মানবাধিকার

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১০:৩২, ৪ মার্চ ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

মানবাধিকার  মানবাধিকারের ধারণাটি আঠারো শতকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের বিকাশকালের ফসল। তবে সমসাময়িক মানবাধিকারের ধারণার উদ্ভব ঘটেছে সাম্প্রতিক কালে। মৌলিক অধিকারের ধারণার বিকাশ ঘটে মূলত ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’ (ইউডিএইচআর)-এর মাধ্যমে, যা ১৯৪৮ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ধ্বংসযজ্ঞের অভিজ্ঞতা থেকে জাতিসংঘ কর্তৃক একটি সনদ হিসেবে গৃহীত হয়। তবে মানবাধিকারের আলোচনা বিশ্বব্যাপি প্রসার লাভ করে বিশ শতকের চল্লিশ থেকে নববইয়ের দশকের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে। বর্তমানে যেকোন বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকারের ধারণা একটি প্রাথমিক কাঠামোগত ভিত্তি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।

মানবাধিকার বলতে বোঝায় মৌলিক অধিকার এবং স্বাধীনতা যা সকল মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার। প্রচলিত ধারণায় এই অধিকারগুলো হচ্ছে অখন্ডনীয় এবং মৌল। তবে এ সকল অধিকার এবং স্বাধীনতা  যেসব ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হোক, তা থাকবে বিতর্কের জন্য উন্মুক্ত। তাই দেখা যায় যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এবং নাগরিক  অধিকার (যা প্রথম প্রজন্মের অধিকার বলে বিবেচিত) বেশি সুবিধা দিচ্ছে বলে অনেকে প্রাধান্য দেন, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারকে (যা দ্বিতীয় প্রজন্মের অধিকার বলে বিবেচিত) অনেকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অনেকে আবার গুরুত্ব দিচ্ছেন যে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে উল্লেখিত মানবাধিকার নির্ধারিত হয়নির্দিষ্ট সংস্কৃতির মাধ্যমে এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

প্রাকৃতিক অধিকার থেকে মানবাধিকার  মানব ইতিহাসের ব্যাপক পরিসরে দেখা যায় যে, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকার, দায়িত্ব এবং কর্তব্যবোধ রূপলাভ করে সমাজের সদস্য হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট দল বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং সে প্রতিষ্ঠান হতে পারে পরিবার, সম্প্রদায়, ধর্ম, পেশাগত গ্রুপ ইত্যাদি। ব্যক্তি হিসেবে প্রতিটি মানুষ তার মানব অস্তিত্বের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্য, এ ধারণাটি সাম্প্রতিক হলেও বহুপূর্ব থেকে প্রচলিত বিভিন্ন প্রথা এবং প্রধান ধর্মীয় অনুশাসনের মূলে এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিক কাল থেকেই সর্বজনীন মানবাধিকারের ভিত্তিমূল হিসেবে প্রাকৃতিক আইনকে বিবেচনা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে প্রাকৃতিক নিয়মাবলি বজায় রাখার ক্ষেত্রে যেসব সংগঠক রয়েছে তা বিভিন্ন সময়ে এবং পরিসরে ধর্মীয় এবং নৈতিক অবস্থান হতে জৈবিক ও সামাজিক রীতিনীতির স্থিরতা দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকগণ প্রাকৃতিক অধিকার এবং ন্যায়নীতি প্রসঙ্গে পরিস্কার ধারণা দেন, যা মূলত প্রাকৃতিক আইন হতে উদ্ভূত এবং বিশ্বে বিদ্যমান প্রাকৃতিক নিয়ম-শৃঙ্খলা থেকে বিকাশ লাভ করেছিল। এই প্রাকৃতিক শৃঙ্খলার একটি ঐশ্বরিক ভিত্তি ছিল যা সৃষ্টিকর্তা বা বিধাতার ইচ্ছা হিসেবে ধরা হয়। এ ব্যাপারে একটি পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় সার্বভৌম প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা হতে, যা সতেরো এবং আঠারো শতকের ইউরোপের বহু দার্শনিক তাদের লেখার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এখানে তাঁরা মত প্রকাশ করেন যে, অধিকার এবং বাধ্যবাধকতা ব্যক্তির সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে সমষ্টিগতভাবে রাষ্ট্রে প্রকাশ পেয়েছে। সামাজিক চুক্তি মতবাদের প্রণেতা তত্ত্ববিদগণ প্রাকৃতিক আইনের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়ার মাধ্যমে একে বিস্তৃত করে মানব সম্প্রদায়ের প্রাকৃতিক অধিকারকে আরো সহজভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন।

