পোড়ামাটির শিল্প

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১২:৫৯, ১২ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

পোড়ামাটির শিল্প  মৃণ্ময়শিল্প বা ভাস্কর্যের সর্বপ্রাচীন নমুনা, যাতে বাঙালি শিল্পিরা বিশেষ নৈপুণ্য অর্জন করেছিল। পোড়ামাটির শিল্পদ্রব্য শিল্পিদের সৃষ্টি-আকাঙ্ক্ষাকে যেমন পূরণ করত, তেমনি সাধারণ মানুষও তাদের গৃহস্থালি বা ধর্মীয় কর্মযজ্ঞে এর ব্যবহার করত। কাদা-মাটিকে সূর্যের তাপে অথবা আগুনে পুড়িয়ে নিয়ে শক্ত এবং টেকসই করা হতো। আর এভাবেই প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে মানুষ পোড়ামাটির সামগ্রী তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে আসছে।

এই শিল্পরীতিটি প্রাচীনকাল থেকে সমগ্র প্রাথমিক মধ্যযুগ ও মধ্যযুগ পর্যন্ত, এমনকি কিছু কিছু হিন্দু স্থাপত্যে এর প্রয়োগ উনিশ শতকের মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। এই শিল্পটি ছোট মাটির ছোট মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদি প্রায় সব রকমের ফর্মেই লক্ষ করা যায়। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো পোড়ামাটির ফলক। ইটের স্থাপত্যের বহির্ভাগের অলঙ্করণে ব্যবহূত পোড়ামাটির প্যানেল ও ফ্রিজ দক্ষিণ এশিয়ার শিল্প জগতে বাংলার গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

পাড়ামাটির ফলক   বাণগড়মহাস্থানএর মতো প্রাচীন প্রত্নস্থলগুলি থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে এ শিল্পের সাথে শিল্পের ইতিহাসের বিশেষজ্ঞদের পরিচিতি ঘটেছিল। এগুলির সৌন্দর্য ও গুরুত্ব প্রকাশ পায় কে এন দীক্ষিত কর্তৃক পাহাড়পুর খননের ফলে, যেখানে পাওয়া গেছে এধরনের শিল্পের সবচেয়ে বৃহৎ আকর। ময়নামতী প্রত্নস্থল থেকে পোড়ামাটির ফলকের প্রাপ্তি প্রমাণ করে যে, বাংলার সমগ্র ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে এ শিল্পের প্রচলন ছিল। পশ্চিম বাংলার চন্দ্রকেতুগড়, তাম্রলিপ্তি ও হরিনারায়ণপুর রীতি এবং বাংলাদেশের মঙ্গলকোট-সরলপুর-পলাশবাড়ি (বগুড়ার মহাস্থানের নিকটস্থ) রীতির সাম্প্রতিক আবিষ্কার এই শিল্প রীতির বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের চন্দ্রকেতুগড় ও তার সমগোত্রীয় ধারা ময়নামতী-পাহাড়পুর ধারার অনেক আগের এবং তাদের রীতি ও বিষয়বস্ত্ত ছিল অনেকটাই ভিন্ন। মঙ্গলকোট ও তার সমগোত্রীয় পোড়ামাটির ফলকগুলি ছয়-সাত শতকের এবং তাদের শিল্প ঐতিহ্য এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে পাওয়া যে কোন রীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এগুলি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক এবং তাদের কিছু কিছু বিষয়বস্ত্ত রামায়ণ থেকে নেওয়া ব্রাহ্মণ্য লোকগাঁথা সম্পর্কিত। এ থেকে প্রতীয়মান যে, বাংলায় পোড়ামাটির শিল্পের একাধিক ধারা প্রচলিত ছিল এবং এই বৈচিত্র্য থাকার কারণেই শিল্পটি মধ্যযুগ, এমনকি পরবর্তী মধ্যযুগেও এর অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল।

