প্রাণিকুল

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১৬:৩০, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

প্রাণিকুল (Fauna)  উপউষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশে নানা ধরনের বাস্ত্তসংস্থানিক পরিবেশ বিরাজমান। দীর্ঘ উপকূলভাগ, অসংখ্য নদ-নদী, খাল-বিল, দিঘি, হ্রদ, হাওর, বাঁওড়, পুকুর এবং অন্যান্য জলাভূমি ছাড়াও এখানে রয়েছে উষ্ণমন্ডলীয় প্রকৃতির নিম্নভূমির চিরসবুজ বন, আধা-চিরসবুজ বন, পাহাড়ি বনাঞ্চল, আর্দ্র পত্রঝরা বন, প্লাবনভূমি এবং লম্বা ঘাসসমৃদ্ধ সমতল ভূমি। ছোট বড় বিভিন্ন রকমের বনাঞ্চল এবং মনোরম জলবায়ু এদেশকে বহুযুগ ধরে বিচিত্র বন্যপ্রাণীর অনবদ্য আবাসস্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কৃষি ও শিল্পের প্রসারণের কারণে বিগত দুই শতকে অনেক এলাকার মৌলিক বৈশিষ্ট্যময় গাছপালার মূল প্রকৃতি এবং সেসঙ্গে বাস্ত্ততান্ত্রিক পরিবেশ বহুলাংশে পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে দেশের প্রাণিকুল ও উদ্ভিদের উপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

এ উপমহাদেশের জীবজন্তু সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয় বহুকাল আগেকার পর্যটক এবং জীববিজ্ঞানীদের বিবরণী থেকে। মুগল সম্রাটদের কেউ কেউ পশুপাখি প্রেমিক ছিলেন। দেখা যায় মুগল শিল্পকলা ও রচনায় জীবজন্তু গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। প্রকৃতপক্ষে, বিজ্ঞানের এক শাখা হিসেবে এদেশে প্রাণিবিজ্ঞানের শুরু ব্রিটিশ রাজত্বকালে। স্টুয়ার্ট বেকার, গুনথার, ব্লিথ, টি.সি জার্ডন, মেলিন, যোসেফ হুকার, ব্লানফোর্ড, হেমিলটন বুকানন, ফ্রান্সিস ডে প্রমুখ মনীষী প্রাণী সম্পর্কিত জ্ঞানভান্ডারে মূল্যবান অবদান রাখেন। অর্ধশতাধিক খন্ডে প্রকাশিত The Fauna of British India আজও ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের অমূল্য অবদানের সাক্ষ্য বহন করে। গোড়ার দিকে গবেষকদের তথ্য ও বিবরণী থেকে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার অভ্যন্তরে এক সময় চমৎকার প্রাণিকুলের সমাবেশ ছিল। এদের কতক যেমন গন্ডার, বুনো মহিষ, বনগরু, অ্যান্টিলোপ (antelope), বনছাগল (serow), নাকতা হাঁস, কাঠময়ূর ইত্যাদি এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অন্যান্য আরও বহু প্রজাতির জীবজন্তুর সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে, এর অনেকগুলিই বিপন্নপ্রায় অথবা বিপন্ন।

এতদ্সত্ত্বেও বাংলাদেশের জলজ এবং স্থলজ পরিবেশে এখনও বহু ধরনের অমেরুদন্ডী এবং মেরুদন্ডী প্রাণী বাস করে। অমেরুদন্ডী প্রাণী সম্পর্কে তথ্য এখনও সম্পূর্ণ নয়, তবে মেরুদন্ডী প্রাণী সম্বন্ধে আমাদের ধারণা সন্তোষজনক।