আঠারো শতকের দার্শনিক জন লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদের বিস্তৃতির দ্বারা সামাজিক চুক্তি মতবাদের যে নতুন ধারা তৈরি হয় তা পরবর্তীতে মানবাধিকার তত্ত্বের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদে রাষ্ট্র কর্তৃক সম্পাদিত দ্বিতীয় চুক্তিতে (১৬৮৯) তিনি যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, বিধাতার বা প্রকৃতির সৃষ্টি হিসেবে প্রতিটি মানবসত্তা প্রকৃতিগতভাবে স্বাধীন এবং সমঅধিকার সম্পন্ন। সুতরাং জনগণের প্রাকৃতিক অধিকার ছিল, এবং প্রাকৃতিক আইন ব্যবহার করে তারা জীবনের এবং সম্পত্তির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ভোগ করত। কাল্পনিকতা সত্বেও লকের প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা আধুনিক ধারার অধিকারের ধারণার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এক্ষেত্রে ১৭৭৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের উল্লেখ করা যায় যেখানে প্রাকৃতিক অধিকারের মতবাদ গ্রহণ করে বলা হয়েছিল, সকল মানুষ সমভাবে সৃষ্ট হয়েছে এবং সেই সাথে প্রকৃতিগতভাবে অখন্ডযোগ্য কিছু অধিকার লাভ করেছে যার মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অনুসন্ধানের মতো অধিকার।

সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা লাভের অল্প কিছুদিনের মধ্যে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার প্রাথমিক ভিত্তির দলিলটি গৃহীত হয়। বাধ্যবাধকতাহীন এই দলিলে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার একনায়ক সুলভ ক্ষমতার ব্যবহার থেকে ব্যক্তিকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে মানবাধিকারের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। বিশ্বের সবগুলো মহাদেশের এবং ধর্মের প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে আন্তর্জাতিকভাবে নির্বাচিত বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটির দ্বারা গবেষণার মাধ্যমে এবং প্রতিটি অধিকার আলাদা অংশে বিভক্ত করে সর্বজনীন মানবাধিকার তত্ত্বটি প্রস্ত্তত হয়। সর্বজনীন মানবাধিকার তত্ত্বে মৌলিক অধিকার এবং স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, যা সমগ্র মানব সত্তার সাথে জড়িত। ইউডিএইচআর-এর ১ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে যে, সকল মানুষই স্বাধীন অবস্থায় সম-মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এর সাথে যোগ করা হয়েছে অর্থনীতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকার এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার। সব অধিকারের সমন্বয়ে প্রণীত ইউডিএইচআর-এ আশা করা হয়েছিল যে, মৌলিক অধিকারসমূহ অবিচ্ছেদ্য এবং অলঙ্ঘনীয় ভাবে তৈরী। ইউডিএইচআর-এ ঘোষিত মানবাধিকারের ধারণা পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে কখনও পূর্ণ সমর্থন পায়নি, এমনকি পরবর্তীতে এ ধারণার বিপক্ষে তাদের কাছ থেকে আপত্তিও এসেছে।

বছর পরিক্রমায় বিভিন্ন কভেন্যান্টস এবং সনদ দ্বারা ইউডিএইচআর-এ বর্ণিত মানবাধিকারের ধারণার পরিসর বৃদ্ধি পেয়ে কাঠামোগতভাবে আরো বিস্তৃত হয়েছে বিভিন্ন যৌথ অধিকার এবং অ-রাষ্ট্রীয় সংগঠক বিশেষ করে বহুজাতিক কর্পোরেশন সমূহের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকারের স্বীকৃতির মাধ্যমে।

সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণার দ্বারা কে অধিকার ভোগ করবে এবং সেটা কোন প্রকার অধিকার তা নির্ধারণ করা হয়নি। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে উপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কঠোর আন্দোলন চলাকালীন সময়ে এ প্রশ্নও উঠে আসে যে অধিকার কার, এবং কোনো নারী বা পুরুষ কী ধরণের অধিকার লাভ করবে। ফলে এ সময়ে অধিকারের এই দুই ধরণের ধারণার সমন্বয়ে নতুন একটি ধারা তৈরী হয় (Lauren-in-Cimel)। কোনো একটি মৌলিক মানবাধিকার কিভাবে অর্জিত হয় এবং কোন অংশটি অহস্তান্তরযোগ্য, এই দুটির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি হয় উপনিবেশিকতাবাদ বিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সময়ে। মূলত এ আন্দোলন জাতিগোষ্ঠী এবং সাম্রাজ্যবাদের মধ্যকার বিরোধকে উদারমতাবলম্বী অধিকারের আন্দোলনের ধারণা দ্বারা সুদৃঢ় করে তোলে।

মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিতর্কে জাতীয়তাবাদীরা ব্যক্তি অধিকারের চেয়ে কোনো জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বেশী প্রাধান্য দেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, উপনিবেশবাদ বিরোধী কর্মী নাইজেরিয়ার মবোনু ওজিক দাবি করেন যে, মাতৃভূমিতে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করা ব্যক্তির একটি প্রাকৃতিক অধিকার। হো চি মিন ভিয়েতনামের স্বাধীনতা ঘোষণাকালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণায় বিধৃত জনগণের অনন্য-সমর্পনীয় অধিকারের উদ্ধৃতি দেন। পশ্চিমা দেশগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও ১৯৫২ সালে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকারের বিষয়টির প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শন করে। ইউরোপের দেশগুলো এবং নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা জীবন ধারনের অধিকার, স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকারের মতো মৌলিক মানবাধিকার ধারণার সাথে আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকারকে সমমর্যাদায় স্বীকৃতি দিতে দ্বিমত পোষণ করেন। বিরোধীদের মধ্যে বেশিরভাগই তৃতীয় বিশ্বের জাতীয়তাবাদের ধারণার প্রতি সন্দেহ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

বিশ্বায়ন, এনজিও এবং নতুন জাত্যতিশায়ী মানবাধিকার শাসনকাল উনিশ শতকের সত্তুরের দশকে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মানবাধিকারের বিষয়সূচী এবং ক্ষমতার ধারণার ক্ষেত্রে এক নতুন পরিবর্তন আসে। পশ্চিমের বাজার অর্থনীতির নিরীখে কমিউনিজম প্রবর্তনের দ্বারা মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। এ সময়ে উনিশ শতকের চল্লিশের দশকের মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশগুলোর ধারণাকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকারকে (যা প্রথম প্রজম্মের অধিকার বলে বিবেচিত) মৌলিক অধিকার হিসেবে গ্রহণ করে। অন্যদিকে তারা অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকারকে (যা দ্বিতীয় প্রজম্মের অধিকার বলে বিবেচিত) অনুরূপ স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ বিভাজনই মূলত তৃতীয় বিশ্ব ও সমাজতান্ত্রিক ব্লক এবং পশ্চিমের ধনতান্ত্রিক ব্লকের মধ্যে একটি বিভাজক ত্রুটিরেখা হিসেবে দেখা দেয়। অধিকারের এই ধারণা দ্বারা এ সময়ে বিশ্বব্যাংকের বাজার প্রসারের বিরোধিতাকারী  এজেন্ডার আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসা হয়।

একইভাবে মানবাধিকার রক্ষার যে মূল কার্যক্রম জাতিসংঘের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল তা আন্তর্জাতিক এনজিওসমূহ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে স্থানান্তরিত হয়। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের তুলনায় এনজিও কার্যক্রম মৌলিক ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।  ক্ষুদ্রতর পরিসরে হলেও মানবাধিকারের আন্তঃদেশীয় শক্তিশালী একটি সমর্থক গ্রুপ তৈরি হয়, যারা নিজ নিজ সরকারকে চাপের মধ্যে রেখে যেকোন ধরনের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ করে। এই গোষ্ঠী অধিকারের কার্যক্রমের ফলে শাসক কর্তৃক ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার উপর বেশি  গুরুত্বারোপ করা হয়।

স্নায়ুযুদ্ধ সমাপ্তির পর মানবাধিকার কার্যক্রমের ভাষা এবং অর্থ দুটোই পরিবর্তিত হয়েছে। সমাজতন্ত্রের পতনের পর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবাধিকার। বিশ শতকের শেষ দ’ুদশকে বসনিয়া এবং রুয়ান্ডার নির্বিচার হত্যাকান্ড, বিশ্বায়ন, স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক এনজিওসমূহের শাখা প্রশাখার বিস্তৃতির প্রভাবের সাথে সাথে নতুন করে সৃষ্ট সুশাসনের ভাষা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে অধিকারের ধারণার অনুপ্রবেশ মানবাধিকারের ধারণাকে বিশ্বব্যাপি প্রসারিত করেছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের প্রেক্ষিতেও এটি একটি বাস্তব ঘটনা। জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি সম্মেলনে, বিশেষ করে নারীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনগুলোতে শুধু নারী অধিকার সংরক্ষণ হয়নি বরং মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়েছে। এক্ষেত্রে ১৯৯৩ সালের মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ভিয়েনা সম্মেলনে মানবাধিকারের বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়।