পোড়ামাটির প্যানেলে হাতি শিকার, পাহাড়পুর, নওগাঁ

ফলকগুলি আংশিক ছাঁচে ঢালা ও আংশিক হাতে গড়া। প্রাচীন যুগে এই ফলকগুলি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মন্দিরগাত্র অলঙ্কৃত করা এবং মন্দির প্রাচীরের একঘেয়েমির মাঝে বৈচিত্র্য আনয়ন করা। ফলকগুলির আরও কিছু ব্যবহার ছিল। এগুলি তীর্থযাত্রীদের জ্ঞাতব্য বিষয় ও মনোরঞ্জনের বস্ত্ত হিসেবেও ব্যবহূত হতো। বিষয়বস্ত্ততে শুধুমাত্র হিন্দু দেবদেবী বা বৌদ্ধ মুর্তিই স্থান পেত না, দৈনন্দিন জীবনচিত্রও এখানে ফুটে উঠত। ফলক নির্মাতাগণ তাদের শিল্পকর্মের মধ্যে প্রকাশ ঘটাত জীবনের বিভিন্ন দিক, যেখানে ফুটে উঠত প্রাসাদে জীবনযাত্রা নির্বাহের প্রতিচ্ছবি, সাধারণ মানুষের সরল জীবন যাপন এবং দরিদ্র মানুষের কুঁড়েঘরে কাটানো জীবনাচার। বাংলার পোড়ামাটির শিল্পের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে জীবনের এধরনের বাস্তবধর্মী প্রতিচ্ছবি।

মন্দির কমপ্লেক্সের বিপুল পরিমাণ জায়গা দখল করত পোড়ামাটির ফলক। এধরনের বিশাল কর্মযজ্ঞ সমাধায় কেবল একজন শিল্পিই যথেষ্ট ছিলেন না, বরং প্রয়োজন হতো একটি গোটা শিল্পি গোষ্ঠীর। তাদেরকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ফলক নির্মাণ করতে হতো, ফলে প্রায় সময়ই তারা এর অন্তর্নিহিত গুণের দিকে নজর দিতে পারত না। তাই ফলকসমূহ যেমন হতো না নির্দিষ্ট মাপের, তেমনি সেগুলি একই রকমভাবে পোড়ানোও হতো না। অনেক সময়ে ফলকের ভেতরের বিষয়বস্ত্ত ফ্রেমের সীমাকে ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে যেত।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পলাশবাড়ি- সরলপুর থেকে সাম্প্রতিককালে সমমাপের ১২ × ৮ × ১১১/২ সেমি পঞ্চান্নটি পোড়ামাটির ফলক আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলি উৎকীর্ণ হয়েছে সাত শতকের শেষার্ধ ও আট শতকের গুপ্ত রীতিতে। রামায়ণের ঘটনাও এগুলিতে বিধৃত হয়েছে। ধারণা করা যায় যে, ফলকগুলি এতদঞ্চলের কয়েকটি বৈষ্ণব মন্দিরের সম্মুখভাগ অলঙ্করণের জন্য নির্মিত হয়েছিল।

পলাশবাড়ি-সরলপুর থেকে প্রাপ্ত ফলকগুলির বিষয়বস্ত্ত বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় যে, শিল্পিরা আঞ্চলিক রীতি ও ধর্মবিশ্বাসে কি পরিমাণ প্রভাবিত ছিল। এর প্রকাশ পাওয়া যায় দশরথের মৃত্যু, রাম-সীতার বিবাহের দৃশ্যে, যেগুলির সাথে মিল আছে স্থানীয় অধিবাস, কন্যা-সম্প্রদান প্রভৃতি অনুষ্ঠানের। এখানে বর্ণনাকৃত ঘটনাসমূহ সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গুপ্ত পোড়ামাটির শিল্পের গভীর প্রভাব থাকলেও এ জাতীয় শিল্পকর্মে জাতিগত ও স্থানীয় প্রভাবের অন্তরঙ্গ যোগাযোগ থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মডেলিংয়ে গুপ্ত ঐতিহ্যের দক্ষতা দেখা গেলেও ভাস্কর্যের কম্পোজিশন ও ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণে স্থানীয় উপাদানকে, যা বিভিন্ন পদ্ধতিতে বিস্তারলাভ করতে শুরু করেছিল, প্রতীয়মান করে তোলে।

