"রায়, কুমুদ শংকর" পাতাটির দুইটি সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

(Added Ennglish article link)
 
 
২ নং লাইন: ২ নং লাইন:
 
'''রায়, কুমুদ শংকর''' (১৮৯২-১৯৫০)  ব্রিটিশ ভারতের যক্ষ্ণারোগ গবেষক ও প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ডা. কে এস রায় নামেই বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। পার্বতী শংকর রায় চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র কুমুদ শংকর রায় ছিলেন তেওতার জমিদার পরিবারের সদস্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় তেওতা একাডেমীতে। পরবর্তীতে হিন্দু স্কুল ও কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষা গ্রহণ শেষ হলে ১৯১১ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। অবশ্য পরে তাঁকে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা শাস্ত্রে সন্মান শ্রেণিতে অধ্যায়নের জন্য স্কটল্যান্ডে পাঠানো হয়।
 
'''রায়, কুমুদ শংকর''' (১৮৯২-১৯৫০)  ব্রিটিশ ভারতের যক্ষ্ণারোগ গবেষক ও প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ডা. কে এস রায় নামেই বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। পার্বতী শংকর রায় চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র কুমুদ শংকর রায় ছিলেন তেওতার জমিদার পরিবারের সদস্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় তেওতা একাডেমীতে। পরবর্তীতে হিন্দু স্কুল ও কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষা গ্রহণ শেষ হলে ১৯১১ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। অবশ্য পরে তাঁকে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা শাস্ত্রে সন্মান শ্রেণিতে অধ্যায়নের জন্য স্কটল্যান্ডে পাঠানো হয়।
  
 +
[[Image:RayKumudSankar.jpg|thumb|400px|কুমুদ শংকর রায়]]
 
স্কটল্যান্ডে অবস্থানকালে শিক্ষক স্যার রবার্ট ফিলিপ তাঁকে যক্ষ্মা রোগ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হওয়ার পরামর্শ দেন। যার ফলে রায় স্কটল্যান্ডের ওচিল হিল স্যানাটোরিয়ামে চিকিৎসক ও কিছু সময়ের জন্য দাপ্তরিক মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। এখানে অবস্থানকালেই তিনি যক্ষারোগ-এর কারণ, উপসর্গ ও রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেন। পরবর্তীতে রায় চেস্টারফিল্ড হাসপাতালে শল্য চিকিৎসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে সার্জিক্যাল রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজে যোগ দেন। এ সময়ে তাঁকে ভারতে প্রত্যাবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং ১৯১৬ সালে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন।
 
স্কটল্যান্ডে অবস্থানকালে শিক্ষক স্যার রবার্ট ফিলিপ তাঁকে যক্ষ্মা রোগ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হওয়ার পরামর্শ দেন। যার ফলে রায় স্কটল্যান্ডের ওচিল হিল স্যানাটোরিয়ামে চিকিৎসক ও কিছু সময়ের জন্য দাপ্তরিক মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। এখানে অবস্থানকালেই তিনি যক্ষারোগ-এর কারণ, উপসর্গ ও রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেন। পরবর্তীতে রায় চেস্টারফিল্ড হাসপাতালে শল্য চিকিৎসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে সার্জিক্যাল রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজে যোগ দেন। এ সময়ে তাঁকে ভারতে প্রত্যাবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং ১৯১৬ সালে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন।
  