এ সময় দেখা যায়, দক্ষিণের বহুমুখি এনজিওগুলো জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে বিভিন্নভাবে গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করে যাচ্ছে। এদের কোনটি পশ্চিমা অর্থায়নে স্থাপিত এবং তাদের অর্থায়নের উপর নির্ভর করেই চলছে, আবার কিছু এনজিও সম্পূর্ণভাবে জাতীয় পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে। যৌথভাবে এরা অধিকারের ধারণার বিশ্ব দৃশ্যপটকে পরিবর্তন করছে, মানবাধিকারের বিষয়টি ব্যাপকতর করছে এবং পরিবেশের অধিকারের ইস্যু থেকে স্বাস্থ্যের অধিকারের ইস্যু, অর্থনৈতিক ন্যায়নিষ্ঠতা, বহুজাতিক দায়দায়িত্ব প্রভৃতি ইস্যুকে অন্তর্ভূক্ত করেছে।

সর্বজনীনতাবাদ বনাম সাংস্কৃতিক-আপেক্ষিকতার দ্বৈত মতবাদের উর্ধ্বে নারী অধিকার এই কৌশলের আলোচনা সমালোচনা মূলত জাতিরাষ্ট্র সমূহের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ পরবর্তী ক্ষমতার প্রভাব এবং অধিনস্থতার সম্পর্ককে উপলব্ধি করতে সক্ষম করে এবং এর দ্বারা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ এবং অবৈধ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরো উন্মুক্ত হয়ে উঠে। বাস্তবক্ষেত্রে দেখা যায় যে, উপনিবেশিক এবং প্রাচ্যের কাঠামো ভিত্তিক জ্ঞানের দ্বারা প্রভাবিত ও সংগঠিত হয়ে  কতগুলো সামাজিক প্রথার স্বীকৃতির ফলে অন্যান্য মানবাধিকার যথেষ্ট উপেক্ষিত রয়ে গেছে। সমালোচকগণ অভিযোগ করেন যে, ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান বৈশ্বিক শক্তির সম্পর্ককে যথাযথ বিবেচনা ব্যতিরেকে সর্বজনীনতাবাদ বনাম সাংস্কৃতিক-বাস্তববাদ বির্তক উপলব্ধি করা যাবে না। এই ইস্যু শুধু সংস্কৃতি ভিত্তিক মানবাধিকার চর্চাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ক্ষমতার অনুশীলনের  রাজনৈতিক রূপকেও সামনে নিয়ে আসে।