পোড়ামাটির অলঙ্করন, আতিয়া মসজিদ, টাঙ্গাইল

স্থাপত্য শৈলীকে আকর্ষণীয় করার জন্য ভবনসমূহে পোড়ামাটির শিল্পের অগ্রগতি পাল পরবর্তী যুগে এসে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। এটি সম্ভবত পরবর্তী যুগে বিকশিত প্রচলিত রীতি বিরুদ্ধ শিল্পকর্মের চাপের ফল। পাহাড়পুর ও ময়নামতীর পর শতক ব্যাপী এই শিল্পকর্মেও ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায় না। তবে এটি ধারণা করা যায় যে গ্রামাঞ্চলে এই বর্ণনাধর্মী শিল্পটি বিভিন্ন ফর্ম ও মাধ্যমে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। যেমন- স্ক্রল পেইন্টিং, মূর্তি তৈরি, চিত্রিত পান্ডুলিপির কাঠের কভার ইত্যাদি।

স্থাপত্যিক ভবনসমূহ অলংকরণের জন্য খোদাইকৃত ইটের ব্যবহারের প্রচলন পুনরায় দেখা যায় প্রাথমিক মুসলিম যুগে চৌদ্দ ও পনেরো শতকে। এই বদ্বীপ অঞ্চলটিতে পাথরের দুষ্প্রাপ্যতা মুসলিম স্থপতিদের ইট ব্যবহারে বাধ্য করে। আর সে কারণেই প্রাচীন পোড়ামাটির শিল্পটি ভবন অলংকরণে ব্যবহূত হতে থাকে। মুসলিম স্থাপত্যে ব্যবহূত পোড়ামাটির প্যানেলগুলিতে উৎকীর্ণ হতো শুধু বিমূর্ত, জ্যামিতিক ও ফুলেল নকশা। মুসলিম ভবনসমূহে ব্যাপকভাবে পোড়ামাটির প্যানেল ব্যবহার করা হয়। প্রাচীনকালের অংকিত জীবজন্তু ও মানুষের প্রতিকৃতির স্থলে ফুল ও জ্যামিতিক নকশা জায়গা করে নিতে শুরু করে। নিজস্ব ঐতিহ্যের অধিকারী আনাতলীয় ও তূর্কি শিল্প রীতির মধ্য এশিয় কারিগরী দক্ষতা মুসলিম ভবনগুলির পোড়ামাটির অলংকরণকে আরও উন্নত করতে সাহায্য করে।

পোড়ামাটির সূর্য মূর্তি, মহাস্থান

বাংলার ইতিহাসে সমগ্র ইলিয়াস শাহীহোসেন শাহী যুগ ধরে মসজিদ ও মুসলিম ইমারতসমূহে পোড়ামাটির ফলকের ব্যবহার চলতে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদএ (১৩৭৫) পোড়ামাটির অলংকরণে স্থানীয় লোকশিল্পের সাথে মুসলিম জ্যামিতিক ও বিমূর্ত নকশার মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। তবে এগুলি তখনও সম্পূর্ণ একাত্ম হয়ে ওঠে নি। একলাখী সমাধিসৌধএ (১৪১৫-১৪৩২) এ সংমিশ্রণের সম্পূর্ণতা দেখা য়ায় এবং স্থানীয় শিল্পের সাথে মুসলিম চরিত্র একত্রিত হয়ে জন্ম নেয় বাংলার এক সাধারণ শিল্প ফর্মূলা। ফলে বাংলার মুসলিম পোড়ামাটির শিল্প পরিগ্রহ করে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ একটি ‘হাইব্রিড স্টাইল’। মুসলিম স্থাপত্য অলংকরণে পোড়ামাটির শিল্প একটি প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।