দেশে ফিরে তিনি কারমাইকেল মেডিকেল কলেজে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেন এবং পাশাপাশি একজন বংশানুক্রমিক মুত্রঘটিত রোগের বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসা সেবার কাজ শুরু করেন। তিনিই ভারতের লালাগ্রন্থী সংযোজনকারী প্রথম চিকিৎসক, রেডিয়াম থেরাপি-এর উদ্যোক্তা এবং এশিয়ায় বক্ষব্যাধী শল্য চিকিৎসার প্রথম চিকিৎসক। অধ্যাপক পদ প্রদানে অস্বীকার করায় তিনি কারমাইকেল কলেজ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর কলকাতার বাসস্থানের (৪৪,ইওরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেন) সংলগ্ন একটি বর্ধিত কক্ষে (বাহির-বাড়ি) তিনি তাঁর জাতীয়তাবাদী ‘জাতীয় আয়ূর্বেজিয়ান পরিষদ’ (Jatiya Ayurbigyan Parishad) এর কাজ শুরু করেন। এর অফিসটি পরে ফোর্বস ম্যানসনে স্থানান্তর করা হয়। এ সংগঠন থেকেই পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এবং হসপিটাল-এর সূচনা হয়।#
+
দেশে ফিরে তিনি কারমাইকেল মেডিকেল কলেজে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেন এবং পাশাপাশি একজন বংশানুক্রমিক মুত্রঘটিত রোগের বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসা সেবার কাজ শুরু করেন। তিনিই ভারতের লালাগ্রন্থী সংযোজনকারী প্রথম চিকিৎসক, রেডিয়াম থেরাপি-এর উদ্যোক্তা এবং এশিয়ায় বক্ষব্যাধী শল্য চিকিৎসার প্রথম চিকিৎসক। অধ্যাপক পদ প্রদানে অস্বীকার করায় তিনি কারমাইকেল কলেজ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর কলকাতার বাসস্থানের (৪৪,ইওরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেন) সংলগ্ন একটি বর্ধিত কক্ষে (বাহির-বাড়ি) তিনি তাঁর জাতীয়তাবাদী ‘জাতীয় আয়ূর্বেজিয়ান পরিষদ’ (Jatiya Ayurbigyan Parishad) এর কাজ শুরু করেন। এর অফিসটি পরে ফোর্বস ম্যানসনে স্থানান্তর করা হয়। এ সংগঠন থেকেই পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এবং হসপিটাল-এর সূচনা হয়।
 
 
[[Image:RayKumudSankar.jpg]]
 
 
 
#কুমুদ শংকর রায়
 
  
 
এ সময়েই মর্ডার্ণ রিভিউতে (Modern Revew) কুমুদ শংকর রায় বাংলা প্রদেশে একটি যক্ষ্মা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিয়ে ‘Tuberculosis in Calcutta’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। প্রবন্ধটি যক্ষ্ণারোগী প্রভাস চন্দ্র বোসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁরই ঐকান্তিক ইচ্ছায় কলকাতায় যক্ষা রোগীদের একটি স্বাস্থ্যনিবাস গড়ে তোলার জন্য তিনি ১.৬ লাখ টাকার একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। কুমুদ সংকর রায় এ সোসাইটির উদ্যোক্তা-সম্পাদক ও সুপারিনটেনডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম যাদবপুরে একটি চার আসনবিশিষ্ট যক্ষ্মা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম বছরগুলোর আর্থিক টানাপোরণের সময়ে কুমুদ রায় নিজে রোগীদের জন্য খাবার রান্না করতেন ও সরবরাহ করতেন। তাঁর এ ব্যতিক্রমধর্মী কাজকে পাগলামী হিসেবে অন্যান্য অধিকাংশ ডাক্তারই প্রচন্ড সমালোচনা করেছেন। যদিও খুব শিগগিরই তাঁর যক্ষ্মা হাসপাতালটির উন্নয়ন ঘটে এবং এটি এশিয়ার প্রথম ও বৃহত্তম যক্ষা হাসপাতালে পরিণত হয়। এ হাসপাতালেই ডা. রায় ভারতে প্রথমবারের মতো বক্ষব্যাধীর শল্য চিকিৎসার অবতারণা করেন। শুধুমাত্র তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতের কাশ্মিরের কুরসোং (Kurseong) শহরে (রায় পরিবারের বাসস্থান ছিলো এখানে) এস.বি.দে নামের দ্বিতীয় স্বাস্থ্য নিবাসটি প্রতিষ্ঠা পায় এবং তিনি স্বাস্থ্য নিবাসের প্রতিষ্ঠতা সম্পাদক ও সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কুরসোং স্বাস্থ্যনিবাস-এর প্রধান ব্লকের নকশা করেন কুমুদ শংকর এর ভাতুষ্পুত্র কেসব শংকর, যিনি গ্লাসগো থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। কলকাতা কর্পোরেশন-এর স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ডা. কে এস রায় তাঁর কাজের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে একটি মশক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ চালু করেন। তিনি আরো ধূম্রজাত বিরম্বনা প্রতিরোধ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন, পানি বিশ্লেষণ বিভাগ পুনঃনির্ধারণ ও পানিতে ক্লোরিনের মাত্রা উন্নয়নের জন্য অন্যান্য যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
 