এটা নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক দেখা যায় যে, সর্বত্র স্বীকৃত কতগুলো কারণ নারী অধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী, এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিস্তৃতি রোধে কোনো সংস্কৃতিতে সার্বজনীন অধিকারের দাবিতে এমন সব বিরোধ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয় যার দ্বারা মানবাধিকারের ধারণাটিকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় আবদ্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, আফ্রিকার নারীদের বিশেষ অঙ্গ কর্তনের (এফজিসি) মতো বিষয়ের প্রচলন তাদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম কারণ হলেও তা পিছিয়ে পড়া আফ্রিকার সংস্কৃতিগত প্রথা বলে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে আমেরিকা ও ইউরোপে দীর্ঘকাল ধরে বহুল প্রসারিত স্বামী-স্ত্রী বিরোধ এবং জীবনসঙ্গী হত্যার মতো বিষয় ‘সংস্কৃতিগত অপরাধ’ বলে গণ্য হয়, যা ইউরোপ-আমেরিকার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে প্রতিফলিত হয় না। একইভাবে সার্বজনীনতাবাদ বনাম সাংস্কৃতিক-আপেক্ষিকতা সংশ্লিষ্ট দ্বৈত মতবাদ থেকে এটা সুস্পষ্ট নয় যে, কোনো একজন ককেসাস নারীকে তার পুরষসাথী কর্তৃক হত্যার পরও সেটাকে আমেরিকায় কেন গৃহবিবাদ হিসেবে ধরা  হয়, অথচ একজন আরব নারীকে তার স্বামী হত্যা করলে সমস্যাটি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ বলে গণ্য হয়, যা তাদের সংস্কৃতিতে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সর্বজনীনতাবাদ বনাম সাংস্কৃতিক-বাস্তববাদ বিতর্ক ১৯৮৫ সালে নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত নারী বিষয়ক জাতিসংঘের তৃতীয় বিশ্ব সম্মেলনে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।  ইউরো-আমেরিকান নারীবাদীগণ এফজিসিকে মানবাধিকারের লঙ্ঘনের প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত করেন, যা আফ্রিকার নারীদের ভোগ করতে হয়। আফ্রিকার নারীবাদীগণ যেখানে আলোচনার বিষয়সূচী হিসেবে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে কাঠামোগত সমন্বয়মূলক নীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে পানি এবং জ্বালানীর মতো প্রয়োজনীয় জিনিস বহনের অধিকারের বিষয়ে আলোচনা করে তখন তারা তার বিরোধিতা করে। আফ্রিকার নারীবাদীগণ আভিযোগ করেন যে, এফজিসি’র প্রতি অসামঞ্জস্যমূলক গুরুত্বারোপ করার পিছনে ইউরো-আমেরিকান নারীবাদীদের দুই ধরনের কারণ রয়েছে : (১) সাম্প্রতিক সময়ের জটিল বিশ্ব অর্থনৈতিক রাজনীতিতে আফ্রিকানদের প্রভাব বিস্তার করতে না দেয়া এবং তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা, যার মধ্যে আফ্রিকান নারীদের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত; (২) এর সাথে রয়েছে ইউরো-আমেরিকান সংস্কৃতির প্রসারের উপনিবেশিক প্রবণতা, এবং আফ্রিকান নারীদের অধিকারের রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেদের জাহির করা। সবগুলো দিকের বিশ্লেষণে তাই বলা যায় যে, সার্বজনীনতাবাদ বনাম সাংস্কৃতিক-বাস্তববাদের মধ্যে দৃষ্টিগোচর হবার মতো বিষয়ের বাইরেও মতবাদগত বিতর্ক বিদ্যমান রয়েছে। ক্ষমতার হস্তান্তরের বৈশ্বিক পরিবর্তনের দ্বারা আন্তর্জাতিক নারীবাদীগণ সময়ের ব্যবধানে দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য আংশিকভাবে দূর করতে কিছুটা সক্ষম হয়েছেন। ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানবাধিকার সম্মেলনে দক্ষিণের এনজিওগুলো এবং নারীবাদীগণ বলিষ্ঠভাবে মানবাধিকারের কথা বলে, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফোরামে দৃঢ়তার সাথে মানবাধিকারের বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বলা যায়, এই সময়ের পর থেকেই মানবাধিকারকে একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় কাঠামোবদ্ধ করা অসম্ভব ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে মানবাধিকারের ব্যাপারটি সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ না করে বরং প্রধান কিছু নীতিগত উপাদান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

ভিয়েনা ঘোষণা এবং কর্মসূচী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল যে, নারীর অধিকার মানবাধিকারের অংশ। এর সঙ্গে মানবাধিকারকে আরও নিশ্চিত করা হয়েছে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রর্দশন এবং মৌল স্বাধীনতার পারস্পরিক নির্ভরশীলতা শক্তিশালী করে নিজেদের মধ্যে চালু রাখার উপর জোর দেয়ার মধ্য দিয়ে।

এশিয়ার মুল্যবোধগত বিতর্ক  মানবাধিকারের ক্ষেত্রে এশিয়ার মুল্যবোধগত যে বির্তক তার সূচনা হয় মূলত দক্ষিণের এনজিও সমূহের ব্যাপক উত্থান এবং বিশ্বায়নের সাথে মানবাধিকারের ধারণার সংযুক্তির ফলে। এনজিও প্রভাবিত মানবাধিকারের এই ধারণা রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি কার্যক্রমের অনিয়ম থেকে শুরু করে উপনিবেশিক ইতিহাস এবং বৈশ্বিক আধিপত্যবাদের সমালোচনা করে থাকে। ভিয়েনা সম্মেলনের সুযোগ নিয়ে এশিয়ার কতগুলো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র দাবি করে যে, এশিয়ায় প্রচলিত মানবাধিকারের ধারণা পশ্চিমা মানবাধিকারের ধারণার চাইতে ভিন্নধর্মী, সুতরাং এর যাচাইয়ের মানদন্ডও ভিন্নধর্মী হওয়া উচিত। অন্যতম মূলপার্থক্য  সাংস্কৃতিক ভিন্নতার উপর যুক্তি প্রদর্শন করে এশিয়ায় ব্যক্তির চাইতে সম্প্রদায়ের ওপর জোর দেয়া হয়, যার সাথে আরো বলা হয় সমষ্টিগত সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের কথা, যা ব্যক্তির নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকারের উপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