আফগান শাসনামলে (১৫৩৮-৭৫) পোড়ামাটির অলঙ্করণ সামান্যই দেখতে পাওয়া যায় এবং মুগল আমলেও এর পরিমাণ ছিল কম। শেষোক্ত আমলে অলঙ্করণে প্লাস্টারকেই প্রাধান্য দেওয়া হতো। সতেরো শতকের শেষ পর্যন্ত এই শিল্পকর্মটি কিছুটা স্থবির অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে এবং এরপর তা আরও সঙ্কুচিত হয়ে এর পূর্বের জৌলুসময় অধ্যায়ের এক কঙ্কালে পরিণত হয়। তবে ষোল শতকে এসে হিন্দু মন্দিরে এই শিল্পকর্মের পুনর্জন্ম লক্ষ্য করা যায়। এটি ছিল বাংলায় শ্রী চৈতন্য এর প্রভাব। ইট নির্মিত  মন্দির স্থাপত্যগুলিতে পোড়ামাটির ফলকে ফুটে উঠত মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের দৃশ্য। এখানে দৃশ্যায়িত হতো মহাকাব্য ও পৌরাণিক কাহিনী, সেই সাথে থাকত ধর্মবহির্ভূত সাধারণ জীবনের ছবি। ইমারত অলঙ্করণে মুসলমানদের উদ্ভাবিত শিল্পের সাথে মন্দির স্থপতিরা এ নকশায় মানুষ ও জীবজন্তুর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে একে করে তোলে আরও উন্নত। ষোল শতকের শেষের দিকে অল্প কিছু মন্দির, যেমন, হুগলির বঁইচিগ্রাম মন্দির (১৫৮০), বর্ধমানের বৈদ্যপুর মন্দির (১৫৯৮) এবং বিষ্ণুপুরের বীর হাম্বীর রাসমঞ্চ মন্দিরে মুসলিম স্থাপত্যে ব্যবহূত ফুলেল নকশার সাথে অপেক্ষাকৃত কম ফিগারযুক্ত নকশা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু মুর্শিদাবাদের গোকর্ণ মন্দির (১৫৯০) ও যশোরের রাইনগর মন্দিরের (১৫৮৮) ফলকসমূহে বিপুল পরিমাণ দেবদেবীর প্রতিকৃতি চোখে পড়ে, যা পরবর্তীযুগের মন্দিরসমূহের জন্য দিক নির্দেশনা সৃষ্টি করে যায়। বাংলায় বিদ্যমান বেশ কিছু সংখ্যক মন্দির আঠারো শতকের শেষ ভাগে এবং ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে নির্মিত হয়েছিল।

মন্দির অলঙ্করণে ব্যবহূত অত্যন্ত মসৃণভাবে খোদাইকৃত পোড়ামাটির ফলকগুলি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ণ অনুসরণ করত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্মুখ ফাসাদটি সাজানো হতো, এবং অন্য দিকগুলিতে হয় এক বা দুটি বড় ফলক বসানো থাকতো অথবা অল্প কয়েকটি সারিতে জ্যামিতিক নকশা সমৃদ্ধ ফলক স্থাপিত হতো। তবে খুব সামান্য কয়েকটি মন্দিরে অলঙ্করণের আতিশয্য চোখে পড়ে। এগুলির মধ্যে দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দির সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। মন্দির প্রাচীর সাজানোর বহুল ব্যবহূত বিষয়বস্ত্ত হলো রামায়ণের ঘটনাবলি এবং শ্রী কৃষ্ণের জীবন কাহিনী। মঙ্গলকাব্যের কবিদের দ্বারা জনপ্রিয় করে তোলা পৌরাণিক কাহিনী কমলে-কামিনী-র ঘটনাও কয়েকটি মন্দিরে উৎকীর্ণ হয়েছে। সমাজের দরিদ্রস্তরে বসবাসকারী এই শিল্পিরা পর্যবেক্ষণ ক্ষমতায় ছিল অসাধারণ, আর তাই তারা তাদের কাজের মাঝে ফুটিয়ে তুলেছে তাদের চারপাশের চোখে দেখা সমাজকে। তাই এই ফলকগুলি সামাজিক ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

