মাড়োয়ারি

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৪:৪২, ৫ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

মাড়োয়ারি  রাজস্থানের প্রাচীন যোধপুর রাজ্যের অন্তর্গত মাড়োয়ার অঞ্চলের একটি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি সম্প্রদায়। রাজস্থান হতে আগমনকারী মাড়োয়ারিগণ পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় বাণিজ্যিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে এবং অগ্রণী বণিক ও ব্যবসায়িরূপে আত্মপ্রকাশ করে। তাদের যেসব বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন ব্যবসায়ে এবং নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাদের সাথে মিলিত হয়, তারাও তাদের আদি বাসস্থান নির্বিশেষে মাড়োয়ারি বলে পরিচিতি লাভ করে। কারণ তারা হয় মাড়োয়ারিদের সাথে সম্পৃক্ত ছিল অথবা তাদের দ্বারা পরিচিতি লাভ করেছিল। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের বিশ্বাসযোগ্যতা রাজস্থানের অন্যান্য ব্যবসায়ী ও বণিকদের মাড়োয়ারি হিসেবে পরিচয় দিতে প্রভাবান্বিত করে। ব্রিটিশ আমলে কলকাতা ও ঢাকার সামাজিক ও ব্যবসায়ী মহলে উত্তর ভারত থেকে আগত সব বণিকরাই মাড়োয়ারিরূপে পরিচিত ছিল। শতেরো শতক অথবা এর আগে থেকেই বাংলায় মাড়োয়ারিদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়। রাজস্থানের অবিমিশ্র মাড়োয়ারিরা কয়েকটি সামাজিক ধর্মীয় গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল, যথা, আগরওয়াল, মহেশ্বরী, ওসওয়াল, খান্ডেশওয়াল ও পড়ওয়াল। নওয়াবী আমলে ওসওয়ালরা বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাধান্য বিস্তার করে বলে মনে হয়। ব্যাংক ব্যবস্থা, অর্থলগ্নী এবং খাদ্যশস্য, বস্ত্র ও লবণ ব্যবসায়ে তাদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক।

আকবরের সময় হতেই মাড়োয়ারিগণ রাজস্থানের বাইরে, বিশেষ করে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। জানা যায় যে, বৈশ্য শ্রেণির কিছু লোক মুগল-রাজপুত সেনাবাহিনীর সাথে প্রথম বাংলায় আগমন করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখানে স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকে এবং স্থানীয় ব্যবসা ও অর্থলগ্নী কারবারে নিয়োজিত হয়। মুর্শিদকুলী খান এর মালগুজার ব্যবস্থায় ইজারাদার, জোতদার, জমিদার ও তালুকদারদের নিকট থেকে জামিন গ্রহণের প্রথা চালু হয়। ফলে আঠারো শতকের প্রথম দিকে সরকারের নিকট মালগুজার মক্কেলদের পক্ষে জামিন হওয়ার কাজটি একটি বড় ধরনের ব্যবসায়ে পরিণত হয়। এই জামিনদারি ব্যবস্থায় মাড়োয়ারিরাই ছিল প্রধান সুবিধাভোগী। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে জামিনী ব্যবসা সবচেয়ে জমজমাট হয়ে ওঠে। ভূস্বামী, ইজারাদার কৃষক ও অন্যান্য ইজারাদাররা তাদের পক্ষে সরকারের নিকট জামিন হওয়ার জন্য মাড়োয়ারিদের শরণাপন্ন হতো। আঠারো শতকের শেষ দুই দশকে মুর্শিদাবাদ ও কলকাতায় সবচেয়ে খ্যাতিমান মাড়োয়ারি পরিবার ছিল ‘হাজারী মাল’। এই পরিবার বাংলার প্রায় সকল জেলায় রাজস্ব জামিন কারবারে নিয়োজিত ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) এর পর হাজারী মাল বিস্তৃত জমিদারি লাভ করেন। অপর একজন নামকরা ব্যবসায়ী ছিলেন দুলালচাঁদ সিং (ওরফে দুলসিং)। তিনি ছিলেন পোরওয়াল মাড়োয়ারি এবং তিনি বাংলার জেলাগুলিতে বিশাল জমিদারি স্বত্ব ক্রয় করেন। তিনি ঢাকায় বাস করতেন এবং এখানে অনেক বিপণিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। বাকেরগঞ্জ, পটুয়াখালী ও কুমিল্লায় তার অনেকগুলি বড় জমিদারির অংশীদার ছিলেন ঢাকার খাজাগণ। পরবর্তী সময়ে সিং পরিবার পাট ব্যবসায়ে যোগ দেন।