এ সময়েই মর্ডার্ণ রিভিউতে (Modern Revew) কুমুদ শংকর রায় বাংলা প্রদেশে একটি যক্ষ্মা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিয়ে ‘Tuberculosis in Calcutta’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। প্রবন্ধটি যক্ষ্ণারোগী প্রভাস চন্দ্র বোসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁরই ঐকান্তিক ইচ্ছায় কলকাতায় যক্ষা রোগীদের একটি স্বাস্থ্যনিবাস গড়ে তোলার জন্য তিনি ১.৬ লাখ টাকার একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। কুমুদ সংকর রায় এ সোসাইটির উদ্যোক্তা-সম্পাদক ও সুপারিনটেনডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম যাদবপুরে একটি চার আসনবিশিষ্ট যক্ষ্মা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম বছরগুলোর আর্থিক টানাপোরণের সময়ে কুমুদ রায় নিজে রোগীদের জন্য খাবার রান্না করতেন ও সরবরাহ করতেন। তাঁর এ ব্যতিক্রমধর্মী কাজকে পাগলামী হিসেবে অন্যান্য অধিকাংশ ডাক্তারই প্রচন্ড সমালোচনা করেছেন। যদিও খুব শিগগিরই তাঁর যক্ষ্মা হাসপাতালটির উন্নয়ন ঘটে এবং এটি এশিয়ার প্রথম ও বৃহত্তম যক্ষা হাসপাতালে পরিণত হয়। এ হাসপাতালেই ডা. রায় ভারতে প্রথমবারের মতো বক্ষব্যাধীর শল্য চিকিৎসার অবতারণা করেন। শুধুমাত্র তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতের কাশ্মিরের কুরসোং (Kurseong) শহরে (রায় পরিবারের বাসস্থান ছিলো এখানে) এস.বি.দে নামের দ্বিতীয় স্বাস্থ্য নিবাসটি প্রতিষ্ঠা পায় এবং তিনি স্বাস্থ্য নিবাসের প্রতিষ্ঠতা সম্পাদক ও সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কুরসোং স্বাস্থ্যনিবাস-এর প্রধান ব্লকের নকশা করেন কুমুদ শংকর এর ভাতুষ্পুত্র কেসব শংকর, যিনি গ্লাসগো থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। কলকাতা কর্পোরেশন-এর স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ডা. কে এস রায় তাঁর কাজের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে একটি মশক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ চালু করেন। তিনি আরো ধূম্রজাত বিরম্বনা প্রতিরোধ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন, পানি বিশ্লেষণ বিভাগ পুনঃনির্ধারণ ও পানিতে ক্লোরিনের মাত্রা উন্নয়নের জন্য অন্যান্য যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

১২:৪৮, ৯ মার্চ ২০১৫ তারিখে সম্পাদিত সর্বশেষ সংস্করণ

রায়, কুমুদ শংকর (১৮৯২-১৯৫০)  ব্রিটিশ ভারতের যক্ষ্ণারোগ গবেষক ও প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ডা. কে এস রায় নামেই বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। পার্বতী শংকর রায় চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র কুমুদ শংকর রায় ছিলেন তেওতার জমিদার পরিবারের সদস্য। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় তেওতা একাডেমীতে। পরবর্তীতে হিন্দু স্কুল ও কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষা গ্রহণ শেষ হলে ১৯১১ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। অবশ্য পরে তাঁকে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা শাস্ত্রে সন্মান শ্রেণিতে অধ্যায়নের জন্য স্কটল্যান্ডে পাঠানো হয়।

