বিড়ি

Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ০৬:৩১, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

বিড়ি  ধূমপানের জন্য তৈরি শুকনা তামাক পাতা দিয়ে পাকানো একটি ক্ষুদ্র শলাকা। শতাব্দীকাল ধরে গ্রামীণ এলাকায় সিগারেটের এই দেশজ বিকল্প ছিল জনপ্রিয়। উনিশ শতকের শেষদিকে ব্রিটিশরা কাগজে মোড়া সিগারেট ভারতে নিয়ে আসে। সম্ভবত ডব্লিউ. ডি অ্যান্ড এইচ.ও উইলস বাংলায় বাজার পাওয়া প্রথম বিদেশি সিগারেট কোম্পানি হিসেবে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে সিগারেটের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু আমদানিকৃত এই বিলাসদ্রব্য বাংলার সাধারণ জনগণের নাগালের বাইরে ছিল। কৃষকরা নিজেই ঐতিহ্যগতভাবে তামাক পাতা দিয়ে গৃহে বিড়ি তৈরি করে থাকে। এখানে বিড়ি তৈরির অসংখ্য ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প রয়েছে।

বিড়ি

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ক্ষুদ্র বা কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিতে ব্যাপক পরিমাণে বিড়ি তৈরি হতো না। বিড়িসেবীরা নিজেরাই ঘরের মধ্যে বিড়ি তৈরি করত। সুপারি উৎপাদনের এলাকাগুলিতে খুই কাগজ নামে পরিচিত সুপারি পাতার বহিঃস্তরের আবরণকে শুকনা ও চূর্ণ তামাক পাতার মোড়ক হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

বিড়িশিল্পের মূল কাঁচামাল বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় উৎপন্ন তামাক পাতা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত তিন বছরে তামাক পাতার বার্ষিক গড় উৎপাদন ছিল ৪০,৬৮৯ টন এবং বিড়ি ও তামাকের অন্যান্য সামগ্রীর গড় উৎপাদন ছিল ১০,৮৪০ টন। ১৯৭৯-১৯৮২ বছরগুলিতে এই সংখ্যা ছিল ৪৫,৯৯৭ টন ও ১৪৮৩৮ টন।

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন পরিচালিত এক জরিপকর্ম অনুসারে দেশে ১,৩৩০টি বিড়ি প্রস্ত্ততকারী কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির মোট স্থায়ী বিনিয়োগ ছিল ১৫.৩০৩ মিলিয়ন টাকা এবং এগুলি ৫,০৭৫ জন শ্রমিকের চাকরির সংস্থান করেছিল, যার মধ্যে ৩,৩১৬ জন ছিল শ্রমিক পরিবারের সদস্য এবং ১,৬৯৯ জন ছিল ভাড়া করা লোক। এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবহূত কাঁচামালের মূল্য ৩৯.১৩৯ মিলিয়ন টাকা এবং কাঁচামালকে শিল্পে রূপান্তরের ব্যয় ৪৯.৪৮৩ মিলিয়ন টাকা।

বাংলাদেশের বিড়িশিল্পে রয়েছে এমন এক অনন্যতা যা স্থানীয় শিল্প-উদ্যোক্তাদের বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা এবং বিনিয়োগে অকপটতার পরিচয় দেয়; এই শিল্পে নিয়োজিত লোকেরা ব্যবস্থাপক বা শ্রমিক হিসেবে শ্রমদানের অভ্যাস, নিয়মানুবর্তিতা ও দেশীয় দক্ষতার জন্য স্বীকৃতি পেতে পারে। এই শিল্পে সাফল্যের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো ফকিরচাঁদ বিড়ি ফ্যাক্টরি, ভান্ডারি বিড়ি ফ্যাক্টরি, আবুল বিড়ি ফ্যাক্টরি এবং আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি। উন্নতমানের বিড়ি তৈরিতে ব্যবহূত টেন্ডু পাতার আমদানি বন্ধের ফলে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে আজিজ বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিক শেখ আজিজের স্বকীয় প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কাগজে মোড়া বিড়ি চালু হওয়ার কারণে বিড়িশিল্পে যে পরিবর্তন ঘটেছে সে আলোকে তিনি স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দেন। আজিজ গ্রুপ ও শেখ আজিজের আদর্শ অনুসরণে আরও অনেকে তাদের বিড়ি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে সিগারেট উৎপাদনকারী কারখানায় রূপান্তর করে।

এইসব শিল্প-উদ্যোক্তাদের অনেকেই তাদের ব্যবসাকে নানাদিকে ছড়িয়ে যথেষ্ট মূলধন সঞ্চয় করতে পেরেছিল এবং পরবর্তীকালে তারা সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছিল।

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের ঐতিহ্যে বিড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পানের মতো বিড়িও একটি সাধারণ বস্ত্ত যা কারও বাড়িতে কেউ এলে কিংবা বাজার বা চা দোকানের মতো স্থানগুলিতে পরিচিত কারও দেখা পেলে দেওয়া হয়। তবে বয়োজ্যেষ্ঠদের সামনে বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে বিড়ি বা সিগারেট না খাওয়া বাঙালিদের মধ্যে প্রথাসিদ্ধ আচরণ। বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের বহু নারী নিয়মিত ধূমপান করে। অনেকে এখন ভিন্ন স্বাদ পাওয়ার জন্য বিড়ি খায়। সম্প্রতি বিড়ি বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে যার ভোক্তা প্রবাসী বাঙালি। বিশেষত বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের স্বদেশানুভূতিই বিড়ি রপ্তানির এই ক্ষেত্র প্রস্ত্তত করেছে।  [এম. হবিবুল্লাহ]