হয়।

কালো-লাল মৃৎপাত্র, পশ্চিমবঙ্গ

বিশেষ ধরনের নলযুক্ত বাটিতে নলের প্রান্তে লাল রঙের দাগ আছে। এ ধরনের মৃৎপাত্রে গ্রাফিটি চিহ্নের উপস্থিতি খুবই কম। অনেক আকারের কালো-লাল মৃৎপাত্র পাওয়া যায়, তার মধ্যে প্রধান আকারগুলি হলো: মাঝারি আকারের ভাজন, যার মধ্যে টিউলিপ ফুলের মতো ফুলদানিগুলি স্বতন্ত্র ধরনের। অন্যান্য আকারগুলি হলো: বাটি, বিশেষ ধরনের নলযুক্ত বাটি, গামলা, সরু গলাযুক্ত পাত্র, থামের উপর বসানো থালা এবং ফুলদানি-স্ট্যান্ড। কালো-লাল মৃৎপাত্র সংস্কৃতি নবোপলীয় যুগ থেকে উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র পরবর্তী যুগ পর্যন্ত প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষে বিকাশ লাভ করেছিল।

শুধু পশ্চিম বাংলায় ৭৭টি প্রত্নস্থলে কালো-লাল মৃৎপাত্রের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। সঠিক তারিখ নির্ণয় (absolute dating) এবং স্তরবিন্যাস থেকে জানা যায় যে, আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে যাত্রা শুরু করে কালো-লাল মৃৎপাত্র তাম্র-প্রস্তর যুগ অতিক্রম করে ঐতিহাসিক যুগে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব তিন শতকেও  প্রচলিত ছিল।

উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র  এর বুনন সাধারণত সূক্ষ্ম ও পাতলা। এটি তৈরিকালে মাটিকে ভালভাবে মথিত করা হতো, পান দেয়া (tempering) উপাদান কম থাকলেও এটি আকর্ষণীয় উজ্জ্বল হয়। পাত্রের মজ্জা কালো থেকে ধূসর রঙের হয়, তবে লালচে রঙ ও অনুপস্থিত নয়। যদিও ৯০% উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের রং জমকালো এবং বাদামীকালো, ১০% এর রং নীল, গোলাপী, রূপালী, সোনালী, বাদামী, চকলেট, বেগুনী এবং গাঢ় লাল। প্রায় সবই একক বর্নিল মৃৎপাত্র, তবে দ্বিবর্ণিলও পরিলক্ষিত হয়। দুটি রঙের সমাহার ব্যতীত দ্বিবর্নিল মৃৎপাত্রগুলির সঙ্গে একক বর্ণিল মৃৎপাত্রের কোন পার্থক্য নেই; যেমন গাঢ় নীল এবং গাঢ় লাল, ধূসর এবং হালকা লাল, কালো এবং গাঢ় বাদামী, কালো এবং বাদামী কালো, ফ্যাকাশে লাল এবং কালো ও ধূসর। মৃৎপাত্রগুলি সাধারণত নকশাহীন, তবে কখনও কখনও রঙের নকশা পরিলক্ষিত হয়। খুবই পরিচিত নকশাগুলি হলো সরু এবং পুরু অনুভূমিক বলয়/বন্ধনী, উলম্ব অাঁচড়, অনুভূমিক বলয় থেকে বেরিয়ে আসা উলম্ব অাঁচড়, আড়াআড়ি বলয়, গোলাকৃতি বন্ধনী বা খিলানাকৃতি নকশা। উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রে রঙের নকশা ছাড়াও খোদাই নকশা এবং গ্রাফিটি দাগও দেখা যায়।

মসৃণ মৃৎপাত্র, মহাস্থানগড়

উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের আকারগুলি চমকপ্রদ। এগুলির মধ্যে বিশেষ ধরনের থালা, বাটি এবং ঢাকনা উল্লেখযোগ্য, তবে দীর্ঘ গলাযুক্ত পাত্র, পিরিচ, ক্ষুদ্রাকৃতির ভাজন, নলযুক্ত পাত্র, সুরাপাত্র উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ভারী ও বড় বড় পাত্র উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র পরিবারে অনুপস্থিত।

উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রগুলি খুব সম্ভবত অভিজাত শ্রেণির জন্য তৈরি, খুবই মূল্যবান ও অত্যুৎকৃষ্ট। উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র ভেঙে গেলে তা তামার পাত দিয়ে জোড়া লাগানো হতো- এমন নিদর্শনও আবিষ্কৃত হয়েছে। এ থেকে মনে করা হয় যে, উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র ভেঙে গেলে তা ছুঁড়ে ফেলা হতো না, বরং তা মেরামত করে পুনরায় ব্যবহার করা হতো।

একারণে পন্ডিতগণ অভিমত প্রকাশ করেন যে, উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র নতুন করে তৈরি করতে যে খরচ পড়ত তা হয়ত তামার পাত দিয়ে জোড়া লাগানো থেকে বেশি ছিল। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মানদন্ডে বিচার করলে উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের স্থান শুধু প্রাচীন ভারত বা দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বরং প্রাচীন বিশ্বের অন্যান্য উৎকৃষ্টতম মৃৎপাত্রের মধ্যে অন্যতম। দ্রুতগতি সম্পন্ন চাকায় ঘুরিয়ে বিশেষ ধরনের চুল্লিতে (sagger-kiln) অতি উচ্চ তাপমাত্রা প্রয়োগ করে এবং আস্তে আস্তে ঠান্ডা করে উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র তৈরি করা হতো বলে পন্ডিতদের অভিমত।

উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের মজ্জার রঙের তারতম্য হয়। বিশেষজ্ঞরা বলতে চেষ্টা করেছেন যে, কুমোররা এই মৃৎপাত্র তৈরির সময় সর্বদা সঠিকভাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না; এছাড়াও মাটিতে লৌহের পরিমাণও সবসময় সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হতো না। অনেক পন্ডিত মনে করেন যে, উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রে যে কালো চকচকে ভাব দেখা যায় তা করা হয়েছে চুল্লী থেকে নামিয়ে কিছুটা গরম অবস্থায় থাকাকালে একধরনের জৈব তরলের প্রলেপ দিয়ে। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে, কালো প্রলেপের উপর কিছু সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কালো উজ্জ্বল ভাব আনা হতো। অবশ্য স্মরণ রাখা দরকার যে, বিভিন্ন রকম বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের পরও কিন্তু উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের তৈরি কৌশল খুব পরিষ্কারভাবে জানা সম্ভব হয়নি।

উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের প্রাপ্তিস্থানের বিস্তৃতি কিন্তু ভারতবর্ষের অন্যান্য যে কোন মৃৎপাত্রের বিস্তৃতি, এমনকি হরপ্পা মৃৎপাত্র থেকেও, বিশাল এলাকা জুড়ে। এই বিশাল এলাকা জুড়ে উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের বিস্তৃতিকে পন্ডিতগণ মৌর্য সাম্রাজ্যবাদ, বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ এবং বাণিজ্যিক পথের আবিষ্কারের সঙ্গে সর্ম্পকিত করেছেন। উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের আয়ুষ্কালকে দুভাগে ভাগ করলে প্রথম পর্যায়কে আনুমানিক ৭০০/৬০০ থেকে ৪০০/৩০০ খ্রিস্টপূর্ব এবং দ্বিতীয় পর্যায়কে আনুমানিক ৪০০/৩০০ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্ব, এমনকি খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত ধরা হয়। বাংলায় বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের কাল খুবই কম; তবে এই অঞ্চলে এই পর্যায়কে আনুমাণিক খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতক ধরা হয়। বাংলায় এই মৃৎপাত্রের প্রাপ্তির কেন্দ্রসমূহের মধ্যে মঙ্গলকোট, চন্দ্রকেতুগড়, বাণগড়, মহাস্থান এবং উয়ারী-বটেশ্বর উল্লেখযোগ্য।

কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, তবে কেবল চকচকে বৈশিষ্ট্য ব্যতীত। কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্রে একটি প্রলেপ সমভাবে দেয়া হতো, ফলে অনেকটা দ্যূতিময় ভাব এলেও উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের আলোকোজ্জ্বল ভাবটা অনুপস্থিত। সর্বভারতীয় কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র পাওয়া গেছে চিত্রিত ধূসর মৃৎপাত্র, কালো-লাল মৃৎপাত্র এবং উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্রের স্তরে। মহাস্থান, উয়ারী-বটেশ্বর, বানগড় ও অন্যান্য প্রত্নস্থলে প্রচুর পরিমাণে কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধরনের বাটি অধিক সংখ্যায় পাওয়া যায়। তবে অন্যান্য উল্লেখযোগ্য প্রকার হলো থালা, দীর্ঘ গলাযুক্ত পাত্র, ছোট ও বড় ভাজন, নলযুক্ত পাত্র, থামের উপর থালা, থামের উপর বাটি ও কালো প্রলেপযুক্ত পাত্র। এই জাতীয় কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র অবশ্যই উন্নত মানসম্পন্ন, কিন্তু অনেক সময় কাঁকরময় মাটি বা সঠিকভাবে পোড়ানো নয় এবং ধীরগতি সম্পন্ন চাকায় তৈরি মৃৎপাত্রও পাওয়া যায়। সাধারণত কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র সূক্ষ্ম থেকে মাঝারি মানের হয় এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন চাকায় তৈরি। এই মৃৎপাত্রের মজ্জার রং ধূসর। এই জাতীয় মৃৎপাত্রের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বার্নিশ করা নমুনাও পাওয়া যায়। কালো রঞ্জকটি ম্যাগনেটাইটের তৈরি। তরলমাটির সঙ্গে সুন্দরভাবে গুঁড়া করা লাল গিরিমাটি মিশিয়ে খুব কম তাপে ঝলসিয়ে কালো উজ্জ্বলতা আনা হতো।

রুলেটেড মৃৎপাত্র  ভারত, শ্রীলংকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহুসংখ্যক প্রত্নক্ষেত্রে প্রাপ্ত আদি ঐতিহাসিক যুগের আরেকটি ধ্রুপদী মৃৎপাত্র। ভারত মহাসাগর অঞ্চলের আদি ঐতিহাসিক যুগের বাণিজ্যিক আদান-প্রদান সম্পর্কিত তথ্যের জন্য রুলেটেড মৃৎপাত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

রুলেটেড মৃৎপাত্র, উয়ার-বটেশ্বর

রুলেটেড মৃৎপাত্রের আবিষ্কার মহাস্থান, উয়ারী-বটেশ্বর, তমলুক এবং চন্দ্রকেতুগড়কে এককভাবে এবং বিশেষভাবে বাংলার সঙ্গে আদি ঐতিহাসিক যুগে দক্ষিণ ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রমবিকাশমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইঙ্গিত প্রদান করে। রুলেটেড মৃৎপাত্র একটি থালা, যার কান্দা ভারী ও বঙ্কিম, তলায় কোন পা নেই, নিম্নাংশ এবং কান্দা সংযুক্ত, মধ্যে কোনো জোড়া নেই। রুলেটেড মৃৎপাত্রের তলদেশ মসৃণ ও উজ্জ্বল। এটি অনেক রঙের হয়। অভ্যন্তরভাগের তলদেশে সমকেন্দ্রে বৃত্তাকার নকশায় খাঁজকাটা থাকে। এই রীতির বৈশিষ্ট্য হলো এক থেকে তিনটি সমকেন্দ্রিক বৃত্ত, যেখানে প্রতিটি বলয়ে তিন থেকে দশ সারি খাঁজকাটা নকশা থাকে। এগুলি বিন্দু, অাঁচড়, কীলক, ত্রিভুজ প্রভৃতি আকৃতির হয়। রুলেটেড মৃৎপাত্রগুলি সচরাচর উন্নতমানের, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিম্নমানেরও দেখা যায়। মৃৎপাত্রের সমরূপতা প্রমাণ করে যে, এগুলি চাকায় তৈরি। রুলেটেড নামটি এসেছে তার বিশেষ ধরনের নকশার কারণে। চাকার মধ্যে যখন মৃৎপাত্রটি থাকে তখন রুলেট এর সাহায্যে বৃত্তাকারে সারিবদ্ধ খাঁজ কেটে নকশা করা হয়।