মূলত ব্যাংক-ব্যবস্থা ও ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ে মাড়োয়ারিরা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। নওয়াবী আমলে মাড়োয়ারিরা টাকশালমুদ্রা ব্যবসায়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। এগুলি ছিল ব্যক্তি মালিকানাধীন। জগৎ শেঠ পরিবার বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় টাকশাল ও ব্যাংকিং ব্যবসায়ে একচেটিয়া প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। ওসওয়াল গোত্রীয় মাড়োয়ারি জগৎ শেঠ পরিবার মুর্শিদাবাদের দরবারে রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ওসওয়াল মাড়োয়ারিদের মধ্যে বিখ্যাত ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্কার গোপাল দাস ও বানারসী দাস পরিবারও অনুরূপ প্রভাব বিস্তার করে। তারা প্রধানত দূরবর্তী বাণিজ্যে  হুন্ডির (মুদ্রা বিনিময়) ব্যবসা করত।

বাংলার তিন বিখ্যাত নওয়াব মুর্শিদকুলী খান, সুজাউদ্দীন খানআলীবর্দী খান যে কোন আর্থিক সংকট মোকাবেলায় এই মাড়োয়ারিদের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। মারাঠা দুর্বৃত্তদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল এই মাড়োয়ারি। আলীবর্দী খানের শাসনামলে এই মারাঠারা বেশ কয়েকবার বাংলা আক্রমণ করে এবং এ সময়ে তারা মাড়োয়ারিদের কাছ থেকে প্রায় তিন কোটিরও অধিক টাকা নিয়ে যায়। নওয়াব মীরকাসিম তাঁর সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য মাড়োয়ারিদের কাছ থেকে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু জগৎ শেঠদের নিকট থেকে প্রত্যাশিত সাহায্য না পাওয়ায় মীরকাসিম ঐ পরিবারের প্রধান দুই ব্যক্তিকে বন্দি করেন এবং বাংলার দুর্দশার জন্য তারাই দায়ী এই অভিযোগে তাদের হত্যা করেন।

উনিশ শতকে ব্যাপক হারে মাড়োয়ারিরা বাংলায় অভিবাসন শুরু করে এবং চার পাঁচ দশকের মধ্যেই এই অঞ্চলের অর্থনীতির উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পূর্ব বাংলার বিভিন্ন শহর যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, নওগাঁ, ময়মনসিংহে মাড়োয়ারিরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। তারা দেশীয় অর্থনীতি ও বাণিজ্যে প্রায় সম্পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। অগ্রণী মাড়োয়ারিরা হুন্ডির অর্থনৈতিক আওতা আসাম ও আরাকান পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে। এর পূর্বে এসব এলাকায় হুন্ডি ব্যবসা চালু ছিল না। আকিয়াব অঞ্চলেও মাড়োয়ারিরা নাট্টুকোটাই চেট্টিয়ারদের ডিঙিয়ে দেশীয় অর্থনীতি ও বাণিজ্যে আধিপত্য বিস্তার করে। পূর্ব বাংলার সাথে আরাকানের ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্কের ফলেই এই একাধিপত্য সম্ভব হয়েছিল। লক্ষ্মীনারায়ণ রামবিলাসের বিশাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। এর সদর দফতর ছিল আকিয়াবে এবং কলকাতা, রেঙ্গুন, খুলনা, চট্টগ্রাম ও সান্দাওয়েতে ছিল শাখা অফিস। এসব কেন্দ্রে তারা হুন্ডি ব্যবসা করত এবং ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি বিশেষকে ঋণ প্রদান করত। কলকাতার বড় বাজারের ছয় জন বিখ্যাত মাড়োয়ারি ব্যাংকার ও বণিক তারাচাঁদ ঘনশ্যামদাস, বংশীলাল আবীরচাঁদ, সদাসুক গম্ভীরচাঁদ, হরসুখদাস বালকিষাণদাস, কোঠিওয়াল দাগা ও রামকিষাণ বাগরী দেশীয় অর্থবাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। এই বিখ্যাত কোঠিওয়ালরা বড় বাজার থেকে পূর্ব বাংলার নওগাঁ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ প্রভৃতি স্থানের মাড়োয়ারি ব্যাংক ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলিতে অর্থ বিনিয়োগ করতেন।