অমেরুদন্ডী  নিম্নশ্রেণীর অমেরুদন্ডীদের মধ্যে কতিপয় পরজীবী প্রোটোজোয়া, স্বাদু ও লবণাক্ত পানির কিছু স্পঞ্জ ও প্রবাল প্রজাতি এবং অনেকগুলি নিমাটোড ও হেলমিনথ পরজীবীর বর্ণনা হয়েছে। হোমোপটেরান কীটপতঙ্গদের প্রায় ২০টি গণের অধীনে ৩০ প্রজাতির জাবপোকা তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ দল অর্থনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ, ফসলের সরাসরি ক্ষতি করা ছাড়াও এরা বিভিন্ন শস্যের ভাইরাস রোগ সংক্রমণ করে। বায়ু প্রবাহের মাধ্যমে ডানাবিশিষ্ট জাবপোকা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র বিশ্বে বহু প্রজাতির মৌমাছিজাতীয় পতঙ্গের বর্ণনা হলেও বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০ প্রজাতির কথা জানা গেছে, এর মধ্যে চারটি মৌমাছি। অন্যান্য হাইমেনোপটেরানদের মধ্যে এদেশের বোলতা ও পিঁপড়াসহ প্রায় ৩০০ প্রজাতির তালিকা তৈরি হয়েছে।

কতিপয় অমেরুদন্ডী ও মেরুদন্ডী প্রাণী
যকৃত কৃমি
পাতা ফড়িং
এডিস মশা
চিংড়ি
স্পঞ্জ
মাকড়াসা
শ্যামা
কালো-পাখা চিল
ডাহুক
বসন্তবৌরি
বাদুড়
পুটি
ব্যাঙ
কুমির
গন্ডার
বনগরু
নীলগাই
বারোশিঙা

প্রজাতির সংখ্যার দিক থেকে Coleoptera প্রাণিজগতের সবচেয়ে বড় বর্গ। সাধারণভাবে বিটল ও উইভিল নামে পরিচিত এসব কীটপতঙ্গের প্রায় ৩৫ প্রজাতির গোবরে পোকা এবং প্রায় ৩০ প্রজাতির পাতাভুক স্ক্যারাব (scarab) বিটলের বর্ণনা হয়েছে। প্রায় ৮০ প্রজাতির উপকারী এবং ১৩ প্রজাতির ক্ষতিকর লেডিবার্ড (ladybird) বিটল-এর তথ্যও লিপিবদ্ধ হয়েছে। এশিয়া মহাদেশ থেকে প্রায় ২৮০ প্রজাতির জোনাকি পোকাজাতীয় বিটল-এর কথা জানা গেলেও বাংলাদেশ থেকে বর্ণনা হয়েছে প্রায় ২০ প্রজাতির।

বাংলাদেশের মাছিজাতীয় পতঙ্গদের মধ্যে বাড়িঘরের মাছি, স্টেবল ফ্লাই (stable fly), নীলমাছি, হভার ফ্লাই, ডিয়ার ফ্লাই, হর্স ফ্লাই, ফলের মাছি, ব্লো ফ্লাই, ক্রেন ফ্লাই ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। স্যান্ড ফ্লাই বাড়িঘরে এবং বাইরেও দেখা যায়। এর এক প্রজাতি বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় কালাজ্বরের রোগজীবাণু ছড়ায়। অন্তত পাঁচটি ফলের মাছি শনাক্ত করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৬০০ প্রজাতির মশার কথা জানা গেলেও বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১১৩ প্রজাতির বর্ণনা হয়েছে। এর কয়েকটি প্রজাতি ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু ইত্যাদি রোগ সংক্রমণের জন্য দায়ী। প্রায় ১৭ গোত্রের অধীনে ৯৫ গণ এবং প্রায় ২৯৯ প্রজাতির মাকড়সা বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বহু প্রজাতির স্বাদু ও লবণাক্ত পানির কাঁকড়া, চিংড়ি এবং লবস্টার বাংলাদেশে পাওয়া যায়। পাঁচ প্রজাতির স্বাদুপানির এবং ৩৫ প্রজাতির সামুদ্রিক কাঁকড়ার কথা জানা গেছে। এর মধ্যে উপকূল এলাকায় Scylla olivacea (mud crab) প্রচুর পরিমাণে আহরিত হয়। বঙ্গোপসাগরের উপকূল ভাগ থেকে দুই প্রজাতির কিং ক্রাব (king crab) বর্ণনা করা হয়েছে। এদেশের স্বাদুপানির ২১ প্রজাতির চিংড়ি এবং লবণাক্ত পানির ৩৪ প্রজাতির চিংড়ি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর থেকে বর্ণিত চার প্রজাতির লবস্টার-এর মধ্যে Panulirus polyphagus এবং Thenus orientalis বাণিজ্যিক দিক থেকে দুটি উল্লেখযোগ্য প্রজাতি। Daphnia, Cypris-সহ আরও কয়েকটি কোপিপড (Copepod) প্রজাতি স্বাদুপানির অতি গুরুত্বপূর্ণ জুপ্লাঙ্কটন। লবণাক্ত পানি থেকে অন্তত আরও ২০টি গুরুত্বপূর্ণ জুপ্লাঙ্কটনের বর্ণনা হয়েছে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকা থেকে দুটি তারামাছের (starfish) প্রজাতিসহ কয়েক প্রজাতির স্যান্ড ডলার, সী আর্চিন এবং সী কিউকাম্বার রেকর্ড করা হয়েছে।