এশিয়ার মুল্যবোধ বিতকের্র মাধ্যমে কিছু যৌক্তিক সমালোচনা উঠে আসে যার দ্বারা মানবাধিকারের ধারণাটি আরো স্বচ্ছ এবং কার্যকর ভাবে উপলব্ধি করা যায়। এর সাথে আদি-সংস্কৃতিগত একটি ধারা তৈরী হয়, যা ব্যক্তি অধিকার বহনকারী উদার মানবাধিকারের ধারণাকে আইনি ও রাজনৈতিক দার্শনিকদের কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন করে তোলে।

বাস্তবে দেখা যায় যে, এশিয়ার মূল্যবোধগত যে দৃষ্টিভঙ্গি তা ব্যাপকভাবে সমস্যাবহুল। এশিয়ার সীমানাগত সীমারেখা এবং সংস্কৃতি বিভিন্ন মিশ্র সংস্কৃতি এবং স্থান থেকে আগত, একে নির্দিষ্ট কোনো মূল্যবোধ দ্বারা সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। বস্ত্তত পশ্চিমের সাথে বিশ্বের অবশিষ্ট অংশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেখা যায় জাতি, সংস্কৃতি এবং শ্রেণীগত বৈচিত্র্যের কারণে এশিয়ার সাথে অন্য অংশের পার্থক্য বিদ্যমান, আঞ্চলিক সীমারেখাগত পার্থক্যতো সেখানে রয়েছেই।

ব্রিটিশ ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তানে মানবাধিকার  মানবাধিকারকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতাদর্শে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যা স্থানীয়  ও আন্তর্জাতিক আলোচনার মাধ্যমে উঠে এসেছে। অধিকারের ধারণার সুনির্দিষ্টতার অভাবে ব্রিটিশ ভারত এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানবাধিকারের সঠিক ইতিহাস প্রণয়নে জটিলতা পরিলক্ষিত হয়। ভাষা এবং শ্রেণীগত জটিলতার সম্পর্কের যে বাধা তৈরি হয়, সেখানে এটা ধরে নেয়া কঠিন যে উপনিবেশ বিরোধী সব বক্তব্য বা চিন্তাধারাই মানবাধিকারের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হিসেবে অসমতাকে বিরোধিতা করছে কিনা। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে স্বাধীনতার জন্য বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী এবং উপনিবেশ বিরোধী যে আন্দোলন তা দক্ষিণ এশিয়ার প্রকৃত মানবাধিকার অর্জনের আন্দোলন কিনা তা উপলব্ধি করাও কঠিন। এ ধারণা বর্তমানে এবং অদূর ভবিষ্যতে কি ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে এটাই আলোচনার বিষয় এবং মানবাধিকারের এই আলোচনায় মানবাধিকার ধারণাটি বিশেষ কিছু শর্তের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক এবং প্রাসঙ্গিকভাবে কিভাবে গড়ে উঠছে তা উপলদ্ধি করা যায়। এক্ষেত্রে উত্তর-দক্ষিণ দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গিকে শুধুমাত্র গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এমন নয়। উনিশ শতকের উপনিবেশিক ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তানের  মানবাধিকার পরিস্থিতি বহুল আলোচিত বিষয় হলেও ষোড়শ শতকের মানবাধিকারের নিজস্ব সংস্কারের আলোচনার সাথে এর সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। এটি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করার মতো কোনো কাঠামো নয়, যার মাধ্যমে সমসাময়িক সংগঠকগণ তাদের কার্যক্রম বুঝতে পারবে অথবা ন্যায়বিচার বা নৈতিকতার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রকাশ করতে পারবে।

