ফয়জননেসা, নুরুননাহার

ফয়জননেসা, নুরুননাহার (১৯৩২-২০০৪) বাংলাদেশের নারী শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলের অধ্যক্ষ (নিয়োগ ১৯৬৬), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর শিক্ষক (অধ্যাপক হিসেবে অবসর, ১৯৯৪) এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত প্রথম মহিলা সিন্ডিকেট সদস্য (১৯৮৫-১৯৮৬) ও বাংলাদেশের জাতীয় বেতন কমিশনের প্রথম মহিলা সদস্য। তাঁর জন্ম ১৯৩২ সালের ২১ মে, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাকদায়। শিক্ষা, নারী অধিকার ও সামাজিক উন্নয়নের আন্দোলনে অগ্রদূত হিসেবে সুখ্যাত ফয়জননেসার পিতা পাঁচনুরের দরগাহী পরিবারের খানসাহেব কাজী মোহাম্মদ সদরুল ওলা, যিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকুরিতে যোগ দেন এবং মন্ত্রণালয়ের সংসদ বিষয়ক বিভাগে উপ-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাতা বেগম রাতুবুননেসা ছিলেন মুর্শিদাবাদের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা। কাজী মোহাম্মদ সদরুল ওলার পূর্বসূরী মির্জা ইতেশামুদ্দীন উঁচু পর্যায়ের একজন আলোকিত দূত হিসেবে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ভ্রমণ করেন। ইতেশামুদ্দিন রচিত ভ্রমণ কাহিনী ‘বেলায়েতনামা’ গ্রন্থে এ বিষয়ে প্রামাণ্য বিবরণী পাওয়া যায়।

নুরুননাহার ফয়জননেসা

ফয়জননেসা শৈশব থেকেই পরিবারের প্রগতিশীল ধ্যানধারনায় প্রভাবিত ছিলেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার প্রতি তাঁর আকর্ষণ গড়ে ওঠে। তিনি পড়াশোনা শুরু করেন কলকাতার সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলে, এরপর ভর্তি হন ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশনে এবং এখান থেকেই ১৯৪৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সমাপ্ত করেন। ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পর তাঁর পরিবার চট্টগ্রামে আসে এবং এখানে তিনি ১৯৪৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক সমাপ্ত করে ১৯৫০ সালে চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সে বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সৈয়দ মকসুদ আলীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফয়জননেসা ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে, ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড এবং ১৯৬৮ সালে কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে প্রাথমিক শিক্ষায় পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন।

শিক্ষাক্ষেত্রেই ফয়জননেসার কর্মজীবন গড়ে ওঠে এবং অগ্রণী শিক্ষাকর্মী হিসেবে তিনি অনেক সাফল্য অর্জন করেন যেগুলির কারণে তিনি বাংলাদেশে শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতির আন্দোলনে একজন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৫৩ সালে সিদ্ধেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, এরপর শিক্ষকতা করেন ভিকারুননেসা নুন স্কুলে। তিনি ১৯৫৯ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশন এন্ড রিসার্চ-এ শিক্ষকতায় নিযুক্ত হন। ১৯৬৬ সালে তাঁকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হয় এবং বাংলাদেশে শিক্ষা চর্চায় নতুন মানদণ্ড তৈরি ও সেসবের ভিত্তিতে শিক্ষার মান উন্নয়নই ছিল এই পদে তাঁর প্রধান দায়িত্ব। শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে প্রসারিত করাকে ফয়জুননেসা একটি ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি নারী অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন এবং এ কারণে যারা প্রচলিত ধ্যানধারনায় বিশ্বাসী ও পরিবর্তনের বিরোধী তাঁদের সঙ্গে মতপার্থক্য প্রায়শই বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করত। ১৯৮১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ হিসাবে তিনিই ছিলেন প্রথম নারী প্রাধ্যক্ষ যিনি এই পদে পরপর দুই মেয়াদে নিয়োগ পান। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর অশেষ নিষ্ঠাবোধ ছিল, তাদের মঙ্গল ও একই সঙ্গে সুশৃঙ্খল আচরণ দুবিষয়েই তিনি ছিলেন মা-এর ভূমিকায় কর্তব্যনিষ্ট একজন আদর্শ অভিভাবক। এ কারণে কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থী তাঁকে এখনও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

নারী অধিকার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল ফয়জননেসার রাজনৈতিক সক্রিয়তার অংশ। ১৯৮৫-৮৬ মেয়াদে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর্তৃপক্ষ সিন্ডিকেটের প্রথম নির্বাচিত মহিলা সদস্য। তিনি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটেরও সদস্য নির্বাচিত হন, পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলাদেশ পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টারের বোর্ড অফ গভর্নর্স-এর সদস্য ছিলেন। শিক্ষা ও রাজনীতিতে নারীদের মর্যাদাপূর্ণ স্থান অর্জনে ফয়জননেসা যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন।