মেরুদন্ডী প্রাণী  আজ পর্যন্ত মেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে প্রায় ২৯,০০০ প্রজাতির মাছ, ৫০০০ প্রজাতির উভচর, ৭৪০০ প্রজাতির সরীসৃপ, ৯০০০ প্রজাতির পাখি এবং ৪৫০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ীর কথা জানা গেছে। বাংলাদেশ ভূখন্ড থেকে এসব প্রাণীর প্রায় ১৬১০ প্রজাতির তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে (সারণি ১)।

সারণি ১ বাংলাদেশের মেরুদন্ডী প্রাণী।

দল মোট জীবিত প্রজাতির সংখ্যা মোট
মাছ ২৫১ (স্বাদু ও সামান্য লোনাপানির) ৪০২ (সামুদ্রিক) ৬৫৩
উভচর ৩৪ (অভ্যন্তরীণ) ৩৪
সরীসৃপ ১৩৭ (অভ্যন্তরীণ) ১৭ (সামুদ্রিক) ১৫৪
পাখি ৩০১ (স্থানীয়)   ৩৪৯ (পরিযায়ী) ৬৫০
স্তন্যপায়ী  ১১০ (অভ্যন্তরীণ) ৯ (সামুদ্রিক) ১১৯
মোট ৮৩৩ (অভ্যন্তরীণ/স্থানীয়) ৭৭৭ (সামুদ্রিক/পরিযায়ী) ১৬১০

মাছ  বাংলাদেশে আছে ৪০২ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত Chondrichthyes শ্রেণীর ৫১ প্রজাতির কোমলাস্থিবিশিষ্ট মাছ এবং Osteichthyes শ্রেণীর ৩৫১ প্রজাতির অস্থিময় মাছ। মোহনা এলাকায় এবং নদ-নদীসহ অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলিতে বাস করে ২৫১ প্রজাতির মাছ।

উভচর  বাংলাদেশে উভচর প্রাণীদের Anura বর্গের কুনো ব্যাঙ ও কোলা ব্যাঙদের মাত্র ২২টি প্রজাতি রয়েছে।

সরীসৃপ  একশত সাইত্রিশটি অভ্যন্তরীণ এবং ১৭টি সামুদ্রিক প্রজাতিসহ মোট ১৫৪টি সরীসৃপ প্রজাতি বাংলাদেশে আছে। অভ্যন্তরীণ প্রজাতিগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ২টি কুমির, ২২টি কচ্ছপ ও কাইট্টা, ১৮টি টিকটিকি ও গুইসাপ এবং ৬৭টি সাপের প্রজাতি। কুমিরের এক প্রজাতি Crocodylus palustris বন্য অবস্থায় এদেশে টিকে নেই। বর্তমানে কেবল বাগেরহাট জেলার হযরত খান জাহান আলীর মাযার শরীফের পুকুরে এটি টিকে আছে।

পাখি  ভারতীয় উপমহাদেশে পাখির প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ১২০০। এর মধ্যে বাংলাদেশ এলাকায় দেখা যায় ৬৫০ প্রজাতি, এর ৩০১টি স্থানীয় এবং ৩৪৯টি পরিযায়ী। বাদিহাঁস (White-winged duck) এবং রাজশকুনসহ (Red-headed vulture) কয়েক জাতের পাখি এদেশ থেকে বিলুপ্তির পথে।

স্তন্যপায়ী  সারাবিশ্বে বর্তমানে টিকে থাকা প্রায় ৪৫০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ীর মধ্যে এ উপমহাদেশে আছে প্রায় এক দশমাংশ। বাংলাদেশে আছে ১২টি বর্গের ৩৫ গোত্রের ১১০টি অভ্যন্তরীণ (inland) প্রজাতি এবং Cetacea বর্গের একটি গোত্রের পাঁচটি সামুদ্রিক প্রজাতি।