ধূসর মৃৎপাত্র, উয়ারী-বটেশ্বর

ধ্রুপদী রোমান শৈলীগত মৃৎপাত্রের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা করে পন্ডিতরা অভিমত প্রকাশ করেন যে, আরিকামেডু রুলেটেড মৃৎপাত্র খ্রিস্টীয় প্রথম শতক থেকে দ্বিতীয় শতকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত। অপেক্ষাকৃত ভালগুলি অবশ্যই উক্ত অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত, তবে নিম্নমানেরগুলি স্থানীয়ভাবে অনুক্রিয়াজাত। কোন কোন গবেষক মনে করেন যে, আরিকামেডু রুলেটেড মৃৎপাত্রগুলি খুব সম্ভবত স্থানীয়ভাবে তৈরি, তবে ‘রুলেটিং’ প্রযুক্তিটি ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসে থাকবে। কারণ সেই সময়ে দক্ষিণ ভারতে এই প্রযুক্তি প্রচলিত ছিল না।

পরবর্তী গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে আসে যে, আরিকামেডু রুলেটেড মৃৎপাত্র খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতক থেকে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। ভারতের আরিকামেডু এবং কোরাইকেডু, শ্রীলংকায় অনুরাধাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ায় সেমবিরান থেকে প্রাপ্ত রুলেটেড মৃৎপাত্রে ব্যবহূত মাটির উপাদান পরীক্ষা করে পন্ডিতগণ এই মতে উপনীত হন যে, সমস্ত রুলেটেড মৃৎপাত্রে ব্যবহূত  মাটি একই ধরনের এবং তা কোন একক উৎস থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকবে।

চিত্রিত মৃৎপাত্র, উয়ারী-বটেশ্বর

যেসমস্ত প্রত্নকেন্দ্রে রুলেটেড মৃৎপাত্র পাওয়া গিয়েছে সেখান থেকে মাটি এবং রুলেটেড মৃৎপাত্র আলোকরশ্মির অপবর্তন (x-ray diffraction) পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে প্রমাণ করা হয়েছে যে, রুলেটেড মৃৎপাত্র বাংলার তমলুক চন্দ্রকেতুগড়ের এবং তা ওই অঞ্চলেই তৈরি হতো। ভারতের আরিকামেডু, আলাগানকুলাম, কোট্টাপাটনাম, মানিকপাটনা, শিশুপালগড়, নাসিক, তমলুক এবং চন্দ্রকেতুগড়, ভিয়েতনামের ট্রা-কিউএ প্রাপ্ত রুলেটেড মৃৎপাত্রের মাটির বৈশিষ্ট্য সাদৃশ্যপূর্ণ; দক্ষিণভারত এবং দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ায় যে মাটি পাওয়া যায় তা রুলেটেড মৃৎপাত্রের মাটি থেকে ভিন্ন। তাই মনে করা হয় যে, তমলুক ও চন্দ্রকেতুগড় অঞ্চলে রুলেটেড মৃৎপাত্র তৈরি হতো এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু ও বণিকরা তা দক্ষিণ ভারত এবং দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার বিভিন্ন কেন্দ্রে নিয়ে যেতো।

বিবিধ বর্ণের মৃৎপাত্র  মৃৎপাত্রের খন্ডাংশ বাংলার বিভিন্ন প্রত্নকেন্দ্রে আবিষ্কৃত হয়েছে। মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত একটি নীল প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্রের খন্ডাংশকে প্রাক-মধ্যযুগীয় বলে অনুমান করা হয়, যা হয়ত সে সময়ে পারস্য উপসাগর এলাকা থেকে এসেছে। পরবর্তী সময়ে পশ্চিম এশিয়া এবং চীন থেকে বাংলায় অনেক প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র এসেছিল। এগুলি Islamic glazed ceramics বলে পরিচিত।

নব্ড মৃৎপাত্র  প্রকারটি বাংলা, ভারতবর্ষ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার আদি-ঐতিহাসিক সময়ের প্রত্নকেন্দ্রে পাওয়া যায়। পাত্রটির বৈশিষ্ট্য হলো এর মধ্যখানে একটি নব্ থাকে যার চারদিকে বৃত্তাকারে ৭-১০টি খাঁজকাটা দাগ থাকে। এই নব্ড মৃৎপাত্রের সুনির্দিষ্ট ব্যবহার কি ছিল তা আজও জানা যায়নি। তবে অনুমান করা হয় যে দৈনন্দিন রান্না, খাবার সরবরাহ বা শো পিস হিসেবে নবড্ মৃৎপাত্র ব্যবহূত হয়নি। ব্রোঞ্জ, পাথর বা মৃৎনির্মিত নবড্ পাত্র কোন ধর্মীয় বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ব্যবহূত হয়ে থাকবে।