পোড়ামাটির মূর্তি  বাংলাদেশের মহাস্থান, পাহাড়পুর, সাভার এবং ময়নামতীতে খননের ফলে বহু পোড়ামাটির মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে, যেগুলি দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের পরিচয় বহন করছে। বাংলাদেশের প্রত্নস্থলগুলি থেকে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রীতে মৌর্য আমলের পোড়ামাটির নিদর্শনের স্বল্পতা রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, মহাস্থান মৌর্য শাসনের অন্তর্ভুক্ত এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এখান থেকে মাত্র দুটি নারী মূর্তি পাওয়া গিয়েছে, যা শৈলীগত বিচারে মৌর্য যুগের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এই মূর্তিগুলির সাথে সামান্য কিছু এন.বি.পি পাত্রের টুকরা এবং পাঞ্চমার্কড মুদ্রা পাওয়া গেছে, যেগুলির তারিখ বিবেচনায় মূর্তিগুলির তারিখ নির্ণয় করা যায়। মূর্তিতত্ত্বের বিচারে আবক্ষ মূর্তি দুটিকে যক্ষিণী বলে শনাক্ত করা যায়।

ষাঁড়, পোড়ামাটি, ময়নামতী

বাংলাদেশে শুঙ্গ যুগীয় পোড়ামাটির মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে বগুড়া জেলার মহাস্থান থেকে। মানুষের মূর্তি ছাড়াও পশু-পাখির কিছু মূর্তি পাওয়া গেছে। এ যুগের মূর্তিগুলির মধ্যে ধর্মীয় ও সাধারণ জীবনচিত্র সম্বলিত মূর্তি চোখে পড়ে।

খ্রিস্টপূর্ব দুই থেকে প্রথম অব্দের তথাকথিত শুঙ্গ যুগের শিল্পীদের শিল্পকর্ম বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মূর্তির সংখ্যাই শুধু বৃদ্ধি পায় নি, সেই সাথে একক ছাঁচে ঢালা মূর্তির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। শুঙ্গ মূর্তিগুলি চারিত্রিক দিক দিয়ে ছিল গ্রামীণ। ভারহুত, সাঁচি ও বোধগয়ার প্রস্তর রিলিফগুলিতে শুঙ্গ পোড়ামাটির মূর্তিগুলির মতো পোশাক-পরিচ্ছদ, কেশ-বিন্যাস ও অলঙ্কার লক্ষ্য করা যায়।

শিল্পিগণ সূর্য, লক্ষ্মী, মাতৃকা, পঞ্চচূড়াসহ যক্ষিণী এবং বসুধরা এবং সেই সাথে তারা প্রথম বারের মতো শকুন্তলার ঘটনাও প্যানেলের মাঝে ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হন।

বাংলাদেশে প্রাপ্ত বেশিরভাগ শুঙ্গ মূর্তি মাথার দিকে ছিদ্রযুক্ত, ফলে এগুলি দেওয়ালের সাথে ঝুলিয়ে গৃহসজ্জার কাজেও ব্যবহার করা যেত। উল্লেখ্য যে, শুঙ্গ রীতির অনুসারী বাংলাদেশের শিল্পিগণ একটিও পুরুষ মূর্তি নির্মাণ করেন নি।

বাংলাদেশে কুষাণ যুগের চিত্র করুণ। এ যুগে পোড়ামাটির মূর্তির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পায়। বাংলাদেশে এ যুগে নির্মিত মাত্র তিনটি নারী মূর্তি আবিস্কৃত হয়েছে। দেখা যায় যে, কোন এক অজানা কারণে মৌর্য ও কুষাণ আমলে বাংলাদেশের শিল্পিরা কেবলই নারী মূর্তিই নির্মাণ করেছে।