বিপন্ন মেরুদন্ডী প্রাণী  এক সময় বিভিন্ন প্রজাতির মেরুদন্ডী প্রাণীর বিপুল সমাবেশ থাকলেও বিগত একশত বছরে এদেশ থেকে বিলীন হয়ে গেছে এক ডজনের বেশি বন্যজন্তু। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এক-শিং গন্ডার Rhinoceros unicornis; জাভা গন্ডার, R. sondaicus; এশীয় দুই-শিং গন্ডার, Didermoceros sumatrensis; বনগরু, Bos gaurus; বানটেং, B. banteng; বুনো মহিষ, Bubalus bubalis; নীলগাই, Boselaphus tragocamelus; বারোশিঙা, Cervus duvauceli; নেকড়ে, Canis lupus; নাকতা হাঁস, Rhodonessa caryophyllacea; ময়ূর (Peafowl), Pavo cristatus; এবং স্বাদুপানির কুমির, Crocodylus palustris। সম্প্রতি (২০০০ সালে) IUCN-Bangladesh মেরুদন্ডী প্রাণীদের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এখান থেকে জানা যায় ৫৪ প্রজাতির অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মাছ, ৮ প্রজাতির উভচর, ৫৮ প্রজাতির অভ্যন্তরীণ সরীসৃপ, ৪১ প্রজাতির স্থানীয় পাখি এবং ৪০ প্রজাতির অন্তর্দেশীয় (inland) স্তন্যপায়ী নানাভাবে হুমকিগ্রস্ত (সারণি ২)। এদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। তথ্যের অভাবে অনেক পরিযায়ী পাখির এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর বর্তমান অবস্থা নির্ণয় করা সম্ভব হয় নি।

সারণি ২ বাংলাদেশে অন্তর্দেশীয় (inland) এবং স্থানীয় (resident) মেরুদন্ডী প্রাণীদের বর্তমান অবস্থা।

দল বিলুপ্ত জীবিত প্রজাতি সংখ্যা স্থানীয়ভাবে হুমকিগ্রস্ত সারাবিশ্বে বিপন্ন তথ্য অপর্যাপ্ত বিপদগ্রস্ত নয়
অতিবিপন্ন বিপন্ন বিপন্নপ্রায় মোট
মাছ (স্বাদুপানি ও মোহনা এলাকা) --- ২৫১ ১২ ২৮ ১৪ ৫৪ --- ৬৬ ১৪৬
উভচর --- ৩৪ --- --- --- ৭৭
সরীসৃপ ১৩৭ ১২ ২৪ ২২ ৫৮ ১৪ ৩৯ ১২
পাখি ৩০১ ১৯ ১৮ ৪১ ১৮ ১৫৮ ১৮৯
স্তন্যপায়ী ১০ ১১০ ২১ ১৩ ৪০ ১৮ ৫৩ ১৭
মোট ১৩ ৮৩৩ ৬৪ ৮৬ ৫১ ২০১ ৫০ ৩২৩ ৩৭১

সম্প্রতি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এ দেশের উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপর ২৮ খন্ডে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফ্লোরা এন্ড ফনা অব বাংলাদেশ’ কোষগ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এতে ১৪ খন্ডে বিস্তৃত বাংলাদেশের আজ পর্যন্ত শনাক্ত করা প্রতিটি প্রাণী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে।  [মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম]

প্রাণিবিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা (Zoology education and research)  কেবল স্বতন্ত্র একটি প্রাণী নয়, গোটা প্রাণিকুল ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, উদ্ভিদ ও অজৈব পরিবেশের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্ক ইত্যাদি সব ধরনের ধারণযোগ্য আলোচনা ও গবেষণা প্রাণিবিজ্ঞানের বিষয়বস্ত্ত। বিশাল পরিসরের কারণে প্রাণিবিজ্ঞান সাধারণত কতকগুলি শাখায় এখন বিভক্ত এবং এগুলির মধ্যে মুখ্য শ্রেণীবিন্যাস, কোষতত্ত্ব, অঙ্গসংস্থান, শারীরবৃত্ত, প্রায়োগিক শারীরস্থান, ভ্রূণবিদ্যা, প্রত্নজীববিদ্যা, জীনতত্ত্ব ও বংশগতি, বাস্ত্তসংস্থান, প্রাণিভূগোল এবং অর্থনৈতিক প্রাণিবিদ্যা। জ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে প্রোটোজুলজী, কীটতত্ত্ব, পরজীবীবিদ্যা, মৎস্যবিদ্যা, বন্যপ্রাণিবিদ্যা, সংরক্ষণ জীববিদ্যা ইত্যাদি শাখাসমূহের উদ্ভব ঘটেছে।