আধুনিক লক্ষ্মীসড়া

নবড্ পাত্রকে ‘মন্ডল’ হিসেবে মনে করা যায়- যেমন, বিশ্বব্রহ্মান্ডের একটি অংশের কাল্পনিক প্রতীক নব্কে মেরু পাহাড় এবং চারদিকের বৃত্তাকার দাগগুলিকে সমুদ্র বলে মনে করা যায়।

অ্যামফোরা  হলো ফ্লাস্কের মতো সাধারণত ঋজুরেখ, লম্বা গলা এবং দুটি হাতল যুক্ত। এর তলাটি হয় চোঙাকৃতি। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তেল এবং মদ রাখার জন্য এগুলি ব্যবহূত হতো। আদি-ঐতিহাসিক যুগের বাংলার সঙ্গে ভূমধ্যসাগর এলাকার বাণিজ্যিক সর্ম্পক বোঝার জন্য বাংলা ও উড়িষ্যা সীমান্তে করন্জীতে প্রাপ্ত একমাত্র অক্ষত অ্যামফোরাটি তাৎপর্যপূর্ণ।

সাধারণ মৃৎপাত্র  কালো-লাল মৃৎপাত্র, উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, কালো প্রলেপযুক্ত মৃৎপাত্র, রুলেটেড মৃৎপাত্র প্রভৃতি বিশেষ শনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ মৃৎপাত্র ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্রে অনেক ধরনের মৃৎপাত্রের খন্ডাংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। তাদেরকে আলোচনার সুবিধার্থে সাধারণ মৃৎপাত্র অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে।

আধুনিক শখের হাঁড়ি

সুনির্দিষ্ট কোন মৃৎপাত্র সূচক ব্যতীত এদের নামকরণ করা সম্ভব নয়। অনুজ্জ্বল লাল মৃৎপাত্র, ধূসর মৃৎপাত্র প্রভৃতিকে সাধারণ মৃৎপাত্রের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এইসব মৃৎপাত্রের বুনন হলো মোটা থেকে মাঝারি মানের। কোন কোন মৃৎপাত্র চাকার সাহায্যে তৈরি হলেও হাতে তৈরি মৃৎপাত্রের সংখ্যা বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মৃৎপাত্র তৈরির মাটি খুব ভালভাবে মথিত করা নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পান দেওয়ার জন্য ব্যবহূত  হয় ধানের তুষ।

বেশিরভাগ মৃৎপাত্রে রঙের প্রলেপ নেই। খুব কম মৃৎপাত্রই চিত্রিত, তবে গ্রাফিটি একেবারে অনুপস্থিত। কিছু কিছু মৃৎপাত্র খন্ডাংশে ছিদ্রযুক্ত নকশা এবং স্ট্যাম্প নকশা পরিলক্ষিত হয়। মাদুর এবং ঝুড়ি নকশার আধিক্য দেখা যায়।

আজও গ্রামবাংলায় মৃৎপাত্র প্রচলিত আছে। বাংলার অনেক গ্রাম আছে যা কুমার পাড়া বা পালপাড়া হিসেবে পরিচিত। কুমার বা পাল বলতে তাদেরকে বোঝায় যারা মৃৎপাত্র তৈরি করে এবং পাড়া বলতে বোঝায় তাদের বসতি স্থাপন। আজকাল দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত হাঁড়ি-কলস ছাড়াও রসের হাঁড়ি, শখের হাঁড়ি, ধর্মঘট, শীতলঘট, নাগঘট, মনসাঘট, মঙ্গলঘট, মহররমঘট, গাজীঘট, লক্ষ্মীসড়া প্রভৃতি বাংলার প্রাচীন সমৃদ্ধ মৃৎশিল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।  [এস.এস মোস্তাফিজুর রহমান]