কুমুদ শংকর রায়

স্কটল্যান্ডে অবস্থানকালে শিক্ষক স্যার রবার্ট ফিলিপ তাঁকে যক্ষ্মা রোগ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হওয়ার পরামর্শ দেন। যার ফলে রায় স্কটল্যান্ডের ওচিল হিল স্যানাটোরিয়ামে চিকিৎসক ও কিছু সময়ের জন্য দাপ্তরিক মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে যোগ দেন। এখানে অবস্থানকালেই তিনি যক্ষারোগ-এর কারণ, উপসর্গ ও রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেন। পরবর্তীতে রায় চেস্টারফিল্ড হাসপাতালে শল্য চিকিৎসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে সার্জিক্যাল রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজে যোগ দেন। এ সময়ে তাঁকে ভারতে প্রত্যাবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং ১৯১৬ সালে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন।

দেশে ফিরে তিনি কারমাইকেল মেডিকেল কলেজে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেন এবং পাশাপাশি একজন বংশানুক্রমিক মুত্রঘটিত রোগের বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসা সেবার কাজ শুরু করেন। তিনিই ভারতের লালাগ্রন্থী সংযোজনকারী প্রথম চিকিৎসক, রেডিয়াম থেরাপি-এর উদ্যোক্তা এবং এশিয়ায় বক্ষব্যাধী শল্য চিকিৎসার প্রথম চিকিৎসক। অধ্যাপক পদ প্রদানে অস্বীকার করায় তিনি কারমাইকেল কলেজ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁর কলকাতার বাসস্থানের (৪৪,ইওরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেন) সংলগ্ন একটি বর্ধিত কক্ষে (বাহির-বাড়ি) তিনি তাঁর জাতীয়তাবাদী ‘জাতীয় আয়ূর্বেজিয়ান পরিষদ’ (Jatiya Ayurbigyan Parishad) এর কাজ শুরু করেন। এর অফিসটি পরে ফোর্বস ম্যানসনে স্থানান্তর করা হয়। এ সংগঠন থেকেই পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এবং হসপিটাল-এর সূচনা হয়।

এ সময়েই মর্ডার্ণ রিভিউতে (Modern Revew) কুমুদ শংকর রায় বাংলা প্রদেশে একটি যক্ষ্মা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিয়ে ‘Tuberculosis in Calcutta’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। প্রবন্ধটি যক্ষ্ণারোগী প্রভাস চন্দ্র বোসের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁরই ঐকান্তিক ইচ্ছায় কলকাতায় যক্ষা রোগীদের একটি স্বাস্থ্যনিবাস গড়ে তোলার জন্য তিনি ১.৬ লাখ টাকার একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেন। কুমুদ সংকর রায় এ সোসাইটির উদ্যোক্তা-সম্পাদক ও সুপারিনটেনডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম যাদবপুরে একটি চার আসনবিশিষ্ট যক্ষ্মা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম বছরগুলোর আর্থিক টানাপোরণের সময়ে কুমুদ রায় নিজে রোগীদের জন্য খাবার রান্না করতেন ও সরবরাহ করতেন। তাঁর এ ব্যতিক্রমধর্মী কাজকে পাগলামী হিসেবে অন্যান্য অধিকাংশ ডাক্তারই প্রচন্ড সমালোচনা করেছেন। যদিও খুব শিগগিরই তাঁর যক্ষ্মা হাসপাতালটির উন্নয়ন ঘটে এবং এটি এশিয়ার প্রথম ও বৃহত্তম যক্ষা হাসপাতালে পরিণত হয়। এ হাসপাতালেই ডা. রায় ভারতে প্রথমবারের মতো বক্ষব্যাধীর শল্য চিকিৎসার অবতারণা করেন। শুধুমাত্র তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ভারতের কাশ্মিরের কুরসোং (Kurseong) শহরে (রায় পরিবারের বাসস্থান ছিলো এখানে) এস.বি.দে নামের দ্বিতীয় স্বাস্থ্য নিবাসটি প্রতিষ্ঠা পায় এবং তিনি স্বাস্থ্য নিবাসের প্রতিষ্ঠতা সম্পাদক ও সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কুরসোং স্বাস্থ্যনিবাস-এর প্রধান ব্লকের নকশা করেন কুমুদ শংকর এর ভাতুষ্পুত্র কেসব শংকর, যিনি গ্লাসগো থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। কলকাতা কর্পোরেশন-এর স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ডা. কে এস রায় তাঁর কাজের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে একটি মশক নিয়ন্ত্রণ বিভাগ চালু করেন। তিনি আরো ধূম্রজাত বিরম্বনা প্রতিরোধ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন, পানি বিশ্লেষণ বিভাগ পুনঃনির্ধারণ ও পানিতে ক্লোরিনের মাত্রা উন্নয়নের জন্য অন্যান্য যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