ফজয়ননেসা সমাজকল্যাণ ও সাংস্কৃতিক বিকাশের কাজেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে তিনি আজিমপুর লেডিজ ক্লাব প্রতিষ্ঠার জন্য একজন উদ্যোগী নেত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে এই উদ্যোগের ক্রমধারায় অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালে তিনি ছায়ানীড় প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিশু সন্তানদের জন্য একটি ডে-কেয়ার সেন্টার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় একটি সমবায় বিপণী প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর চেষ্টাতেই রোকেয়া হলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনের পার্শ্ববর্তী স্থানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে দুটি স্মারক ভাষ্কর্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

ফয়জননেসার জীবনে একটি কর্মপ্রয়াস ছিল বাংলাদেশের নারীদের ক্ষমতায়ন বিষয়ে কাজ। তিনি বেগম রোকেয়া ফাউন্ডেশনের একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন যেটি দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিয়ে আসছে। তাঁরই উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উইমেন স্টাডিজ ডিপার্টমেন্ট নামে একটি নতুন বিভাগ চালু হয়েছে। তিনি মহিলা পরিষদেরও একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং সংস্থাটির মহানগর শাখার সভাপতি ছিলেন, যে পদে থেকে তিনি ‘উইমেন ফর উইমেন’ নামে নারীদের একটি গবেষণা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

ফয়জননেসা অনেকগুলি প্রকাশিত রচনার লেখক এবং এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে ‘হাতের লেখা শিখন পদ্ধতি’, ‘একাত্তরের প্রচ্ছন্ন প্রচ্ছদ’, ‘কালের শামুখ ভেলা’ (সম্পাদক), ‘চিলড্রেন’স ওয়ার্ল্ড অফ ইফেকটিভ বিহেভিয়ার: সোশ্যাল এন্ড পলিটিক্যাল’ এবং রোকেয়া সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল স্কুলের ৩৫ প্রাক্তন শিক্ষার্থীর লেখা সমন্বয়ে গ্রহ্নিত ‘রোকেয়ার মানস কন্যা’। এসব প্রকাশনা থেকে শিক্ষা, শিশু উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়নে ফয়জননেসার ঐকান্তিক আগ্রহ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে এগুলি তাঁর অন্তর্দৃষ্টিমূলক নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর প্রভাবেরও পরিচয় বহন করে। ১৯৪৭-এ দেশবিভাগের পর পুরনো ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সেসময় বেতার বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ড. ফয়জননেসা ড্রামা সার্কেলে যোগ দিয়ে বেতারে বাংলা ও ইংরেজি নাটক সম্প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

ড. ফয়জননেসা শিশু, তরুণ ও যুব সমাজের মানস ও গঠনমূলক সংস্কৃতি বিকাশেও ভূমিকা রাখেন যার অংশ হিসেবে ১৯৬০-এর দশকে রেডিও-র ‘খেলাঘর’ প্রোগ্রামে তাঁর গঠনমূলক কাজের কথা বলা যায়। এসব প্রোগ্রামে শিশু-তরুণরা ‘লাইভ’ শো-তে অংশ নিতেন। এভাবে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে ফয়জননেসার পরিচয় গড়ে ওঠে এবং তিনি রেডিওতে নারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য যথাক্রমে ‘মহিলা মাহফিল’ ও ‘শিক্ষার্থীদের আসর’ নামে দু’টি অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। ২০১৯ সালে ফয়জননেসা ‘রোকেয়া পদকে’ ভূষিত হন (মরনোত্তর) এবং এটি ছিল নারীসমাজের বিকাশ ও শিক্ষায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতি। ফয়জননেসার দুই ছেলে সন্তানের একজন ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ সাদ আন্দালিব এবং ‘কনেক্ট হাব লি.’-এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়া সাঈদ আরস্তু। তাঁর মেয়ে সন্তানও দু’জন: নজরুল সংগীত গায়িকা ‘জেমস অফ নজরুল’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাংবাদিক সাদিয়া আফরিন মল্লিক এবং অপরজন ‘স্পর্শ ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও শিশুসাহিত্যিক নাজিয়া জাবীন।

ফয়জননেসা ২০০৪ সালের ৩১ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তবে তিনি যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে গেছেন, অসংখ্য যত গুণীজন তৈরি করেছেন এবং শিক্ষা ও নারী অধিকার আন্দোলনে যে পদচিহ্ন রেখে গেছেন সেসবের মধ্য দিয়েই তিনি সদা জাগরুক আছেন। তাঁর জীবন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, শিক্ষার গুরুত্ব ও সামাজিক ন্যায্যতার প্রতীক। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাঁর অবদান উজ্জ্বল থাকবে। তিনি সর্বদাই থাকবেন অগ্রদূত ও প্রণম্য মানুষদের তালিকায়। [সাদিয়া আফরিন মল্লিক]