বাংলাদেশে মানবাধিকার আন্দোলন নিয়ে কার্যত আলোচনার সূত্রপাত হয় বিশ শতকের আশির দশকে ঐতিহাসিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। মূলত স্থানীয় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা। বিশেষ করে বিশ শতকের শেষভাগে, যখন স্নায়ু যুদ্ধের একটি কৌশল হিসেবে কম্যুনিজমের প্রসার রোধ করার জন্য পশ্চিমের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তৃতীয় বিশ্বের একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন দেয় তখন থেকে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের মানবাধিকার আলোচনায় এ সময়টি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে মানবাধিকার বিশ শতকের আশির দশকে বাংলাদেশে আন্দোলিত নাগরিক সমাজ তাদের আন্দোলনের মুখে সামরিক শাসক কর্তৃক বারবার নিগৃহীত এবং স্বাধীন মতামত প্রকাশের উপর নিয়ন্ত্রন বা হস্তক্ষেপের শিকার হতো। গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে সারা বিশ্বে যখন একনায়কতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছিল, বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের আন্দোলন তখন মানবাধিকারের কাঠামোর আওতায় একটি শক্তিশালী ভিত্তি পেয়েছিল। নেতৃস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতো  নেতৃস্থানীয় প্রতিবাদী মানবাধিকার এবং আইনি সহায়তার সংগঠনগুলো এ আন্দোলনে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রাখে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র যখন মানবাধিকার সংস্থারূপে আত্মপ্রকাশ করে তখন দেশে তীব্র রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং জনঅসন্তোষ বিরাজমান ছিল। সামরিক শাসক এ সময়ে জনগণের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রকে স্পষ্টভাবে দমনের চেষ্টা চালায়। এতে পরিস্থিতির অবনতি ঘটার ফলে রাজনৈতিক দলের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক আন্দোলনে সমর্থন জানায়। এই আন্দোলন দেশের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের লালিত আকাঙ্খাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং একটি নতুন মাত্রা দেয়। রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সূচনার সাথে সাথে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র কিভাবে টিকে থাকবে এটা নিয়েও বিতর্কের সূচনা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতো সংস্থাগুলো রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে জড়িত হওয়ায় মানবাধিকারের ইস্যুগুলোর অত্যাবশ্যকীয়তা সকল জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরো অধিকমাত্রায় অনুভূত হতে শুরু করে।

প্রকৃতপক্ষে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতো সংগঠনগুলো সময়ের সাথে অনেকখানি অগ্রগতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছে বলা যায়। ১৯৮৬ সালে যখন এটি প্রতিষ্ঠিত হয় তখন হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি সংগঠন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাঠামো তৈরিতে কাজ শুরু করে। সাম্প্রতিক এক তথ্যে জানা যায় যে, প্রায় ৩০ টির মতো সংস্থা অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা সংগঠণগুলো তাদের পরিধি আরো বিস্তৃত করেছে। বর্তমানে পরিবেশ অধিকার থেকে শুরু করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের অধিকার, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং দলিত সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদ বিষয়ক প্রচারণা চালানোর মাধ্যমে মানবাধিকার সংগঠণগুলো তাদের কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে। দেশের নেতৃস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো হচ্ছে: আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিজয়ী পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়্যার্স্ অ্যাসোসিয়েশন (বিএনডব্লিউএলএ), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), অধিকার এবং পরিবেশ ও মানব উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত সংস্থা।

সরকার ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নব্য-উদারতাবাদের সাথে সংযুক্তির দ্বারা দেশের শাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন মানবাধিকারের কার্যক্রমকে প্রত্যক্ষভাবে উদ্দীপিত করেছে। সম্প্রতি দাতা দেশগুলোর আগ্রহে অধিকার নিয়ে সচেতনতা মূলক কর্মকান্ড বহুল পরিমাণে প্রসারিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে মানবাধিকারের সমর্থকদের কাজের অন্যতম প্রধান মূলনীতি হচ্ছে অধিকারের অবিভাজ্য বা অবিচ্ছেদ্য প্রয়োগ নিশ্চিত করা। নারীর অধিকার মানবাধিকারের একটি স্বীকৃত অধিকার হিসেবে বহুলাংশে গৃহীত হয়েছে। বর্তমানে মানবাধিকার কর্মীগণ মানবাধিকারের আওতাধীন বিষয়বস্ত্ত আরো প্রসারিত করে যৌনকর্মী এবং যৌন ও লিঙ্গগত সংখ্যালঘুদের অধিকার মানবাধিকার কাঠামোর আওতায় আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অধিকার ব্যাহত হয় এমন সব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তা ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত যে ক্ষেত্রেই সংগঠিত হোক। এক্ষেত্রে বস্তিবাসী বা যৌনকর্মীদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কথা বলা যায়।

বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বেশিরভাগ সামরিক শাসকদের শাসনকালে জন্মলাভ করার ফলে জাতীয় সামরিক বাহিনীর বিরোধিতাকারী শক্তি হিসেবেই বেশিরভাগ সময় কাজ করে এবং বহুজাতিক কোম্পানিসমূহ কর্তৃক যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় তা মানবাধিকার সংস্থা কর্তৃক অনেকটা উপেক্ষিত থেকে যায়। এক্ষত্রে বরং বহুজাতিক কোম্পানি কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে গঠিত বিভিন্ন কমিটি  (যেমন: গ্যাস, তেল ও পেট্রোলিয়াম বিষয়ক কমিটি) কার্যকর ভূমিকা রাখে, যদিও এরা মানবাধিকার বিষয়ক কোনো এনজিও নয়।

বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার সমূহের মধ্যে আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমঅধিকারের (অনুচ্ছেদ- ২৭) এবং ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে  সকলের আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ-৩১ এবং ৩৩)। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসমূহে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সুযোগের সমতা ও কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের কর্মের অধিকার লাভের নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে।

সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা (ইউডিএইচআর) সহ বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট চুক্তি এবং সনদের অন্যতম স্বাক্ষরকারী সদস্য। বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি এবং সনদ সমূহ হলো: অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক কভেন্যান্ট (আইসিইএসসিআর), নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক কভেন্যান্ট (আইসিসিপিআর), শিশু অধিকার বিষয়ক সনদ (সিআরসি), নিপীড়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ (সিএটি) এবং নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের সনদ (সিডও)। এছাড়াও বাংলাদেশ সিডও সনদের অপশোনাল প্রটোকলও স্বাক্ষর করেছে। তবে বাংলাদেশ অভিগমনকারী শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে (আইসিআরএমডব্লিউ) স্বাক্ষরকারী দেশ হলেও এখন পর্যন্ত এর  অনুমোদন করেনি।

বাংলাদেশে যদিও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং সনদ সমূহ অনুমোদন লাভ করেছে, তবে এর পুরোপুরি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ক্রমাগতভাবে কয়েকটি সরকার ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে দেখা যায় যে আইসিইএসসিআর, আইসিসিপিআর, সিডও সনদ সমূহের ক্ষেত্রে এবং সিএটি ও সিআরসি’র অপশোনাল প্রটোকলের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ঘোষণা এবং সংরক্ষণ এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

নারীবাদী আন্দোলনকারীদের চাপের মুখেও সবকটি সরকারই সিডও’র অপশোনাল প্রটোকলের উপর সংরক্ষণ বজায় রেখেছে এই কারণে যে এটি শরীয়া আইনের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। এখানে সাংস্কৃতিক বাস্তববাদ বনাম  সর্বজনীনতাবাদের বিতর্ক পরিলক্ষিত হয়। নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে দেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ দু’বার জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সংস্কার কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়। ২০০৯ সালের মে মাসে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বারের জন্য এই কাউন্সিলে পুনঃনির্বাচিত হয়। এছাড়াও বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নের প্রথম পর্যবেক্ষণ কাল পালন করছে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার আন্দোলন মূলত বিশ শতকের আশির দশকে স্থানীয় কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। এই কাঠামো গড়ে উঠেছিল অনেকটা তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে, বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি পরবর্তী মুক্তবাজার অর্থনীতির উত্থানের মধ্য দিয়ে। সাধারণভাবে বলা যায়, এনজিওসমূহের উত্থান, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সমূহের কার্যক্রম এবং বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া দেশে মানবাধিকার আলোচনাকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

সিডও’র উপর সংরক্ষণ তুলে নেয়ার দাবির সাথে সাথে দেশে মানবাধিকারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা কিছু ক্ষেত্রে উত্তেজনা এবং বিরোধের সৃষ্টি করছে, যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছে। জনগণের ধর্মীয় কিছু ব্যাপারে সহানুভূতি বৃদ্ধি বিশেষ করে নারীদের আবরুর বিষয়ে সচেতন মনোভাব বৃদ্ধির সাথে সাথে এই প্রশ্ন আরো উন্মুক্ত হয়েছে যে অধিকারের বিষয় কারা হবেন, কে নির্ধারণ করবে নারীর সমানাধিকার, কোন কারণে অধিকার লঙ্ঘিত হবে এবং কোন কারণে লঙ্ঘিত হবে না ইত্যাদি বিষয়সমূহ। জনগণের সচেতনতার ফলে এই বিষয়গুলো এখন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।  [দিনা মেহনাজ সিদ্দিকী]