প্রাচীনকালের প্রকৃতিবিদরা প্রকৃতিতে জীবজন্তু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাণিবিজ্ঞানের চর্চা শুরু করেছিলেন। হিপোক্রেটিস (আনু. ৪৬০-৩৭০ খ্রিস্টপূর্ব) ও অ্যারিস্টটল (আনু. ৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্ব) তাঁদের সময়কালে বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণার ধারাবাহিক সংগঠনের প্রয়াস পান, কিন্তু রোমান আমলে তাতে ভাটা পড়ে এবং গ্যালেন-এর স্মরণীয় অবদানের পর ১৮ শতক পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞান গবেষণায় উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি অর্জিত হয় নি। কুভ্যের (১৮১২) প্রত্নজীববিদ্যাকে বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ল্যামার্ক, মেন্ডেল ও ডারউইন প্রমুখদের মতবাদ বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণায় বিপ্লব আনে। লিনিয়াস (১৮৫৭) প্রথম প্রাণীর দ্বিপদ নামকরণ প্রবর্তন ও যথাযথ ব্যবহার করেন।

শিক্ষা ও গবেষণা বাংলাদেশে উচ্চস্তরে প্রাণিবিজ্ঞান চর্চার সূচনা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের অধীনে ১৯৩৯ সালে, যেখানে ১৯৪৮-৪৯ শিক্ষাবর্ষে প্রাণিবিদ্যার স্নাতক (পাস) কোর্স চালু হয়েছিল। অধ্যাপক পঞ্চানন মহেশ্বরী জীববিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন। প্রাণিবিদ্যার বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষণার অগ্রগতি সাধিত হলে এই বিষয়ে পৃথক একটি বিভাগ খোলার প্রয়োজন অনুভূত হয়। ফলে ১৯৫৪ সালে স্বতন্ত্র এক বিভাগ হিসেবে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রতিষ্ঠা হয়। অধ্যাপক হাবিবউল্লাহ খান ইউছুফজাই প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রথম বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৫২-৫৩ সালে প্রাণিবিদ্যা বিষয়ে জীববিজ্ঞান বিভাগে প্রথম স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু হয়। ইতোপূর্বে প্রাণিবিদ্যার স্নাতক (পাস) কোর্সে ভর্তি হওয়া ছাত্ররা এই বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) কোর্সে বদলির সুযোগ পায় এবং তাঁরা ১৯৫৪ সালের চূড়ান্ত স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। সূচনালগ্ন থেকে প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এক্ষেত্রে শিক্ষা ও গবেষণায় মূল্যবান অবদান রেখে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৪ সালে প্রাণিবিদ্যা বিভাগ জীববিজ্ঞান অনুষদের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতঃপূর্বে এটি বিজ্ঞান অনুষদের অধীন ছিল। বর্তমানে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগ যে ভবনে অবস্থিত প্রাণিবিদ্যা বিভাগ প্রথমে ওখানেই ছিল এবং ১৯৫৫ সালে বিভাগটি বর্তমান ভবনে স্থানান্তরিত হয়।