উনিশ শতকে কলকাতা ও বাংলার অন্যান্য শহরে অধিকাংশ বিপণি-মালিকই ছিল জয়পুর থেকে আগত শেখবতী আগরওয়াল মাড়োয়ারি। আফিম ও নীল ব্যবসা ব্রিটিশদের একচেটিয়া হলেও এই ব্যবসায়ে মূল অর্থলগ্নীকারী ছিল মাড়োয়ারিরা। শিবরাম রামঋখ দাস ও তারাচাঁদ ঘনশ্যাম দাস পরিবারের অর্থায়নে দ্বারকানাথ ঠাকুর বেশ কয়েকটি নীল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করেন।

ইউরোপীয় ও মাড়োয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলি পূর্ব বাংলার পাট ব্যবসায়ে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। কলকাতায় ছিল এদের সদর দফতর। কারবারি, ফেরিওয়ালা ও কৃষকরা ছিল বড় মাড়োয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলির অধীনস্থ মক্কেল। মাড়োয়ারিরা এদের অর্থের যোগান দিত এবং এদের উৎপাদিত দ্রব্য সংগ্রহ করত। ১৮৪৭ সালে নাথুরাম রামকিষাণ কলকাতায় মেসার্স রামকিষাণ দাস শিবদাজল প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানটি কমিশন এজেন্সি, পাট ও ধানের কারবার করত এবং পাটের মৌসুমে বাংলার অন্যান্য এলাকায় এজেন্সি খুলত। ১৯০০ সালের মধ্যে কলকাতার পাট ব্যবসায়ীদের অর্ধেকেরও বেশি ছিল মাড়োয়ারি। কালকাতার জুট বেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ৭৪ জন সদস্যের মধ্যে ৪৯ জনই ছিল মাড়োয়ারি। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে গুলাবচাঁদজী কলকাতায় অপর একটি ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং, পাট রপ্তানি ও জাহাজ চলাচল ব্যবসায়ে প্রভূত সাফল্য অর্জন করে। রংপুর ও দিনাজপুরে কয়েকটি শাখা অফিস খোলা হয়। এছাড়া বেশ কিছু ব্যক্তিগত পাট ব্যবসায়ীও ছিল, যেমন লোহিয়া, নাগ, শেঠিয়া, তুলারাম ও দুগার পরিবার।

বাংলার জেলাগুলিতে ও কলকাতায় অবস্থানরত মাড়োয়ারিদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। অনুমান করা হয়, বাংলায় মাড়োয়ারিদের উপস্থিতির কোন পর্যায়েই তাদের সংখ্যা দুই লক্ষের অধিক ছিল না। হিন্দু ও জৈন ধর্মের অনুসারী এবং বহু বর্ণে বিভক্ত হলেও তারা সামাজিকভাবে একই সম্প্রদায় হিসেবে একত্রে বসবাস করত। বাংলায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী প্রায় সকল জৈনই ছিল শ্বেতাম্বর। হিন্দু মাড়োয়ারিদের প্রধান দেবতা হলো গণেশ ও লক্ষ্মী। মাড়োয়ারিদের সামাজিক অবকাঠামো ছিল খুবই সাধারণ ও গতানুগতিক এবং তা ক্রমবর্ধমান পরিবারের ধারণায় গড়ে উঠেছিল। পিতা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব এবং তিনিই পরিবারের প্রধান হিসেবে পরিবারিক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের সমাজে নারীর স্বাধীনতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। অপরাপর হিন্দু সমাজের নারীদের তুলনায় তারা গৃহেই অবরুদ্ধ থাকত এবং শিক্ষার সকল ক্ষেত্রেই ছিল পশ্চাৎপদ। মাড়োয়ারিরা তাদের স্বদেশ থেকে বয়ে আনা সনাতন পঞ্চায়েত প্রথা অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। পঞ্চায়েত সামাজিক ও ধর্মীয় বিরোধের নিষ্পত্তি করত এবং পঞ্চায়েতের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ সদস্যদের জন্য ছিল অবশ্য পালনীয়। মাড়োয়ারিদের উপর স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাবও পরিলক্ষিত হয়। তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অদ্ভুত ছিল হোলি, দিওয়ালি, রাখি ও করওয়াচোথ। বাংলার মাড়োয়ারিরা ছিল দ্বিভাষী। নিজেদের মধ্যে তারা তাদের মাড়োয়ারি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করত, কিন্তু তাদের সম্প্রদায় বহির্ভূত লোকদের সাথে তারা বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলত। সকল মাড়োয়ারিরই সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস ছিল। হিন্দু ও জৈন উভয় ধর্মে মাড়োয়ারিরাই ছিল নিরামিষভোজী।