ভাই কিরণ শংকর রায়ের সঙ্গে কুমুদ শংকর রায়ও চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং উভয়ই স্বরাজ্য পার্টির সক্রিয় কর্মী ছিলেন। সি, আর দাসের অনুপ্রেরণায় কুমুদ শংকর ফরিদপুর আসন থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেন এবং ১৯২৫ সালে স্বরাজ্য পার্টির চীফ হুইপ মনোনীত হন। ১৯২৬ সালে তিনি কলকাতা করপোরেশনের কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হন এবং ১৯২৯ সালে পৌরপরিষদের ঊর্ধ্বতন সদস্য হন। বিপ্লবী ভূপতি মজুমদার ছিলেন কুমুদ শংকরের খুব কাছের মানুষ। তিনি খুব সতর্কতা ও গোপনীয়তার সঙ্গে কলকাতার আকরুর দত্ত লেনে বিপ্লবীদের জন্য, বিশেষ করে আহত ও আঘাতপ্রাপ্ত বিপ্লবীদের জন্য একটি বাড়ি ভাড়া করেন। তাদেরকে নিজ সেবালয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের পর তাদেরকে তিনি এ বাড়িতে আশ্রয় দিতেন।

জাতীয় চিকিৎসাসেবা আন্দোলন-এর অংশ হিসেবে ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠা পায় ইন্ডিয়ান মেডিকেল এসোসিয়েশন (আই এম এ)। ডা. রায় ছিলেন এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম একজন। প্রায় বারো বছর তিনি এর সম্পাদক এবং বেশ কয়েক বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ বছরগুলোতে তিনি চিকিৎসা পেশাজীবীদের সংঘবদ্ধ করার কাজে প্রায় পুরো দেশ ভ্রমণ করেন। আই এম এ জার্নালের প্রথম সম্পাদক স্যার নীলরতন সরকারের মৃত্যুর পর তিনিই এর দ্বিতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এ আন্দোলনের ফল হিসেবে ভারতের চিকিৎসা শিক্ষার শীর্ষ শাখা ‘ইন্ডিয়ান মেডিকেল কাউন্সিল’-এর জন্ম হয়। স্বাভাবিক ভাবেই কুমুদ শংকর রায় এ কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি হন।

চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ের উপর কুমুদ শংকরের অনেকগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সংবাদপত্র ও সাময়িকীসমূহে চিকিৎসা ও সামাজিক ইস্যু নিয়েও তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। উপমহাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশেষ করে বন্যা, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর সময়ে বেঙ্গল সিভিল প্রটেকশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রিলিফ কর্মকান্ড পরিচালনায় তিনি দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ফেলো হিসেবে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নৃতত্ত্ববিভাগ’ চালু করার ব্যাপারে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। যৌবনের শুরুতে কুমুদ রায় ছিলেন সুকুমার রায় এর ‘সোমবারের ক্লাব’ এর সদস্য এবং  প্রমথ নাথ চক্রবর্তী এর ‘সবুজপত্র’ চক্রের ঘনিষ্ট সহযোগী। কুমুদ শংকর রায় ১৯৫০ সালে মাত্র ৫৮ বছর বয়সে  ভেলোরে মারা যান।  [আর রায়]