এই বিভাগে শিক্ষক, স্নাতকোত্তর শেষপর্ব (থিসিস গ্রুপ), এম.ফিল এবং পিএইচ.ডি শিক্ষার্থীরা কীটতত্ত্ব, মৎস্যবিদ্যা, পরজীবিবিদ্যা ও বন্যপ্রাণী জীববিদ্যায় গবেষণাকর্ম পরিচালনা করছেন। এককভাবে প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে, বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণাকর্ম চলছে। গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্র হলো ১. কীটতত্ত্ব– ভেক্টর বায়োলজী ও ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশক ব্যবহার ও ঢাকা শহরের মশা নিয়ন্ত্রণের বিশেষ প্রসঙ্গসহ মশা নিয়ন্ত্রণ; কীটপতঙ্গের শ্রেণীবিন্যাস, অঙ্গসংস্থান ও ভ্রূণবিদ্যা; পতঙ্গ বাস্তব্যবিদ্যা; অর্থকরি ও চিকিৎসা বিষয়ক কীটতত্ত্ব; মাকড়সা ও উইয়ের শ্রেণীবিন্যাস ও বাস্তব্যবিদ্যা; ২. মৎস্যবিদ্যা– অ্যাকুয়াকালচার, মাছের রোগতত্ত্ব ও পরজীবীবিদ্যা; লিমনোলজী (limnology), পুকুর ও হ্রদে মাছের উৎপাদন; মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা; বিপণন, প্রক্রিয়াকরণ ও মান নিয়ন্ত্রণ; মাছের জীববিদ্যা; প্লাবনভূমিতে মৎস্যচাষ; ৩. পরজীবীবিদ্যা– শ্রেণীবিন্যাস, বাস্তসংস্থান, জীববিদ্যা, রোগসংক্রমণ ও পরজীবী নিয়ন্ত্রণ; বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞান– শ্রেণীবিন্যাস, প্রজনন জীববিদ্যা; প্রজনন-শারীরবৃত্ত, খাদ্যবস্ত্ত ও খাদ্যাভ্যাস, Eco-ethology; এবং উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ব্যবস্থাপনা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭২ সালে স্বতন্ত্র প্রাণিবিদ্যা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ইতোপূর্বে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধীনে সম্পূরক বিষয় হিসেবে প্রাণিবিদ্যা পড়ানো হতো। ১৯৬৯ সালে সেখানে প্রথম প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু হয়। এ বিভাগে বর্তমানে প্রাণিবিদ্যার স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর, এম.ফিল, পিএইচ.ডি ডিগ্রি কোর্স ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। স্নাতকোত্তর স্তরে কোষজীববিদ্যা, রেশমপোকা চাষপদ্ধতি, বাস্ত্তসংস্থান, পতঙ্গবিদ্যা, মৎস্যবিদ্যা, বংশগতিবিদ্যা ও প্রাণিপ্রজননবিদ্যার বিশেষ কোর্স রয়েছে। বিভাগটিতে মাঠপর্যায়ে গবেষণার জন্য ১৫ একর জমি ও কতকগুলি পুকুর আছে। বিভাগে গবেষণা কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রজনন-জীববিদ্যা, বাস্ত্তসংস্থান, শারীরবৃত্ত, তুঁতগাছ ও রেশমপোকার প্রাকৃতিক শত্রু; দানাশস্য, লেবু ও গুদামজাত ফসলের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের জীববিদ্যা, বাস্ত্তসংস্থান ও নিয়ন্ত্রণ; ড্রসোফিলার বংশগতিবিদ্যা- মশা ও মাছির বংশগতি নিয়ন্ত্রণ; পুকুরে মাছের খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি। বিভাগের শিক্ষাগত ও শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য বিভাগীয় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকমন্ডলীর উদ্যোগে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিজ্ঞান সমিতি’ গঠিত হয়েছে। সমিতি প্রতি বছর ইংরেজিতে University Journal of Zoology ও বাংলায় ‘প্রবাল’ এই দুটি সাময়িকী প্রকাশ করে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৭ সালে প্রাণিবিদ্যা গবেষণা ও অধ্যয়নের উচ্চতর কেন্দ্র হিসেবে Institute of Biological Sciences প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল কৃষি, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিল্প ও শক্তি ব্যবহারের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যাসহ অন্যান্য বিভাগের সহযোগিতায় আধুনিক জীববিজ্ঞানে গবেষণা কর্মকান্ড উন্নয়ন। এই ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এম.ফিল এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রি পর্যায়ে গবেষণার উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৭৩ সালে; বিভাগীয় প্রধান ছিলেন অধ্যাপক শফিক হায়দার চৌধুরী। এই বিভাগে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক (সম্মান), স্নাতকোত্তর, এম.ফিল এবং পিএইচ.ডি পর্যন্ত অধ্যয়ন ও গবেষণার সুযোগ আছে। স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীর জন্য এখানে বিশেষ কোর্সে স্বাদুপানির প্রাণী, মৎস্যজীববিদ্যা, কীটতত্ত্ব ও পরজীবীবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। এখানকার গবেষণাধীন বিষয়গুলির মধ্যে উল্লেখ্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের জৈবনিক নিয়ন্ত্রণ; শিল্পকারখানার বর্জ্য ও কৃষি রাসায়নিক বিষক্রিয়ার পরিণাম; হালদা নদীর প্রাণী; পানির তলবাসী প্রাণী; কাপ্তাই জলাশয়ের ভৌত-রাসায়নিক ও জীববিদ্যাগত পরিস্থিতি; মাছের শ্রেণীবিন্যাস; বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ মাছের জীববিদ্যাগত অবস্থা; বোস্তামি কাছিমের প্রজনন জীববিদ্যা; ছোট স্তন্যপায়ী ও পাখির পরজীবীঘটিত রোগ; মাকড়সা, গঙ্গাফড়িং, ম্যান্টিস চিংড়ি, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ, coccoid ও hymenopteran বর্গভুক্ত পরজীবীদের শ্রেণীবিন্যাস ও জীববিদ্যা; এবং কর্ণফুলি নদীর মোহনার গুরুত্বপূর্ণ ক্যারিডীয় চিংড়ির পরিসংখ্যান ও গবেষণা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক আবদুল লতিফ ভূঁইয়াকে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানে ২ বছরের স্নাতকোত্তর কোর্স চালুর মাধ্যমে ১৯৭২-৭৩ সালে শিক্ষাবর্ষের শুরু হয়। ১৯৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের ৩ বছরের স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু হয়। ১৯৮৩ সালের ১৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান বিভাগকে পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে উন্নীত করে। এই ইনস্টিটিউটে মৎস্য জীববিদ্যা, বাস্ত্তসংস্থান, অণুজীববিদ্যা, প্লাঙ্কটনবিদ্যা, ম্যানগ্রোভ গবেষণা, হাইড্রোলজী, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ ও অনুসন্ধান, সমুদ্রের পানিদূষণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর, এম.ফিল, পিএইচ.ডি কোর্সে পড়াশুনা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