বিশ শতকের প্রথমদিকে কলকাতা ভিত্তিক মাড়োয়ারি সম্প্রদায় দু অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি অংশ ছিল গোঁড়া ধর্মপন্থী ও অনেকটা ব্রিটিশপন্থী এবং জাতীয়তাবাদ বিরোধী। এরা ব্রিটিশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিয়োজিত প্রাচীনপন্থী বানিয়া ও ব্যবসায়ী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতো। অন্য অংশটি ছিল ধর্মীয় ক্ষেত্রে সংস্কারবাদী এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী। বিখ্যাত বিরলা গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা জি.ডি বিরলা ছিলেন জাতীয়তাবাদী দলের নেতা। এই সংস্কারবাদী দলটি বহু হিন্দু সংস্কার আন্দোলনে অর্থের যোগান দিত। ঘনশ্যাম দাসের পরিবার আর্য সমাজ আন্দোলনের সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করেন বলে শোনা যায়। কংগ্রেসের প্রতি মাড়োয়ারিদের সমর্থন সুবিদিত। মহাত্মা গান্ধী ও নেহরু পরিবার মাড়োয়ারিদের কাছ থেকে আর্থিক অনুদান ও আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন। সম্ভবত এঁরাই মাড়োয়ারিদের মানবিক ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকান্ড পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ফলে বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে কলকাতা ও অন্যান্য শহরে মাড়োয়ারিদের অর্থ সাহায্যে অনেক স্কুল ও কলেজ গড়ে ওঠে। ১৯৪৩ সালের মহাদুর্ভিক্ষে মাড়োয়ারি রিলিফ সোসাইটি ত্রাণকার্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মাড়োয়ারিরা চল্লিশের দশকে বেশ কিছু হাসপাতাল, দুস্থ নিবাস ও দাতব্য শিবির প্রতিষ্ঠা করে। রক্ষণশীল মাড়োয়ারিরাই ছিল সংখ্যায় বেশি এবং এরাই বাংলায় মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের প্রধান দুটি প্রতিষ্ঠান ‘মাড়োয়ারি অ্যাসোসিয়েশন’ ও ‘মাড়োয়ারি চেম্বার অব কমার্স’কে নিয়ন্ত্রণ করত। এমনকি কংগ্রেস ও হিন্দু অভিজাতবর্গের সমর্থন সত্ত্বেও জি.ডি বিরলা ১৯২৩ সালে মাড়োয়ারি অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হতে পারেননি। কলকাতা থেকে সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে মাড়োয়ারি প্রতিনিধি ছিলেন ব্রিটিশ সমর্থিত রক্ষণশীল মাড়োয়ারি কেশোরাম পোদ্দার।

রক্ষণশীলদের প্রাধান্য হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে এক মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছিল। বিশ শতকের বিশের দশকে রক্ষণশীল মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলি মুসলমানদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক রক্ষায় প্রকাশ্য অস্বীকৃতি জানায়। মাড়োয়ারি দোকানীরা মুসলমান ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রয় করতে অস্বীকার করে। মাড়োয়ারি বাড়ির মালিকেরা মুসলমানদের নিকট বাড়ি ভাড়া দিতে অস্বীকার করে এবং মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা স্থানীয় মুসলমান রঞ্জক, দর্জি ও তাঁতিদের অপসারণ করে তদ্স্থলে মধ্যদেশীয় হিন্দুদের নিয়োজিত করে। মুসলমান বাদক, গাড়োয়ান ও সহিসদেরও বর্জন করা হয়। সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয় যে, ধর্মীয় কারণেই এরপর কোন উত্তম মাড়োয়ারি তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের নিয়োগ দান করবে না এবং কোন মুসলমানের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন করবে না। পন্ডিতগণ মনে করেন যে, ১৯২৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা অনেকটা মাড়োয়ারিদের এই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির ফল।

১৯২৯ সালের  মহামন্দা এবং ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের ফলে বিপুলসংখ্যক মাড়োয়ারি পূর্ব বাংলা ছেড়ে চলে যায়; তবে বেশ কিছুসংখ্যক মাড়োয়ারি এখানে থেকে যায় এবং প্রধানত বস্ত্র ও পাট ব্যবসা চালিয়ে যায়। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের  সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এর ফলে মাড়োয়ারি সম্প্রদায় বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। বর্তমানে মাত্র ৭০০ মাড়োয়ারি বাংলাদেশে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের তুলারাম পরিবার ও ঢাকার দুগার পরিবার সর্বাধিক পরিচিত।  [প্রদীপ চাঁদ দুগার]