বাংলাদেশে পোড়ামাটির মূর্তি চরম উৎকর্ষ লাভ করে গুপ্ত যুগে। গুপ্তযুগের প্রায় ত্রিশটির মতো মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। এই পোড়ামাটির মূর্তিগুলিতে সমসাময়িককালের প্রস্তর ও ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ও সেই সাথে চিত্রকলার গুণাগুণ চোখে পড়ে। যদিও গুপ্ত যুগে একক এবং দ্বৈতভাবে ঢালাইকৃত (moulded) মূর্তি নির্মিত হয়েছে, তথাপি বাংলাদেশের শিল্পিরা এ ধরনের একক মূর্তি নির্মাণে বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে।

পোড়ামাটির মেডালিয়ানে যুগল দম্পতি, মহাস্থান

পূর্ববর্তী শতকগুলিতে চালু হওয়া মূর্তি পূজা গুপ্তযুগে এসে বেশ গতি লাভ করে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ পোড়ামাটির মূর্তির সকল শাখায় এ ধরনের উন্নতি চোখে পড়ে। ব্রাহ্মণ্য হিন্দু মূর্তি, যেমন- সূর্য, নরসিংহ, শিব, বায়ু ইত্যাদি এ যুগেই নির্মিত হয়েছিল। গন্ধর্ব-এর মতো অর্ধ-দেব মূর্তিও এ যুগে নির্মিত হয়। মাতৃকা মূর্তি নির্মাণের প্রচলিত রীতি অবশ্য চলতেই থাকে, সেই সাথে বৌদ্ধ সংমিশ্রণও ঘটে। মৃৎশিল্পিদের কাছে এ সময়ে মনুষ্য আকৃতি প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্রীয় বিষয় বস্ত্ততে পরিণত হয়। শিল্পিরা খুব সাধারণভাবেই প্যানেলগুলি সাজাতো, যাতে হয় বৌদ্ধ কাহিনী অথবা পঞ্চতন্ত্র থেকে নির্বাচিত অংশ বিবৃত হতো।পাল-চন্দ্র যুগের পোড়ামাটির মূর্তিগুলি বেশিরভাগই ইটের আদলে পাওয়া যায়। এগুলি পাহাড়পুর ও ময়নামতীর মন্দির দেওয়াল সাজাতে ব্যবহূত হয়েছিল। বিষয়বস্ত্ততে পঞ্চতন্ত্রের বিবরণ অন্তর্ভুক্ত থাকত। সৌন্দর্য্যের দিক থেকে পাল পোড়ামাটির মূর্তি একটি নতুন নন্দনশৈলী উদ্ভাবন করে। এ যুগে তিন ধরনের মূর্তি চোখে পড়ে। প্রথম ধরনের মূর্তিগুলিতে ধ্রুপদী বাধ্যবাধকতার ক্ষীণ ছাপ চোখে পড়ে।

দ্বিতীয় ধারার মূর্তিগুলির মাঝে আংশিক ধ্রুপদী ও আংশিক স্থানীয় রীতির বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়।পাল যুগের তৃতীয় ধারার মূর্তিগুলি গুপ্ত যুগের ধ্রুপদী ধারণা থেকে একেবারেই স্বাধীন এবং এগুলিতে আবেগময় অনুভূতিতে সম্মোজ্বল স্থানীয় প্রকাশভঙ্গি সুস্পষ্ট। মূর্তিতত্ত্বের ভাষায় এ যুগে বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্ব, তারা, মঞ্জুশ্রী ও পর্ণ সবরী এবং হিন্দু দেবদেবী যেমন, শিব, নারদ, বিষ্ণু, ব্রহ্মা, গণেশ ইত্যাদি নির্মিত হয়েছে।