ঢাকার অদূরে সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮৬ সালে প্রাণবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (Institute of Life Sciences) প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে এ ইনস্টিটিউটে উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যা, দুটি বিভাগ ছিল। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৭ সালে এতে ফার্মেসি বিভাগ যুক্ত হয়। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম। সূচনালগ্ন থেকেই এখানে প্রাণিবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও ফার্মেসিতে স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু ছিল। এখন প্রাণিবিদ্যা বিভাগে কীটতত্ত্ব, লিমনোলজী, মৎস্যবিদ্যা এবং বন্যপ্রাণী ও সংরক্ষণ জীববিদ্যা নামের বিশেষ শাখাগুলি স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য চালু রয়েছে। বিভাগে বিভিন্ন বিষয়ে এম.ফিল ও পিএইচ.ডি করার সুযোগ আছে। প্রাণবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ২০০১ সালের শুরুতে জীববিজ্ঞান অনুষদে রূপান্তরিত হয়।

ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলি বিভাগে প্রাণিবিজ্ঞান গবেষণা ছড়িয়ে রয়েছে। বিভাগগুলি হলো প্রাণিবিদ্যা, কীটতত্ত্ব, মৎস্য জীববিদ্যা ও লিমনোলজী, অ্যাকুয়াকালচার ও ব্যবস্থাপনা এবং মৎস্য প্রযুক্তি। শেষোক্ত তিনটি বিভাগ এখন মৎস্য অনুষদের অন্তর্ভুক্ত। Veterinary Sciences এবং Animal Husbandry অনুষদ দুটিতে পরজীবীবিদ্যাসহ প্রাণিবিজ্ঞানের বিষয়ও পড়ানো হয়। প্রাণিবিদ্যা বিভাগে স্নাতকপূর্ব মৌলিক বিষয়গুলি অধ্যয়নের ব্যবস্থা রয়েছে। কীটতত্ত্ব বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স পড়ানো হয়। সেখানে সাধারণ কীটতত্ত্ব ছাড়াও বিভিন্ন শস্যের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ, শ্রেণীবিন্যাস, জীববিদ্যা, বালাই নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তব্যবিদ্যা সম্পর্কে গবেষণা পরিচালিত হয়।

মৎস্য অনুষদে মাছের জীববিদ্যা, পানির বাস্তব্যবিদ্যা, অ্যাকুয়াকালচার, মাছ চাষ ব্যবস্থাপনা এবং মাছ প্রক্রিয়াকরণ ও প্রযুক্তিসহ মৎস্যবিদ্যা ও অ্যাকুয়াকালচার সংশ্লিষ্ট কোর্স রয়েছে। মাছের খাদ্য, মাছের আহার গ্রহণ সংক্রান্ত বাস্তব্যবিদ্যা, মাছের কৃত্রিম প্রজনন, মাছের পরজীবী ও রোগ, সমন্বিত মাছচাষ, মাছচাষ সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর ইত্যাদি বিষয়ে এখানে গবেষণা পরিচালিত হয়।।

গাজীপুরে সালনায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক Institute of Postgraduate Studies in Agriculture) ১৯৮০ সালে কীটতত্ত্ব বিভাগ খোলা হয়। কৃষি কীটতত্ত্ব, ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা এবং প্রায়োগিক কীটতত্ত্বের বিভিন্ন শাখায় এম.এস এবং পিএইচ.ডি কোর্স ও গবেষণার ব্যবস্থা আছে।

জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা (জগন্নাথ কলেজ সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে); ঢাকা কলেজ, ঢাকা; ইডেন কলেজ, ঢাকা; তিতুমীর কলেজ, ঢাকা; সাদত কলেজ, টাঙ্গাইল; আনন্দমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ; মুরারী চাঁদ কলেজ, সিলেট; চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম; বিএল কলেজ, দৌলতপুর; বিএম কলেজ, বরিশাল; কারমাইকেল কলেজ, রংপুর; আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া; রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী; এবং পটুয়াখালী কলেজ, পটুয়াখালীসহ প্রায় দুই ডজন কলেজে প্রাণিবিজ্ঞানের স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়েছে। গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কর্মসূচি তদারক করে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (BCSIR) খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, (সাবেক খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ) নিম্নবর্ণিত প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মকান্ডসমূহ পরিলাচনা করছে: অপচনশীল আহরণোত্তর খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, যেমন দানাশস্য, শিম, তৈলবীজ ইত্যাদি; পচনশীল খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন, যেমন মাছ, ফল, শাকসবজি; হাঁস-মুরগির খামারের জন্য খাদ্যবর্জ্যের সদত্যবহার; দেশের সার্বিক খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের বা সংশোধনের মাধ্যমে সমাজকল্যাণে অবদান; খাদ্য সংরক্ষণের জন্য দেশজ প্রযুক্তির বিকাশ; পথ্য ও পুষ্টি উন্নয়ন ইত্যাদি।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৭৬ সালে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এ প্রতিষ্ঠানের কীটতত্ত্ব বিভাগই মূলত বিভিন্ন ধরনের শস্যের ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনার উপর গবেষণার দায়িত্বপ্রাপ্ত। এখানে গম, ভুট্টা, জোয়ার (চীনা, কাওন), তৈলবীজ (সরিষা, তিল, চীনাবাদাম ও তিসি), ডাল (মসুরি, মুগ, খেসারি, ছোলা, অড়হর), তামাক, তুলা, মূলজ ও কন্দজ ফসল (আলু, মিষ্টিআলু ও কচু), মসলা, শাকসবজি (বেগুন, ঢেঁড়স) এবং কুমড়াজাতীয় ফসলের (খিরা,বাঙ্গি ও তরমুজ) ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনার উপর গবেষণা কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। এই বিভাগটি ইঁদুর, পাখি ও শিকারি স্তন্যপায়ীর মতো ক্ষতিকর মেরুদন্ডীদের ব্যবস্থাপনা এবং লাক্ষা উৎপাদন বৃদ্ধির ওপরও কাজ করছে।

এছাড়া বাংলাদেশের নিম্নোক্ত গবেষণা সংস্থাগুলিতেও প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়: বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশন; বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন; বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (SRARRSO); বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ প্রানিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট; বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ও সামাজিক চিকিৎসা ইনস্টিটিউট (NIPSOM)।  [এস.এম হুমায়ুন কবির]