গুপ্ত ও গুপ্ত পরবর্তী যুগে এ অঞ্চলে গাঙ্গেয় সভ্যতার যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব তা ছিল মঙ্গলকোট থেকে আবিষ্কৃত পোড়ামাটির মূর্তির মধ্যে দেখা যায়। ১৯৮১-৮৩ সালের মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক খননকৃত স্তূপটি মহাস্থানগড় প্রত্নস্থল থেকে প্রায় ১ কিমি পশ্চিমে অবস্থিত। একটি ছোট্ট মন্দিরের ভিত্তি দেওয়ালের নিচে এক হাজারেরও বেশি পোড়ামাটির মূর্তি পাওয়া গেছে। মুর্তিগুলির অধিকাংশ শিরস্ত্রাণযুক্ত খন্ডিত নারী মস্তক, উন্নত বক্ষ ও স্বচ্ছ পরিচ্ছদ আবৃত। মঙ্গলকোট প্রত্নস্থলে প্রাপ্ত পোড়ামাটির মূর্তিগুলি অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অধিকাংশ মূর্তির মাথা সাপের ফণাযুক্ত। অধিকাংশ দেবদেবীর মাথায় একক সাপের ফণা লক্ষ করা যায়। ফণাগুলি মস্তক শীর্ষে নির্মিত ক্ষুদ্রাকৃতির ছাতাসদৃশ। এ বৈশিষ্ট্যের ব্যতিক্রম হিসেবে খুব কম ক্ষেত্রেই একাধিক ফণার সমাবেশ পরিলক্ষিত হয়। এই সর্পফণা নির্মাণ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, মূর্তিগুলি সম্ভবত উপ দেবদেবীর প্রতীক ছিল। মাথার আকার অনুপাতে সর্পফণার আকার নির্ধারিত হতো। প্রাপ্ত পোড়ামাটির মূর্তিগুলিকে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে: (ক) মস্তক ও আবক্ষ মূর্তি: অপেক্ষাকৃত অধিক সংখ্যক মূর্তি এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এগুলিকে বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে দুটি বিশেষ গ্রুপে ভাগ করা যায়। প্রথম ধরনের মূর্তিগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল সমাজের উঁচু স্তরের নর-নারীর মূর্তি; (খ) অদ্ভুত প্রকৃতির মূর্তি: এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত পোড়ামাটির মূর্তিগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হলেও, মুখাবয়ব নির্মাণে শিল্পিরা যেমন দেখিয়েছেন, পারদর্শিতা তেমনি হয়েছেন যত্নশীল। এ গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত অন্য ধরনের আর একটি শ্রেণির পোড়ামাটির মূর্তিতে নারী মূর্তির আধিক্য দেখা যায়। এখানে নারী প্রকৃতি ও স্বকীয়তা স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করা হয়েছে। শিল্পরীতি বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, মূর্তিগুলি নিখুঁতভাবে তৈরি এবং এগুলির দৈহিক সৌন্দর্যে কোমল আবেদন সৃষ্টির প্রয়াস অভিনব বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে। এ রীতিটি গুপ্ত যুগে প্রবেশের ক্রান্তিলগ্নের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে; (গ) বৃহদাকার ধর্মীয় মানব মূর্তি: ধর্মীয়ভাব প্রকাশের জন্য এ শ্রেণির বৃহদাকার মানব মূর্তি নির্মিত হয়েছে। গুপ্তযুগের শিল্পরীতির অনুসরণে নির্মিত মূর্তিগুলিতে ভাবের গভীরতা ও কুষাণ যুগের মথুরা শিল্পিদের পার্থিবতা প্রাধান্যলাভ করেছে। কিছু মূর্তির মুখমন্ডলে বিস্ফোরিত নেত্র, ধনুকাকৃতির ভ্রূ প্রতীয়মান করে যে এগুলি গুপ্ত ও গুপ্ত পরবর্তী যুগের এবং এগুলিতে মথুরার কুষাণ ভিত্তিক গুপ্ত রীতির প্রভাব লক্ষণীয়।  [সাইফুদ্দীন চৌধুরী]